৪:২৩ এএম, ২৪ নভেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | | ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

ঈদ আছে ‘ঈদ কার্ড’ নেই

২৫ আগস্ট ২০১৭, ০৭:৪৮ এএম | রাহুল


এসএনএন২৪.কমঃ ঈদ মানেই আনন্দ।  অতীতের সকল দুঃখ ভুলে সবাই মেতে ওঠে ঈদ আনন্দে।  ঈদ পারস্পরিক সর্ম্পক বাড়িয়ে দেয়।  আর এই সম্পর্ক বাড়ানোর জন্য বা ঈদ আনন্দ  ভাগাভাগির জন্য প্রিয়জন বা কাছের কাউকে দেয়া হয় ঈদ কার্ড।  কিন্তু কালেরগর্ভে যেন ঈদ হাড়িয়ে গেছে বাঙালির ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যম ‘ঈদকার্ড’।  কিন্তু এখন  প্রায় সবাই ই-মেইল, মেসেঞ্জার, ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটস অ্যাপ এ জানান ঈদের শুভেচ্ছা।  তাই এখন নেই ‘ঈদ কার্ড’। 

একটু অতীতের দিকে মুখ ফেরালেই চোখের সামনে  ভেসে ওঠে  গ্রামের ঈদ কার্ডের দোকানগুলো।  ঈদ আসলেই  পাড়া মহল্লার অলিতে গলিতে বসতো ছোট ছোট দোকান।  ঈদকার্ডের পশরা সাজিয়ে বসতো দোকানিরা।  বিক্রেতারা থাকতো পাড়ার যুবক কিশোরেরা।  দোকানে সুতা টাঙিয়ে সাজিয়ে রাখা হতো নানা বর্ণের কার্ড।  প্রত্যেকেই তার পছন্দ অনুসারে কার্ড কিনতো প্রিয়জনের জন্য।  ফুল, পাখি, হাতি, প্রজাপতি, টিয়া পাখি, সবুজ ঘাস অথবা নানা ধরণের ফুলের ছবি আঁকা থাকতো কার্ডের ওপর।  আবার কার্ডের উপরে নানা বর্ণের কলম দিয়ে লেখা থাকতো ‘ঈদ মেবারক’। 

‘একটা সময় ঈদের ছুটির আগেই বাবা অনেকগুলো কার্ড নিয়ে আসতেন।  একে একে সবগুলো কার্ড লেখতেন বাবার প্রিয়জনদের দেয়ার জন্য।  তখন আমরা একবারে ছোটই ছিলাম বলা যায়।  অফিস থেকে এসে রাতে বাবা কার্ড লেখা বসতেন।  আমরা ভাই-বোনেরা পাশে বসে থাকতাম।  বাবা গ্রামে যাওয়ার আগে মনে করে সবগুলো কার্ড আগে ব্যাগে নিতেন।  গ্রামে বাবার কাছের আথবা পছন্দের মানুষদের কার্ড বিতরণ করতেন।  আমাদেরও ইচ্ছে হতো।  বাবার কাছে কার্ড কেনে দেয়ার জন্য বায়না ধরতাম।  কিন্তু না পেয়ে  মা এই ছিলেন একমাত্র ভরসা ঈদকার্ড কেনে দেয়ার জন্য। ’ বলছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী হাফেজা লাবণ্য। 

স্কুল কলেজের তরুণেরা হুমড়ি খেয়ে পড়তো পাড়ার দোকানগুলোতে।  প্রতিযোগিতা হতো কে কতো ভাল ‘ঈদকার্ড’ কিনতে পারে।  বন্ধু, প্রিয়জন অথবা ভালবাসার মানুষের জন্য কেনা কার্ডটিতে যত্ন করে লেখা হতো মনের কথা বা জানানো হতো ঈদের শুভেচ্ছা।  প্রিয়জনের কাছ থেকে ঈদের কার্ড পেলে আনন্দের সীমা থাকতো না।  কেউ কেউ বুক পকেটে নিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়াতেন।  এদিকে প্রিয়জনের কাছ থেকে  ঈদ কার্ড না পেলে অভিমানের যেন শেষ থাকতো  না।  রাগে ক্ষোভে অনেকের ঈদ অনন্দটাই মাটি হয়ে যেত। 

এখন গ্রামের দোকান গুলোতে পাওয়া যায় না ‘ঈদ কার্ড’।  হারিয়ে গেছে গ্রামের বর্ণিল সাজের দোকান গুলো।  ’ঈদকার্ড’ এখন যেন অতীত হয়ে গেছে।  এখন তরুণেরা  ঈদ উপহার কেনার জন্য ভিড় করেন নামিদামি শপিংমলে।  প্রিয়জনের জন্য কেনেন ঈদের ঊপহার। 

সময়ের পরিক্রমায় ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ঈদ উপহারে এসেছে নানা বৈচিত্র।  হারিয়ে যাওয়া ঈদ কার্ডের জায়গায় স্থান করে নিয়েছে মোবাইলের এসএমএস।  তবে এর সংখ্যাও কম।  এর চেয়ে বরং ভার্চুয়াল ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ই বেশি।  ভার্চুয়াল ঈদকার্ড বা ইমেইলের মাধ্যমে, অথবা ফেসবুকে শুভেচ্ছা জানিয়েই যেন দ্বায় সারা হচ্ছে মানুষ। 

ঈদকার্ড বেশি দেখা যায় কর্পোরেট অফিস গুলোতে।  তাও আবার সব অফিসে দেখা যায় না।  ই-মেইলের মাধ্যমেই জানানো হয় ঈদের শুভেচ্ছা।  তবে ‘ঈদ কার্ডে’র শুভেচ্ছা বার্তায় যে রকম আন্তরিকতা, ভালবাসা ছিল।  ভার্চুয়াল শুভেচ্ছা বিনিময়ে সে রকম আনন্দও নেই।  যেন হারিয়ে যাচ্ছে ঈদ উপহার বিনিময়ের আবেদন। 

কর্পোরেট অফিস, অফিস-আদালত, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন অর্ডার দিয়ে ঈদ কার্ড তৈরি করে।  কারণ এখন ঈদকার্ড ও তেমন পাওয়া যায় না।  তার ফলেই এই অর্ডার দেওয়া।  নিজের মতো তৈরি করতে বিভিন্ন দোকানে দেয়া হয় এ অর্ডার।  দোকান মালিকেরা ও ব্যবসা হচ্ছে না। 

এর ফলে শিশু-কিশোর, তরুণ প্রজন্মের কাছে অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে ’ঈদকার্ড’।  বাঙালি সংস্কৃতির এই সুন্দর ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যাচ্ছে।  আর  এর মাধ্যমে আবেদন হারাচ্ছে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়। 

লেখক: শতাব্দী জুবায়ের