২:৩৪ এএম, ২১ নভেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১




‘একজন শিক্ষকের মর্যাদা ও বেতন বৈষম্য’

০১ মে ২০১৯, ০৫:২৭ পিএম | জাহিদ


এসএনএন২৪.কম : বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাস জানতে ও বুঝতে গেলে গোড়ার দিককার উচ্চশিক্ষার ইতিহাস জানা প্রয়োজন।  কারণ আজকের এই শিক্ষাব্যবস্থা একদিনেই গড়ে ওঠেনি। 

সভ্যতার শুরু থেকে শিক্ষার নানা ধরণ, প্রকরণ ও স্তর বেয়ে রূপান্তরিত হতে হতে আজকের এই শিক্ষাব্যবস্থা চ‚ড়ান্ত অবস্থা লাভ করেছে।  এর পেছনে রয়েছে নানা শাসকগোষ্ঠি, দল, ব্যক্তির যুগপৎ প্রচেষ্টা।  রয়েছে বিদেশি শিক্ষার প্রবেশ ও অনুপ্রবেশ।  আমাদের মনে রাখা দরকার, একজন শিক্ষিত মানুষ বহু মানুষ তৈরি করতে পারে।  আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলিতে  আবার শিক্ষকের নামে অশিক্ষক নিয়োগ দিলে তদ্র‚পভাবে একজন শিক্ষক হাজারও খারাপ মানুষ বানাবে যা বলার অপেক্ষায় রাখে না। 

আজ আমরা আধুনিক সভ্যতায় এসে দাঁড়িয়েছি।  অথচ ক’দিন আগের কথা চিন্তা করলে বুঝতে পারি ।  আজকের আমাদের সন্তান গ্রামের স্কুলটিতে টাই ও জুতো পোশাক  পড়ে যায়।  অথচ আমরা অনেকেই ছোট্রবেলার স্কুল জীবনটা হাফপেন্ট পড়ে কাটিয়ে দিয়েছি।  পাঁকা ঘরের ছাঁদ থেকে সিমেন্ট খসে পরা এমনকি ধর্ম স্যারের বেতের বারি খাওয়ার ভয়ে ক্লাশ থেকে জানালা দিয়ে পালিয়ে যাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি ঘটনা কমবেশি অতীতকে নিয়ে স্মৃতি  বহন করে।  সময় বদলিয়ে যায় বোর্ড পরীক্ষা দিতে গিয়ে।  ধকল পোহাতে হয়েছে অতীতের অবলিলায় সময় নষ্টও করেছি বলে!

আমাদের অনেকের খুব কাছের শিক্ষক ছাত্র জীবনে স্মৃতি হয়ে থাকে।  আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের  ফাইন আর্টস এর ছাত্র ছিলাম।  সেখানে অনেক শিক্ষককে বন্ধুর মত করেই ছাত্রদের সাথে মিশতে দেখেছি।  এমনকি আমার একজন প্রিয়  শিক্ষক ড. সুশান্ত কুমার অধিকারী স্যারকে সাইকেল চালিয়ে ক্যম্পাসও এ আসতে দেখেছি।  অনেক বড় মাপের বড় মনের মানুষ তিনি। 

গান বাজনা, ছবি আঁকা, কখনো লাল টি- সার্ট, কখনো ফতুয়া -ধুতী যা আমাদের সৃষ্টিশীল হওয়ার মানষিকতাকে বেগবান করে তুলতে যথেষ্ট্য সাহস যোগাতেন।  তাকে দেখে বার বার সম্মান করা,শ্রদ্ধা করার ইচ্চা বেড়ে যেত আমাদের।  বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় শিক্ষককে সে সময় মনে হতো, বিশেষ করে শর্ম্মা স্যারের কথা না বললে নয়, আমি কলেজে নিয়োগ নেয়ার সময় তিনি সাবজেক্ট এক্সপার্ট হয়ে এসেছিলেন ।  তিনি আসবেন  ভাবতে পারিনি আর বাইবা বোর্ড এ তিনি আমাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, কেমন আছো? হ্যা তোমাকে চিনতে পারছি। 

সেদিন আমার কাছে মনে হয়েছিল স্যারকে যদি একটু সেবা করার সুযোগ পেতাম।  সময় সুযোগ হয়ত সে দিন অনুকলের বাইরে অবস্থান করছিল। চারুকলার সবচেয়ে পেইন্টিং এ ভাল শিক্ষক হিসেবে শর্ম্মা স্যারকে সবাই জানে। যে সময় স্টুডেন্টদের তেল রং এ পেইন্টিং দেখাতেন আর সে সময় স্টুডেন্ট ও অন্যান্য শিক্ষকদের লাইন ধরে দেখতে দেখেছি প্রায় দিনই।  সে সময়টি আমার জীবনের একজন খুব কাছের মানুষটিকে পাওয়া।  সেদিন অনুভব করলাম ,আমি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ার সুযোগ না পেতাম শিক্ষার একটি পৃষ্ঠা খালি হয়ে থাকতো। 

শিক্ষা জীবনের বিরাট একটি অংশ থেকে আমাকে বঞ্চিত হতে হত, যে কারনে কথা গুলো বললাম তা হলো  এতে প্রমাণিত হয়, একজন ভালো শিক্ষককের  সম্মান যে কত বড় তার তুলনা করা কোন কিছুতেই সম্বভ নয় ।  আজকের দিনের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষকতা মানে বিকেল ৫টাপর্যন্ত  চাকুরি নয়, ক্লাসের বাইরেও শিক্ষকদের অনেক কাজ থাকে।  শিক্ষা নিয়ে গবেষনা, শিক্ষাকে ছাত্রদের মাঝে সুন্দর করে বিলিয়ে দে’য়াসহ শিক্ষার আলো প্রচারে যুগোপযোগী কৌশল তৈরীতে মনোযোগী হওয়া। 

আর এসব কাজ ভালোভাবে করতে হলে চিন্তামুক্ত জীবন চাই।  শিক্ষকদের এমন বেতন দিতে হবে যাতে তারা স্ব-সম্মানে জীবনযাপন করতে পারে।  আমাদের উচিত ভালো বেতন দিয়ে, ভালো সম্মান দিয়ে, ভালো সুশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া।  এমন বেতন দিতে হবে যাতে তারা নিজ বিদ্যালয়ে পাঠদান ছাড়া অন্য কোথাও বাড়তি উপার্জনের জন্য পড়াবে না।  আর এসব কাজ ভালোভাবে করতে হলে চিন্তামুক্ত জীবন চাই। 

আমরা জানি, একজন আদর্শবান শিক্ষক সমাজ বদল ও গঠনে বিশেষ ভ‚মিকা রাখেন।  আদর্শ শিক্ষকই শুধু পারেন আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার রূপরেখা ও কাঠামো তৈরি করতে।  এ জন্যই শিক্ষকতাকে অপরাপর পেশার মানদÐে পরিমাপ করা যায় না বলে অনাদিকাল থেকে এটি একটি সুমহান পেশা হিসেবে সমাজ-সংসারে পরিগণিত হয়ে আসছে।  কারণ, জ্ঞানই মানুষের যথার্থ শক্তির পথনির্দেশ দিতে পারে।  শিক্ষকরা মানুষ তৈরির কারিগর।  শিক্ষকরা জাতির প্রধান চালিকাশক্তি।  এক কথায় বলা যায়, শিক্ষক মানুষ চাষ করেন।  যে চাষাবাদের মধ্য দিয়ে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে।  পাশাপাশি পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র তার দ্বারা উপকৃত হয়। 

জ্ঞাননির্ভর সমাজ গঠনে প্রয়োজন মানুষ গড়ার কারিগর।  তাই শিক্ষকদের পর্যাপ্ত পেশাগত স্বাধীনতা থাকা দরকার।  এর পাশাপাশি যথার্থভাবে শিক্ষকদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।  দেশব্যাপী শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার আদায় ও মর্যাদা সুরক্ষাসহ শিক্ষকদের জীবনের মান উন্নত করার ব্যাপারে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।  শিক্ষকতা অতি সম্মানিত ও মহান পেশা।  কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, সামাজিক দায়িত্ব ও মর্যাদার দিক থেকে শিক্ষকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের সমাজে এমনকি জাতীয়ভাবে শিক্ষকদের তেমন সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয় না।  ক্ষেত্রবিশেষ শিক্ষকতার মতো মহান পেশাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখা হয়। 

বলতে লজ্জা হয়, দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত ও শারীরিকভাবে নিগৃহীত হতে দেখা যায়।  এটা অত্যন্ত ঘৃণ্য ও অমানবিক কাজ। কলেজ  কিংবা  বিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্টের নামে শিক্ষকদের ওপর খবরদারি করা হলে তা শিক্ষকদের আত্মসম্মানে আঘাত পায়,অশিক্ষিত মেনেজমেন্ট পদ্ধতিকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে শিক্ষিত কমিটির সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে শিক্ষকের মর্যাদাকে অক্ষুন্ন রাখতে নীতিমালা তৈরি করার প্রয়োজন বলে মনে করছি।  বিশেষ করে কম শিক্ষিতদের স্কুল কলেজ কমিটিতে না রাখায় বুদ্ধিমানের কাজ।  এতে শিক্ষার পরিবেশ বিশৃঙ্খলতা থেকে রেহায় পাবে বলে মনে  হয়।  অপর পক্ষে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও প্রতিষ্ঠান সভাপতি মিলে ভাল ও মেধা সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দিলে যথাযথভাবে শিক্ষার মান অনেক গুনে বেড়ে নিশ্চিত! আমাদের উচিত শিক্ষায় সরকারকে আরও বেশিবেশি বাজেটসহ  বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। 

কারন, শিক্ষকদের এমন বেতন-ভাতাদি দিতে হবে যাতে করে তারা সম্মানে জীবনযাপন করতে পারে।  কারণ হিসেবে বলতে চাই, যে মফস্বলের শিক্ষকটির খারাপ ছাত্রটি একটি বেসরকারি ইনিস্টিটিউট হতে কোনমত পাশ করে অনেক টাকা বেতন পায়।  অথচ একজন সৎ  শিক্ষক হিসেবে সারা জীবন চাকরী করে শুধুমাত্র টাকার জন্য অভাবি মানুষ হিসেবে সনÍানদের কাছে এমন কথা অনেকই শুনতে হয়।  টাকা (বেতন) এর কারনে যদি প্রতিনিয়ত এ পেশার মুল্য পরিবার সন্তানের কাছে মুল্যহীন হয়ে পড়ে।  একজন শিক্ষক যদি সম্মানের দিক দিয়ে সকল পেশার উর্ধ্বে থাকে,তাহলে দেশের শিক্ষিত গড়ার কারিগর যারা, তাদের সম্মানের স্বার্থে মুল্যায়ন করে বেতন সকল পেশার উধ্বে রাখতে এ তো বাধা কেন?

সফিকুর ইসলাম শিল্পী
প্রভাষক ও সাংবাদিক
রানীশংকৈল, ঠাকুরগাঁও