৬:০৫ এএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, শনিবার | | ৬ রবিউস সানি ১৪৪০




এক হাতে স্বপ্নপূরণের লড়াই

০৮ মার্চ ২০১৮, ০৯:৪০ এএম | নকিব


এসএনএন২৪.কম : জন্মের পর থেকে ডান হাত অকেজো রেজওয়ানা আনজুম রোকসানার।  এ নিয়ে তার মা-বাবা ছিলেন দুশ্চিন্তায়। 

তবে রোকসানার চিন্তা ছিল একটু আলাদা।  ডান হাত অকেজো তো কী, বাম হাত তো আছে।  তাই ডান হাতের সব কাজ বাম হাতে করার কায়দা রপ্ত করতে শুরু করেন রোকসানা এবং সফলও হন।  এরপর আর তার পথচলায় বাধা হতে পারেনি কিছুই।  প্রবল ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে শারীরিক প্রতিবন্ধীকতাকে হার মানিয়ে আজও স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে লড়ে যাচ্ছেন তিনি। 

এসএসসি ও এইচএসসি পাস করার পর রোকসানা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন।  এখন তিনি স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। 

রেজওয়ানা আনজুম রোকসানার বাড়ি রাজশাহীর বানেশ্বরে।  মুদি-দোকানি মাসেম আলী মোল্লার মেয়ে তিনি।  পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের সংসারে রোকসানা তৃতীয়।  তার একমাত্র ভাই বাপ্পীও প্রতিবন্ধী।  বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে।  সংসারে আছে ছোট আরও দুই বোন।  পড়াশোনা করছে তারাও। 

আরও কিছুদিন পরেই সংসারের সব ভার এসে পড়বে রোকসানার কাঁধে।  সে ভার নিতেই নিজেকে প্রস্তুত করছেন তিনি।  সংসারের বেহাল অবস্থার কথা ভেবেই এক হাতেই তিনি লড়ে যাচ্ছেন জীবনের সঙ্গে। 

রোকসানা জানান, পড়ালেখার খরচ চালিয়ে এপর্যন্ত আসতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাকে।  তবে স্কুলে পড়া অবস্থায় মেধা তালিকায় সবসময় দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থানে অবস্থান করতেন।  সেই সুবাধে বাৎসরিক ১০০০/১২০০ টাকা বৃত্তি পেতেন।  আর তা দিয়ে স্কুল পর্যন্ত পড়ালেখা চালিয়ে নিয়েছেন।  কলেজ জীবনও পার করেছেন অনেকটা একইভাবেই। 

তিনি আরও জানান, এসএসসি ও এইচএসসি পাস করার পর রাবির মনোবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন।  এরপর প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জ ডেভেলপমেন্ট’ (পিডিএফ) –এ যোগ দেন।  এখান থেকে বাৎসরিক ১৪ হাজার টাকা বৃত্তি পেতেন।  এর বাইরে দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-উপদেষ্টা দফতর থেকে ফরম পূরণের টাকা এবং ২০১৭ সালে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা বৃত্তি পান তিনি, যা দিয়ে কোনোরকমে চালিয়ে নিচ্ছেন পড়ার খরচ।  এতো প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও প্রথম বর্ষে ৩.২১ ও দ্বিতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষায় ৩.৩০ জিপিএ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। 

রোকসানা বলেন, ‘সংসারের হাল ধরার জন্য কষ্ট হলেও বাম হাতেই সব কাজ করি।  পড়ালেখাটাও ধরে রেখেছি। ’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক সময় খুব খারাপ লাগতো।  কারণ, আর দশটা মানুষের মতো আমি নয়।  সবকিছু চাইলেও করতে পারি না।  তার ওপর আমাদের সমাজে মেয়ে হয়ে এত কিছু করা সহজ নয়।  কিন্তু সেসব ভেবে আর কী হবে? মনকে সান্ত্বনা দিয়েছি, যেকোনও মূল্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।  থেমে থাকিনি।  এখন একটাই স্বপ্ন, শিক্ষক হওয়া। ’

কেবল রোকসানা নয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রোকসানার মতো আরও ১৩ জন নারী প্রতিবন্ধী আছেন, যারা পিডিএফ-এর সদস্য।  এর বাইরে অনিবন্ধিত আরও শিক্ষার্থী রয়েছেন, তবে তাদের সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-উপদেষ্টা অধ্যাপক জান্নতুল ফেরদৌস বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রত্যেক মাসে তিন জনকে বৃত্তি দেওয়া হয়।  এর বাইরে প্রতিটি বিভাগ প্রতিবন্ধীদের বিশেষ যত্ন নেয়।  তাদের এ বিষয়ে অবহিত করা আছে।  অনেকে চার তলায় উঠতে পারে না, তাদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।  এছাড়া, আবাসিক হল বলি আর একাডেমিক ক্ষেত্র বলি, সব জায়গাতেই তাদের বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। ’



keya