৭:৫৪ পিএম, ২২ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার | | ২২ সফর ১৪৪১




অনুবাদে আমার প্রথম সাহস

৩০ নভেম্বর -০০০১, ১২:০০ এএম | মোহাম্মদ হেলাল


এসএনএন২৪.কম ডেস্ক : আমাদের বাংলা সাহিত্যের ত্রিশের দশকের প্রতিষ্ঠিত কাব্যাধুনিকতা থেকে বের হয়ে একজন স্বকীয় ধারার নাগরিক-বিদগ্ধ কবি হিসেবে শামসুর রাহমান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।  তিনি বাংলাদেশের প্রধান কবি তো বটেই, সেই সঙ্গে সমগ্র বাংলা সাহিত্যের অতি উল্লেখযোগ্য কবিও।  এমনকি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ কবি বলে আমি মনে করি।  বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একেবারে নিজস্ব কণ্ঠস্বর হয়ে তিনিই প্রথম এলেন।  তাঁর কবিতায় বাংলাদেশের পরিবর্তিত মধ্যবিত্ত নগরজীবনের প্রতিফলন ঘটেছে।  নান্দনিক দিক থেকেও রাহমান আকর্ষণীয়।  তাঁর কবিতার বিষয়বস্তুর পরিধি যেমন ব্যাপক তেমনি সমৃদ্ধ। 
আমার শামসুর রাহমানের কবিতা পাঠ ছাত্রাবস্থা থেকেই।  তাঁকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিজের কবিতার আবৃত্তি করতেও শুনেছি।  তাঁর সঙ্গে সত্তর দশকে একাধিকবার দেখা হয়েছে দৈনিক বাংলার অফিসে।  তখন তিনি আমাকে ইংরেজির ছাত্র ও একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জানতেন।  মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কবির ছিল ভীষণ আগ্রহ ও শ্রদ্ধা।  শামসুর রাহমানসহ অন্যরা একবার ভারতের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক খুসবন্ত সিংকে নিয়ে এলেন ঢাকায়।  শামসুর রাহমান আমাদের সবাইকে ডেকে পাঠালেন দৈনিক বাংলার অফিসে।  আমি আর শহীদ কাদরী গেলাম।  ইতিমধ্যে শহীদ কাদরী আমার খুব কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছেন। 
এরপর কবির সান্নিধ্য যাকে বলে, সেটি প্রথম পাই শামসুর রাহমানের বাড়িতেই, একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে।  আশির দশকের একেবারে শুরুর দিকের কথা।  তখন আমরা ফর্ম নামে একটা মানসম্মত ইংরেজি সাময়িকী বের করতাম।  মোট চারটি সংখ্যা হয়েছিল।  একটি সংখ্যার জন্য শামসুর রাহমানের একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম।  তবে সাময়িকীটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেটি আর প্রকাশের আলো দেখেনি।  তত দিনে আমি অনেকটাই পড়েছি শামসুর রাহমান; এবং মুগ্ধ হয়েছি, ভালো লেগেছে।  বিশেষত আমাদের ইতিহাসের যে বিবর্তন এবং সেই বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কবিতার যে পরিবর্তন—সেটি আমাকে ভীষণ মুগ্ধ করেছে।  সব ধরনের জাতীয় সংকটে তাঁর কবিতা আশ্রয়-অনুপ্রেরণা হিসেবে এসেছে আমাদের কাছে।  এই জন্য তাঁকে আমার খুব তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়; আর সেই মনে হওয়া থেকেই তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কিছু কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করার সুযোগ তৈরি হলে আমি দ্বিতীয়বার না ভেবেই সেটি লুফে নিই।  এখানে উল্লেখ থাকে যে আমার অনুবাদ কর্মের সূচনা ঘটে শহীদ কাদরীর কবিতা অনুবাদের মাধ্যমে।  কিন্তু বই হিসেবে শামসুর রাহমান-ই প্রথম। 

যদ্দুর মনে পড়ে, কাজটি শুরু হয়েছিল ১৯৮৪ সালের দিকে।  শামসুর রাহমান তখন দৈনিক বাংলার সম্পাদক।  আামি পড়াই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে।  ব্র্যাক সবে বই প্রকাশ শুরু করেছে।  তারাই আমাকে প্রস্তাব দিল, রাহমানের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশে আগ্রহ দেখাল।  কার মাধ্যমে যে শামসুর রাহমানের নির্বাচিত কবিতা অনুবাদের প্রস্তাবটি আমার কাছে এসেছিল, এত দিন বাদে তা আর আজ মনে নেই।  তবে এটি মনে আছে, আমি খুব আগ্রহের সঙ্গে প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছিলাম।  এ সময় অনুবাদ নিয়ে বেশ কয়েকবার কবির সঙ্গে কথা হয়েছে।  তিনি আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।  বলেছিলেন, আপনার যেসব কবিতা ভালো লাগে সেগুলো অনুবাদ করুন।  আমার কোনো অপত্তি নেই।  প্রথমে কবির বিভিন্ন সময়ের সিলেক্‌টেড পোয়েমস অব শামসুর রাহমান-এর প্রচ্ছদপ্রতিনিধিত্বশীল এবং তাৎপর্যপূর্ণ কবিতাগুলো থেকে বাছাই করা হলো।  তাঁর প্রথম দিককার কবিতাগুলো নান্দনিক ও কাব্যিক বোধের দিক থেকে অনেক বেশি শুদ্ধ মনে হলেও শেষের দিকের কবিতাগুলো আমার বেশি ভালো লাগার কারণ সেগুলো আরও বেশি দেশ-কাল-রাজনীতি-জীবন সম্পৃক্ত ছিল।  তো, নান্দনিক কবিতা এবং দেশ-কাল-রাজনৈতিক সম্পৃক্ত কবিতা—দুই পর্ব থেকেই কবিতা নেওয়া হলো মোটামুটি সুষমভাবে।  কিন্তু এ কথা আজ বলাই যায়, শামসুর রাহমানের কবিতার অনুবাদ মোটেও সহজ কাজ ছিল না।  বস্তুত কোনো অনুবাদই সহজসাধ্য ব্যাপার নয়।  ভাষার বোধ যতটা অনুবাদযোগ্য, ভাষার নান্দনিক বা আলংকারিক দিক ততটা অনুবাদযোগ্য নয়।  এক ভাষাকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করতে গেলে তাই উৎস-ভাষার কিছু না কিছু হারাবেই।  যে কারণে হয়তো মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্ট বলেছিলেন, ‘অনুবাদে যা হারিয়ে যায় তা-ই হচ্ছে কবিতা। ’ (শামসুর রাহমানও অনুবাদ করেছিলেন রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা)।  অনুবাদ প্রসঙ্গে এ মুহূর্তে ইতালির কথাসাহিত্যিক উমবার্তো ইকোর কথাও মনে পড়ছে।  তিনি বলেছেন, অনুবাদ মানেই হলো নেগোসিয়েশন।  অর্থাৎ একাধিক শব্দের ভেতর সমঝোতায় আসা।  ইকোর একটা বই আছে অনুবাদবিষয়ক—মাউস অর র‍্যাট? বাংলায় যদি বলি, একটা ইঁদুর দৌড়ে পালাচ্ছে।  ইংরেজিতে তাকে মাউস বলব, না র‍্যাট বলব? এখানেই আসছে বোঝাপড়ার ব্যাপার।  এখানে বাংলায় হয়তো একটা শব্দ আছে কিন্তু ইংরেজিতে আছে দুটো শব্দ।  আবার এর উল্টোটাও হতে পারে।  মূলত এসব জিনিস নেগোসিয়েট করতে হয়, কিছু জিনিস ছাড় দিতে হয়, কিছু বাড়তি যোগ করতে হয়।  আবার কবি-সমালোচক এজরা পাউন্ডের মতে, অনুবাদ হলো ‘এ ফর্ম অব ক্রিটিসিজম’।  অর্থাৎ অনুবাদ হচ্ছে মূল টেক্সটের সমালোচকীয় পাঠ।  অনুবাদক এটাকে কীভাবে বুঝলেন, কীভাবে আস্বাদন করলেন—এসব প্রকাশ পায় এর মধ্যে।  তাই আমি যে শামসুর রাহমানের কবিতা অনুবাদ করেছি, তাতে আমার কাব্যবোধ ও কাব্যরুচির ভেতর দিয়ে সেটি উপস্থাপিত হয়েছে।  এই কারণে মূল টেক্সট অভিন্ন থাকলেও বিভিন্ন অনুবাদে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো তার কিছুটা ভিন্নতা চোখে পড়ে। 
কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছন্দ।  বাংলা ভাষায় ছন্দটা হচ্ছে মাত্রা গুণে।  আর ইংরেজিতে স্ট্রেসের ওপর ভিত্তি করে।  এখন ইংরেজিতে করলে মূলের সঙ্গে সেটা কতটা তুল্য হতে পারে—এসব বিষয় শামসুর রাহমান অনুবাদের সময় মাথায় রাখতে হয়েছে।  এ ক্ষেত্রে আমি কোনো বাঁধাধরা নিয়ম অনুসরণ করিনি।  যেমন এখানে কবির প্রথম বই প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে-এর বিখ্যাত ‘টেলিমেকাস’ কবিতাটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করা যেতে পারে।  মূল বাংলায় কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত।  মাত্রাবৃত্তে যে রকম একটা মৃদুদোলা আছে, এই অনুবাদে ঠিক ওই দোলাটা নেই।  তবে সেই দোলের মধ্যে যে নাটকীয়তা আছে, সেই নাটকীয়তাটা এখানে অটুট রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।  অনুবাদে মোটের ওপর আমি কবিতার মুড বা ভঙ্গিকে ধরার চেষ্টা করেছি। 

তো, এসব বাস্তবতা মেনে নিয়েই আমি শামসুর রাহমানের নির্বাচিত কবিতা অনুবাদে হাত দিই এবং ধীরে ধীরে কাজটি সম্পন্ন করি।  কবিতাগুলো এমন করে অনুবাদ করার চেষ্টা করি যাতে সেগুলো যেন কোনো আক্ষরিক অনুবাদ না হয়ে ওঠে—আলাদা করে ইংরেজিতে কবিতা হয়েছে বলে মনে হয়।  সেই চেষ্টা থেকেই কবিতাগুলো অনুবাদ করেছি।  ১৯৮৫ সালে ব্র্যাক থেকে সিলেক্টেড পোয়েমস অব শামসুর রাহমান শিরোনামে বইটি বের হয়।  এটি ছিল বাই ল্যাঙ্গুয়াল—অর্থাৎ বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষা পাশাপাশি ছিল। 

বলতে পারি, পাঠক ভালোভাবেই গ্রহণ করেছিলেন বইটি।  বাংলা সাহিত্যের বিদেশি পণ্ডিত উইলিয়াম রাদিচে তখন দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য নিয়ে কাজ করছেন।  প্রশংসা করে তিনি বইটির একটি আলোচনা লিখেছিলেন।  ইতিহাসবিদ শ্রীনাথ রাঘবন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর ১৯৭১: আ গ্লোবাল হিস্ট্রি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ শীর্ষক একটা গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছিলেন।  ওই বইয়ের পেছনের ব্লার্ব লিখেছিলাম আমি।  পরে রাঘবন আমাকে জানান যে আমার এ কাজে তিনি খুব খুশি হয়েছেন, কেননা যখন তিনি ১৯৭১-এর ওপর কাজ করছেন, তখন আমার অনুবাদে শামসুর রাহমানের নির্বাচিত কবিতা সব সময় তাঁর সঙ্গে ছিল।  রাহমানের কবিতা পড়ে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা পান তিনি। 

পরে অবশ্য বইটির একটি বর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে পাঠক সমাবেশ থেকে, ২০০৮ সালে।  এই নব্য মুদ্রণে কয়েকটি কবিতা যোগ করা হয়েছে, যেগুলো পরে বিভিন্ন সময়ে অনূদিত।  তবে এই সংকলনটি এখন আর বাজারে নেই।  আগামী নভেম্বরে ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’-এ সিলেক্‌টেড পোয়েমস অব শামসুর রাহমান-এর নতুন একটা সংস্করণ বের হতে যাচ্ছে।  এখানে যুক্ত হচ্ছে নতুন আরেকটি কবিতা—‘স্বাধীনতা তুমি’।  আগের সংস্করণগুলোয় কবির জনপ্রিয় এই কবিতাটি ছিল না।  ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটি অনুবাদের পেছনে একটি কাহিনি আছে—ঔপন্যাসিক তাহমিনা আনাম তাঁর এ গোল্ডেন এজ উপন্যাসের জন্য উইলিয়াম রাদিচেকে অনুরোধ করেছিলেন কবিতাটি অনুবাদ করে দিতে।  কিন্তু রাদিচে তাঁকে বললেন আমার নাম।  আদতে রাদিচে ও তাহমিনার অনুরোধে এ গোল্ডেন এজ-এর জন্য কবিতাটির কিছু অংশ অনুবাদ করি।  পরে বাকিটা শেষ করেছি এই প্রকাশিতব্য সংকলনের জন্য। 

কবিতার অনুবাদে আক্ষরিক হতে গেলে অনেক সময় কাব্যিক দ্যোতনাটা নষ্ট হয়ে যায়।  তাই কাব্যময়তার কথা ভেবে ‘ওয়ার্ড ফর ওয়ার্ড’ বা শব্দের বদলে শব্দ—এই মতবাদে না গিয়ে ‘সেন্স ফর সেন্স’ অর্থাৎ চিন্তার আলোকে চিন্তা—এই মতবাদে যেতে হয়।  আমিও সেটা করেছি। 

সিলেক্‌টেড পোয়েমস অব শামসুর রাহমান অনুবাদের ক্ষেত্রে আমার প্রথম সাহস।  আমার প্রথম অনূদিত বই।  ফলে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অন্য রকম প্রেম।  পরে মনসামঙ্গলসহ আরও বেশ কয়েকটি বই অনুবাদ করেছি আমি।  এখন বই করার জন্য আবারও অনুবাদ করছি শহীদ কাদরীর কবিতা; তবে শামসুর রাহমানের নির্বাচিত কবিতার সঙ্গে আমার যে ভালোবাসা, সে তো প্রথম প্রেমের মতো।  ভুল বললাম, প্রথম প্রেমের মতো নয়, সে আমার প্রথম প্রেমই। 

এসএনএন২৪.কম/মিম