১১:৩৩ পিএম, ২১ জুন ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৭ শাওয়াল ১৪৩৯

South Asian College

উদ্যম ও পরিশ্রম

২৭ জানুয়ারী ২০১৮, ০৪:৫০ পিএম | সাদি


এসএনএন২৪.কম : চাকরি করা কাজ উত্তম, যখন তা হয় জাতির সেবা- যখন  তাতে মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয় না ।  যখন জীবন ধারণের সম্বল হয়ে পড়ে চাকরি- যখন সেটাকে দেশ-সেবা বলে মনে হয় না, তখন তা করো না ।  সত্য ও আইন অপেক্ষা উপরিস্থ কর্মচারীকে যদি বেশি মানতে হয়, তা  হলে সরে পড়।  প্রভুর সামনে যদি মনের বল না থাকে, কঠিন ভাবে সত্য বলতে না পার, প্রয়োজন হলেই চাকরি ছেড়ে দেবার সঙ্গতি না থাকে-তা হলে বুঝব চাকরি করে তুমি পাপ করেছ। 

মনের স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে না পারলে তোমাতে ও পশুতে প্রভেদ থাকবে না – জীবন তোমার মিথ্যা হবে ।  স্বাধীন-হৃদয়, সম্যেও সেবক কামার হও, সেও ভালো।  নিজকে যন্ত্র করে ফেলো না। 

সৎ, জ্ঞানী ও মহং যিনি, তিনি নিজেকে ব্যক্তিত্বহীন করতে ভয়ংকর লজ্জা বোধ করেন ।  তিনি তাতে পাপ বোধ করেন।  চাকরি করে অন্যায় পয়সায় ধনী হওয়ার লোভ রাখ ? তোমার চেয়ে মুদি ভালো।  মুদির পয়সা পবিত্র।  অনেক যুবক  থাকতে পারে, যারা মনে করে কোনা  রকম একটা চাকরি সংগ্রহ করে  সমাজের ভেতরে আসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই হলো।  চুরির সাহায্যেই হোক বা অসং উপায় অবলম্বন করেই হোক, ক্ষতি নেই। 

চরিত্র তোমার নিষ্কলঙ্ক- সামান্য কাজ করে পয়সা উপায় কর, তাতে জাত যাবে না ।  চুরি অন্যোয়ের সাহায্যে যে বাচঁতে চেষ্টা করে, তারই জাত যায়, অসৎ উপায়ে আয় কােরো না, মিথ্যার আশ্রয় নিও না।  লোক কায়দায় ফেলে অর্থ সংগ্রহ করতে তুমি ঘৃণা বোধ করো। 

ইউরোপের জ্ঞানগুরো প্লেটো মিসর ভ্রমণকালে মাথায় করে তেল বেচে রাস্তা-খরচ যোগাড় করতেন।  যে কুঁড়ে, আলসে, ঘুষখোর ও চোর, সেই হীন।  ব্যবসা বা ছোট স্বাধীন কাজে মানুষ হীন হয়না- হীন হয় মিথ্যা চতুরতা ও প্রবঞ্চনায়।  পাছে জাত যায়, সম্মান নষ্ট হয়- এই ভয়ে পরের গল্পগ্রহ হয়ে মাসের পর মাস কাটিয়ে দিচ্ছ? সম্মান কোথা, তা তুমি টের পাওনি?

সৎ উপায়ে যে পয়সা উপায় করা যায় তাতে তোমার আত্মার পতন হবে না।  তোমার অত্মারপতন হবে না।  তোমার আত্মার পতন হবে আলস্য ও অসাধুতায়।  তোমার ষ্পর্ষে কাজ গৌরব ময় হবে। 

আমাদের দেশের লোক যেমন আজকাল বিলেতে যায় এক কালে তেমনি করে বিলেতের লোক গ্রিস ভ্রমণে যেত।  বিলেতে-ফেরত লোককে কেউ ইট টেনে বা কুলির কাজ করে পয়সা উপায় করতে দেখেছে?

বিলেতের এক পন্ডিত দেশভ্রমণ দ্বারা অগাধ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন- গ্রিকদেশ থেকে ফিরে এসে তিনি আরম্ভ করলেন এমন কাজ- যা তুমি আমি করতে লজ্জাবোধ করব।  তাতে কি তাঁর জাত গিয়েছিল? যার মধ্যে জ্ঞান ও গুণ আছে, সে কয়দিন নিচে পড়ে থাকে? লোকে তাকে সম্মান করে উপরে টেনে তোলেই। 

কাজের মানুষের জাত যায় না- এটা বিশ্বাস করতে হবে।  কাজহীন হও ঐ সময় যখন কাজের ভেতর অসাধুতা প্রবেশ করে, আর কোন সময়েই নয়।        

বিশ্ব সভ্যতার এত দান তুমি ভোগ কর এসব কি কর হলো? হাতের সাহায্যে নয়? কাজকামকে খেলো মনে করলে চলবে না ।  মিস্ত্রিও হাতুড়ির আঘাত, কামারের কাপালের ঘাম, কুলির কোদালকে শ্রদ্ধার চোখে দেখো। 

অনেকে বলে, তাদের জন্য কোন কাজ নেই ।  যে কাজই তারা কারুক, যে দিকেই তারা হাঁটুক- কেবল ব্যার্থতা আর ব্যর্থতা! র্মূখ যারা তারাই এ কথা বলে।  তাদের এ ব্যর্থতার জন্য তারা নিজেরাই দায়ী! এই নৈশরশ্যেও হা-হুতাশ তাদেরই অমনোযোগ আর কুঁড়েমির ফল। 

ডাক্তার জনসন মাত্র কয় আনা পয়সা নিয়ে লন্ডনের মতো শহরে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল, অথচ তিনি কারও কাছে কোন হাত পাতেননি।  এক বন্ধু তাকেঁ এক সময় এক জোড়া জুতো দিয়েছিলেন।  অপমানবোধ করে তিনি সে জুতো পথে ফেলে দিয়েছিলেন।  উদ্যম, পরিশ্রম ও চেষ্টার সামনে সব বাধাঁই পানি হয়ে যায়।  এ গুণ যার মধ্যে আছে , যে ব্যক্তি পরিশ্রমী,  তার দু:খ নেই।  জনসনেকে অনেক সময় রাত্রিতে না খেয়ে শুয়ে থাকতে হতো, তাতে তিনি কোনদিন ব্যথিত বা হতাশ হননি।  বাধাকে  চূর্ণূ করে বীর পুরূষের মাতো তিনি যে র্কীতি রেখে গিয়েছেন- তা অনেক দেশের অনেক পন্ডিতই পারবেন না। 

গুণ থাকলে চেষ্টা না করলে জগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করা যায় না ।  আরভিং সাহেব বলেছেন, চুপ করে বসে থাকবে কাজ হবে না।  চেষ্টা কর, নড়াচড়া কর, এমন কি কিছু-নাড় ভেতর কিছু ফলাতে পারবে।  কুকুরের মাতো চিৎকার কর, সিংহ হয়েও ঘুমিয়ে থাকলে কি লাভ?

পরীক্ষার কৃতকার্য হয়েছ, তারপর মনে হচ্ছে তোমার মূল্য এক পয়সা নয়।  জিজ্ঞাসা কর, কেন? জান না, এ জগতে যারা নিত্যন্ত আনাড়ি তারা মাসে হাজার হাজার টাকা উপায় করছে?  তোমার এই মর্মবেদনা ও দুঃখের কারণ তুমি মূর্খ।  মানুষ বালিতে সোনা ফলাতে পারে, এ তুমি বিশ্বাস কর না? তুমি কুড়েঁ, তোমার উদ্যম নেই, তুমি একটা আত্মপ্রত্যয়হীন অভাগা। 

কাজ ছোট হোক, বড় হোক, প্রাণ-মন দিয়ে করবে।  মূল্যহীন বন্ধুদের লজ্জায় কাজকে ঘুণা করো না।  সকল দিকে, সকল রকমে তোমার কাজ কর যাতে সুন্দর হয় তাতে চেষ্টা করবে। 

ফকস সাহেবকে একসময় এক ভদ্রলোক বলেছিলেন, আপনার লেখা ভালো নয়।  কাজের চরুতার প্রতি তারঁ এত নজর ছিল যে, তিনি সেই দিন থেকে স্কুলের বালকের ন্যায় লেখা আরম্ভ করলেন এবং অল্পকলের মধ্যে তাঁর লেখা চমৎকার হয়ে গেল। 

উন্নতির এক কারণ হচ্ছে দৃষ্টি ও মনযোগ।  এক ভদ্রলোকের খানিক জমি ছিল।  জমিতে লাভ তো হতোই না , বরং দিন দিন তাঁর ক্ষতি হচ্ছিল।  নিরুপায় হয়ে নাম মাত্র টাকা নিয়ে তিনি এক ব্যাক্তিতে ইজারা দিলেন।  কয়েক বছর শেষে ইজারাদার এক দ্বীন ভূষামীকে বললেন, যদি জমিগুলো  বিক্রয় করেন তাহলে আমাকেই দিবেন।  আপনার কৃপায় এই কয় বছওে আমি অনেক টাকা জমা করতে সক্ষম হয়েছি।  ভূষাম্বী অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এক বছরের ভেতরে যে জমিতে আমি এক পয়সাও উপায় করতে পারিনি, সেই জমিতে মাত্রকয়েক বছর চাষ করেই করিদ করতে সাহস করছ? সে বলল, আপনার মতো অমনোযোগী ও বাবু আমি নই! পরিশ্রম ছাড়া আমি কিছু জানি নাই।  বেলা দশটা পর্যন্ত ঘুমানো আমার অভ্যাস নয়। 

এক যুবক স্কট সাহেবের কাছে উপদেশ চেয়েছিল।  যুবককে তিনি এই উপদেশ দেন: কুঁড়েমি কোরো না, যা করবার, তা এখনই আরম্ভ কর।  বিশ্রাম যদি করতে হয় কাজ সেরে করবে। 

সময়ের সাথে যারা সদ্ধ্যবহার করে, তার জিতেবেই।  সময়েই টাকা, সময় টকার চেয়েও বেশি।  জীবনকে উন্নত করো কাজ করে।  জ্ঞান অর্জন ।  চরিত্রকে ঠিক করে বসে থাক।  কৃপণের মাতো সমেয়র কাছ থেকে তোমার পাওয়া বুঝে নাও। 

এক ঘন্টা করে প্রতিদিন নষ্ট কর, দেখবে বৎসর শেষে গুণে দেখ, অবহেলায় কত সময় নষ্ট হয়েছে।  এক ঘন্টা করে প্রতিদিন একটু করে কাজ কর, দেখবে বৎসর শেষে, এমনকি মাসে কত কাজ তোমার হয়েছে।  তোমার কাজ দেখে তুমি নিজেই বিষ্মিত হবে ।  প্রতিদিন তোমার চিন্তা একখানা কাগচের বেশি নয়- দশ লাইন করে ধরে রাখ, দেখবে বছর শেষে তুমি একখানা সুচিন্তিত চমৎকার বই লিখে ফেলেছ। 

জীবনকে ব্যবহার কর দেখবে মৃত্যু জীবনের হাজার র্কীতির নিশান উড়িয়ে দিয়েছে।  জীবন আলস্যে, বিনা কাজে কাটিয়ে দাও, মৃত্যুকালে মনে হবে জীবন তোমার একটা মিথ্যা লীলার অভিনয় ছাড়া আর কিছু হয়নি- একটা সীমাহীন দুঃখ ও হা-হুতশার সমষ্টি।  জীবন  শেষে যদি তুমি বল,‘জীবনে কী করলাম?  কিছু হলো না, তাতে কি লাভ হবে? কাজের প্রারম্ভে ভেবে নিও, তুমি কোন কাজের উপযোগী, জগতের কোন কাজ করবার জন্য তুমি তৈরী হয়েছে- কোন কাজে তোমার আত্মা তৃপ্তি লাভ করে। 

সাধুতা ও সত্যের ভেতর দিয়ে যেমন উন্নতি লাভ করা যায়, এমন আর কিছুতে নয়।  সত্য এবং সাধুতাকে লক্ষ রেখে ব্যবসা কর, তোমার উন্নতি অবশ্যম্ভাবী।  জুয়াচুরি করে দু দিনের জন্য তুমি লাভবান হতে পার, সে লাভ দু দিনের।  জগতের যে সুস্থ মানুষ ব্যবসাতে উন্নতি করেছে তাদের কাজ কামের কখনও মিথ্য জুয়া চুরি ছিল না।  ব্যবসা, ভালো কাজ –এর ভেতরে অমর্যদার কিছু নেই।  অগৌরব হয় হীন পরাধীনতায়, মিথ্যা ও অসাধুতায়। 

এক ব্যাক্তি মুদি জীবনের লজ্জা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিল।  মরবার আগে একখানা কাগজে লিখে রেখে গিয়েছিল যে, ‘এ  হীন জীবন আমার পক্ষে অসহনীয়। ’  তার মৃত্যুাতে  আমাদেও মানে কোন দয়ার উদ্রেক হয় না।  লোকটি এত হীন ছিল যে,  তার মুদি হয়ে বাচঁবার কোনা অধিকার ছিল না।  কাজকাম বা ব্যাবসাতে অগৌব নেই ।  ঢাকার সুপ্রসিদ্ধ নবাব বংশের পূর্ব বঙ্গের প্রসিদ্ধ।  এই বংশের  প্রতিষ্ঠতা আলিমউল্লাহ্  ছিলেন একজন ব্যবসায়ী।  জাতির কল্যাণ হয় ব্যবসা ভেতর দিয়ে।  ব্যবসাকে যে শ্রদ্ধার চুকে দেখেনা সে মূর্খ।   ইংরেজ জাতির এই গৌরব- গরিমার এক কারণ ব্যবসা।  ব্যবসা না করলে তার এত বড় হতে পারত না। 

যে জিনিস কিনলে ঠকেছ বলে মনে হয়, সে জিনিস কখনও দিও না ।  কখনও অনভিজ্ঞ ক্রেতাদের ঠকিও না ।  হয়তো  মনে হবে তোমার লোকসান হলো, কিন্তু না, অপেক্ষা কর, তোমার সাধুতা ও সুনাম ছাড়াতে দাও , লোকসানের দশ  গুণ তোমার পকেটে ভর্তি হবে। 

ব্যবসার ভেতর সাধুতার রক্ষা করে কাজ করা অনেকখানি মানুষত্বের দরকার ।  যে ব্যবসায়ী লোভ সংবরণ  করে নিজের সুনামকে বাচিঁয়ে রাখে, সে কম মহত্ত্বের পরিচয় দেয় না।  মিষ্ট ও সহিষ্ণ ব্যবহার, ভদ্রতা এবং অল্প লাভের ইচ্ছা তোমার ব্যবসায়ী জীবনকে সফল করবে। 

অনবরত চাকরি লোভে যুবকেরা সোনার শক্তিভরা জীবনকে বিড়ম্ভিত করে দিচ্ছে।  মিস্ত্রি, কামার দরজি, এরা কি সত্যিই নিন্ম স্তরের লোক? অশিক্ষিত বলেই কি সভ্য সামাজে এদের স্থান নেই? যা তুমি সামান্য বলে অবহেলা  করছ, তা কতখানি জ্ঞান, চিন্তার ও সাধনার ফল তা কি ভেবে দেখেছ? শিক্ষত ব্যক্তি যে কোন কাজই করুক না, তার সম্মান, অর্থ দুই-ই লাভ হবে ।  আত্মার অফূরন্তর শিক্তিকে মানুষের কৃপাপ্রার্থী হয়ে ব্যর্থ করে দিয়ো না। 

**লেখাটি ডা. লুৎফর রহমান এর উন্নত জীবন‘র (দশম পরিচ্ছেদ ) বই থেকে সংগৃহিত**