৪:৩৮ এএম, ১ এপ্রিল ২০২০, বুধবার | | ৭ শা'বান ১৪৪১




গ্রামে গঞ্জে এখন তেমন দেখা যায় না ঢেঁকি

১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০৪ পিএম | নকিব


নকিব ছিদ্দিকী, চট্টগ্রাম : বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে এখন পুরোপুরি যান্ত্রিক ঢেউ লেগেছে। 

মাছে ভাতে বাঙ্গালীর ঘরে এক সময় নবান্নের উৎসব  হতো ঘটা করে।  উৎসব ছিল মাটির গন্ধ মাখা ধান। 

ঢেঁকি ছাটা ধানের চালের ভাত আর সুস্বাদু পিঠার আয়োজন।  রাতের পর রাত জেগে শরীরটাকে ঘামে ভিজিয়ে ঢেঁকিতে ধান ভানার পর প্রাণ খোলা হাসি। সেই ঢেঁকি অতীতের বুদ্ধির ঢেঁকির এখন প্রস্থান ঘটেছে। 

কথায় আছে না ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে'_ বাংলার এ প্রবাদ বাক্যটি বহুকাল ধরে প্রচলিত হলেও ঢেঁকি আর এখন ধান ভানে না।  অথচ এক সময় গ্রাম বাংলায় ধান ভানার একমাত্র যন্ত্রই ছিল ঢেঁকি। 

চাল ভানাসহ অন্যান্য কাজে এর ব্যবহার ছিল ব্যাপক।  ঢেঁকি প্রধানত ধানের তুষ ছাড়িয়ে চাল বানানো কাঠের তৈরি কলবিশেষ।  ঢেঁকিতে প্রায় ছয়ফুট লম্বা এবং ছয় ইঞ্চি ব্যসবিশিষ্ট একটি কাঠের ধড় থাকে। 

মেঝে থেকে প্রায় ১৮ ইঞ্চি উচ্চতায় ধড়ের একেবারে সামনে ২ ফুট লম্বা একটি গোল কাঠ থাকে।  এটিকে মোনা বলা হয়।  দুটি খুঁটির ভেতর দিয়ে একটি ছোট হুড়াকা থাকে।  এ হুড়াকার ওপরই ছোট খাট একটা তিমির মত, বা সেসনা বিমানেরমত একটা কাঠ উঠা নামা করে।  আর মস্ত বড় এ কাঠের ঢেঁকি দিয়েই এক সময় ধান ভেনে চাল বানানো হতো।  পিঠা পুলি তৈরির জন্য চালের গুঁড়া বানানো হতো।  হালকা শীতের আবাহনে তৈরি হতো দারুণ একটা উৎসববের আনন্দ মেলা। 

এক সময় নতুন ফসল তোলার পর বাংলার গ্রাম গঞ্জের বাড়িতে বাড়িতে এক পেড়ে শারীর শরীরে মহিলাদের পায়ের নৃত্যের তালে তালে ঢেঁকিরশব্দ মুখরিত হয়ে উঠত।  একজন ঢেঁকিতে পা দিত আর একজন ঢেঁকির সেই ওঠানামার তালে তালে হস্ত সঞ্চালন করে বিপদজনক অবস্থায় তার ভেতর হাত দিয়ে ধান নেড়ে চাল তৈরিতে সাহায্য করতো। 

এ কাজে অসতর্কতার জন্য কাউকে কাউকে ব্যাথাও পেতে হতো।  এসময় তার চার পাশে হাস মুরগীরা জড়ো হতো খুদ কুড়া খাওয়ার জন্য।  এ ছিল এক আনন্দ।  গ্রামের মানুষ ভুলে গেছেন ঢেঁকি ছাটা চালের স্বাদ।  কোন পরিবারে এখন সেই ঢেঁকি এখনও ইতিহাস হয়ে পড়ে আছে পারিবারিক ঐতিহ্যের স্মুতি হয়ে। 

কালের ব্যবধানে এক সময়ের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য এ ঢেঁকির ব্যবহার এখন নেই বললেই চলে। সব এলাকাতেই বর্তমান আধুনিক যুগে ঢেঁকির পরিবর্তে ধান ছাঁটাইসহ চালের গুঁড়া তৈরি হচ্ছে বিদ্যুৎচালিত মেশিনে। 

যান্ত্রিক যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে ঢেঁকির অস্তিত্ব আজ জাদুঘরে স্থান পেয়েছে।  অথচ ১০/১৫ বছর আগেও গ্রাম অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ঢেঁকি ছিল।  ছিল ঢেঁকি ঘর।  সত্যি কথা বলতে গেলে ঢেঁকির কথা আজ যেনরূপকথার গল্পের মতো করে শোনতে  হয় আমাদের নতুন প্রজন্মকে। 

আগামী প্রজন্মের কাছে হয়তো এটা স্বপ্নের মত মনে হবে।  ঢেঁকি যে এখন জাদুঘরে শোভা পাবে তা সময়ের ব্যাপার। 


keya