৫:১৮ পিএম, ২৬ মে ২০১৯, রোববার | | ২১ রমজান ১৪৪০




উপজেলা নির্বাচন: কেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ অপচয়?

১২ মার্চ ২০১৯, ১১:০২ এএম | জাহিদ


নির্বাচন কমিশন পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনে ৯১০ কোটি টাকা বাজেট চূড়ান্ত করেছে।  চতুর্থ উপজেলা নির্বাচন ৬ ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।  এবার ৫ ধাপে ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।  নির্বাচনের কাজ সম্পন্ন করতে ইসি ব্যয় করবে ৯১০ কোটি টাকা।  পাঁচ বছর আগে ২০১৪ সালে ৬ ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বাজেট ছিল ৪০০ কোটি টাকা।  চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনের বাজেট থেকে আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য বাজেট ৫১০ কোটি টাকা বেশি। 

নির্বাচন কমিশন কর্তৃপক্ষ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, ৯১০ কোটি টাকার বাজেটের বিরাট অংশ অর্থাৎ ৭৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য।  সূত্র জানায়, এই বরাদ্দের বড় অংশ ব্যয় হবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাতা বৃদ্ধির পেছনে।  আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের পারিশ্রমিকও বৃদ্ধি করা হয়েছে। 

উল্লিখিত পারিশ্রমিক বা ভাতা বৃদ্ধির কারণ বুঝতে কারও অসুবিধা বা কষ্ট হওয়ার কথা নয়।  জনমনে গুঞ্জন উঠেছে, নির্বাচনের সঙ্গে নিয়োজিত ব্যক্তিরা গত ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে পরিমাণ উৎসাহ ও চতুরতার সঙ্গে ২৯ ডিসেম্বর রাতেই সম্পন্ন করেছেন, তার পুরস্কার (!) হিসেবেই তাদের পারিশ্রমিক বা ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।  

উপজেলা নির্বাচনে বহুল সমালোচিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করার সিদ্ধান্তের কারণেও বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে।  ইসি সূত্রমতে, শুধু ইভিএম পরিচালনা এবং এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ১৭০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।  অথচ সংবাদমাধ্যমে ইসি সচিব উপজেলা নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপের তফসিল ঘোষণাকালে বলেছেন, যথাযথ প্রস্তুতি না থাকায় নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। 

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, ইভিএম পরিচালনা ও এ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ খাতে ১৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরও যথাযথ প্রস্তুতি কেন সম্পন্ন হলো না? এ ছাড়া দেশের প্রায় সব দলের আপত্তি সত্ত্বেও বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সীমিতভাবে ইভিএম ব্যবহার করে কী ধরনের সুফল মিলেছে, তা জনগণ এখনও অবগত নয়।  সংসদ নির্বাচনে জনগণ দেখেছে, ভোট ডাকাতির মহোৎসবে ব্যালট আর ইভিএমের মধ্যে কোনো তফাত হয়নি।  বরং ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে ডাকাতি আরও সহজ ও দ্রুত করা সম্ভব হয়েছে। 

যে দেশে বিগত কয়েকটি নির্বাচনে জনগণের নিজ হাতে ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি বা ভোটের মাধ্যমে জনমতের প্রতিফলন হওয়ার সুযোগ হয়নি, সে দেশে ভোটিং মেশিন ব্যবহারের বিলাসিতা করে ১৭০ কোটি টাকার অতিরিক্ত বরাদ্দ অপ্রয়োজনীয় এবং অপব্যয় ছাড়া আর কিছু নয়।  জনগণের কাছে তা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। 

দশম জাতীয় সংসদের ভোটারবিহীন, প্রার্থীবিহীন ও বয়কটের তথাকথিত নির্বাচনের প্রহসনের পর জনগণ ভোটের প্রতি আস্থা হারায়।  তার পরও দুই মাস পর অনুষ্ঠিত চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের কারণে জনগণ ভোট দিতে পারবে- এমন জনপ্রত্যাশা সৃষ্টি হয়।  জনগণের মধ্যে ভোটের উৎসবমুখর আবহ তৈরি হয়। 

জনগণের প্রত্যাশা ও প্রবল ইচ্ছার ফলে চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে জনগণ বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।  জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়। 

এ ধারা অব্যাহত থাকলে চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি সব ধাপেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে- এই ভেবে সরকার ও সরকারি দল স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কিত ও চিন্তিত হয়ে পড়ে।  এমনিতেই দশম জাতীয় সংসদের ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।  সঙ্গত কারণেই উপজেলা নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেওয়া তাদের জন্য কঠিন ছিল।  

এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে পরবর্তী ধাপের নির্বাচনগুলোতে যেভাবেই হোক বিজয় কেড়ে নিতে দলীয় প্রার্থী, কর্মী ও প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়।  ফলে পরবর্তী ধাপের নির্বাচনগুলোতে প্রশাসনের সহযোগিতায় ভোটকেন্দ্র দখল, আগের রাতে ভোট ডাকাতি, জাল ভোট প্রদান, ভোটের দিনে প্রকাশ্যে জোরপূর্বক সরকারদলীয় প্রার্থীর পক্ষে সিল মারা হয়েছে। 

এভাবে নির্বাচনের ফলাফল সরকারি দলের প্রার্থীদের পক্ষে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।  ৬টি ধাপের ফলাফল (ছক) তুলনামূলক বিচার করলে দেখা যাবে, জনমতকে কীভাবে প্রশাসনের সহযোগিতায় ভূলুণ্ঠিত করে সরকারের পক্ষে নিয়ে যাওয়া যায়।  

উপরোক্ত ছক পর্যালোচনায় এটা পরিস্কার, নির্বাচন কমিশন চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার দোহাই দিয়েছে ঠিকই, ইসি ধাপে ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে সরকারের নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছে।  চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যে জনপ্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছিল, সরকারি দল ও প্রশাসনের এহেন ন্যক্কারজনক আচরণে তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।  জনগণের ভোটের প্রতি অনীহা, অশ্রদ্ধা ও আস্থাহীনতা আরও বৃদ্ধি পায়।  

এবার পঞ্চম উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে ২৯ ডিসেম্বরের রাতের নজিরবিহীন ভোট ডাকাতির মাধ্যমে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই মাস পর।  ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২৯ ডিসেম্বর রাতেই শেষ করেছে।  সরকারি প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন দেশের গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক মেরে দিয়েছে।  তথাকথিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা জনগণের কাছে এতই সাম্প্রতিক যে, তা মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন হয় না। 

এ নজিরবিহীন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই বিএনপি খুব স্বাভাবিকভাবে পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  ফলে পঞ্চম উপজেলা নির্বাচন হবে একতরফা, প্রতিযোগিতাহীন ও নিষ্প্রভ।  আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লাভ করে যে প্রার্থী 'নৌকা' প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন, তিনিই নিশ্চিতভাবে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত বলে ঘোষণা পাবেন।  

সম্প্রতি ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচনের নাটক মঞ্চস্থ হতে দেখেছে দেশের সবচেয়ে সচেতন নগরবাসী।  আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার পর আতিকুল ইসলাম ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পরবর্তী মেয়র বা নগরপিতা- তা আর কাউকে বলে দিতে হয়নি।  দেশের জনপ্রিয় দল বিএনপি মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করায় এ উপনির্বাচনটি হয়েছে প্রতিযোগিতাহীন ও একতরফা। 

তাই ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার তাগিদ অনুভব করেনি।  নতুন ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্রগুলো ছাড়া অন্যান্য কেন্দ্র ছিল প্রায় ফাঁকা।  নবনির্বাচিত মেয়র হয়তো বুঝতেই পারেননি, তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।  আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া প্রয়োজন মনে করেনি।  ভোটারদের অপেক্ষায় ছিল ভোটকেন্দ্রগুলো।  

প্রতিদ্বন্দ্বী পিডিপির মেয়র পদপ্রার্থী শাহীন খান রাতে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমি নিজে ৪০টির বেশি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেছি।  ভোটার উপস্থিতি একেবারেই কম ছিল।  সব মিলিয়ে ৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়ছে বলে মনে হচ্ছিল না।  এখন এত ভোট কোথা থেকে এসেছে, বুঝলাম না!’ নগরবাসীরও প্রশ্ন- এ ধরনের নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ বা অপচয় করার কোনো যৌক্তিকতা ছিল কি-না?

টাকার অপচয় ছাড়াও এ উপলক্ষে ঢাকা শহরে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে বিলাসিতা এবং রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।  যে উপনির্বাচনে ভোটের প্রয়োজন হয়নি, সেই তথাকথিত নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার স্বার্থে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে বহিরাগতদের বের করার ঘোষণা জনমনে ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে।  

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রের উপনির্বাচন পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের একটি প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যায়।  আসন্ন উপজেলা নির্বাচনও ঠিক একইভাবে একতরফা ও প্রতিদ্বন্দ্বিহীনভাবে অনুষ্ঠিত হবে- এতে সন্দেহের অবকাশ নেই।  এ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নিশ্চিতভাবে বুঝতে পেরেছেন, তাকে নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হবে। 

এটা জেনে কোনো প্রার্থী কি ভোটভিক্ষা করার জন্য জনগণের দুয়ারে দুয়ারে যাবেন? জনগণই কি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার কোনো তাগিদ বা প্রয়োজন অনুভব করবেন? মোটেই না।  তাহলে প্রশ্ন-পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনের চর্তুথ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের বাজেট থেকে ৫১০ কোটি টাকা বৃদ্ধি করে ৯১০ কোটি টাকা বরাদ্দের কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ বা প্রয়োজনীয়তা আছে কি?

পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয় দল বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় মূলত নৌকা মার্কার প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।  ইতিমধ্যে অনেক নৌকা মার্কার প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।  প্রতিটি নির্বাচনে কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী নানা কারণে বা পরিচিত হওয়ার উদ্দেশ্যে নির্বাচনে নামমাত্র অংশগ্রহণ করে থাকেন। 

ফলাফল প্রকাশের পর ওইসব প্রার্থী কে কত ভোট পেয়েছেন, তার খবর আর কেউ রাখে না।  পত্রপত্রিকায়ও প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করা হয় না।  এবারের উপজেলা নির্বাচনেও হয়তো কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী লোক দেখানো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।  এ ছাড়া ভাইস চেয়ারম্যান (সাধারণ) ও ভাইস চেয়ারম্যান (নারী) পদে নির্বাচন উন্মুক্ত থাকার ফলে হয়তো ভোটকেন্দ্রে কিছু ভোটার উপস্থিত হবেন।  

কিন্তু দলীয় নির্বাচনে মূল পদে নির্বাচনের নামে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপনির্বাচনের মতোই একটি তামাশার নাটক মঞ্চস্থ করার কোনো বিকল্প নেই।  এমতাবস্থায়, ইতিমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নৌকা মার্কার প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের সঙ্গে অবশিষ্ট নৌকার প্রার্থীদের নির্বাচিত ঘোষণা করে দিলে অতি সহজেই নির্বাচন-নামীয় নাটক সমাপ্ত করা যায়।  রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমাকৃত জনগণের ৯১০ কোটি টাকার অপচয় খুব সহজেই পরিহার করা যায়।  


keya