৭:০২ এএম, ১৭ অক্টোবর ২০১৮, বুধবার | | ৬ সফর ১৪৪০


এরদোয়ান তুরস্কের নয়া সুলতান

২৩ জুলাই ২০১৮, ১১:০৭ এএম | জাহিদ


এসএনএন২৪.কম :  তুরস্কের প্রেসিডেন্ট পদে রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান পুননির্বাচিত হয়েছেন।  এর কিছুদিন পরেই দেশটিতে বলবৎ জরুরি অবস্থার মেয়াদ আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে। 

এর আগে তিন মাস করে সাতবার জরুরি অবস্থার মেয়াদ বাড়িয়েছিল এরদোয়ান সরকার।  ব্যর্থ এক সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে তুরস্ক গত দুই বছর এভাবেই এগিয়েছে। 

এদিকে বিবিসি জানিয়েছে, ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর জারি করা জরুরি অবস্থা চলাকালীন লক্ষাধিক লোককে গ্রেপ্তার বা চাকরিচ্যুত করা হয়।  সরকারি পরিসংখ্যান ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, এ সময় জরুরি ডিক্রি জারি করে এক লাখ সাত হাজারেরও বেশি লোককে সরকারি চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ৫০ হাজারেরও বেশি লোককে বিনা বিচারে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। 

ব্যর্থ ওই অভ্যুত্থানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা ইসলামপন্থি তুর্কি নেতা ফেতুল্লাহ গুলেন ও তার সমর্থকদের দায়ী করেছে তুরস্ক।  অভিযোগ অস্বীকার করেছেন গুলেন; যিনি একসময় প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের রাজনৈতিক মিত্র ছিলেন।  যাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে ও জেলে পোরা হয়েছে তারা গুলেনের সমর্থক বলে অভিযোগ তুরস্ক সরকারের।  ২০১৬ সালের ওই অভ্যুত্থানের সময় সামরিক বিমান থেকে পার্লামেন্টে বোমাবর্ষণ করা হয়েছিল এবং আড়াইশোরও বেশি লোক নিহত হয়েছিল। 

সম্প্রতি বিপুল নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে আরও পাঁচ বছরের জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নতুন মেয়াদ শুরু করেছেন এরদোয়ান।  প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এরদোয়ান নিজের জামাতা বেরাক আলবাইরাককে তুরস্কের অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন।  ৯ জুলাই তুরস্কের পার্লামেন্ট দপ্তরে শপথ নেওয়ার পর রাজধানী আঙ্কারায় প্রেসিডেন্টের বাসভবনে উপস্থিত আন্তর্জাতিক নেতা ও কয়েক হাজার অতিথিদের সামনে ভাষণ দেন এরদোয়ান। 

ভাষণে ৬৪ বছর বয়সী এ নেতা বলেন, ‘আমরা, তুর্কি হিসেবে ও তুরস্কের লোক হিসেবে আজ থেকে নতুনভাবে শুরু করছি।  আমরা ওই পদ্ধতিকে পেছনে ফেলে আসছি, যা অতীতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে আমাদের দেশের অনেক ক্ষতি করেছে। ’

এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোয়ানের জয়ের মধ্য দিয়ে তুরস্কের ক্ষমতার ভারসাম্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।  পার্লামেন্ট পদ্ধতির শাসনব্যস্থা থেকে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বিলুপ্ত করা হয়েছে।  এক বছর আগে বিতর্কিত একটি গণভোটের মাধ্যমে এ পরিবর্তনের অনুমোদন আগেই নিয়ে রাখা হয়েছিল।  ৯৫ বছর আগে অটোমান সাম্রারাজ্যের পতনের পর তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের শুরু থেকে যে শাসনব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছে, এর মাধ্যমে তার অবসান হলো। 


এখন থেকে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান, উভয় দায়িত্বই পালন করবেন প্রেসিডেন্ট।  তিনি পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়াই মন্ত্রিসভা গঠন করবেন, মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবর্তন করতে পারবেন। 

এরদোয়ান বলেন, অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য, ২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তে সিরিয়া ও ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ থেকে তুরস্ককে রক্ষার জন্য নির্বাহী ক্ষমতার দিক দিয়ে প্রেসিডেন্টের অনেক বেশি ক্ষমতাশালী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।  ভাষণে তিনি ‘শক্তিশালী সরকার ও শক্তিশালী তুরস্ক’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। 

এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করা তার্কিশ এয়ারলাইনসের সাবেক নির্বাহী ফোয়াত ওকতাইকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।  সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হুলুসে আকাসকে নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বানিয়েছেন।  পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কভুসগলু অপরিবর্তিত আছেন।  মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী মেহমেত সিমসেক, তাকে এরদোয়ানের আগের সরকারের সবচেয়ে ‘মার্কেট-ফ্রেন্ডলি’ মন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হতো।  তাকে বাদ দিয়ে জামাতা আলবাইরাককে নতুন অর্থমন্ত্রী করার পরই তুরস্কের অর্থবাজারে একটি ধাক্কা লেগেছে, নেমে গেছে তুর্কি মুদ্রা লিরার মান। 

এরদোয়ানের সমর্থকরা তুরস্কের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তনকে এমন এক নেতার জন্য উপহার হিসেবে বিবেচনা করছেন, যিনি জনজীবনে ইসলামি মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়েছেন, ধর্মভীরু শ্রমজীবী শ্রেণির পাশে থেকেছেন এবং ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।  অন্যদিকে এসব পরিবর্তন তুরস্ককে স্বৈরাচারী শাসনের দিকে নিয়ে যাবে বলে সতর্ক করেছে বিরোধীরা।  আধুনিক তুরস্কের জনক মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের প্রতিষ্ঠিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি করার জন্য এবং এগুলোকে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও বাকস্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এরদোয়ানকে অভিযুক্ত করেছেন। 

রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান হলেন তুরস্কের ১২তম প্রেসিডেন্ট, যিনি ২০১৪ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন।  ২০০১ সালে তিনি এ কে পার্টি (জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা একেপি) প্রতিষ্ঠা করেন।  প্রতিষ্ঠার অল্পদিনের মধ্যেই দলটি জনসমর্থনের মাধ্যমে এক নম্বর অবস্থানে চলে আসে।  দলটি ১৯৮৪ সালের পর প্রথমবার তুরস্কের ইতিহাসে একদলীয় দল হিসেবে এবং পর পর চারবার (২০০২, ২০০৭, ২০১১, ২০১৪) সংসদীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়।  প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ক্ষমতাসীন এই দলের সভাপতি ও প্রধান দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের আগেও ২০০৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তুরষ্কের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং তার আগে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ইস্তাম্বুলের মেয়র হিসেবে এরদোয়ান দায়িত্ব পালন করেন।  ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রবেশাধিকারের চুক্তি, গত ১০ বছর ধরে চলাকালীন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও তুর্কি লিরার (তুর্কি মুদ্রা) দাম্য পুনর্নির্ধারণ, সুদের হার কমানো, অতীতে অটোমান শাসনাধীন দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন ও বিশ্বমহলে নেতৃস্থানীয় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তিকে মূল লক্ষ্য রেখে বৈদেশিক নীতি গ্রহণ (নব্য-অটোমানবাদ), বিরোধী বিক্ষোভকারীদের সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি কারণে বিশ্বমহলে তিনি ব্যাপকভাবে আলোচিত। 

এবার নির্বাচনে বিজয় এরদোয়ানের জন্য সহজ হয়নি।  বলা যায়, দেড় দশক পর তুরস্কের বিরোধীরা স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করেছিল।  কিন্তু যার সাফল্য নিয়ে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল শেষ পর্যন্ত তিনি তা মিথ্যা প্রমাণ করলেন।  শুরুতে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিরোধী দল কিছুটা সংশয় প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা পরাজয় মেনে নিয়েছে।  ৫২.৫ শতাংশ ভোট নিয়ে তুরস্কে প্রথম নির্বাহী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন ১৬ বছর শাসনক্ষমতায় থাকা রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান। 

তার জোটের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া তুর্কি জনগণের সংখ্যাও নেহাত কম নয়, ৪৭.৫ শতাংশ।  এ নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে তিনি আরও পাঁচ বছর তুরস্ক শাসন করার সুযোগ পেলেন।  তুরস্কের নতুন সংবিধান অনুযায়ী তিনি ২০২৩ সালের পর ফের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন, তখন যদি জয়ী হন তবে ২০২৮ পর্যন্ত তিনিই হবেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। 

এ নির্বাচনের আগে তুরস্কের ভাবি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার বিষয়ে একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী পদটি বাদ যাবে এবং নির্বাহী ক্ষমতা পুরোপুরি চলে যাবে প্রেসিডেন্টের হাতে।  অর্থাৎ প্রেসিডেন্টই হবেন ‘হেড অব দ্য স্টেট’ এবং ‘হেড অব দ্য গভর্নমেন্ট’।  প্রেসিডেন্ট সরাসরি নিজের পছন্দমতো মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, বিচারক ও আমলা নিয়োগ করতে পারবেন।  কোনো নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট আসবেন না। 

এর আগে জাতীয় বাজেট পার্লামেন্টের মাধ্যমে পাস হতো।  এখন এর খসড়া তৈরি করবেন প্রেসিডেন্ট নিজেই।  যদি পার্লামেন্ট নতুনটা গ্রহণ না করে, তবে আগের বাজেটের বাস্তবায়ন হবে।  পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্টকে অভিযুক্ত করতে পারবে তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন সাংবিধানিক আদালত, যার বেশির ভাগ সদস্যই নির্বাচন করবেন প্রেসিডেন্ট। 

তুরস্কের নতুন সুলতান রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের বিপুল ক্ষমতা কতখানি প্রভাবিত করবে ইউরোপ-আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে? তুরস্কের রাজনীতিতে এরদোয়ান যে এক শক্তিমান নেতা এবং আধুনিক তুরস্কের জনক মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের পর তুরস্কের রাজনীতিতে আর কোনো নেতা এতটা ক্ষমতার অধিকারী হননি।  এরদোয়ানের ক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলেও বিশ্বের শাসকদের কাছে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের পররাষ্ট্রনীতি কিন্তু পুরোপুরি ধোঁয়াশাময়।  পেন্টাগন নিজেও জানে না সিরিয়া যুদ্ধে তুরস্ক আসলে কার পক্ষে। 

দুনিয়াজুড়ে মার্কিন স্বার্থবিরোধী অবস্থান নিলেও নিজের স্বার্থেই আমেরিকা কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না।  কারণ মধ্যপ্রাচ্য ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করেছে তুরস্ক।  যদিও আমেরিকার কাছ থেকে যুদ্ধবিমান নেওয়ার কথা বললেও এখন তুরস্ক ঝুঁকছে রাশিয়ার দিকে।  এরদোয়ান মার্কিন সমর্থিত জোট ন্যাটোর সদস্য হয়েও চীন-রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট ইউরেশিয়াতে যোগ দেওয়ার কথাও ভাবছেন।  কাগজ-কলমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হয়েও প্রায়ই ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনায় সরব হয়ে ওঠেন এই তুর্কি প্রেসিডেন্ট।  তবে সিরীয় শরণার্থী ঢলের আশঙ্কার কথা ভেবে চুপ থাকেন ইউরোপীয় নেতারাও। 

ন্যাটোর প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলেও তুরস্কের অবস্থান কিন্তু মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধেই।  তুর্কি সেনাবাহিনী মার্কিন স্বার্থবিরোধী কাজ করেছে বহুবার।  প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের শাসনেই তুরস্ক গণতন্ত্র ও মানবাধিকার উপেক্ষা করেছে।  আর স্পষ্টভাবেই রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।  ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মার্কিন-তুর্কি সম্পর্ক।  রুশ মিসাইল সরিয়ে রাখলেও সিরিয়া নিয়ে এরদোয়ানের অবস্থান খুব অস্পষ্ট।  কুর্দি সেনাদের সহায়তায় আইএসকে দমন করা মার্কিন সেনাদেরও হুমকি দিয়েছেন তিনি।  পেন্টাগনও বুঝতে পারে না তুরস্ক আসলে কার পক্ষে। 

একটি বিষয় কিন্তু বলতে হয়, ধারাবাহিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার যুক্তি দেখিয়ে মাত্র কয়েকজনই রাজনীতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে তা দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টায় সফল হয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এ মুহূর্তে অন্যতম।  তার লৌহমানবসুলভ ভাবমূর্তি গণতন্ত্রের সঙ্গে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়।  গণতন্ত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকতে হয়, জবাবদিহি থাকতে হয়, ভিন্নমতের একটা আলাদা গুরুত্ব থাকে।  তুরস্কে এসব কিছুর কোনো অস্তিস্ত নেই। 

দেশটিতে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি।  অন্যদিকে আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সৌদি সরকারের নমনীয় অবস্থানের বিপরীতে তার এই অবস্থানে ইসলামপন্থিরা অনেকটাই উজ্জীবিত হয়ে উঠেছেন।  সিরিয়া সংকটেও প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ভূমিকা লক্ষণীয়।  এর পরের বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, কেবল এরদোয়ানের সমর্থকরা নয়, রক্ষণশীল, ধর্মভীরু তুর্কিদের কাছে তিনিই একমাত্র ভরসা। 

মুসলিম বিশ্বেও এরদোয়ান নেতৃত্ব নিতে চাইছেন।  তাকে অনেকেই অটোমান সুলতান সুলেমানের সঙ্গে তুলনা করছেন।  গত বছর ইস্তাম্বুল শহরে দুই দিনব্যাপী ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে মুসলিম বিশ্বের সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যের ডাক দেন এরদোয়ান।  এ সম্মেলনে মুসলিম দেশগুলোর বিদ্যমান তিক্ততা দূর করে সুসম্পর্কের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানান তিনি। 

তার বক্তব্য ছিল- আমাদের ধর্ম ইসলাম, শিয়া বা সুন্নি নয়।  মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশে সর্বদাই সুদৃঢ় অবস্থান ছিল এরদোয়ানের।  মানবতাবিরোধী এ অপরাধের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।  আন্তর্জাতিক মহলকে রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার জন্য আহ্বান জানান তিনি।  প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের কঠোর নেতৃত্বের কারণে তুরস্ক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। 

ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে নিজ দেশে উদারতার প্রতি কিছুটা পক্ষপাত আছে এরদোয়ানের।  তুরস্কের লোকজন তাদের ধর্ম বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারার বিষয়টিকে সমর্থন করেন এরদোয়ান।  তার এ বার্তা গ্রামাঞ্চলে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে।  এরদোয়ানের কিছু সমর্থক তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে তুলনা করে তাকে ‘সুলতান’ নামে ডাকে। 

চার সন্তানের জনক এরদোয়ান মনে করেন, মুসলিমদের জন্মনিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয়।  তাদের যত সম্ভব সন্তান নেওয়া উচিত।  সম্প্রতি তুরস্কের প্রেসিডেন্টের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে রাজধানী আঙ্কারায় একটি প্রাসাদ তৈরি করেছেন এরদোয়ান।  প্রাসাদটির নাম ‘হোয়াইট প্যালেস’।  এক হাজার কক্ষ আছে ওই প্রাসাদটিতে।  মার্কিন প্রেসিডেন্টের দফতর হোয়াইট হাউস কিংবা রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দফতর ক্রেমলিনের চেয়েও এটি বড়।  প্রাসাদ তৈরি করতে খরচ হয়েছে ৪৮২ মিলিয়ন ডলারের বেশি। 

এদিকে এরদোয়ানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে তুরস্কের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।  দেশটিতে এখন গড়ে ৪.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।  এ কারণেই তিনি তুরস্কে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পেরেছেন।  তার নেতৃত্ব নিজ দেশের বাইরে কতটা প্রভাব রাখতে পারে, সে বিষয়ে এখনো চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়া যাচ্ছে না।  মধ্যপ্রাচ্যের সংকট উত্তরণে তিনি যদি কার্যকর কিছু করতে পারেন, তবেই চূড়ান্ত রূপে নিজেকে প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন। 

সম্প্রতি রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানকে আড়াই মণ আম উপহার হিসেবে পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে আম নিয়ে তুরস্ক যান পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল।  ৯ জুলাই আঙ্কারায় প্রেসিডেন্ট প্যালেসে তুরস্কের পুনর্র্নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের অভিষেক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।  ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন পরিকল্পনামন্ত্রী।  পরিকল্পনামন্ত্রীর সঙ্গে ওই অনুষ্ঠানে তুরস্কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতও যোগ দেন। 

বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধী জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের ফাঁসির পর এরদোয়ানের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পর বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি হয়।  পরে আবার দুই পক্ষ বিরোধ মিটিয়ে ফেলে।  এর মধ্যে জুনের শেষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরদোয়ানকে স্বাগত জানিয়ে তাকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন।  রোহিঙ্গা নিয়ে তুর্কি নেতার অবস্থান বাংলাদেশের পক্ষে এসেছে।  তাই এরদোয়ানের ক্ষমতায় থাকা আমাদের জন্য এক দিক দিয়ে স্বস্তিকর, যা মনে করছে মুসলিম উম্মাহও। 

মোহাম্মদ জমির: সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং প্রধান তথ্য কমিশনার


keya