১২:৫৩ এএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, রোববার | | ১২ মুহররম ১৪৪০


গুরুদাসপুরে দেশি মাছের সংকট পুকুরের মাছে চাহিদাপুরণ

১৫ এপ্রিল ২০১৮, ০৩:১৭ পিএম | সাদি


মো. আখলাকুজ্জামান, গুরুদাসপুর প্রতিনিধি : একটা সময় ছিল নদী-নালা, খাল-বিল, জলাশয়ে হাত দিয়েই ধরাযেত বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ।  আষাঢ়-শ্রাবন মাসের হালকা বৃষ্টিতেই পানি ছেড়ে শুকনোয় উঠে আসতো কই মাছের ঝাঁক।  তখন মাছের প্রাচুর্য্য ছিল।  কিন্তু এখন নাটোরের গুরুদাসপুরে দেশি মাছের জায়গা দখল করে নিয়েছে পুকুরে চাষ করা মাছ।  বর্ষায় মাছের দাম থাকে আকাশ ছোঁয়া।  ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে না থাকায় মাছের চাহিদাই মিটছেনা। 

এলাকার শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আত্হার হোসেনের ভাষ্যমতে,- ষাটের দশকে বয়সে তরুণ ছিলেন তিনি।  গুরুদাসপুর উপজেলার আত্রাই-নন্দকুঁজা নদীসহ বিভিন্ন জলাশয়ে মাছ ধরতেন দলবেঁধে।  জাল ফেললেই উঠে আসতো মাছ।  তখন মাছের এতটাই প্রাচুর্য্য ছিল যে, আঁশটে গন্ধ ছড়িয়ে পড়তো চারদিকে।  সেই গন্ধ এখন শুধু ইতিহাস।  তবে আশির দশক পর্যন্ত বাচা, আইড়কাটা, বাঁশপাতা, তিনকাটা, বউমাছ, ভেদা, কই, দেশিয় মাগুর, শিং, বোয়াল, পাবদা মাছের সমাহার ছিল।  তখন হালি বা গাদা চুক্তিতে চারআনা-আটানাতেই কেনাযেত এসব মাছ।  আর অপেক্ষাকৃত ছোট মাছগুলো হাঁস-মুরগী এবং অতিথি পাখিরা দলবেঁধে খেত। 

জানা যায়, মাছের প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে পোনা নিধন ও মাছের উৎস নষ্ট হয়ে যাওয়াই দেশি মাছ সংকটের কারন।  একই সাথে ফারাক্কার বিরুপ প্রভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবসহ দখল-দূষণ এবং মানুষের নিষ্ঠুর-নির্মমতায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে নদী-নালাগুলো।  তাছাড়া নদী ও বিলের বুকচিরে অপরিকল্পিতভাবে যথেচ্ছা পুকুর খনন, সড়ক ও বসতবাড়ি নির্মান করা হয়েছে।  ফলে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে জীব-বৈচিত্র্য। 

গুরুদাসপুর পৌর এলাকার চাঁচকৈড় হাটে খোঁজনিয়ে জানাগেছে,- মিঠা পানির প্রতি কেজি বোয়াল মাছ আকার ভেদে ৪০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা, বাইয়াম ৬০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা, পুকুরে চাষ করা পাবদা ৮০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা, গুঁচাই ৫০০-৬০০ টাকা, আইড় ৬০০-৭০০ টাকা, পাতাসি (তিনকাটা) ৭০০ টাকা, সোল ৪০০-৬০০ টাকা এবং ছোট প্রজাতির মাছগুলো ৬০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।  তবে পুকুরে চাষ করা মাছগুলো ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে। 

মাছ বিক্রেতা রায়হান ও মোজাম্মেল হোসেন জানান, এবছর বর্ষাকাল থেকেই দেশি মাছের আকাল ও দাম বেশি রয়েছে।  মাছের আমদানী কম থাকায় দাম বেশি হচ্ছে।  তবে পুকুরে চাষ করা মাছের ঘাটতি নেই।  দামও অনেকটা সহনীয়।  কয়েকজন ক্রেতা জানান, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দেশি মাছ কেনা যায়না।  অথচ ছোট বেলা থেকেই তারা মাছের প্রাচুর্য্যে বড় হয়েছেন।  কিন্তু দেশি মাছের দাম বেশি হওয়ায় বাধ্য হয়ে পুকুরে চাষ করা মাছ খেতে হচ্ছে। 

গুরুদাসপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা একেএম আব্দুল হালিমের তথ্যমতে, উপজেলায় ১ হাজার ৪৮৮ হেক্টর আয়তনে ৪ হাজার ৬২০টি পুকুর রয়েছে।  এসব পুকুর থেকে বছরে মাছের উৎপাদন হয় ৫ হাজার ৪৩৫ মেট্রিক টন মাছ।  এছাড়াও ১৯৮ হেক্টর আয়তনের নয়টি নদীতে ১৮৯ মেট্রিক টন মাছ, ২২ হেক্টরের ছয়টি বিলে ২২ মেট্রিক টন, ৯ হেক্টরের তিনটি খালে মাত্র ৯ মেট্রিক টন এবং ৩ হাজার ১৩২ হেক্টরের ৩০টি প্লাবনভূমিতে ৩ হাজার ১৩২ মেট্রিক টন মাছের উৎপাদন হয়। 

বছরে মাছের মোট উৎপাদন হচ্ছে ৮ হাজার ৭৮০ মেট্রিক টন।  তার মধ্যে প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ পাওয়া যায় ৩ হাজার ৩৪৫ মেট্রিক টন।  উপজেলায় মাছের চাহিদা রয়েছে ৪ হাজার ৭০৩ মেট্রিক টন।  সেক্ষেত্রে মাছে উদ্বৃত্ত রয়েছে ৪ হাজার ৭৭ মেট্রিক টন। 

উপজেলা মৎস কর্মকর্তা আরো জানান, এমনচিত্র শুধু গুরুদাসপুর উপজেলাতেই নয়।  দেশের বৃহত্তম বিলখ্যাত চলনবিলের অন্যান্য উপজেলাতেও দেশি মাছের সংকট রয়েছে।  তবে বাড়তি মাছের চাহিদা মেটাতে বিল-নার্সারি ও অভয়াশ্রম গড়ে তোলায় দেশি মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ জেলেদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হচ্ছে। 


keya