১০:৪০ এএম, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, শনিবার | | ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০




গোপালগঞ্জে মনোমুগ্ধকর পদ্মবিলের সৌন্দর্য্য, দর্শনার্থীদের ভীড়

০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৪:১৮ পিএম | জাহিদ


এম.শিমুল খান, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি : দেশে সর্বাধিক পরিচিত ফুলের একটি পদ্ম।  জলে ফুটে থাকা পদ্ম শুধু বিল নয় প্রকৃতির সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে।  আর গোপালগঞ্জের পদ্মবিলের সৌন্দর্য্য আপনাকে হারিয়ে দেবে এক অন্যভুবনে। 

বিলটিকে দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন ফুলের বিছানা পেতে রেখেছে কেউ।  প্রতিদিনই এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসছেন দর্শনার্থীরা।  আবার এই মৌসুমে কোনো কাজ না থাকায় পদ্ম ফুল তুলে বাজারে বিক্রি করে আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছেন স্থানীয়রা। 

গোপালগঞ্জ জেলার চারপাশে রয়েছে অসংখ্য বিল।  তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জেলা সদর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থতি বলাকইড় বিল।  গোপালগঞ্জে ১৯৮৮ সালের পর থেকে বর্ষাকালে এ বিলের অধিকাংশ জমিতেই প্রাকৃতিক ভাবে পদ্মফুল জন্মে।  আর এ কারণে এখন এ বিলটি পদ্মবিল নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে।  বর্ষা মৌসুমে এ বিলের চারিদিকে শুধু পদ্ম আর পদ্ম।  বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গোলাপি আর সাদা রং এর পদ্ম দেখলে মন ও জুড়িয়ে যায়।  চোখ যত দূর যায় শুধু পদ্ম আর পদ্ম। 

৬৪টি পাপড়ি মেলে প্রকৃতি প্রেমীদের স্বাগত জানায় এ ফুলেরা।  এমন অপরূপ দৃশ্য যেন ভ্রমণ পিপাসুদের যেন হাতছানি দিচ্ছে।  আকাশে সূর্য উঁকি দেয়ার পরপরই বিলে আসতে শুরু করেন পর্যটকরা।  তারা নৌকায় ঘুরে সৌন্দর্য্য উপভোগ করেন।  স্থানীয়রাও ভ্রমণ পিপাসুদের সার্বিক সহযোগীতা করে থাকেন। 

স্থানীয়রা জানায়, বর্ষা মৌসুমে এ বিলে প্রায় ১০ হাত পানি থাকে।  সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের এ সময় কোন কাজ থাকে না।  তাই শুধু সৌন্দর্যই নয় বর্ষা মৌসুমে কোনো কাজ না থাকায় এ বিলে জন্ম নেয়া পদ্ম ফুল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন শত শত পরিবার।  সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজায় পদ্ম ফুলের চাহিদা থাকায় ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত বিল থেকে ফুল তুলে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। 

বিল এলাকায় এর মূল্য কম থাকলেও শহরে এক একটি ফুল ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।  এতে দৈনিক ৫ থেকে ৬'শ টাকা উপার্জন করছেন ফুল বিক্রেতারা।  আর এ আয় দিয়ে খুব ভালো ভাবেই চলছে তাদের সংসার।  এছাড়া এ বিলের পদ্ম ফুল ঢাকা, খুলনা, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছেন পাইকাররা। 

স্থানীয় বাসিন্দা কাইমুজ্জামান সরদার বলেন, ১৯৮৮ সালের বন্যার পর থেকে এ বিলে পদ্মফুল ফুটতে দেখা যায়।  প্রতি বছরই ফুলের সংখ্যা ও পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

স্থানীয় বাসিন্দা সাহাবুদ্দিন শেখ (৬০) বলেন, প্রতিদিন অনেক মানুষ দল বেঁধে পদ্মফুল দেখার জন্য পদ্ম বিলে আসছেন।  তারা নৌকা ভাড়া করে বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন।  স্থানীয়রাও ভ্রমণ পিপাসুদের সহযোগিতা করছেন।  হিন্দু ধর্মালম্বীরা বিভিন্ন পূজা-পার্বণে পদ্মফুলের ব্যবহার করেন।  তাই এলাকার শ্রমজীবী মানুষ ফুল ও ফল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। 

পদ্মবিলে ঘুরতে আসা শিশু মেহজাবিন মোহনা, প্রত্যাশা মন্ডল বলেন, স্কুল থাকায় তেমন একটা ঘুরতে যেতে পারি না।  তাই ছুটির দিনে বিলে পদ্ম দেখতে এসেছি।  খুব ভালো লাগছে। 

গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক সমীর কুমার গোস্বামী জানান, বর্ষা মৌসুমে এ বিলে প্রাকৃতিক ভাবে জন্ম নেয়া পদ্মফুল একদিকে যেমন বিলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে তেমনি কাজ না থাকা লোকজন ফুল বিক্রি করে লাভবানও হচ্ছেন। 

গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান বলেন, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় রয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধী।  প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা এখানে আসনে।  সেখানে থেকে তারা পদ্ম ফুলের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে চান।  যাতে কোন সমস্যা ছাড়াই পর্যটকরা সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পারেন তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

ঢাকা থেকে যাবেন যেভাবে : রাজধানীর গুলিস্তান, সায়েদাবাদ বা গাবতলী থেকে গোপালগঞ্জে যাওয়ার বাস রয়েছে।  এদের মধ্যে আপনি টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, এমাদ পরিবহন, দোলা, বিআরটিসি মধুমতি এক্সপ্রেস পরিবহনসহ অনেক বাসে এখানে আসতে পারেন।  আরও আছে কমফোর্ট লাইন, সেবা গ্রীনলাইন, গোল্ডেন লাইন পরিবহনের বাসও।  এসব বাস পাটুরিয়া দিয়ে যায়। 

ভাড়া সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ভাড়া সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।  রাতে পাটুরিয়া দিয়ে আসলে বাসগুলো কাকডাকা ভোরে নামিয়ে দেবে গোপালগঞ্জ শহরতলির পুলিশ লাইন্স মোড়ে।  সেখান থেকে ইজিবাইক বা মাহেন্দ্র ভাড়া করে আসবেন সদর উপজেলার বলাকইড় গ্রামের দক্ষিণপাড়া গ্রামে।  ভাড়া নেবে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।  সময় লাগবে ২০ থেকে ২৫ মিনিট। 

এ ছাড়া পুলিশ লাইন্স মোড় থেকে ইজিবাইকে করে গোপালগঞ্জ কাঁচাবাজার এলাকায় যাওয়া যায়।  ভাড়া নেবে জনপ্রতি ৫ টাকা।  এরপর সেখান থেকে বলাকইড়ের মাহেন্দ্র স্ট্যান্ড থেকে সরাসরি দক্ষিণপাড়ার পীরু সরদারের বাড়ির কাছের সেতু।  এই সেতুর নিচ থেকে নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। 

নৌকা ভাড়া ও ঘোরাঘুরি : দক্ষিণপাড়ার পীরু সরদারের বাড়ির কাছের সেতুর নিচ থেকে নৌকা ভাড়া করার পরে মাঝি প্রায় এক ঘণ্টায় দর্শনার্থীদের পুরো বিল ঘুরিয়ে দেখান।  ভাড়া নেন ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা।  নৌকাগুলো বেশ বড়ই।  একসঙ্গে ১০ থেকে ২০ জন বসা যায়। 

পদ্মবিল দেখে রাতের মধ্যে ঢাকায় ফিরতে চাইলে বিকেল ৫ টায় ফিরতি বাসে উঠে পড়ুন।  সময় লাগবে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা।  গোপালগঞ্জ শহরের পুলিশ লাইন্স মোড় ও সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের সামনেই বিভিন্ন বাসের কাউন্টার।  সেখান থেকে বাসে উঠে রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ঢাকায় ফেরা যায়। 

কী খাবেন : খাওয়ার পর্বটা গোপালগঞ্জ শহরে সারলেই ভালো।  শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে বেশ কিছু ভালো হোটেল আছে।  এখানকার হোটেল বার বি কিউ, সিসিয়ান চায়নিজ রেস্টুরেন্ট, শম্পা হোটেল, শেখ স্ন্যাক্স ও ঐশী রেস্টুরেন্ট নাশতা ও দুপুরের খাবার খেতে পারেন এসব হোটেলে। 

দেশীয় খাবার ও বিলের তাজা মাছ খেতে চাইলে যেতে পারেন শহরের পোস্ট অফিস মোড়ে।  সেখানে তিন-চারটি হোটেল রয়েছে।  এর মধ্যে বড়দার হোটেল ও হোটেল রোমান্স প্রসিদ্ধ।  হাতে সময় থাকলে চলে যেতে পারেন গোপালগঞ্জ শহরতলির বেদগ্রামের হোটেল গুলোয়।  যেখানে ভুনা খিচুড়ির সঙ্গে সুস্বাদু হাঁসের মাংস চেখে দুপুরের খাওয়া পর্বটি সেরে নিতে পারেন। 

রাতে থাকবেন কোথায় : কেউ যদি বিকেলে না ফিরে গোপালগঞ্জে থাকতে চান তবে ফিরে আসতে হবে শহরেই।  কারণ বলাকইড় গ্রামে এখনো থাকার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।  শহরে এসে হোটেলে উঠতে পারেন।  বিল থেকে শহরের আসার পরই পাবেন পলাশ গেস্ট হাউস, জিমি হোটেল, হোটেল রাজ, হোটেল সোহাগ, হোটেল রিফাত প্রভৃতি।  এগুলোতে এসি ও নন এসি রুম পাবেন।  এসি রুমে ভাড়া পড়বে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা।  নন এসি রুমের ভাড়া পড়বে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা।