৯:১৬ এএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার | | ১৪ মুহররম ১৪৪০


কতটা কাজে দেবে নতুন সড়ক পরিবহন আইন?

১১ আগস্ট ২০১৮, ০৮:৪৩ পিএম | মাসুম


এসএনএন২৪.কম : সড়ক পরিবহন খাতে চলমান নৈরাজ্যকর ব্যবস্থা বহুল আলোচিত বিষয়।  বড় কোনো দুর্ঘটনা হলে এ বিষয়টি সামনে আসে।  আবার সময়ান্তরে চলে যায় পেছনে।  এবারের অবস্থাটা একটু ভিন্ন ধরনের।  রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্র রাজীব ও ছাত্রী দিয়া গত ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের নিচে চাপা পড়ে নিহত হয়।  দুটি বাস প্রতিযোগিতা করে চালাতে গিয়ে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটায়।  ঘাতক বাসের চালক ও মালিক গ্রেপ্তার হয়েছেন।  সেই চালকের রয়েছে হালকা যানবাহন চালানোর লাইসেন্স। 

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ও দেশের অনেক স্থানের স্কুল-কলেজ, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে সোচ্চার হয়ে আন্দোলন করেছেন।  সরকার বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদে সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া অনুমোদন করেছে। 

সরকার-সমর্থক বলে অভিযুক্ত কিছু লোক আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছেন।  সংবাদমাধ্যমের কর্মীরাও হামলার শিকার হয়েছেন।  সরকারের নানা উদ্যোগের মুখে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়েছে।  রাজপথের এমন আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সুযোগ নেই। 

তবে শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সড়ক পরিবহনব্যবস্থার বেশ কিছু অনিয়ম দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।  তারা একজন মন্ত্রীর গাড়ি রাস্তার বিপরীত দিকে চলা থেকে বিরত করেছে।  বিরোধী দলের একজন নেতাও আইন ভেঙে ক্ষমা চেয়েছেন।  আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কিছু গাড়িতেও গাড়ির কাগজপত্র ও চালকদের লাইসেন্স পাওয়া যায়নি। 

যাঁরা সড়কে আইন প্রতিষ্ঠা করবেন, তাঁদের কেউ কেউ যে সে আইন মানছেন না, ছাত্রছাত্রীরা তা প্রত্যক্ষভাবে দেখিয়ে দিয়েছে।  যানবাহনের চালকের লাইসেন্স বা যানবাহনের হালনাগাদ ফিটনেস না থাকার জন্য তারা পুলিশের মাধ্যমে বেশ কিছু মামলা দিয়েছে।  এটা ছাত্রদের কাজ নয়, তবে দেশের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরা দিনের পর দিন তা উপেক্ষা করে এ অবস্থার সৃষ্টি করেছেন।  অনাচারের জন্য তারুণ্য ক্ষুব্ধ হয়। 

সড়ক যোগাযোগব্যবস্থায় যানবাহনের মালিক ও শ্রমিকদের ভূমিকা উপেক্ষা করার নয়।  সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে প্রধানত বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও মাইক্রোবাস জড়িত থাকে।  হালকা গাড়িও মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটায়।  বাণিজ্যিক পরিবহনমালিকেরা উদ্যোক্তা হয়ে নিজ পুঁজি বা ঋণ করে গাড়ি কেনেন।  চালান শ্রমিকেরা।  আমাদের অপ্রতুল ও ভঙ্গুর সড়কব্যবস্থায় যানবাহন চালনা অনেক পরিশ্রমসাধ্য কাজ।  আর মালিকেরাও ঝুঁকি নিয়েই বিনিয়োগ করেন। 
উভয় পক্ষের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে গণপরিবহনব্যবস্থা।  হতে পারে এটি ত্রুটিযুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ, তবে লাখ লাখ যাত্রীর চলাচল ও মালামাল পরিবহনের কাজটিও তাঁরাই করছেন।  ব্যবস্থাটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে প্রভূত অবদান রাখছে।  তবে এর বিনিময়ে তাঁরা আইনকে অবজ্ঞা করতে পারেন না। 

পৃথিবীর সব দেশেই যানবাহন চলে আইন মেনে।  বিকাশমান অর্থনীতিতে এসব যানবাহনের সংখ্যা আরও বাড়বে।  তবে এগুলোর নিরাপদ চলাচলব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অপ্রতুল।  সবচেয়ে বড় কথা, এ সেক্টরে চাঁদার নামে আদায়কৃত অর্থের লেনদেন অবিশ্বাস্য পরিমাণ।  এ লেনদেনের অংশীদার শুধু পরিবহন ইউনিয়নের নেতা-কর্মী নন, এতে রয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার কর্মকর্তারা।  এ চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এ খাতে নৈরাজ্যও অনেকাংশে কমে আসবে।  কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটা বেড়েই চলেছে। 

সরকার নতুন আইনের খসড়া করেছে এবং এতে এ ধরনের দুর্ঘটনা বা প্রাণহানি কমে যাবে বলে তারা আশা করছে।  বর্তমান আইনে সাজার পরিমাণ অপ্রতুল এবং এগুলো যৌক্তিক পরিমাণে পুনর্নির্ধারণ প্রয়োজন, সন্দেহ নেই।  কিন্তু বিধান যত কঠিন হোক, এর দৃশ্যমান বাস্তবায়ন না হলে যে সুফলের দাবি করা হচ্ছে তা কীভাবে আসবে, এটা বোধগম্য হচ্ছে না।  প্রকৃতপক্ষে গাড়ির মালিক ও শ্রমিকদের সাংগঠনিক শক্তিকে ট্রেড ইউনিয়নের নামে অপব্যবহার করছে কিছু লোভী ও ক্ষমতাধর লোক।  আর যখন যাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকেন, তখন তাঁরা তাঁদের লোক হয়ে যান।  প্রশাসন তাঁদের চাপে এবং ক্ষমতার বশীভূত হয়ে পারস্পরিক অংশীদারত্বের ভিত্তিতে চালু রয়েছে এ অব্যবস্থা।  পরিমাণ কম হলেও এখনো সব অনিয়মের জন্য সাজার ব্যবস্থা আছে।  ইচ্ছাকৃতভাবে বা অবজ্ঞাজনিত গাড়ি চালানোর জন্য মৃত্যু ঘটালে দণ্ডবিধিতে সাজার বিধান বর্তমান আইনেও রয়েছে। 

কঠোর আইনের বিরুদ্ধে পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের দৃঢ় অবস্থান রয়েছে।  অন্যদিকে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন, প্রস্তাবিত আইনটি সড়ক নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট নয়।  এর অনেক দুর্বলতা রয়েছে।  প্রকৃতপক্ষে দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন থাকলে একটি পক্ষের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় সব এদিক-সেদিক হয় না।  পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা কোনো একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করেই গাড়ি চলাচল বন্ধ করে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেন।  যথাযথ কারণ ছাড়া বিনা নোটিশে পরিবহন ধর্মঘট ডাকলে সেসব গাড়ির লাইসেন্স বাতিল করার ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের রয়েছে।  কিন্তু কখনো কি তা করা হয়েছে?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শাসনব্যবস্থা খুব একটা উন্নত, এমন নয়।  ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম—সবই আছে সেখানে।  রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের অভিযোগও রয়েছে।  কিন্তু গণপরিবহনে আমাদের অনিয়মের ধারেকাছেও নেই তারা।  মোটামুটি কার্যকর একটি ব্যবস্থা সেখানে চলছে।  আমরা কত ধরনের রেয়াতি সুবিধা দিয়ে ট্যাক্সি ও সিএনজি সার্ভিস ঠিকমতো চালাতে পারছি না।  তাঁরা তাঁদের পছন্দমতো জায়গা এবং তাঁদের নির্ধারিত ভাড়া ছাড়া যান না।  এর ব্যতিক্রম খুব কম।  এ দেশের বহু লোক কলকাতায় যান বেড়াতে।  ট্যাক্সিতে ভাড়ার পরিমাণ আমাদের অর্ধেক।  মিটারেই যেতে হয় যাত্রীর প্রয়োজনীয় স্থানে।  ট্যাক্সির গায়ে লেখা থাকে ‘নো রিফিউজাল’।  বিমানবন্দর থেকে শহরে যাওয়ার জন্য কলকাতা পুলিশই নির্ধারিত ভাড়া আদায় করে ট্যাক্সির কুপন দেয়।  এটা অবজ্ঞা করতে পারেন না কোনো চালক।  আমরা এ রকম কিছুই কি করতে পারি না? বরং মনে হয়, দিন দিন অবক্ষয়ের দিকে যাচ্ছি। 

প্রস্তাবিত আইনটির সুফল সম্পর্কে সরকার আশাবাদী।  আমরাও আশাবাদী হতে চাই।  তবে যেসব আইন আছে, সেগুলোই ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা শুরু হোক না কেন? এগুলো প্রয়োগ করতেই যদি হাত কাঁপে, তাহলে নতুন আইন করে লাভ কতটা হবে?

লেখক : আলী ইমাম মজুমদার

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

majumderali1950@gmail.com