১০:২৩ এএম, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, রোববার | | ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

আমার দাদা রুদ্র

৩০ অক্টোবর ২০১৭, ০২:০৩ পিএম | নিশি


এসএনএন২৪.কম : কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (১৯৫৬-১৯৯১)।  আমাদের দশ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়।  আমরা ডাকি ‘দাদা’ নামে।  দাদার সঙ্গে আমার বয়সের পার্থক্য বিশ বছরেরও বেশি।  আমার শৈশব-কৈশোর যখন মিঠেখালি গ্রামে ও মোংলায় কাটছে, দাদা তখন ঢাকায়।  ফলে দাদার সান্নিধ্য পেয়েছি অনেক কম। 

দাদার সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতিও তাই আমার খুব অল্প।  মনে পড়ে, স্কুলে ভর্তি হবার সময় দাদা আমার নাম বদলে দিল (আমাদের প্রায় সব ভাইবোনের নামই দাদা পরিবর্তন করেছিল)।  আব্বা আমার নাম রেখেছিলেন মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ।  দাদা স্কুলের ফরমে আমার নাম নির্ধারণ করে দিল- হিমেল বরকত। 

দাদা নিজেও বদলে নিয়েছিল নিজের নাম, লেখালেখির শুরুর দিকেই।  মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ থেকে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।  দাদা একবার আমাদের ছোট তিন ভাইবোনকে (ইরা, সুমেল ও আমি) সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রকাশিত পৃথিবীর ইতিহাস নামে একটি বই উপহার দিল।  তাতে লিখে দিল ‘ধর্মীয় গালগপ্পো থেকে মুক্ত থাকার জন্য বইটি পড়ে নেয়া প্রয়োজন। 

আরেকটি স্মৃতির কথা খুব মনে পড়ে, স্কুলে পড়ার সময় টুকটাক ছড়া লিখতাম।  একদিন মেজো আপা (সোফিয়া শারমিন) খাবার টেবিলে দাদাকে জানাল, ‘দাদা, বাবু তো ছড়া-টড়া লিখছে।  তুমি একটু দেখে দিও। ’ আমি স্বভাবসুলভ লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম।  দাদা হেসে বলল, ‘ভালো তো! আমাকে দেখিয়ো। ’ আমি গোপনে-গোপনে ছড়াগুলো নতুন করে, কাটাকুটি ছাড়া আলাদা কাগজে তুললাম। 

কিন্তু দাদাকে দেখাবার লজ্জাটুকু কাটাতে পারলাম না।  লেখা আর দেখানো হল না।  তবে, আবৃত্তি শেখার সৌভাগ্য হয়েছিল দাদার কাছ থেকে।  স্কুলের প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত কবিতাগুলো আমরা দাদার কণ্ঠে রেকর্ড করে নিতাম, তারপর ওগুলো শুনে-শুনে নিজেদের প্রস্তুত করতাম। 

এখনো কানে বাজে দাদার সেই ভরাট-দরাজ গলার আবৃত্তি, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুঃসময়’ কবিতাটি- যেটি আবৃত্তি করে স্কুলে প্রথম হয়েছিলাম।  পরে জেনেছি, ঢাকায় যে কজন কবি স্বকণ্ঠে কবিতাপাঠে শ্রোতাপ্রিয় ছিলেন, দাদা তাদের অন্যতম। 

দাদাকে ঘিরে এরকম আরো কিছু টুকরো-টুকরো স্মৃতি আমার জমা আছে।  কিন্তু সেগুলো দিয়ে ব্যক্তি রুদ্রের সমগ্রতাকে দাঁড় করানো যায় না।  আগেই বলেছি, বয়স এবং অবস্থানগত দূরত্বের কারণে দাদার নিবিড় সান্নিধ্য আমার ভাগ্যে জোটেনি।  অথচ, দাদাই নির্ধারণ করে দিয়েছে আমার পথ।  মনে পড়ে, দাদা বেঁচে থাকতে দাদার পরিচয় দিতে গিয়ে সংকোচ বোধ করতাম।  সংকোচের কারণও ছিল। 

নতুন কারো সঙ্গে পরিচয়পর্বের শুরুতে বাবা-মার পরিচয় জেনেই জিজ্ঞেস করত, ‘তোমার বড় ভাই কী করে?’ বলতাম, ‘কবি।  কবিতা লেখে। ’ এই উত্তর তাদের সন্তুষ্ট করতে পারতো না।  বিস্ময়-বিহ্বল চোখে তাদের অবধারিত পরবর্তী প্রশ্ন হতো, ‘আর কিছু করে না?’ প্রতিনিয়ত এই অভিজ্ঞতার

মুখোমুখি হতে-হতে আমার কিশোর-মনে ধারণা জন্মালো, কবিতা লেখা বা লেখালেখি করা বোধহয় কোনো কাজের মধ্যে পড়ে না বা পড়লেও তা হয়তো সম্মানজনক কিছু নয়। 

আমার এই গ্লানি-সংকোচ নিমিষে উড়ে গেল দাদার মৃত্যুর পর।  সত্যি বলতে গেলে, মৃত্যুর পরই দাদাকে আমার চেনার শুরু।  সেসময় প্রায় প্রতিদিনই দাদাকে নিয়ে সংবাদপত্রে বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হচ্ছে।  দেশের বরেণ্য কবি-সাহিত্যিক, দাদার বন্ধু, পরিচিত-অপরিচিত অনেকের লেখায়, স্মৃতিচারণে দাদার প্রবল জনপ্রিয়তা ও কবি হিসেবে তার গুরুত্ব উপলব্ধি করলাম। 

তার বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও সংগ্রামী চৈতন্যে মুগ্ধ হলাম।  এসময় কিছু শুভানুধ্যায়ী আমাকে শোনালেন, ‘তোমাকেও তোমার দাদার মতো লেখালেখি করতে হবে। ’ অবচেতনে হয়তো গেঁথে গিয়েছিল সেই স্বপ্নের বীজ।  দাদার কবিতা পড়তাম প্রচুর আর একটু-একটু লেখারও চেষ্টা করতাম।  এরপর কলেজ শেষ করে ভর্তি হলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে, লেখালেখির স্বপ্নে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে টানা দু-বছর দাদার রচনাবলি সম্পূর্ণ করার কাজে মনোনিবেশ করলাম।  দাদার মৃত্যুর পর ‘কবি রুদ্রে’র সঙ্গে যে-পরিচয়, তা আরো ঘনিষ্ঠ হল এসময়।  দাদার পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্র, সংবাদপত্র-সাময়িকী, বিভিন্ন সাংগঠনিক দলিল দেখতে-দেখতে দাদাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম। 

দাদা নিজেই এতো সযত্নে সবকিছু গুছিয়ে না-রাখলে তার পূর্ণাঙ্গ রচনাবলি সম্পাদনা করা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য হতো।  বুঝতে পারলাম, যারা রুদ্রকে এলোমেলো, বোহেমিয়ান মনে করেছে তারা আসলে ভুলপাঠই করেছে রুদ্রের। 

কবিতার প্রতি, কর্মের প্রতি আমৃত্যু মগ্নতার পরিচয় পেয়েছি তার সংরক্ষণ-সচেতনতায়, অসংখ্যবার পাণ্ডুলিপি পরিমার্জনায়, পুনর্লিখনের পরিশ্রমে।  রাখাল, দ্রাবিড়, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বাংলাদেশ সংগীত পরিষদ প্রভৃতি সংগঠনের মূল কাগজপত্র থেকেও বুঝতে পারি, রুদ্রের সাংগঠনিক সক্রিয়তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা কত প্রগাঢ় ছিল। 

তবে সবচে বড় কথা- রুদ্রের কবিতাই রুদ্রের বিশ্বস্ত পরিচয়।  দ্রোহী, সংগ্রামী, আপসহীন এক অপ্রতিরোধ্য তরুণ সকল অন্যায়ের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, স্পষ্ট স্বরে বলছে : ‘ভুল মানুষের কাছে নতজানু নই’; সাম্যবাদের স্বপ্ন ছড়াতে-ছড়াতে যে ছুটে যাচ্ছে আদিগন্ত : ‘দিন আসবেই, দিন আসবেই দিন সমতার’ ঔপনিবেশিক আবিলতা থেকে জাতিকে মুক্ত করতে ঐতিহ্যের, মাটির, শিকড়ের দিকে যে বারবার আমাদের টেনে নিয়ে গেছে ‘বিশ্বাসের তাঁতে আজ আবার বুনতে চাই জীবনের দগ্ধ মসলিন’ কিংবা ‘আমরা কি হারাইনি লালনের একতারা মাটির হৃদয়/ আমরা কি হারাইনি প্রিয় পথ, প্রিয়তম গ্রামের ঠিকানা?

বোলে- সেই রুদ্রই আমার চৈতন্যের শিক্ষক, আমার শ্রদ্ধেয় দাদা।  কেবল আমারইবা কেন, নতুন প্রজন্মের অসংখ্য তরুণকে দেখছি প্রিয় কবি হিসেবে রুদ্রকে উচ্চারণ করতে, তাকে নিয়ে গবেষণা করতে।  ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন’ রুদ্রের দূরদর্শী, অভ্রান্ত এই পঙক্তি এখনো মুখে-মুখে, সময়ের প্রয়োজনেই।  বুঝতে অসুবিধা হয় না, রুদ্রের জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবার কারণ তার শাণিত চৈতন্য। 

এই নিরাপস ও দ্রোহ তাকে তারুণ্যের বরপুত্র করে তুলেছে।  শুধু কবিতায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ফোটাবার পারঙ্গমতায় নয়, রুদ্র তার সাহসী জীবনাচার দিয়েও সেই বিশ্বাসকে যাপন করেছে- মিছিলে নেমেছে, শ্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করেছে।  এখানেই রুদ্র অনন্য শিল্প ও জীবনকে যে একপাত্রে পান করার সক্ষমতা দেখিয়ে গেছে। 

দুর্ভাগ্য যে, মাত্র পঁয়ত্রিশ বছরেরও কম সময় বেঁচেছিল দাদা।  এর মধ্যেই সে লিখে গেছে সাতটি কাব্যগ্রন্থসহ (উপদ্রুত উপকূল, ফিরে চাই স্বর্নগ্রাম, মানুষের মানচিত্র, ছোবল, গল্প, দিয়েছিলে সকল আকাশ, মৌলিক মুখোশ) পাঁচ শতাধিক কবিতা, একটি কাব্যনাট্য (বিষ বিরিক্ষের বীজ), অর্ধশতাধিক গান ও বেশকিছু ছোটগল্প। 

বয়স হিসেবে লেখার এই পরিমাণ ও বৈচিত্র্য যেকোন লেখকের জন্যই ঈর্ষণীয়।  শিল্পের প্রতি প্রবল দায়বদ্ধতা ছাড়া এমন সৃষ্টিযজ্ঞ সম্ভবও নয়।  জীবনের শেষদিকে দাদা সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমেও সক্রিয় হতে চেয়েছিল, কিন্তু অকালমৃত্যু তাকে স্তব্ধ করে দিল। 

দাদার অকালপ্রয়াণের সেই ব্যথাতুর স্মৃতি দিয়েই শেষ করছি।  আমি তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি।  সদ্য স্কাউটে যোগ দিয়েছি।  প্রতি শুক্রবার যেতাম ক্লাস করতে।  এমনই এক শুক্রবারের (২১ জুন ১৯৯১) দুপুরে ক্লাস শেষে বাড়ির পথে ফিরছি, তখনই খবর পেলাম- দাদা খুব অসুস্থ, আমাদের ঢাকায় যেতে হবে।  বাসায় পৌঁছে বুঝতে পারলাম, দাদা আর নেই।  গ্যাস্টিক আলসারে আক্রান্ত হয়ে দশদিন হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে মোটামুটি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে, তার পরদিনই সকালে হার্ট অ্যাটাক। 

কী ভয়ংকর আকস্মিক এই সংবাদ! ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছি, কিছুতেই কান্না থামে না।  শুনলাম দাদাকে বাড়ি আনা হবে।  আমাদের আর ঢাকায় যেতে হল না।  দাদা এলো ট্রাকে।  ফুলে-ফুলে সাজানো কফিন, হাজার-হাজার মানুষের ভালোবাসার স্মারক।  বড় আপা (শরিফুন হাসান বীথি) আমাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে-দিতে নিজেই কেঁদে উঠল : ‘দেখো, দাদাকে নিয়ে এসেছি।  ফুল দিয়ে সাজিয়ে নিয়ে এসেছি। ’ আমরা ট্রলারে উঠলাম। 

নানাবাড়ি মিঠেখালিতে দাদার কবর দেয়া হবে।  ট্রলারের ছাদে বসে, কফিনের পাশে নিঃশব্দে কেঁদে যাচ্ছি আর মনে-মনে অসংখ্যবার পড়ে চলেছি দাদার শেষ কবিতার দু-লাইন :‘মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আর আকাশ দ্যাখা হয় না/ এতো কিছুই দ্যাখার থাকে, এতো কিছু দেখতে হয় মাটিতে প্রতিদিন’। 

বাইরে তখন ট্রলারের যান্ত্রিক গর্জন আর আমার ভেতর ভাই-হারানোর হাহাকার।  অশ্রুঝাপসা চোখে আকাশের দিকে তাকালাম।  ভাবলাম- আকাশ দেখতে না পারার কষ্টেই কি দাদা আকাশ হয়ে গেল? আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখতে বোলে গেল?