৯:২১ এএম, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার | | ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১




এ কোন সমাজে বাস করছি আমরা!

১৩ অক্টোবর ২০১৯, ০৪:৩৬ পিএম | নকিব


এসএনএন২৪.কম: আমরা মানবজাতি সৃষ্টির সেরা জীব।  এটা সৃষ্টকর্তা নিজেই বলেছেন। 

কিন্তু সৃষ্টিকর্তা নিজেও দেখছেন এ জাতির মধ্যেও কত পশু এবং হি¯্র অমানুষ আছে। 

তবুও তিনি কেন এসব পশুদের নির্মূল করছেন না, সেটা তিনিই ভালো জানেন।  কিন্তু এভাবে যে বেশিদিন চলতে পারবে না সমাজ সেটা এখনই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এসব পশুরা।  আমি পশু বলছি তাদের যারা বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিঠিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। 

কি অপরাধ করেছে সে? তার মতামত আর সত্য তুলে ধরেছে তাই? তাহলে কি সত্য বলা যাবে না? যদি সত্য বললে খুন হতে হয় তবে সত্য না বলা-ই শ্রেয়।  অন্তত জীবনটা বাচঁবে।  আর উপরের শিরোনামের উত্তরটাও পাওয়া যাবে।  আমরা এমন সমাজেই বাস করছি।  যে সমাজে সত্য বললে খুন হতে হয়, যে সমাজে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায় না, যে সমাজে অনিয়মের বিরোদ্ধে কিছু বলা যায় না আমরা সে সমাজেই বাস করছি। 

আবরারকে যারা হত্যা করেছে তারা কেন হত্যা করবে? সে শিবির তাই? নাকি সে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে তাই।  প্রথমত তার পোস্ট টা আমরা পড়ি,  ৪৭ এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্রবন্দর ছিল না।  তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল।  কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো।  বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেওয়া হয়েছিল।  ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে। 

কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল।  যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চাই না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব। 

কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তরভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব।  যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।  হয়তো এসুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন- “পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি / এ জীবন মন সকলি দাও, / তার মত সুখ কোথাও কি আছে / আপনার কথা ভুলিয়া যাও। ”

তার এ পোস্ট পড়ে যদি তাকে হত্যা করার কিংবা পেঠানোর ইচ্ছে হয় তাহলে বলতে হয় আমরা প্রথমত একটা অসুস্থ জাতি।  যেখানে কিছু বুঝার আগে হত্যা আর কিছু জানার আগে খুন।  এরপর আসি তার শিবিরের সাথে সম্পৃক্ততা।  আমি জানি না আবরার ফাহাদ শিবিরের সাথে সম্পৃত্ত আছে কি নেই।  তবে যদি সে শিবির হয়েও থাকে তাকে পেঠানোর আইন বাংলাদেশে কখন চালু হয়েছে সেটা আমার বোধগম্য নয়।  এ বিষয়ে প্রশাসন ভালো বলতে পারবে। 

যদি শিবির করায় আবরার ফাহাদ খুন হয় তাহলে বাংলাদেশের সকল মানুষকে আজ থেকে ছাত্রলীগ করতে হবে।  তা না হলে দিন-দুপুরে সকলেই খুন হবেন।  যেভাবে বিশ্বজিতকে হত্য করা হয়েছে।  মনে আছে বিশ্বজিতের কথা? সেই দৃশ্য কি আপনার চোখে ভাসে? যখন প্রাণ বাচাঁনোর জন্য এদিক ওদিক ছুটছে আর বলছে, আমি শিবির নই, আমি শিবির নই।  তখনও এই ছাত্রলীগের দয়া-মায়া হয় নি।  কেড়ে নিয়েছে তার প্রাণ।  এটা মনে হয় ছাত্রলীগের অধিকার।  আবরার ফাহাদও একই পথের বলি হয়েছে। 

আপনার আমার কাছে আবরার ফাহাদের মৃত্যু তেমন কিছু নয়।  কিন্তু তার পরিবার জানে এটা কি।  ছেলেকে কষ্ট করে পড়িয়ে আজ এতোদূর এনছেন।  যে বুয়েটে পড়া সকলের স্বপ্ন সেখানে সে নিমিষেই সুযোগ পেয়েছে তার মেধা দিয়ে।  যা শুধু তার পরিবারের গর্ব নয় দেশেরও গর্ব।  এই আবরারও হতে পারতো দেশের একজন সম্পদ।  আমি ভুল বলছি? দেশের সম্পদ তো ছাত্রলীগ মনে হয়।  সে জন্য সম্পদের ভাগ চাইতে গিয়েছিলেন জাবি উপার্চযের কাছে।  সে সম্পদের ভাগ নিতে গিয়ে মুখোশের ভেতরে থাকা মানুষগুলোকে চিনে ফেলেছে দেশের মানুষ।  মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও আর সহ্য করতে পারেননি।  বহিস্কার করে দিয়েছেন সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদককে। 

তবে কি এখন বুয়েটের ছাত্রলীগ কমিটিকেও বহিস্কার করে এ ঘটনার সমাপ্তি ঘটাবেন! দেখাযাক কি হয়।  আমরা বাঙ্গালীরা কিছু পারি আর না পারি দেখতে ভালোই পারি।  যেমন করে আগুনে পুড়ার দৃশ্য দেখেছিলাম আর ভিডিও করেছিলাম। 

আমি যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের রতœ বলেছিলাম, তখন অনেকে আমাকে আওয়ামী সনদও দিয়ে ফেলেছেন।  ঠিক তেমনী আজ হয়তো অনেকে শিবির-জামায়েত সনদ দিয়ে দিবেন।  এর মানে আপনি সত্য বলতে পারবেন না।  সত্য বললেই সমস্যা। 

যাইহোক এসব ভয় নিয়ে হয়তো লেখকরা লিখেন না।  কয়েকদিন আগে কলাম লেখক ইসহাক খানের ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন--, ভীষণ অবাক বিস্ময়ে এই লেখা লিখছি।  অতীতে লক্ষ্য করেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সামান্য হাঁচি কাশি দিলেই ছাত্রলীগ মধুর ক্যান্টিন থেকে আনন্দ মিছিল নিয়ে টিএসসি ঘুরে আসতো।  অথচ সামাজিক দুরারোগ্য ব্যাধির মতো ভয়াবহ দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর সাহসী পদক্ষেপের পরও ছাত্রলীগ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে মুড়ি খাচ্ছে।  আওয়ামী লীগ এবং তার শাতাধিক অঙ্গসংগঠন সবাই বসে বসে পিঠ চুলকাচ্ছে।  অভিযানের পক্ষে কোথাও কোন মিছিল নেই।  মানববন্ধনও চোখে পড়ছে না।  তাহলে কি তারা এই অভিযানে নাখোশ?

নাখোশের ব্যাপারটা প্রথম দিনই স্পষ্ট হয়েছে যুবলীগের চেয়ারম্যান [বৃদ্ধ] ওমর ফারুক চৌধুরীর প্রতিক্রিয়ায়।  আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরাও আশ্চর্যজনক ভাবে নিরব।  যারা নিয়মিত সরকারের কলাটা মুলাটা খাচ্ছেন তারাও মুখে কুলুপ এঁটে তামাশা দেখছেন। 

এবার আমাদের কথা বলি।  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি একা নন।  এই অভিযানে আমরা আপনার সঙ্গে আছি।  আপনি দৃঢ় মনোবল নিয়ে দুর্নীতিবাজদের টুটি চেপে ধরুন এবং দেশকে রক্ষা করুন। 

আমরা কিছুতেই এই দেশকে ধ্বংস হতে দিতে পারি না।  একদিন এই দেশের জন্য জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করেছি।  প্রয়োজনে আবার যুদ্ধ করবো তবু দেশকে ধ্বংস হতে দেব না।  জয়বাংলা। 

লেখকের এমন পোস্ট পড়ে আমাদের সকলের আর বুঝার বাকি থাকে না আমরা কোন সমাজে আছি।  তবে একটা কথা আমাদের বুঝতে হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্যায়কে কখনও ছাড় দেন না।  কিন্তু দুখেঃর বিষয় এই নেত্রীর সাথে তার দল এবং সংগঠন আজ নেই।  নেই বলতে চোখে পড়ার মতো নেই।  ছাত্রলীগ শিবিরকে পেঠাতে পারে, খুন করতে পারে, সম্পদের ভাগ নিতে পারে কিন্তু নিজেদের দলে যারা অন্যায় করে, দুর্নীতি করে তাদের ধরিয়ে দিতে পারে না। 

এসব দুর্নীতিবাজদের পেঠাতে পারে না।  এটা শুধু প্রধানমন্ত্রী শেখা হাসিনাই পরেন।  আবার আমাদের সমাজে একশ্রেনীর মানুষ আছে যারা গুজব এবং মিথ্যা রটিয়ে মজা পায়।  অনেকে বলছে সম্্রটাকে গ্রেফতার করে আবরার ফাহাদের ঘটনাকে আড়াল করতে চাইছে সরকার।  এসব নোংরা মনস্ক কথাবার্তা ছড়িয়ে আমরা প্রমাণ করি আমরা আসলেই নোংরা রয়ে গেছি।  আমাদের মন এখনও পরিস্কার করতে পারিনি আমরা। 

তাই নোংরা খোলস থেকে বেরিয়ে আমাদের সত্যের পথে ন্যায়ের আসতে হবে।  নতুবা আমরা এই নোংরা সমাজেই রয়ে যাবো আজীবন। 

লেখক: আজহার মাহমুদ

প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক