১:২৯ পিএম, ১২ জুলাই ২০২০, রোববার | | ২১ জ্বিলকদ ১৪৪১




করোনায় সামাজিক অপবাদ কেন বেড়েই চলেছে?

০১ জুন ২০২০, ০১:৪৫ পিএম | নকিব


সুব্রত ব্যানার্জী, অতিথি লেখক :  করোনাকালে সামাজিক অপবাদ বা স্টিগমা নতুন কিছু নয়।  বাংলাদেশে সামাজিক স্টিগমা বা অপবাদের কালচার শুরু হয় ইতালি প্রবাসীদের দেশে ফেরার ঘটনা দিয়ে। 

প্রবাসীরা দেশে আসার পর যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানোর ঘটনা মিডিয়ায় আসার পর এক ধরনের আতঙ্কের সৃষ্টি হয় জনমনে। 

আর প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সবার হাতে কোয়ারেন্টিনের তারিখের একটা বিশেষ সিল দেওয়া হয় এবং তাদের গ্রামের বাড়িগুলোতে লাল পতাকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়। 

এভাবে অপবাদ বা স্টিগমা আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।  পরবর্তী সময়ে পাড়ার চায়ের স্টলে, দোকানে প্রবাসীদের প্রবেশ নিষেধ এই মর্মে ব্যানার টানানো হয়।  এভাবে অপবাদের রূপ আরো স্থায়ী হয়।  মানুষ প্রবাসীদের নিয়ে নানারকম নেতিবাচক কথাবার্তা বলতে শুরু করে। 

এ তো গেল প্রবাসীদের নিয়ে স্টিগমার কালচার।  তবে করোনা ভয়ে দেশে এই মহামারির সময়ে একের পর এক অমানবিক সব ঘটনা ঘটে চলছে।  করোনার উপসর্গ থাকায় টাঙ্গাইলের সখীপুরের জঙ্গলে বৃদ্ধা মাকে ফেলে যাওয়া ও পাবনার দুর্গম যমুনার চরে এক বৃদ্ধকে ফেলে যাওয়ার ঘটনা।  মাকে টাঙ্গাইলের সখীপুরে বনে ফেলে যাওয়ার সময় তার সন্তানরা বলেছিল— ‘মা, তুমি

এই বনে এক রাত থাকো।  কাল এসে তোমাকে নিয়ে যাব’ এই কথা বলে মাকে শাল-গজারির বনে ফেলে যান তার সন্তানেরা।  চরম দুঃখের ঘটনা করোনায় আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে পরিবারের লোকজন তাদের মরদেহ গ্রহণ পর্যন্ত করছে না।  কেউ কেউ হাসপাতালে বাবা-মা, স্বজনদের ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে।  পরে পুলিশ, প্রশাসনসহ স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় মৃতদেহের শেষকৃত্য সম্পন্ন হচ্ছে। 

সামাজিকভাবে করোনা রোগী, তাদের পরিবার, চিকিৎসক, নার্স, পুলিশসহ অনেককেই এই সামাজিক অপবাদের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।  ডাক্তার বলার পরও বাড়িওয়ালা বাসা থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে করোনা সংক্রমণের ভয়ে।  এদিকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় সিএনজিচালক জোর করে নামিয়ে দিয়েছে করোনা শোনার পর।  যে ডাক্তার ও সেবাকর্মীদের আমাদের প্রয়োজন এই ভয়াবহ দুর্যোগে, সেই চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ জরুরি সেবায় নিয়োজিত মানুষ ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশে কটূক্তি ও অমানবিক আচরণের শিকার হচ্ছেন।  এই পরিস্থিতি বুঝতে পেরে করোনা রোগীরা অন্য রোগের

চিকিৎসার জন্য হাসাপাতালে গেলেও নিজেকে করোনা রোগী হিসেবে প্রকাশ করছে না।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ তাদের এক প্রতিবেদনে ৭৫টি সামাজিক স্টিগমার ঘটনার উল্লেখ করেছে।  সবচেয়ে জঘন্য বিষয় হলো, নারায়ণগঞ্জে এক ডাক্তার পরিবারের ১৭ সদস্য করোনা পজিটিভ হওয়ার সংবাদ পাওয়ার পর এলাকার লোকেরা সেই পরিবারের প্রতি কোনো সহমর্মিতা তো দেখায়নি, উল্টো ঐ পরিবারের ওপর এলাকার

মানুষেরা ঘৃণা, অবজ্ঞা আর ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। 

যেখানে এই সংকটকালে আমাদের মধ্য সামাজিক সম্প্রীতি আরো প্রকট থাকার কথা সেখানে ঘটছে বিপরীত ঘটনা।  সংকটকালে মানুষের এমন আচরণ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসের বিখ্যাত কলামিস্ট ডেভিড ব্রুক লিখেছেন, সাধারণত দেখা যায় কোনো মহামারি দেখা দেওয়ার প্রথম দিকে মানুষ সহযোগিতা পরায়ন থাকলেও পরে, মানে মহামারির প্রকোপ বাড়লে মানুষের আচরণ পাল্টে যায়।  মহামারি যদি সংক্রমক হয়, তাহলে তা মানুষের ভালোবাসার বাঁধনকে ছিন্ন করে ফেলে।  মানুষ ভয়ে অমানবিক আচরণ করে থাকে। 

উল্লেখ্য, করোনাকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই স্বাস্থ্যকর্মী ও জরুরি অবস্থায় প্রথম যারা এগিয়ে আসেন, তাদেরকেও স্টিগমার শিকার হতে দেখা গেছে।  অপরদিকে বাউমেন
(২০০৭ সালে) তার এক আর্টিকেলে বলেন যে রোগের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসার বিষয়ে জ্ঞানগত অস্পষ্টতা থেকেই মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণার বিস্তার ঘটে, যার পরিনতিতে মানুষে মানুষে
বৈষম্য ও সামাজিক স্টিগমা বিরাজ করে। 

১৯৯০ সালে মেডিকেল সাইকোলজিস্ট ফিলিপ স্ট্রং ‘এপিডেমিক সাইকোলজি: এ মডেল’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলেছিলেন, ভয়, আতঙ্ক, নীতি-নৈতিকতা মহামারির সময় মানুষের আচরণকে
প্রভাবিত করে থাকে।  এর আগে ১৯৮০ সালে মরণব্যাধি এইডসও জনগণ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের যথেষ্ট ভীত করে তুলেছিল।  এইডস নিয়ে প্রচার-প্রচারণার আগে মানুষ এইডস রোগীদের কুষ্ঠরোগীদের
মতো এড়িয়ে চলত।  ইবোলা ও মার্স এর সময়েও তাই ঘটেছিল। 

অতীতে প্লেগ, কলেরা, গুটিবসন্ত মহামারির সময় আতঙ্ক ও অপবাদের ঘটনা বিস্তর ঘটেছে।  এসব কারণেই স্টিগমার হাত থেকে রক্ষার জন্য অনেকেই অসুখের কথা স্বীকার করে না।  যার ফলে

সামাজিক সংক্রমণ আরো বেড়েই চলেছে।  জার্মান সমাজবিজ্ঞানী উলরিচ বেক এর ' রিস্ক সোসাইটি' তত্ত্বে যেমন বলেছিলেন যে মডার্ন সোসাইটি মানুষের শরীরকেও সন্দেহের তালিকা থাকে মুক্তি দেয়নি।  সমাজ তাকে রিস্ক মনে করলেই তার ওপর নেতিবাচক আচরণ করে। 

এ প্রসঙ্গে অপরাধবিজ্ঞানে আরভিং গফম্যান, ১৯৬৩ সালে উনার লেখা বিখ্যাত ‘স্টিগমা: নোটস অন দ্য ম্যানেজমেন্ট অব স্প্যয়েলড আইডেন্টিটিতে’ বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন, সমাজে বিভিন্ন অপরাধী, ভিন্ন জাতিসত্ত্বা ও বর্ণের জনগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু, সমকামী-উভকামী ও ট্রান্সজেন্ডার গোষ্ঠী,
যৌনকর্মীদের “সাংকেতিক (সিম্বুলিক) স্টিগমার” মাধ্যমে স্টেরিওটাইপভাবে দেখা হয় এবং বিরুপ আচরণ করা হয়।  

উল্লেখ্য, এই তত্ত্বে দেখানো হয়েছে, এইডস রোগীদের সমাজে স্টিগমাটাইজেশনের শিকার হতে হয়।  একইভাবে বর্তমানে করোনা আক্রান্ত রোগীদেরও সামাজিক বৈষ্যমের শিকার হতে হচ্ছে।  শুধু তাই নয়, এখানে বিখ্যাত দার্শনিক মিশেল ফুকোর কাঠামোগত স্টিগমার ধারণাও কাজ করছে।  ফুকো বলেছেন, স্টিগমা শুধু সমাজ বা গোষ্ঠীর মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ে তা নয়, বরং সরকার ও রাষ্ট্র নিজেও এই ধরনের রোগীদের ওপর “স্টিগমা” আরোপ করে।  উদাহরণ- ঠাণ্ডা-কাশি বা করোনায় আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে অস্বীকৃতি জানানো, করোনা পরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা, করোনা সন্দেহে প্রবাসীদের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরুপ আচরণ, এ সমস্ত বৈষম্যই কাঠামোগত স্টিগমার অর্ন্তগত। 

পরবর্তী সময়ে কানাডার বিখ্যাত ওটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক হ্যানেম স্টেসি ২০১২ সালে তার এক লেখায় বলেন, স্টিগমা এত দ্রুত মানুষের মধ্য সঞ্চারিত হয় যে যারা স্টিগমার স্বীকার হয় তারা ব্যাপারটিকে মেনে নেয় এবং স্বাভাবিক ব্যাপার মনে করেন। 

সামাজিকভাবে যে সোশ্যাল স্টিগমার কালচার চলছে তাতে করে সব ধরনের সামাজিক সম্প্রীতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে।  সোশ্যাল স্টিগমার এই অপকালচার থেকে বেরিয়ে আসতে হলে রোগীদের প্রতি ঘৃণা আর অবজ্ঞার কালচার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।  অপবাদের ঘটনার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, গণমাধ্যমে সতর্কতার সঙ্গে স্টিগমাবিরোধী ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন।  স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসন, রাজনীতিবিদ ও স্বেচ্ছাসেবীর সমন্বয়ে অপবাদ নিরসনে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। 

যিনি অপদস্থ হয়েছেন, তাকে মানসিকভাবে সাহায্য করা অত্যন্ত জরুরি।  যারা অপবাদ দিচ্ছেন, প্রয়োজনে তাদের শনাক্ত করা জরুরি।  করোনায় আক্রান্তদের মনোবল অটুট রাখতে সহায়তা করতে হবে। 

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের সহযোগী অধ্যাপক শাহাদুজ্জামান বলেন, যারা কাউকে অপদস্থ করায় ভূমিকা রাখবেন তাদের আইনের আওতায় আনা দরকার।  সামাজিক পর্যায়ে
নানা রকম পদক্ষেপও নেওয়া উচিত। 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজী অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়