১০:১৯ এএম, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, সোমবার | | ১৩ মুহররম ১৪৪০


একাত্তরের জননী কে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছে সর্বস্তরের মানুষ

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৩:৩০ পিএম | মাসুম


এসএনএন২৪.কম : একাত্তরের জননী’ খ্যাত লেখিকা জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ।  সোমবার সকালে রমা চৌধুরীর মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল থেকে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে নেওয়া হয়।  সেখানে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা শেষে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। 

রমা চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাড়ের ব্যথাসহ নানা রোগে ভুগছিলেন।  গত বছরের ডিসেম্বরে বাসায় পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে গিয়েছিল তাঁর।  সেই থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।  কয়েক দিন আগে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়।  গতকাল রাত ১০টায় তাঁকে সেখানে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। 

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ভোররাত ৪টা ৪০ মিনিটে রমা চৌধুরীর লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। 

একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত এই মহীয়সী নারীর মরদেহ হাসপাতাল থেকে সকাল ১০টায় নেওয়া হয় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।  সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসেন লেখিকা শহীদজায়া মুশতারী শফী। 

তিনি বলেন, রমা চৌধুরী আজীবন সংগ্রামী একজন নারী।  তিনি কারও দান গ্রহণ করেননি।  নির্মোহ একজন নারী।  নিজে বই লিখে তা বিক্রি করে জীবনযাপন করেছেন।  তাঁর অবদান অনেক।  রাষ্ট্রের কাছে তাঁর অনেক কিছু পাওনা ছিল। 

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আমেনা বেগম, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, নগর বিএনপির সভাপতি শাহাদাত হোসেন ও সহসভাপতি আবু সুফিয়ান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা, লেখিকা রীতা দত্ত, উদীচী চট্টগ্রামের সহসভাপতি চন্দন দাশ, আবৃত্তিশিল্পী রণজিৎ রক্ষিত, রাশেদ হাসান, গণজাগরণ মঞ্চের সমন্বয়ক শরীফ চৌহান প্রমুখ। 

অর্পণ চরণ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ, কৃষ্ণ কুমারী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, পাহাড়িকা সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, সরকারি মুসলিম হাইস্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রমা চৌধুরীকে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান। 

পরে পুলিশের একটি চৌকস দল গার্ড অনার দেয়।  বিউগলে বাজানো হয় করুণ সুর। 

শহীদ মিনার থেকে রমা চৌধুরীর মরদেহ নেওয়া হয় নগরের চেরাগী পাহাড় চত্বরে।  সেখানে এক কক্ষের একটি বাসায় তিনি থাকতেন।  সেখান থেকে বোয়ালখালীর পোপাদিয়ার গ্রামের বাড়িতে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়।  সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করার কথা রয়েছে। 

রমা চৌধুরী ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন রমা চৌধুরী।  তিনিই ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ)।  ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন।  দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। 

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তিন পুত্রসন্তানের জননী ছিলেন।  থাকতেন পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায়।  তাঁর স্বামী ভারতে চলে যান।  ১৩ মে সকালে পাকিস্তানি সেনারা এসে চড়াও হয় তাঁর ঘরে।  এ সময় দুগ্ধপোষ্য সন্তান ছিল তাঁর কোলে।  এরপরও তাঁকে নির্যাতন করা হয়।  পাকিস্তানি সেনারা গানপাউডার দিয়ে আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে দেয় তাঁর ঘরবাড়ি।  পুড়িয়ে দেয় তাঁর সব সম্পদ।  নিজের নিদারুণ এই কষ্টের কথা তিনি লিখেছেন ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থে। 

জয়লাভের পর ২০ ডিসেম্বর তাঁর বড় ছেলে সাগর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।  এর ১ মাস ২৮ দিন পর মারা যায় আরেক ছেলে টগর।  এরপর তিনি জুতা পরা বাদ দেন।  পরে অনিয়মিতভাবে জুতা পরতেন তিনি।  ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর আরেক ছেলে মারা গেলে পুত্রশোকে তিনি আর জুতা পায়ে দেননি।  খালি পায়ে হেঁটে নিজের লেখা বই বিক্রি করে চলতেন এই নারী।  বর্তমানে বেঁচে আছেন তাঁর আরেক ছেলে জহর চৌধুরী।