৬:১০ পিএম, ১৯ আগস্ট ২০১৯, সোমবার | | ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০




আমার সাংবাদিকতার হাতে খড়ি

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৩৫ পিএম | জাহিদ


এস এম জামাল, কুষ্টিয়া : সালটা তখন ২০০৭।  সময়ের প্রয়োজনেই দৈনিক ''সময়ের কাগজ'' পত্রিকার যাত্রা শুরু।  আমার সাংবাদিকতার হাতে খড়ি সেই ২০০১ সাল থেকে।  যখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি।  একটু একটু করে কবিতা লিখতে লিখতে সংবাদ লেখা শুরু করলাম। 

কুষ্টিয়া প্রথম প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা ''বাংলাদেশ বার্তা'' পত্রিকায় সংবাদ পাঠাতাম কাগজে লিখে।  আবার সেই সংবাদটুকু পত্রিকার অফিসে পাঠানো লাগতো আমাকেই।  কারন ইন্টারনেট তো আর সেসময় তেমন একটা ছিলোনা। 

২০০৭ সালে এসে যখন সময়ের কাগজ পত্রিকার রিপোর্টার হয়ে কাজ শুরু করি।  তখন পত্রিকাটির অফিস ছিলো কলেজ মোড়ের আমিন ফার্মেসীর পাশের পুরোনো ভবন "খান মঞ্জিলে"।  তখনও অফিসে এসে সংবাদ পৌছানো লাগতো।  তবে পত্রিকাটি সুবিধা করে দিয়েছিলো আমাদের বাইরের প্রতিনিধিদের জন্য। 

সেটি হলো যে কোন বাসে হেলপার অথবা সুপারভাইজারের কাছে লেখা সংবাদের চিরকুটটি মজমপুরের শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টারে জমা দিলেই অফিসের ষ্টাফরা কেউ এসে নিয়ে যেতো।  সালটা গড়িয়ে ২০০৯।  তখনও জানতাম না লিড নিউজটা আসলে কি? আমার ইউনিয়ন ছিলো মিরপুর উপজেলার বারুইপাড়া।  অথচ পাশেই নওপাড়া বাজারে ন্যায্যমুল্যে (ফেয়ার প্রাইস) চাল পাওয়া যেতো। 

যেটা কেজি প্রতি ২৫টাকা তবে জনপ্রতি ৫কেজি করে চাল লাইনে দাঁড়িয়ে কিনতে হতো।  অথচ পাশেই বারুইপাড়া ইউনিয়নের জন্য এ সুযোগ তখন ছিলোনা।  এসব নিয়ে একটা প্রতিবেদন লিখলাম।  ভাবছি পরদিন ছাপা হবে।  কিন্তু সেই নিউজ আর ছাপা হয়নি।  কয়েকদিন পর সম্পাদক আমাকে ফোনে আরও কিছু তথ্য নিলো সেই নিউজের ভিত্তিতে এবং রাতে অফিস থেকে আমাকে ফোন করে বললো পত্রিকা কি আরও বেশি করে পাঠাবো। 

কারন আমার নিউজ নাকি লিড হচ্ছে।  আমি তখনো বুঝিনি লিড নিউজ আসলে কি? যাই হোক পরদিন সকালে পত্রিকায় চোখ বোলাতেই বাইনেমে নিউজের শিরোনাম দেখে আমার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে এলো।  মোটা মোটা হরফে  লেখা ''শহুরে চাল ২৫ আর গ্রাম্য চাল ৪০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে'।  শিরোনাম যথার্থ ছিলো। 

নিউজের ভিতরেও ছিলো কিছু কথা।  যার কিছু কথা এখনো আমার হৃদয়ে গাঁথা।  না খেয়ে শহরের মানুষ মারা যাবার ঘটনা একটিও নেই।  কিন্তু না খেয়ে গ্রামের মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা অনেক রয়েছে।  নিউজটি বারবার পড়েছি।  শুধু তাই নয়, আমার বাজারে যতগুলো কপি যেতো আরও বেশকিছু ফটোকপি করে বিক্রি করতে হয়েছিলো।  সেদিনই বুঝলাম লিড নিউজের গুরুত্ব কি? ধন্যবাদ জানাই পত্রিকার সম্পাদককে। 

তিনি কয়েকদিন ধরে আমার লেখা নিউজটাকে গুরুত্ব দিয়ে এডিট করে যথযাথভাবে উপস্থাপন করেছিলো।  সেসময় আমার মন আরও আনন্দ ও আর উল্লসিত হয়েছিলো।  ভালো কাজ করলে বা ভালো রিপোর্ট করলে এভাবে লিড নিউজ হবে।  এমন ধ্যান ধারনা চিন্তা চেতনা ছিলো।  ভালো সংবাদ উপস্থাপন করার জন্য শুধু ভাবতাম।  এছাড়াও আমার সেই বাজারে একটা জরাজীর্ণ ব্রীজ ছিলো।  যেটির অসংখ্য নিউজ আমি করেছি।  প্রতিনিয়ত ঘটতো দুর্ঘটনা। 

ব্রীজ পার হতে গিয়ে একজন মারা গিয়েছিলো এবং আহতও অনেক হয়েছে এছাড়াও পঙ্গুত্ববরণ হতে হয়েছিলো অনেকেই।  সেসময়ও আমি সেই ব্রীজের রিপোর্ট করে ষ্টুডিও থেকে ক্যামেরা ভাড়া করে এনে ছবি তুলে প্রিন্ট করে পত্রিকা অফিসে পাঠিয়েছি।  ব্রীজের জন্য আমাকে সেসময় সময়ের কাগজের নির্বাহী সম্পাদক বর্তমান "মাটির ডাক" পত্রিকার সম্পাদক লুৎফর রহমান কুমার আমাকে বিভিন্নভাবে দিকনির্দেশনা দিতেন।  সেই ব্রীজ নির্মাণ হওয়ার ফলে আমার সাংবাদিকতার স্বার্থকতা পেয়েছিলাম বলৌ আমি মনে করি। 

আরেকটি কথা না বললেই নয়, যখন আমার নিজের কম্পিউটার নেই।  সেটা ২০১০ সালের কথা।  আমার একটা স্থানীয় মশান বাজারে ওষধের দোকান ছিলো।  তার তিনটা দোকানের পাশে ফটোষ্ট্যাট এন্ড কম্পিউটারের একটা দোকান ছিলো।  দোকানের কর্ণধার আমার একসময়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।  পরবর্তীতে তিনি একটি কলেজের অধ্যাপনা করতেন।  একই সাথে ইউনিয়নের সরকারী কাজীও ছিলেন। 

আমার কোন কম্পিউটার না থাকায় সেই দোকান থেকে নিউজ লিখে ই-মেইলে অফিসে পাঠাতাম।  বিনিময়ে আমার ১০টাকা তাদেরকে দিতে হতো।  হঠাৎ সেই দোকান মালিক আমাকে বললেন তুমি কম্পিউটার টাইপ করা শিখো।  অগত্য কিভাবে শিখবো এমন ভাবতে ভাবতেতোর দোকানের একটা অব্যবহৃত কি-বোর্ড সেই দোকান থেকে নিয়ে আমার দোকানে এসে সেটার অক্ষর খোঁজার চেষ্টা করলাম। 

যদিওবা সেই কি-বোর্ডের কয়েকটা বোতাম ছিলোইনা।  এভাবেই কিছুদিন যাওয়ার পর আর তাকে বিরক্ত না করে কম্পিউটারে বসে নিউজ লিখে অফিসে পাঠাতাম।  লিড নিউজের কাহিন-২: এলাকায় অনেক বাল্যবিয়ে হতো।  আবার কিছুদিন যেতে না যেতেই ডিভোর্সের কথা শুনতাম। 

তাই বাল্যবিয়ে নিয়ে নিউজ করার সিদ্ধান্ত নিলাম।  নিউজের শিরোনাম দিলাম বেড়েই চলেছে বাল্যবিয়ে ''ভোটের আশায় কিংবা টাকার বিনিময়ে জন্মনিবন্ধন সনদপত্র দিচ্ছে ইউপি চেয়ারম্যান''।  এবং সেসময় অনেকের সাক্ষাৎকার নিলাম।  যথারিতী সেই দোকানে বসে সেই কাজীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। 

কাজী বলেছিলো, জন্মনিবন্ধন-এ বয়স পুর্ণ দেখে আমি বিয়ে রেজিষ্ট্রি করে থাকি।  জন্মনিবন্ধনের যদি অল্প বয়স থাকে তাহলে আমি বিয়ে রেজিষ্ট্রি করতাম না।  ব্যস, সেসময় তিনি হাসিমুখেই কথাগুলো বললে পরদিন তিনি আমাকে তার দোকানে যেতে নিষেধ করেছিলেন।  বলেছিলেন আমার দোকান থেকে আর কোন নিউজ পাঠানো যাবেনা।  সেখানেই শেষ নয়, পরদিন সেই চেয়ারম্যানের লোকসহ তার ছেলেরা আমাকে বলেছিলো এসব নিউজ করার সাহস হয় কি করে? আমাকে হুমকি দেওয়ার পরে তখন আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। 

কেবলমাত্র সম্পাদককে বিষয়টি জানালো তিনি আমাকে স্থির হতে বলেন এবং পরবর্তীতে কোন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন।  তারপর উপজেলার সিনিয়র এক সাংবাদিক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একত্রে বসে বিষয়টি সুরাহা হয়।  

তবে আমার সাংবাদিকতার পেছনে সেই পত্রিকার সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিকীর ক্ষুরধার লেখনি এবং তার কিছু কথা আমাকে আজ এ পর্যন্ত আনতে সক্ষম হয়েছে।  তাই স্যালুট আবু বক্কর সিদ্দিক।