১১:৩৪ এএম, ২২ নভেম্বর ২০১৭, বুধবার | | ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

‘গণহত্যা’ বলতে বাধা কোথায়?

০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০২:৩৬ পিএম | রাহুল


এসএনএন২৪.কমঃ নাফ নদীতে ভেসে আসা শিশুদের লাশের ছবিই কিছুক্ষণ পরপর মনের পর্দায় ভেসে ওঠে।  এ শিশুদের বাবারা কোথায়? তারা কি আদৌ বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে? জীবন্ত শিশুকে পেয়ে বাবার যে আবেগ দেখলাম, নিথর দেহের সন্তানকে পেলে তাদের কী অবস্থা হতো? তবে কি তারা মরে গিয়েই বেঁচেছেন? জীবিত থেকে সন্তানের এই লাশের ভার কী করে বইতেন রোহিঙ্গা বাবা? যাঁরা বইছেন বাস্তবে, তাঁরাই বা কী করে বইছেন এ ভার?

পত্রিকার একটা ছবিতে দেখলাম, নাফ নদীর তীরে বালুর মধ্যে শোয়া রোহিঙ্গা এক মা তাঁর সন্তানকে বুকে ধরে রেখেছেন, অথচ মাও মৃত, সন্তানও মৃত—আহারে, কী করুণ মৃত্যু।  কিন্তু মৃত্যুও তাদের আলাদা করতে পারেনি।  সহ্য করতে পারি না, চোখ ফিরিয়ে নিই। 

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানুষকে কেটেকুটে সাফ করে ফেলা হলেও এসব মানবতাবাদী এগুলোকে কিছুই মনে করছেন না।  ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ভরে গেছে নৃশংসতার বীভৎস সব ছবিতে।  তারপরও এদের কারো বোধোদয় নেই।  মিয়ানমারের রাখাইনে কবে থামবে রক্তের এ উৎসব?

কোনো একদিন তো থামবেই।  কিন্তু তত দিনে রোহিঙ্গাদের কতজন বেঁচে থাকবে, কতজন হারাবে তাদের প্রিয়জন, কত মায়ের বুক খালি হবে, কত নারীর সম্ভ্রম মিশে যাবে রক্তেভেজা মাটিতে আর নাফ নদীর জলে—তার হিসাব কি কেউ করছে? মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এ মুহূর্তে যে হত্যাযজ্ঞ চলছে, তা একাত্তরের বর্বরতার শামিল।  কোনো কোনো হত্যার যে চিত্র যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে এসেছে, তা এমনকি হার মানিয়েছে ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যাগুলোকেও।  তাহলে আমরা একে গণহত্যা বলছি না কেন?

সহ্য করার ক্ষমতা নেই, তবু নৃশংসতা কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার চিত্র দেখতে একটা দৃশ্য পুরোটা দেখলাম।  হায়রে মানুষ।  কিন্তু মিয়ানমারের সেনা আর রাখাইনরা এত সহজে কাউকে মারছে না।  তারা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে, তিলে তিলে, জখমের পর জখম করে তারপর শেষে গিয়ে গলা কাটছে বা গুলি করছে।  এই নির্মমতা এতটাই জঘন্য যে এটা কেবল দেখলেই বিশ্বাস হবে, কল্পনা করে এই দৃশ্য কখনোই বোঝা যাবে না। 

দৈনিক যুগান্তরে একটা সংবাদ দেখলাম ঈদের পরদিন।  শিশু সন্তানের জন্য হত্যাযজ্ঞ শুরুর আগেই ঈদের জামা কিনে রেখেছিলেন এক বাবা।  কিন্তু প্রাণভয়ে পালিয়ে আসার সময় কিছুই আনা হয়নি।  সন্তান তার যুদ্ধ কী, শরণার্থী কী, তা তো বোঝে না।  বায়না ধরে, তার ঈদের জামাটা চাই।  সন্তানের চোখের দিকে তাকিয়ে আর থাকতে পারলেন না।  ঈদের আগের দিন স্ত্রীসহ আবার ঢুকে পড়লেন রাখাইনে।  যদি কিছু জিনিসপত্র নিয়ে আসা যায়, কে জানে, এ নৃশংসতা কবে বন্ধ হয়।  কিন্তু বিধিবাম।  ফিরে আসার সময় পড়ে গেলেন একেবারে হিংস্র হায়েনার সামনে।  মুহূর্তেই কতগুলো গুলি ভেদ করে গেল স্বামী-স্ত্রী দুজনের শরীর। 

ওপরে বলছিলাম, একাত্তরের গণহত্যার সঙ্গে এর মিল আছে।  পত্রিকায় আসা এই দম্পতির হত্যাকাণ্ডের খবর যেন আরো বেশি করে মিলে যায় সে সময়ের পাকহানাদারদের হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে।  কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আমরা কেউই এই নির্মম নৃশংস গোষ্ঠীবদ্ধ হত্যাকাণ্ডকে এখনো গণহত্যা বলছি না।  কেন?

কেবল বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিক কোনো মিডিয়াও এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা বা জেনোসাইড বলছে না।  এমনকি বিশ্ব মিডিয়ায় এখনো খুব একটা জায়গাও পায়নি হাজার হাজার রোহিঙ্গার সিস্টেমেটিক এই নরহত্যা।  বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরাসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কিছু সময় ধরে চোখ রাখলাম।  নাহ, কোথাও রোহিঙ্গা নেই।  পুরাটা জুড়ে কেবল উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা। 

মিয়ানমার সরকার সে দেশে সাংবাদিক প্রবেশে নানা বিধিনিষেধ অনেক আগে থেকেই আরোপ করে রেখেছে।  সে কারণে গণহত্যার প্রকৃত চিত্র তুলে আনাও যাচ্ছে না।  এ ক্ষেত্রে নিকট প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের সরকার এবং গণমাধ্যমের একটা দায়-দায়িত্ব কিন্তু তৈরি হয়।  সেই দায়িত্ব আমরা কতটুকু সঠিকভাবে পালন করছি, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন থেকে যায়। 

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গণহত্যার সংজ্ঞা তুলে ধরে হলেও গণহারে রোহিঙ্গা হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ বলে প্রচার করার সাহস বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে দেখাতে হবে।  যত দ্রুত বিশ্বকে এটা জানানো যায়, ততই সবার জন্য মঙ্গল—রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর জন্য, প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের নিরাপত্তার জন্য এবং সর্বোপরি মানবতার জন্য।  রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের চেতনার সঙ্গে এটা কোনোভাবেই যায় না যে, গণহত্যাকে সংঘাত ও সহিংসতা বলে প্রচার করে যাব।  সংঘাত হতে হলে কোনো ঘটনায় অন্তত দুটি পক্ষ থাকতে হয়।  রাখাইন রাজ্যে পাখির মতো মানুষ হত্যায় কেবল একটি পক্ষই সক্রিয়।  সেখানে এক পক্ষ কেবল মারছে, আরেক পক্ষ কেবল মরছে।  দ্বিতীয় পক্ষের দ্বারা কাউকে মারার কোনো সুযোগ যেমন নেই, সামর্থ্যও নেই।  এটা কি আমরা জানি না? যদি জানি, তবে তা বিশ্বকে জানাতে বাধা কোথায়?

লেখক : জাফর উল্লাহ সোহেল