১১:৩৫ এএম, ২২ আগস্ট ২০১৮, বুধবার | | ১০ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯


আসছে নতুন বিজয়

১৬ ডিসেম্বর ২০১৭, ০১:৩০ পিএম | সাদি


এসএনএন২৪.কম : তারপর আমরা আত্মীয়তা বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করি।  আমাদের সম্পর্কগুলো সমষ্টি থেকে এককে রূপান্তরিত হতে থাকে।  ভুলে যেতে থাকি যৌথ খামার গড়ার স্বপ্ন দেখা।  আমরা থেকে ‘আমি’তে সংকীর্ণ হই।  এই হলো ১৯৭১ থেকে ২০১৭-র বিজয়ে পৌঁছার লাভ-লোকসানের হিসাব।  ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের ভ্রুণটি আচমকা একাত্তরে দানা বাঁধেনি।  সাধারণভাবে রাষ্ট্রভাষা বাংলা দাবিকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখার আঁতুড়ঘর ভাবা হয়।  কিন্তু আমরা যদি বাংলা বা বাংলাদেশের পরম্পরার ইতিহাসের পেছনের পাতাগুলো উল্টে আসি দেখতে পাব- সেই চর্যাপদের কাল থেকে বা তারও আগে এই অঞ্চলের মানুষের বহিরাগত শাসকদের দ্বারা শোষিত হয়ে আসছিল। 

সেই সময়কার পদকর্তারা তাদের রচনায় শোষণের চিত্র তুলে ধরেছেন।  শোষিতরা ছিলেন এই জমিনেরই ভূমিপুত্র।  তারা বরাবর অধীনতা থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছে।  সেই স্বপ্ন প্রণোদিত করেছে তাদের বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার।  সেই বিদ্রোহে পরাজয়ের চেয়ে বিজয়ই ছিনিয়ে এনেছে এই অঞ্চলের ভূমিপুত্ররা।  ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতায় অসাম্য এবং শোষণের বিরুদ্ধে একাত্তরে বাঙালি ঐক্য গড়ে তোলে।  এই ঐক্য ছিল সব শ্রেণিপেশার মানুষের।  প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।  যাদের সুযোগ হয়েছে অস্ত্র ধরার তারা অস্ত্র ধরেছে।  যারা অস্ত্র হাতে রণক্ষেত্রে যেতে পারেনি, তারা রণক্ষেত্রের যোদ্ধাদের মানসিক ও পরোক্ষ সহায়তা দিয়েছে।  শত্রুকে সামাজিক ভাবে প্রতিরোধও করেছে সুযোগ মতো।  একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেই বাংলাদেশের সব শ্রেণিপেশা ও ধর্মের মানুষ এক স্বপ্ন দেখেছিল। 

মুক্তিযুদ্ধ জনযুদ্ধে পরিণত হওয়াতে পাক হানাদার বাহিনী নয় মাসেই পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়।  মিত্রবাহিনীর সহায়তাকে স্বীকার করে, এই সত্য অস্বীকারের সুযোগ নেই যে-ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের সব মানুষ ও প্রকৃতি যখন একযোগে শত্রুর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে পড়ে, তখন নতজানু হয়ে আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। 

মানচিত্র পাওয়া গেল।  কিন্তু সেই মানচিত্রকে স্বপ্নের মতো করে গড়ে তোলার যে লড়াই, সেখানে আর সমষ্টির সমাবেশ দেখা গেল না।  লোভের রঙে মানচিত্র আঁকার কাজ শুরু হয়।  সেখান থেকেই শুরু হয় আত্মীয়তা ছিন্ন করার প্রক্রিয়া।  মুক্তি সংগ্রামের জনযুদ্ধে যে বাঙালি ছিল একে অপরের আত্মার আত্মীয়, সেই বাঙালি একে অপরের কাছে অপরিচিত হতে শুরু করে।  আত্মীয়তাকে  অস্বীকার করার অভ্যেস তৈরি হতে থাকে।  জনযুদ্ধের কথা ভুলে যেতে থাকে বাংলাদেশ।  কিংবা বলা যায় একাত্তর উত্তর বাংলাদেশকে স্বাধীনতা বা বিজয়ের খাদ মেশানো গল্প শোনানো হতে থাকে।  সেই গল্পে জনমানুষ নেই।  আছে সমাজের, রাষ্ট্রের বা ক্ষমতা বলয়ের আশপাশের মানুষরা। 

বিজয়ে যে পতাকা উঠে এসেছিল হাতে, সেই পতাকা ছিনতাই হয়ে চলে যায় যুদ্ধ অপরাধীদের কাছে।  পুনর্বাসন হয় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির।  রাজনীতি তার মতো করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা বা ইতিহাসের প্রোপাগাণ্ডা চালাতে থাকে।  ক্ষমতার রং অনুসারে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উলটপালট হতে থাকে।  এই প্রক্রিয়াতে বাংলাদেশ নামক মানচিত্রে ‘?’ অনিবার্যভাবে জায়গা করে নেয়। 

প্রশ্ন আসে কে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, কে স্বাধীনতার পক্ষে আর কে বিপক্ষে।  প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে প্রশ্ন উঠার কারণ- জন বা আম মানুষ তার বিজয়ের ইতিহাস লিখতে পারেনি।  তার বীরত্বের কথা শোনার চেষ্টা করেনি রাষ্ট্র।  রাজনৈতিক দূষণে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া মুখগুলোও মুক্তিযোদ্ধার দাবিদার হয়ে জমিন কাঁপাতে শুরু করে।  রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ভাগ বসাতেও তারা আগ্রাসী।  আবার এ কথাও সত্যি কে পক্ষ বা বিপক্ষের শক্তি তা কেবল রাজনৈতিক মুনাফা লাভেই ব্যবহৃত হয়েছে বা হচ্ছে। 

কিন্তু যে আমজনতা স্বপ্ন দেখেছিল সাম্যের, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের।  সেই স্বপ্নকে দুঃস্বপ্ন করে তোলার একটি লড়াই তো আছেই।  ফলে এখানে লোভাতুর বর্জুয়া শ্রেণির বিকাশ ঘটছে তড়তড়িয়ে।  লুট-দখলের প্রতিযোগিতা থেমে নেই।  যেমনটি থেমে নেই রাজনীতিকে অশুদ্ধ করার নকশা।  এই নকশার অংশ হিসেবে শিক্ষাকে বাণিজ্যিক রূপ দেয়া হয়েছে, এর ভিত্তিতে কুঠারের আঘাত চলছেই।  তারুণ্যকে বিভ্রান্ত করার নানা ফাঁদ তৈরি হচ্ছে নিত্য।  একটি শ্রেণি বাংলাদেশকে টাকা উৎপাদনের সুফলা জমি হিসেবে ব্যবহার করে, সেই টাকা তার দ্বিতীয় স্বদেশে পাচার করে দিচ্ছে।  বাংলাদেশের ওপর আস্থা নেই তাদের।  কোনো স্বপ্ন দেখে না তারা বাংলাদেশকে নিয়ে।  বাংলাদেশের ক্ষমতার  উপভোগই তাদের একমাত্র লালসা। 

প্রশ্ন হলো এই গোষ্ঠীকে বাংলাদেশকে, তার বিজয়কে হজম করে নেবে।  তারা ভোগ দখলের জন্য জনমানুষের সঙ্গে আত্মীয়তায় যে বিচ্ছিন্নতা এনেছে, সেই ‘নষ্ট’ অভিযানে তারা জয়ী হবে? শেষ হাসি কি হাসবে তারাই? ২০১৭-এর বিজয় দিবসে দাঁড়িয়ে আমি সেই পূর্বাভাস দিতে পারছি না।  বরং উচ্চস্বরে বলতে চাই-তাদের পরাজয়ের দিন ঘনিয়ে আসছে।  বাংলাদেশের একাত্তর পরবর্তী সময়ের প্রজন্ম কিংবা নতুন শতাব্দীর যে প্রজন্ম তারা রণক্ষেত্রে নেমে পড়েছে।  অস্ত্র হাতে নয়।  তাদের সবার সঙ্গে নিজের মতো করে জয়ী হওয়ার অস্ত্র।  কেউ সংস্কৃতি ক্ষেত্রে, কেউ তথ্যপ্রযুক্তিতে, কেউ কৃষি-শিল্পের উদ্যোক্তা হিসেবে কিংবা কেউ নেমে পড়েছে রাজনৈতিক আদর্শের  শুদ্ধ মন্ত্র নিয়ে।  ওরা একাত্তর পরবর্তী সময়ের গেরিলা যোদ্ধা।  ওদের আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ়।  ওরা জয়ী হবেই হবে।  ওদের বিজয় মিছিলে যোগ দিতে আমি তৈরি।