১২:৫৭ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার | | ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০


এরদোগান কি পারবে সৌদির বিরুদ্ধে ?

২৪ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:০৭ এএম | মাসুম


এসএনএন২৪.কম : তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির ইস্তানবুল কনস্যুলেট ভবনে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরবেন বলে যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে এই বিভৎস ঘটনার নতুন তেমন কিছু বেরিয়ে আসছে বলা যায় না। 

তবে ঘটনার শুরু থেকে এই পর্যন্ত তুরস্কের সরকারি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কথাবার্তায় এটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, তুরস্ক খাশোগি ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার কোনো চেষ্টা করবে না। 

তুরস্কের ক্ষমতাসীন এ কে পার্টির মুখপাত্র শনিবার থেকে বারবার বলে আসছেন যে তুরস্ক খাশোগি হত্যার বিস্তারিত তদন্ত করে ফলাফল সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরবে। 

এ কে পার্টির উপ-প্রধান এবং পার্টির সাবেক মুখপাত্র এবং সাবেক মন্ত্রী নুমান কুরতুলমুশ এক টেলিভশন প্রোগ্রামে এ হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাদেরকে বাঁচানোর সৌদি প্রচেষ্টা সফল হতে দেবে না।  ঘটনার পেছনের মূল ঘটনাকে লুকানোর যে কোনো কৌশল ব্যর্থ সফল হতে দেবে না। 

যদিও ঘটনার প্রথম দিক থেকেই তুরস্ক একই মনোভাব ব্যক্ত করলেও ঘটনা প্রবাহের দিকে তাকালে সৌদি ও তুরস্কের মধ্যে কোনো চুক্তি হতে পারে বলে ধারণা করা হতো। 

আন্তর্জাতিক মহল বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের জনমতের সঙ্গে তুরস্কের জনগণ ও এই ঘটনার মূলোৎপাটনের জন্য তুরস্ক সরকারকে চাপে রাখছে। 

কিন্তু এরদোগান তদন্তের ফলাফল হিসেবে গত দুই সপ্তাহ ধরে পত্র পত্রিকায় যে খবরগুলো বেড়িয়েছে সেগুলোর বাইরে নতুন তেমন কিছুই বলেননি। 

তবে তার এই বক্তৃতার মাধ্যমে এতদিন পত্র-পত্রিকায় বেরোনো খবরগুলো তুরস্কের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতি পেলো। 

এরদোগান তার বক্তৃতায় যে বিষয়গুলোতে প্রাধান্য দিয়েছেন-

১. খাসোগি হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত এবং রাজনৈতিক একটা হিংস্র হত্যা। 

২. শুধুমাত্র নিম্ন স্তরের কিছু কর্মকর্তার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিয়ে ঘটনার মূল হোতারা পার পেতে পারে না। তিনি এর মাধ্যমে সরাসরি না হলে পরোক্ষভাবে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকেই ইঙ্গিত করেছেন। 

৩. হত্যাকাণ্ডের হুকুমদাতা, পরিকল্পনাকারী এবং এই নৃশংস ঘটনার বাস্তবায়নকারী সকলকেই আইনের অধীনে এনে বিচার করার আহ্বান জানান তুরস্কের রাষ্ট্রপতি। 

৪. বাদশা সালমান বিন আবদুল আজিজ আল-সৌদের ওপর তার পূর্ণ আস্থা ব্যক্ত করেন এরদোগান।  সৌদি বাদশাকে তিনি তার বক্তব্যে ‘পবিত্র দুই মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক ও মহামান্য বাদশা’ বলে সম্বোধন করেছেন।  একই সঙ্গে তিনি বলেন এই ঘটনার পূর্ণ তদন্তের ক্ষেত্রে সৌদি বাদশার আন্তরিকতার প্রশংসা করেছেন। 

৫. তিনি খাসোগির হত্যাকাণ্ড নিয়ে সৌদি স্বীকারোক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষপে বলে বর্ণনা করছেন।  তবে সৌদি আরব ওই হত্যাকাণ্ডের যে বিবরণ দিয়েছে তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। 

৬. তার মতে, খাশোগির মৃত্যু নিছক কোনো হাতাহাতি থেকে নয় বরং পূর্বপরিকল্পিত।  আর এই পরিকল্পনার পিছনে সৌদি কনসুলেটের এক কর্মকর্তা ২৯ সেপ্টেম্বর সৌদি সফর করেন।  সরকারের উর্ধ্বতন ব্যক্তিদের কাছ থেকে নির্দেশ নিয়ে খাশোগি হত্যার একদিন আগে ইস্তানবুলে ফিরে আসে।  আর এই ব্যক্তিই সিকিউরিটি সিস্টেম হার্ডডিস্ক সরিয়ে ফেলে।  ধারণা করা হচ্ছে, এরদোগানের বর্ণনা করা এই লোক কনস্যুলেটের সিনিয়র অফিসার।  ওই লোকটিই সৌদি গোয়েন্দা উপ-প্রধান আল আসিরি থেকে সরাসরি অনুমতি নিয়ে আসেন। 

৭. তুরস্কের নেতা আরেকটা বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, খাশোগি যেহেতু আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিত একটি মুখ এবং হত্যাকাণ্ড সৌদির কনস্যুলেট ভবনে হলেও যেহেতু তুরস্কে ঘটছে সেহেতু তুরস্ক এর শেষ উদ্ঘাটন করবেই। 

৮. তিনি তুরস্কের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করারও প্রস্তাব করেন। 

৯. সৌদি বাদশাকে উল্লেখ করে এরদোগান বলেন যে ১৮ জন ব্যাক্তিকে সৌদি এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে গ্রেফতার করেছে তাদেরকে তুরস্কের কাছে হস্তান্তর করুক এবং তাদের ইস্তানবুলে বিচার করার আশা ব্যক্ত করেন এরদোগান। 

১০. এরদোগানের মতে, এ ঘটনার পেছনে শুধু সৌদি আরব না বরং তার আঞ্চলিক সহযোগীরাও জড়িত।  একথা বলে মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে আঙুল তুললেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। 

তবে এতদিন পত্রপত্রিকায় এই হত্যাকাণ্ডের অডিও ও ভিডিও রেকর্ড তুর্কি কর্মকর্তাদের কাছে আছে বলে যে দাবি করা হয়েছিল তিনি সে ব্যাপারে কোনো কিছুই বলেন নাই। 

তার আজকের বক্তব্যে এটা স্পষ্ট হলো যে, তুরস্ক সৌদির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতে যাবে না।  সৌদি বাদশাকে ঘটনাটি হ্যান্ডেল করার জন্য সুযোগ দিচ্ছে তুরস্ক।  পরোক্ষভাবে ক্রাউন প্রিন্সকে ঘটনার পেছনের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ইঙ্গিত করে তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করছে। 

তুরস্ক হত্যাকাণ্ডটিকে ঘিরে সৌদির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে সৌদি সরকারকে একটা সমঝোতায় নিয়ে আসতে চাচ্ছে।  আন্তর্জাতিক মহল যে সৌদি-তুর্কি একটা সংঘাতের আশা করছিল এরদোগান আজকের বক্তব্যে তাদের সে আশার গুঁড়েবালি দিলেন। 

সর্বোপরি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো রাজনৈতিক অবস্থানে না গিয়ে বরং তুরস্ক সৌদিকে কূটনৈতিকভাবে চাপে রেখে নিজের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক অনেকগুলো বিষয়ে সৌদির কাছ থেকে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করতে পারে। 

যেমন-

১. সৌদি বাদশা সালমানের সক্রিয়ভাবে দেশ পরিচালনার আহ্বান এবং প্রিন্স সালমানকে বিশেষ করে তুরস্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়গুলোতে নিষ্ক্রিয় রাখার আহ্বান। 

২. খাশোগির হত্যাকাণ্ডের সৌদি তদন্তের পূর্ণ ফলাফল খুব দ্রুত ঘোষণা। 

৩. এই ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। 

৪. আঞ্চলিক বিষয়গুলোতে বিশেষ করে সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ইসরাইল বিষয়ে তুরস্কের স্বার্থ বিরোধী পদক্ষেপগুলো থেকে বিরত থাকা। 

লেখক : সারওয়ার আলম, ডেপুটি চিফ রিপোর্টার-নিউজ পাবলিশার

আনাদলু এজেন্সি, তুরস্ক