৩:১৩ এএম, ২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার | | ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

আইন শিক্ষার আধুনিকায়নে কিছু প্রস্তাব

১৯ অক্টোবর ২০১৭, ১২:০৩ পিএম | নিশি


এসএনএন২৪.কম: মানবজীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে আইন।  এ থেকে পালানোর কোনো পথ নেই, এমনকি মৃত্যুতেও। 
ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে মাতৃগর্ভে থাকতেই অজ্ঞাত ব্যক্তি আইনের সুরক্ষা পায়।  আবার মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ, সুনাম, সম্পত্তি আইনের আওতায় পরিচালিত হয়।  আইন ছাড়া এক মুহূর্তও চিন্তা করা যায় না।  ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র আর রাষ্ট্রের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন আইন ছাড়া অচল।  কাজেই আইন শিক্ষার গুরুত্ব ও এর আধুনিকায়ন অতিরঞ্জিত করার সুযোগ নেই।  সাবেক ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে আইন ও বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাঁচ হাজার বছরেরও অধিক পুরনো লিখিত ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায়।  খ্রিস্টের জন্মের আগে ও পরে মিলিয়ে এক হাজার ৫০০ বছর ধরে হিন্দু শাসনামল প্রচলিত ছিল ভারতবর্ষে।  এ সময় আইন ও বিচারব্যবস্থা প্রধানত হিন্দু শাস্ত্রভিত্তিক ছিল।  সুসংগঠিত আদালতব্যবস্থার পাশাপাশি সুবিন্যস্ত পদ্ধতিগত আইন নারদ স্মৃতি, বৃহস্পতি স্মৃতি, কাত্যায়ন স্মৃতির সাক্ষাৎ মেলে এ সময়ে।  বর্তমান সময়ের বার কাউন্সিল, বার অ্যাসোসিয়েশনের মতো আইনজীবীদের প্রতিষ্ঠান সে সময় না থাকলেও আইনজীবীরা আদালতে মামলাকারীদের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করতেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।  হিন্দু শাসনামলের পর ১১৯২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ভারতবর্ষের শাসনকার্য পরিচালনা করে মুসলমানরা।  এ সময় সাম্রাজ্যের রাজধানী থেকে গ্রাম অবধি আদালতের শ্রেণিক্রম বিস্তৃত ছিল।  পদ্ধতিগত আইন হিসেবে বিখ্যাত ছিল ফিকহ-ই-ফিরোজশাহী ও ফতোয়া-ই-আলমগীরি।  আধুনিক বিচারব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের মতো মুহতাসিব-ই-মুমালিক ছিলেন সাম্রাজ্যের প্রধান আইন কর্মকর্তা।  এ ছাড়া বর্তমানের সরকারি আইনজীবী পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) ও জিপির (গভর্নমেন্ট প্লিডার) মতো মুসলিম শাসনামলে নিম্ন আদালতে সরকারি আইনজীবীরা মুহতাসিব, ভকিলুই-শরাহ ইত্যাদি নামে পরিচিত ছিলেন। 

হিন্দু ও মুসলিম শাসনামলে বিচারক ও আইনজীবী নিয়োগের বিধান থাকলেও পৃথক কোনো আইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাস জানা যায় না।  মুসলিমদের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে উপনিবেশ স্থাপনের পর ইংরেজ কর্মচারীরা ও সময়ে সময়ে ইংল্যান্ড থেকে আগত ব্যারিস্টার ও আইন বিশেষজ্ঞরা বিচারকের দায়িত্ব পালন করতেন।  অন্যদিকে মুফতি, মৌলভি ও পণ্ডিত আদালতে ধর্মীয় আইন ব্যাখ্যা করতেন।  ইংলিশ আইনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ইংল্যান্ড থেকে আইনজীবীরা এসে ভারতবর্ষে আইন পেশায় নিয়োজিত হন।  এ উপমহাদেশে আইন পেশার আধুনিকায়নে ১৭৯৩ সালে কর্নওয়ালিশ প্রণীত বিচার বিভাগীয় পরিকল্পনায় (কর্নওয়ালিশ কোড) প্রথম সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।  এ বিচারিক পরিকল্পনার আগে যে কেউ তার ইচ্ছা-খুশিমতো আইন পেশায় নিযুক্ত হতে পারত, এ জন্য কোনো শর্ত পূরণ বা সনদ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল না।  কর্নওয়ালিশ কোডের বিধান অনুযায়ী কেউ আইন পেশায় নিযুক্ত হতে চাইলে তাকে যোগ্যতার প্রমাণ সাপেক্ষে সদর দেওয়ানি আদালত থেকে সনদ গ্রহণ করতে হতো।  সততার সঙ্গে আইন পেশা পরিচালনার জন্য আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করতে হতো।  আইনজীবীরা (ভকিল নামে পরিচিত ছিল) মামলা পরিচালনার জন্য কর্নওয়ালিশ কোডের তফসিলে নির্ধারিত ফির বেশি গ্রহণ করতে পারতেন না।  ভকিলরা সরাসরি মক্কেলের কাছ থেকে ফি গ্রহণ করতে পারতেন না।  মক্কেল ফির টাকা আদালতে জমা দিত, আর আইনজীবীরা আদালত থেকে মামলা পরিচালনার ফি গ্রহণ করতেন।  কোনো আইনজীবী অসদাচরণ বা নির্ধারিত ফির অতিরিক্তি গ্রহণ করলে তাঁর সনদ বাতিল করা হতো। 

কর্নওয়ালিশ আইন পেশার উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও আইন শিক্ষার জন্য পৃথক কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোর্স চালু করেননি।  ভারতবর্ষে আনুষ্ঠানিক আইন শিক্ষার যাত্রা শুরু হয় ১৮৫৫ সালে বোম্বে ও মাদ্রাজের সরকারি এফিস্টোন কলেজ ও কলকাতার হিন্দু কলেজে আইনের অধ্যাপকের পদ প্রবর্তনের মাধ্যমে।  এ সময় আইন শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আইনের গ্র্যাজুয়েট তৈরি, যাতে তারা আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে পারে।  সামাজিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রয়োজন ও চাহিদার প্রতি এ সময় আইন শিক্ষা পুরোপুরি উদাসীন ছিল।  এ সময় আইন-শৃঙ্খলা ও আদালতের বাইরে উন্নয়ন, মানবাধিকার, দারিদ্র্যবিমোচন, ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন, নারী-পুরুষ লিঙ্গভিত্তিক সুবিচার ও সমতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আইনের ভূমিকা আছে বলে বিবেচনা করা হতো না।  ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশের আইন শিক্ষায় কিছু মেরামতি ও প্রসাধনী সংস্কার করা হলেও এর উদ্দেশ্য ব্রিটিশদের মতোই শুধু আইন-শৃঙ্খলা ও আদালতের মধ্যেই সীমিত থাকে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে।  এ সময় জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা, জি-৮, জি-২০ ইত্যাদি নানা অধিজাতীয় ও হাইব্রিড প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছে।  অন্যদিকে বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতি, প্রাইভেটাইজেশন, যোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তির নজিরবিহীন উন্নয়ন, পরিবেশদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, বিদেশি বিনিয়োগ, বহুজাতিক কম্পানির ব্যাপক সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদ, জঙ্গিবাদ, ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।  ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে মোকাবেলা করতে হচ্ছে নতুন নতুন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ।  অপরাধ ও প্রতারণার নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হচ্ছে।  ফলে আইনজীবী ও বিচারকদের ভূমিকা এক সংকটপূর্ণ মোড় নিয়েছে।  অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন পলিসেন্ট্রিক বৈশ্বিক আইনব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে, যার ফলে আইনের গতানুগতিক ধারণা পাল্টে গেছে।  বৈশ্বিক রেগুলেটরি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরকারগুলোর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক পরিচালিত হওয়ার ফলে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের ব্যবধান এখন শুধু তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ।  রাষ্ট্রীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের মিথস্ক্রিয়ায় এ দুই আইনের মধ্যে ব্যবধান ভেঙে পড়েছে।  ফলে আইনের কার্যাবলি ও ভূমিকায় মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে।  আইন এখন দারিদ্র্যবিমোচন, প্রবৃদ্ধির সুষম বণ্টন, নারী-পুরুষ সমতা, পরিবেশ, জলবায়ু, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজস্বনীতি, মানবাধিকার ও সামাজিক উন্নয়নের এক কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।  আইনের শাসনের ধারণায়ও এসেছে মৌলিক পরিবর্তন।  এখন শুধু গণতান্ত্রিক সংসদে প্রণীত আইনের দ্বারা শাসনকেই আইনের শাসন বলা হয় না।  বরং যে আইনের দরিদ্র, বঞ্চিত, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের পূর্ণাঙ্গ জীবনধারণের সুযোগ সৃষ্টির সক্ষমতা আছে, সেই আইনের অধীনে শাসনকে আইনের শাসন বলা হয়।  আইনের শাসন ও আইনের ভূমিকার মৌলিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আইন পেশায় জড়িত বিচারক ও আইনজীবী উভয়ের জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির অনুরূপ পরিবর্তন অপরিহার্য।  গতানুগতিক আইন শিক্ষার মাধ্যমে আইন পেশাকে নতুন ভূমিকায় রূপান্তর করা তথা আইনজীবী ও বিচারকদের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য গড়ে তোলা সম্ভব নয়। 

পরিবর্তনের নতুন সুরটি অনুধাবন করে অনেক দেশের মতো ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বেশ কিছু আইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উদ্ভূত বৈশ্বিক ও রাষ্ট্রীয় চাহিদাকে বিবেচনায় রেখে আইন শিক্ষার বিষয়বস্তু তথা কারিকুলাম ও শিক্ষা পদ্ধতিতে খোলনলচে পাল্টে আমূল সংস্কার করেছে।  ভারতে শুধু আইন শিক্ষাদানের জন্যই অনেক আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।  পাকিস্তানেও অনুরূপ আইন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে।  নেপাল ও শ্রীলঙ্কার কিছু প্রতিষ্ঠানেও আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামের মডেল ও শিক্ষাদান পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।  নতুন মডেলের কারিকুলামে এ বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে যে আইন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিষয় নয়, বরং আইনশাস্ত্রের মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি, যুক্তিবিদ্যা, ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ইত্যাদি নানা বিষয়ের সঙ্গে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত অধ্যয়নের একটি শাখা।  ইউরোপ, আমেরিকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অধ্যয়নের জন্য পূর্বশর্ত হিসেবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয় অধ্যয়ন করতে হয়। 

Louis D. Brandies বলেছেন, যে আইনজীবী সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতি অধ্যয়ন করেননি তাঁর মধ্যে জনগণের শত্রু হওয়ার প্রবণতা থাকে।  আইনজীবী ও বিচারককে সমাজ পরিবর্তনের এজেন্ট হতে হলে ওই সমাজের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস অধ্যয়ন অত্যাবশ্যক।  শুধু আইনের আবশ্যিক বিষয়ের খুঁটিনাটি জ্ঞান আইনের চমৎকার টেকনিশিয়ান তৈরি করলেও তা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করতে পারে না।  আইনের দক্ষ টেকনিশিয়ান আইনের আক্ষরিক ব্যাখ্যায় ঈর্ষণীয় পারদর্শী হলেও তাঁর আইনের মানবিক ব্যাখ্যা করার সক্ষমতা অতি সীমিত।  আইনের মানবিক ব্যাখ্যা করার জন্য যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনা ও পরিপ্রেক্ষিতে আইন তৈরি করা হয়েছে, তা অনুধাবন ও বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি যে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে আইনটি প্রয়োগ করা হবে সে বিষয়েও অনুসন্ধান করতে হবে।  ২০০ বছর আগে আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জেফারসন আমেরিকান গণতন্ত্র ও প্রজাতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে আইনজীবীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন, আইনজীবীদের শুধু আইনের তত্ত্ব ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়াবলি জানলেই চলবে না, তাঁদের রাজনৈতিক তত্ত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে, আধুনিক ও প্রাচীন ইতিহাস ও দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে হবে।  রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘কেবল যাহা কিছু নিতান্ত আবশ্যিক তাহাই কণ্ঠস্থ করিতেছি।  তেমনি করিয়া কোনোমতে কাজ চলে মাত্র, কিন্তু বিকাশ লাভ হয় না।  হাওয়া খাইলে পেট ভরে না, আহার করিলে পেট ভরে, কিন্তু আহারাদি রীতিমতো হজম করিবার জন্য হাওয়া খাওয়ার দরকার।  তেমনি একটা শিক্ষাপুস্তককে রীতিমতো হজম করিতে অনেক পাঠ্যপুস্তকের সাহায্য আবশ্যক।  আনন্দের সহিত পড়িতে পড়িতে পড়িবার শক্তি অলক্ষিতভাবে বৃদ্ধি পাইতে থাকে; গ্রহণশক্তি, ধারণাশক্তি ও চিন্তাশক্তি বেশ সহজে এবং স্বাভাবিক নিয়মে বললাভ করে...।  ’ এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আরো বলেছেন, ‘আমাদের দেহ সাড়ে তিন হাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ, কিন্তু তাই বলিয়া ঠিক সাড়ে তিন হাত পরিমাণ গৃহ নির্মাণ করিলে চলে না।  স্বাধীন চলাফেরার জন্য অনেকখানি স্থান রাখা আবশ্যক, নতুবা আমাদের স্বাস্থ্য ও আনন্দের ব্যাঘাত হয়।  শিক্ষা সম্বন্ধেও এই কথা খাটে।  যতটুকু কেবলমাত্র শিক্ষা অর্থাৎ অত্যাবশ্যক তাহারই মধ্যে শিশুদিগকে (শিক্ষার্থীদেরকে) একান্ত নিবদ্ধ রাখিলে কখনোই তাহাদের মন যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িতে পারে না।  অত্যাবশ্যক শিক্ষার সঙ্গে স্বাধীন পাঠ না মিশাইলে ছেলেরা ভালো করিয়া মানুষ হইতে পারে না—বয়ঃপ্রাপ্ত হইলেও বুদ্ধিবৃত্তি সম্বন্ধে সে অনেকটা পরিমাণে বালক থাকিয়া যায়।  ’

আধুনিক আইন শিক্ষার দাবি অনুযায়ী ইউরোপ, আমেরিকা ও ভারতের মডেল অনুসরণে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন শিক্ষার আধুনিকায়নে আইনের আবশ্যিক বিষয়ের পাশাপাশি কিছু সহায়ক বিষয় যেমন—রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, যুক্তিবিদ্যা, ব্যবস্থাপনা, কম্পিউটারের মৌলিক ধারণা, সাধারণ ও আইনের পারিভাষিক ইংরেজি কোর্স, কমিউনিটি ভিজিট, কমিউনিটি সার্ভিস অন্তর্ভুক্ত করে সিলেবাস প্রণয়ন করেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সেই সিলেবাস অনুমোদন দিয়ে আইন শিক্ষার আধুনিকায়ন তথা যুগোপযোগীকরণে অনন্য ভূমিকা পালন করেছে।  সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আইন শিক্ষার যে মডেল সিলেবাস তৈরি করেছে, তা কমিশনের আগের অবস্থানের সঙ্গে শুধু বৈপরীত্যমূলকই নয়, বরং কিছু ক্ষেত্রে পশ্চাত্মুখিতার আভাস দেয়।  যেসব কারণে এই মডেল সিলেবাসটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে তা হলো—এক. দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবি ও এলএলএমে একই কোর্স পড়ানো বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈচিত্র্যের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।  আইনের ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পারদর্শিতা অর্জন করবে, এটাই কাম্য।  তদুপরি আইনের ভূমিকা শুধু আদালতের বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।  আইন এখন গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সুশাসন, উন্নয়ন, দারিদ্র্যবিমোচন, সম্পদের সুষম বণ্টন, ব্যক্তিক, সামাজিক ন্যায়বিচার, জলবায়ু, পরিবেশ, মানবাধিকার ইত্যাদি নানা বিষয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।  তাই আইন অধ্যয়ন অভিন্ন সিলেবাসে বন্দি না থেকে ভিন্ন মাত্রা ও আঙ্গিকে অধ্যয়ন অধিকতর যুক্তিসংগত।  যেটি এক ও অভিন্ন হতে পারে, তা হলো ডিগ্রি প্রদানের জন্য ন্যূনতম ক্রেডিট ও আবশ্যিক বিষয় নির্ধারণ করে দেওয়া, যা পূরণ না করলে ডিগ্রি স্বীকৃত হবে না।  এর বাইরে বড়জোর সহায়ক বিষয়ের একটি তালিকা আলোচনা সাপেক্ষে তৈরি করা যেতে পারে।  দুই. সিলেবাসে প্রতিটি কোর্সকে চার ক্রেডিট দেখানো হয়েছে, যা কমিশনের অন্যান্য মডেল সিলেবাসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।  অন্য সব সিলেবাসে এটি তিন ক্রেডিট।  তিন ও চার ক্রেডিটের এ পার্থক্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি করবে।  তিন. এই সিলেবাসে আইনের আবশ্যিক বিষয়ের বাইরে ফাউন্ডেশন কোর্স হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, যুক্তিবিদ্যা, ব্যবস্থাপনা, কম্পিউটার সিস্টেম, কমিউনিটি ভিজিট, কমিউনিটি সার্ভিস কোনো কিছুই রাখা হয়নি, যা আধুনিক আইন শিক্ষার ধারণার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।  এমনকি আমাদের শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ ইংরেজি ও আইনের পারিভাষিক ইংরেজি শিক্ষার যে বিধান রয়েছে তা-ও এ সিলেবাসে বাদ দেওয়া হয়েছে।  চার. বিশ্বায়নের যুগ বিশেষায়িত শিক্ষার যুগ।  কিছু বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিশেষায়িত ডিগ্রি প্রদানের ব্যবস্থা করেছে।  এ সিলেবাসে কোনো পর্যায়েই বিশেষায়িত শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়নি।  পাঁচ. সার্ক একটি সম্ভাবনাময় সংস্থা।  বাংলাদেশ সার্কের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।  সার্কভুক্ত রাষ্ট্রের আইনব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানসম্পন্ন কিছু আইনজীবী তৈরি খুবই জরুরি।  কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এ বিবেচনায় তাদের সিলেবাসে সার্ক ল, সাউথ এশিয়ান লিগ্যাল সিস্টেম, সার্কভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সংবিধানের তুলনামূলক অধ্যয়ন ইত্যাদি কোর্স চালু করেছে; কিন্তু কমিশন প্রস্তাবিত সিলেবাস চালু হলে এ কোর্সগুলো পড়ানো বন্ধ হয়ে যাবে। 

এ কথা অস্বীকার করার জো নেই, আইনজীবী ও বিচারকের সম্মানার্থে ব্যবহৃত ‘Learned’, ‘Your Honour’, ‘Honourable’ শব্দগুলোর মর্যাদা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।  একজন আইনজীবীর প্রশিক্ষণে ঘাটতি থাকলে তিনি তাঁর মক্কেল তথা ন্যায়বিচারের জন্য হুমকি, সমাজের তাঁর কাছ থেকে কমই পাওয়ার আছে এবং তিনি পেশার জন্য অসম্মান বয়ে আনেন।  আর এসবের জন্য আইন শিক্ষার আধুনিকায়ন অপরিহার্য।  সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বের সঙ্গে সংগতি রেখে কারিকুলাম তৈরি ছাড়া কিভাবে আইন শিক্ষার আধুনিকায়ন সম্ভব?