১১:২৪ এএম, ২৫ নভেম্বর ২০১৭, শনিবার | | ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

অনিন্দিতার বাড়ি ফেরা

০৭ আগস্ট ২০১৭, ০১:০৫ পিএম | পলি


এসএনএন২৪.কম : প্রায় এক মাস পর বাড়ি ফিরছে অনিন্দিতা।  উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে ভার্সিটির ভর্তি কোচিং করার জন্য শহরে গিয়েছিল।  সামনে পূজা, তাই কোচিং ছুটি হয়ে গেছে।  হোস্টেলের গেট থেকে বাবার সঙ্গে মথুরা বাজার পর্যন্ত এসেছে।  বাজারের পাশেই ওর প্রাক্তন কলেজ।  গাড়ি থেকে নেমে কলেজের দিকে তাকায়।  মনটা বেদনায় হু হু করে ওঠে।  বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে।  চোখ দু’টি ঝাপসা হয়ে আসে।  অতীতের স্মৃতি হানা দেয়।  বাবার ডাকে চৈতন্য ফিরে পায়।  বাবার পিছু পিছু বাড়ির পথে পা বাড়ায়। 

মনে পড়ে ফেলে আসা অনেক স্মৃতি।  মাত্র ছয় মাস।  বেশিদিন আগের কথাও নয়।  মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিযে কলেজে পা রাখতেই ভিন্ন এক অনুভূতি কাজ করে।  জীবনটাকে উপভোগ্য মনে হয়।  সবার ক্ষেত্রেই যেটা হয়।  নিজেকে নতুন করে দেখা।  কেমন একটা ভালো লাগা- ভালোবাসার জন্ম হয় ভেতরে ভেতরে।  ভালো লাগা যদিও বিপজ্জনক।  তা-ও আবার সহপাঠি কিংবা উপর শ্রেণির কেউ হলেও ভিন্ন কথা।  অনেকটা আকাশ থেকে পড়ার মতো। 

কৃষ্ণ সারথী তার মন হরণ করেছিল।  কলেজের বাংলা প্রভাষক।  খণ্ডকালীন শিক্ষক হয়ে এসেছিলেন কলেজে।  এমএ পাস করে সময় কাটানোর জন্য এই কলেজে পড়াতে আসে।  পাশাপাশি স্থায়ি একটা চাকরির খোঁজে।  কৃষ্ণ সারথী অল্প কয়েক দিনেই কলেজে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।  অন্য ক্লাসে ছাত্রছাত্রী না থাকলেও তার ক্লাসে কক্ষভর্তি।  ব্যাপারটা খুব উপভোগ্য মনে হয় তার কাছে।  লেকচার দিয়েও মজা পায় খুব। 

বাইরে বেশ গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ।  কারো সঙ্গে খুব বেশি মেশে না।  কোন আড্ডাতেও তেমন নেই।  ক্লাস শুরুর দশ মিনিট আগে কলেজে আসে।  পাঠদান শেষে আবার চলে যায়।  থাকে উপজেলা শহরে।  সেখান থেকে বাস বা অটোরিকশায় চড়ে প্রতিদিন এই কলেজে আসে।  কলেজ থেকে যে টাকা পায়; তা হয়তো যাতায়াতেই শেষ।  তবুও আসে।  শিক্ষক বলে একটা মর্যাদা তো আছে?

ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক বা শিক্ষকদের মধ্যে কেউ ডেকে কথা বললে উত্তর দেয়।  এ ব্যাপারটা ছাত্রীদের বেশ মর্মাহত করে।  কৃষ্ণ সারথী বয়সে নবীন, অবিবাহিত পুরুষ অথচ মেয়েদের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে না।  কোন মেয়ে প্রশ্ন করলে বা কিছু জানতে চাইলে হাঁটতে হাঁটতেই জবাব দেয়।  গায়ে পড়ে কিছু বলার মতো লোক না। 

কৃষ্ণ সারথীর এমন ‘আমি-আমি’ ভাবটা ভালোই লাগে অনিন্দিতার।  সে-ও সুযোগ খোঁজে কিছু বলার।  একবার সুযোগ পেলে ভালোবাসার কথাটাই না হয় বলে দেবে।  অবশ্য কৃষ্ণ সারথীকে অহংকারী বলেই জানে অনিন্দিতা।  দেখতে দেখতে ছয় মাস পার হয়ে যায়।  ঘুঘু তো আর খাচায় ধরা দেয় না।  ফাঁদ পেতে বসে আছে।  অথচ ফাঁদের আশপাশ দিয়েও হাঁটে না শিকার।  শিকারী শুধু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।  কিন্তু কথা বলার সুযোগও তো হয় না।  ক্লাসেও প্রশ্ন করতে সাহস হয় না। 

কৃষ্ণ সারথীর ব্যক্তিত্ব, চলাফেরা ও গুণাবলীতে সবাই তাকে সমীহ করে।  একটু বেশি শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে, শুভকামনা করে।  বিষয়টা অনিন্দিতার কাছে সুখকর বলে মনে হয় না।  প্রতিহিংসার অন্তর্জ্বালায় জ্বলতে থাকে সে। 

আট-নয় মাস পর ফেসবুকের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় অনিন্দিতা।  নাম খুঁজে পেয়ে যায়।  বন্ধুত্বের আবেদন জানায়।  অনিন্দিতার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেয়ে আইডিটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবে কৃষ্ণ সারথী।  কলেজের কিছু ছাত্রের সঙ্গে ফেসবুকে বন্ধুত্ব করলেও কোন ছাত্রীকে এখনো বন্ধুতালিকায় যুক্ত করেনি।  অনিন্দিতাকে যুক্ত করলে এটাই হবে প্রথম।  অনেক ভেবে-চিন্তে উদার মনেই তাকে গ্রহণ করে। 

রাত জেগে লেখালেখির অভ্যাস কৃষ্ণ সারথীর।  সারা দিনের কর্মব্যস্ততার পর রাত ১১টায় বাসায় ঢোকে।  তাই ফেসবুকেও রাতেই বসে।  রাত যত বাড়ে, ফেসবুকে কবি-সাহিত্যিকের সংখ্যাও বাড়ে।  এক গভীর রাতেই ক্ষুদেবার্তার মাধ্যমে অনেক কিছু জানা হয় অনিন্দিতার।  অনিন্দিতাও জেনে নেয় কৃষ্ণ সারথীকে।  তিনি আবৃত্তি করেন, মঞ্চ নাটক করেন ইত্যাদি।  অনিন্দিতা গান গাইতে ভালোবাসে।  কৃষ্ণ সারথী একটা গান শোনানোর আবদার করে একরাতে।  অনিন্দিতা কৃষ্ণ সারথীর মুঠোফোনে সাড়া দেয়।  তাকে গান শোনায়।  বিমোহিত হয়।  আলাপ জমতে থাকে। 

দিন যতই গড়ায় তাদের সম্পর্কও ততই মধুর হতে থাকে।  জীবনের ব্যর্থতা, হতাশা, গ্লানি- সবই ভাগাভাগি করে নেয় দু’জন।  কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়।  দু’জনেই যেন কারো দ্বারা প্রতারিত।  জীবনের প্রথম হোচট কাটিয়ে নতুন গতিতে চলতে একটু দম নিতে হয়।  কৃষ্ণ সারথীও মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় অনিন্দিতাকে জীবন সঙ্গী করার।  কাউকে না কাউকে তো বিয়ে করতেই হবে।  একটু জানাশোনা থাকলে মন্দ হয় না ভেবেই অনিন্দিতাকে গ্রহণ করার চিন্তা করে। 

সেদিন গভীর রাতে অনিন্দিতাই ভালোবাসার কথাটা জানায়।  কেঁপে ওঠে কৃষ্ণ সারথীর সারা শরীর।  কোন হঠকারিতা বা ছলচাতুরী নেই তো এর মধ্যে? তারা উভয়ে হিন্দু ধর্মের হলেও পান্না বা পরিমলের কথা স্মরণ করে ছাত্রীর প্রেমে সাড়া দিতে প্রবৃত্তি হয় না।  লোকে শুনলে মন্দ বলবে এ ভয়ে কিছুদিন ঝুলন্ত অবস্থায় থেকে যায় ব্যাপারটা। 

ক্লাসে গেলে অনিন্দিতার দিকে চোখ তুলে তাকাতে সংকোচ হয়।  অনিন্দিতাও লজ্জা পায়।  কখনো কখনো ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকে কৃষ্ণ সারথীর দিকে।  অন্যমনস্ক হয়ে যায় মাঝে মাঝে।  এভাবেই চলে যায় কিছুদিন।  অবশেষে অনিন্দিতার জোরালো আবেদনে ইতিবাচক সাড়া দিতে বাধ্য হয় কৃষ্ণ সারথী। 

বিষয়টি গোপন রাখার শর্তে ফেসবুক আর ফোনেই সারা দিন-রাত কথা হয় তাদের।  কৃষ্ণ সারথীর শত ব্যস্ততার মাঝে কখনো কখনো যোগাযোগ শিথিল হয়ে যায়।  অনিন্দিতা কষ্ট পায়।  কান্নাকাটি করে।  কথা বলতে বলতে রাত ভোর হয়ে যায়।  খুনসুঁটিতেই কেটে যায় অগণিত সময়।  অতি গোপনীয়তার মাঝে এগিয়ে চলে প্রেম।  ক্যাম্পাসে কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না।  যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে।  অনিন্দিতা কখনো সাজেশন, কখনো প্রশ্নের উত্তর খোঁজার নামে কৃষ্ণ সারথীর কাছে আসে।  একটু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অনেক তৃপ্তি আর সন্তুষ্টি নিয়ে বাড়ি যায়। 

প্রেম যতই গোপন হোক; একদিন তা প্রকাশিত হয়।  তাদের বেলাতেও ব্যতিক্রম হয়নি।  কিছুদিন যেতেই লুকিয়ে ফোনে কথা বলার সময় অনিন্দিতা মায়ের কাছে ধরা পড়ে যায়।  মা জানতে পারেন কৃষ্ণ সারথীর কথা।  তিনিও কথা বলেন কৃষ্ণ সারথীর সঙ্গে।  এরপর থেকে মায়ের মাধ্যমেই অনিন্দিতার সঙ্গে কথা হয় কৃষ্ণ সারথীর।  মা তাদের অনেক সহযোগিতা করেন।  অনিন্দিতা বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে।  বড়ই আদরের।  বাবা বাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী।  জমি-জমাও মন্দ নয়।  বাবার এখন বিশ্রাম দরকার; বয়স হয়েছে।  অনিন্দিতাকে নিয়ে বাবা-মা’র অনেক স্বপ্ন।  অনিন্দিতাও চায় পরিবারের হাল ধরতে।  কৃষ্ণ সারথীও তাদের পাশে দাঁড়াতে চায়। 

দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে কৃষ্ণ সারথীর বিদায়ের ক্ষণ এসে হাজির হয়।  অনিন্দিতার নির্বাচনী পরীক্ষার পর কৃষ্ণ সারথীও কলেজ থেকে বিদায় নেয়।  সঙ্গে নিয়ে ফেরে অনিন্দিতার একবুক ভালোবাসা।  অর্জন এই এতটুকুই।  মার্চ মাসে ঢাকায় একটা অফিসে চাকরি হয় কৃষ্ণ সারথীর।  অনিন্দিতা ও তার মা সাদরে গ্রহণ করে এ সুসংবাদ।  কারণ অনিন্দিতার মা-ই বলেছিল, ‘মেয়ের বিয়ের বয়স হচ্ছে।  তোমাকে তাড়াতাড়ি প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। ’ বলতে গেলে অনিন্দিতার ভালোবাসার পরশে অগোছালো একটা মানুষ নিজেকে গোছাতে আরম্ভ করে।  নিয়মিত অফিস করে।  কাজের ফাঁকে ফাঁকে কথা হয় অনিন্দিতার সঙ্গে।  সারাক্ষণ কত স্বপ্ন বোনে তারা। 

দু’মাস পরে শারীরিক গোপন সমস্যার চিকিৎসার জন্য বাবা-মা’র সঙ্গে অনিন্দিতা ঢাকায় আসে।  কৃষ্ণ সারথীকে ফোন দিয়ে দেখা করতে বলে।  দেখা হয় তাদের।  কিন্তু সমস্যার কথা বলে না কৃষ্ণ সারথীকে।  ‘তেমন কিছু না।  মেয়েলি ব্যাপার।  ও তুমি বুঝবে না’ বলে অনেকটা সময় কাটিয়ে দেয় অনিন্দিতা।  তাদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আনন্দ চিত্তেই অফিসে ফেরে কৃষ্ণ সারথী।  অফিস শেষে বাসায় গিয়ে কথা হয় দু’জনের।  অনেক কথা। 

চিকিৎসা শেষে ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরে অনিন্দিতা।  এরপর থেকে হঠাৎ করে যোগাযোগ শিথিল হতে থাকে।  যে ফেসবুকের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠতা; সে ফেসবুকের কারণেই দ্বন্দ্ব শুরু হয়।  কৃষ্ণ সারথীকে এড়িয়ে চলে অনিন্দিতা।  চলে ঝগড়া-বিবাদ।  চলতেই থাকে।  একে অপরকে আনফ্রেন্ড করে।  ফোনের যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়। 

কৃষ্ণ সারথীর দেওয়া কমদামি ফোনটা অনিন্দিতার হাতে থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ফোন পায় না কৃষ্ণ সারথী।  কারণটা জানা হয় না।  কেন অনিন্দিতা তাকে এড়িয়ে চলে? কী অপরাধ তার? অনিন্দিতাও কিছু বলে না।  শুধু কাঁদে।  ‘তোমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব না’- এর বেশি কখনোই সে বলতে পারেনি কৃষ্ণ সারথীকে।  অনিন্দিতার মায়ের ফোনে ফোন দিয়েও এখন পাওয়া যায় না তাকে।  একবুক হতাশা নিয়ে বিরহের অথৈ জলে হাবুডুবু খেতে থাকে কৃষ্ণ সারথী। 

একদিন রাগের মাথায় কিছু অপ্রাসঙ্গিক ও কড়া কথা বলেছিল কৃষ্ণ সারথী।  খুব কষ্ট পেয়েছিল তাতে অনিন্দিতা।  পুরুষদের প্রতি একটা বিরূপ ধারণা জন্মায় তার।  পারিবারিক জটিলতা, মানসিক দ্বন্দ্ব, পূর্বাপর প্রতারণা ক্রমান্বয়েই বিধ্বস্ত করে তোলে অনিন্দিতাকে।  অবশেষে তিক্ততম সমাপণ।  কৃষ্ণ সারথী অনেক চেষ্টা করে অনিন্দিতাকে ফেরাতে।  ক্ষমা চায়।  কাঁদে।  অনিন্দিতা নাছোড় বান্দা।  অনিন্দিতার মা-ও ফেরাতে পারে না মেয়েকে।  কৃষ্ণ সারথীকে সান্ত্বনা দেয়।  হতে পারে সেটা অন্তর থেকে অথবা ছেলে ভোলানো। 

সামনে পূজা।  একবছরের বেশি সময় পার হতে চলেছে।  অথচ সম্পর্কটা বিচ্ছেদের চূড়ান্তে।  গত পূজায় খুব মজা করেছিল দু’জন।  একে অন্যের পছন্দের পোশাক পরেছে।  দিনগুলো বেশ আনন্দেই কেটেছিল।  অথচ কৃষ্ণ সারথী এবার ছুটিতে বাড়ি আসবে না।  ঢাকাতেই থেকে যাবে একা।  পূজা উপলক্ষে কোন কেনাকাটাও করেনি।  কী কিনবে? কেন কিনবে? কার পছন্দে কিনবে? হিসেব মেলে না।  এমন বিষাদময় আনন্দ চায় না সে।  সে নির্মল আনন্দ চেয়েছিল।  গম্ভীর মানুষটা আরো বেশি গম্ভীর হয়ে যায়। 

অনিন্দিতাকে বাড়ি ফিরতেই হয়।  হোস্টেল বন্ধ হয়ে গেছে।  থাকার কোন উপায় ছিল না।  কৃষ্ণ সারথীর জন্য মন কাঁদে।  কিন্তু ফিরে যাবার পথও বন্ধ।  সে পথে নিজেই কাঁটা বিছিয়ে রেখেছে।  তাই বিষণ্নতার ঝাঁপি নিয়েই বাড়ি ফিরছে অনিন্দিতা।  বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হয়- এমন প্রেম জীবনে না এলেই ভালো হতো।  কেন সে বন্ধুদের কথায় চ্যালেঞ্জ নিতে গেল? সেই চ্যালেঞ্জে সাময়িকভাবে সে জিতলেও চূড়ান্তভাবে জিতলো তার বন্ধুরা।  আর অনিন্দিতা ঠকালো দুটি মানুষকে- প্রথমত রূপমকে; দ্বিতীয়ত কৃষ্ণ সারথীকে।  তাই মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো- এই ফেরাই যেন শেষ ফেরা হয়। 

Abu-Dhabi


21-February

keya