২:৪৩ এএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | | ২৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

আজ সাতক্ষীরা মুক্ত দিবস

০৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৯:৩১ এএম | মুন্না


জাহিদ হোসাইন, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : আজ ৭ ডিসেম্বর।  সাতক্ষীরা মুক্ত দিবস।  ১৯৭১ সালের এই দিনে সাতক্ষীরার দামাল ছেলেরা থ্রি নট থ্রি আর এসএলআরের ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে সাতক্ষীরা শহরে প্রবেশ করে।  ওড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা। 

সন্তান হারানোর বেদনা ভুলে সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সাথে রাস্তায় নেমে আসে মুক্তিপাগল আপামর জনতা।  দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সেদিনের সাহসী সস্তানরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল।  পাক হানাদার ও তাদের দোসররা মা-বোনের ইজ্জত হরণ করেছিল।  ধ্বংস করতে চেয়েছিল বাঙ্গালীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে। 

শত্রুর বুলেটের এত সব আঘাত সহ্য করেও সাতক্ষীরার সন্তানরা অন্ততঃ ৫০টি যুদ্ধের মোকাবেলা করেছিল।  সাতক্ষীরার মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে হিংস্র বিরোধিতা কারীদের ৪ জনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাবুনালে মামলা হয়েছে। 

হত্যা, ধর্ষণসহ ৭টি অভিযোগে সাতক্ষীরার কুখ্যাত রাজাকার জেলা জামাতের আমির খালেক মন্ডল আব্দুল্লাহিল বাকী, খান রোকনুজ্জামান ও জহিরুল ওরফে টিক্কার বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে।  এদের মধ্যে খালেক মন্ডল ও বাকিকে আটক করা হয়েছে।  অন্য দুই আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।  এমনকি আদালত কর্তৃক ডেইলি স্টার ও জনকণ্ঠ পত্রিকায় আসামি হাজির হওয়ার বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়েছে। 

জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২ মার্চ সাতক্ষীরা শহরে পাকিস্তান বিরোধী মিছিলে রাজাকাররা গুলি করে হত্যা করে শহিদ আব্দুর রাজ্জাককে।  আর এখান থেকে শুরু হয় সাতক্ষীরার দামাল ছেলেদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া।  মুক্তিযুদ্ধের খরচাদি বহনের জন্য সাতক্ষীরা ট্রেজারি হতে অস্ত্র আর ন্যাশনাল ব্যাংক হতে অলংকার টাকা পয়সা লুটের মধ্য দিয়ে শুরু মুক্তির সংগ্রাম। 

৮ম ও ৯ম সেক্টরের অধীনে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ট্রেনিং শেষে ২৭ মে সাতক্ষীরার ভোমরা সীমান্তে প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়।  এ সময় পাক সেনাদের ২ শতাধিক সৈন্য নিহত হয়।  ১৭ ঘণ্টাব্যাপী এ যুদ্ধে শহিদ হয় ৩ জন, আহত হয় আরো ২ জন মুক্তিযোদ্ধা।  এরপর থেমে থেমে চলতে থাকে সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের গুপ্ত হামলা।  এসব যুদ্ধের মধ্যে ভোমরার যুদ্ধ, টাউন  শ্রীপুর যুদ্ধ, বৈকারী যুদ্ধ, খানজিয়া যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। 

এ সব যুদ্ধে শহিদ হয় ৩৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা।  লাইটের আলোয় অসুবিধা হওয়ায় ৩০ নভেম্বর টাইম বোমা দিয়ে শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত পাওয়ার হাউস উড়িয়ে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ভীত সন্ত্রস্ত করে ফেলে পাক সেনাদের।  রাতের আঁধারে বেড়ে যায় গুপ্ত হামলা।  পিছু হটতে শুরু করে পাক সেনারা।  ৬ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় টিকতে না পেরে বাঁকাল, কদমতলা ও বিনেরপোতা ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে পাক বাহিনী সাতক্ষীরা থেকে পালিয়ে যায়।  ৭ ডিসেম্বর জয়ের উন্মাদনায় জ্বলে ওঠে সাতক্ষীরার দামাল ছেলেরা। 

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে শত্রুদের গুলিতে সাতক্ষীরার শহিদ আব্দুর রাজ্জাক, কাজল, খোকন, নাজমুল, হাফিজউদ্দিন, নুর মোহাম্মদ, আবু বকর, ইমদাদুল হক, জাকারিয়া, শাহাদাত হোসেন, আব্দুর রহমান, আমিনউদ্দিন গাজী, আবুল কালাম আজাদ, সুশীল কুমার, লোকমান হোসেন, আব্দুল ওহাব, দাউদ আলী, সামছুদ্দোহা খান, মুনসুর আলী, রুহুল আমীন, জবেদ আলী, শেখ হারুনার রশিদ প্রমূখ বীর সন্তান শহিদ হন। 

তবে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও সাতক্ষীরার বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি আজও।  একই সাথে সাতক্ষীরা কালেক্টরেট চত্বরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত শহিদ স্মৃতি স্তম্ভে রাজাকারের নাম উল্লেখ থাকায় তা উদ্বোধন করা হয়নি।  সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে যান না মুক্তিযোদ্ধারা।  অযত্নে আর অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে বধ্যভূমি ও গণকবরের স্মৃতিচিহ্ন। 

সাতক্ষীরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোশারফ হোসেন মশু বলেন, প্রতিবছর ৭ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা মুক্ত দিবস উপলক্ষ্যে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের আয়োজনের যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনটি পালন করা হয়।  সাতক্ষীরার বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছি সরকারের কাছে।  একই সাথে সাতক্ষীরা কালেক্টরেট চত্বরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত শহিদ স্মৃতি স্তম্ভে রাজাকারদের নাম মুছে সেটি উদ্বোধনের জোর দাবি জানাচ্ছি। 

সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক আবুল কাশেম মোঃ মহিউদ্দিন বলেন, সাতক্ষীরার বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হবে।  একই সাথে কালেক্টরেট চত্বরের শহিদ স্মৃতিস্মম্ভ নিয়ে বিদ্যমান বির্তক নিরসন করে তা অচিরেই উদ্বোধন করা হবে।