৮:৫৪ পিএম, ২২ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার | | ২২ সফর ১৪৪১




চইলা গেলে আমায় পাইবা না...

৩০ নভেম্বর -০০০১, ১২:০০ এএম | মোহাম্মদ হেলাল


// মফিজুর রহমান //

রাস্তায় পা রাখতেই সুললিত নারীকণ্ঠ কানে এলো।  সঙ্গে বাদ্য-বাজনা।  বাজনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এক নারী গাইছে-: বন্ধু আইলা না, আইলা না; চইলা গেলে আমায় পাইবা না...

চলে যাওয়ার রকমফের আছে।  যার চলে যাওয়ার সঙ্গে ‘শেষ বিদায় স্টোরের’ সাদা কাপড়, সাবান, আতর, আগরবাতি ইত্যাদি যুক্ত হয়, ইহজীবনে তাকে আর পাওয়া যাবে না- এ তো জানা কথা।  কোকিলকণ্ঠী নারী নিশ্চয়ই এ জাতীয় চলে যাওয়ার কথা বলছে না!

শেষ বিদায় স্টোরে ফর্দ পাঠিয়ে মানুষ সাধারণত আল্লাহ-রসূলের নাম নেয়; গান গায় না।  এ নারী যে রাগ করে চলে যাওয়ার কথা বলছে না- এ ব্যাপারেও কোনো সংশয় নেই।  রাগ করলে মানুষ চিৎকার-চেঁচামেচি করে; গলায় সুর তোলে না।  বাকি রইল অভিমান।  সুরের লহরী তোলা নারীর গলায় অভিমানের বিষয়টিও স্পষ্ট নয়।  তাহলে?

কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর মনোসংযোগ করতে থুম পদ্ধতি খুব কাজে দেয়।  ফুটপাতের একপাশে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে থুম ধরলাম।  বোধের কপাট খুলে যেতেই সুরের ভেতর লুকিয়ে থাকা বাণিজ্যিক ধারার সুক্ষ্ম বিষয়টা বোধগম্য হল। 

কোনোকিছুর নেপথ্যে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য থাকলে, তার প্রচার-প্রচারণা আকর্ষণীয় করে তোলার নানা প্রয়াস লক্ষ করা যায়।  যেমন লটারির টিকিট বিক্রেতারা ড্র-এর আগের দিন সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিয়ে পথচারীদের উদ্দেশে মাইকে বলতে থাকে-

: আর মাত্র একদিন! আগামীকাল ড্র।  সময় শেষ- খেলা ফাইনাল।  কপাল যদি না হয় ফাটা, ঘুরতে পারে ভাগ্যের চাকা...

ছোটবেলায় যাত্রা বা সার্কাসের প্রচারণায়ও বাণিজ্যিক কৌশলের নানা ব্যবহার লক্ষ করেছি।  মানবহৃদয়ে ঝড় তুলতে সক্ষম কোনো নৃত্যশিল্পীর নাম বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে পেশাদার প্রচারকর্মী চটুল গলায় মাইকে বলত-
: অদ্য রজনীর সেরা আকর্ষণ প্রিন্সেস মর্জিনা ও একঝাঁক ডানাকাটা পরীর ঝুমুর-ঝুমুর নাচ।  হেলায় সুবর্ণ সুযোগ হারাতে না চাইলে চলে আসুন আমাদের আলো ঝলমল রঙিন রঙ্গমঞ্চে।  উপভোগ করুন সখিদের নিয়ে প্রিন্সেস মর্জিনার হৃদয় মুচড়ানো নাচ ও গান...

হৃদয়ে মোচড় খাওয়ার বাসনা নিয়ে নিশ্চয়ই সেদিন যাত্রা বা সার্কাসের প্যান্ডেলে লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়ত।  আজকাল বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য হাসিলের নানা কৌশল চোখে পড়ে।  এগুলোর মধ্যে একটা হচ্ছে, রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের কিছু কিছু দোকানের পক্ষ থেকে তিনদিন বা সাতদিনের সময় নির্দিষ্ট করে দিয়ে মূল্যহ্রাসের ‘তাওয়া গরম অফার’ সংবলিত পোস্টার দেয়ালে-দেয়ালে সেঁটে দেয়া হয়।  এক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই একই ধরনের ঘটনা ঘটে।  মূল্যহ্রাসের সুযোগ নিতে আগ্রহীরা ‘তাওয়া ঠাণ্ডা’ হওয়ার আগেই সেসব দোকানে গিয়ে হাজির হয়। 

গায়িকায় গলায় বারংবার উচ্চারিত ‘পাইবা না- পাইবা না’র মধ্যে কী উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে, কাছে না গেলে বোঝা যাবে না।  বাতাসে ভাসতে থাকা সুর-তরঙ্গের লেজ ধরে জায়গামতো হাজির হলাম।  দেখি, বিশাল মজমা।  চারপাশে নানা বয়সী লোকজন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।  মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় গায়িকার দু’পাশে দাঁড়ানো আরও দুই নারী।  তাদের হাতে দু’ধরনের বাদ্যযন্ত্র। 

এ তিনজনের পেছনে বসা ঝাঁকড়া চুলের মধ্যবয়স্ক এক লোক হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে। 

গান শেষ হল।  মাইক্রোফোনের দখল নিলেন ত্রিশোর্ধ্ব হালকা-পাতলা এক লোক।  নিজের পরিচয় দিলেন ওই তিন নারীর দুলাভাই বলে।  শালী-দুলাভাইয়ের হাসি-ঠাট্টার সম্পর্ক সমাজস্বীকৃত।  শালীত্রয়ের সঙ্গে দুলাভাইয়ের ঠাট্টা-মশকরা শুনে কিছুক্ষণ ভালোই হাসাহাসি চলল।  মজমা স্থির হওয়ার পর হারমোনিয়ামে নতুন সুর উঠল।  গায়িকারও পরিবর্তন হল।  নতুন গায়িকা গলায় সুর তুলল-
তুমি দেখিয়াও দেখলা না
তুমি জানিয়াও জানলা না
ও তুমি বুঝিয়াও বুঝলা না-
জ্বালাইয়া গেলা মনের আগুন, নিভাইয়া গেলা না...

এ পর্যায়ে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হলেন পরিপাটি চেহারার অন্য এক ভদ্রলোক।  নিজের নাম বললেন দুলাল কবিরাজ।  সাদা ফুলহাতা শার্ট, কালো প্যান্ট, পায়ে কালো জুতা ও গলায় টাই পরা দুলাল কবিরাজ গায়িকার হাত থেকে মাইক্রোফোন নিয়ে নিলেন।  বললেন-
: তোমার নাম যেন কী!
- সুরাইয়া। 
: সুরাইয়া; অস্থির হইও না।  একটু আগে ফায়ার সার্ভিসের লোকজনের সঙ্গে ফোনে আমার কথা হইছে।  তারা আগুন নিভানোর সাজ-সরঞ্জাম লইয়া রওনা হওয়ার পর বর্তমানে কাকলি ট্রাফিক সিগনালের জ্যামে আটকা পড়ছে। 

জ্যাম ছুটলেই কারেন্টের গতিতে আইসা তোমার আগুন নেভানোর ব্যবস্থা করবে।  এবার মজমার উদ্দেশে দুলাল কবিরাজ বললেন-
: এই ফাঁকে আপনাদের উদ্দেশে কিছু কথা বলতে চাই।  বলব?
সঙ্গে সঙ্গে মজমার মধ্য থেকে উত্তর এলো-
: বলেন- বলেন। 

- ধন্যবাদ।  কথা অতি সামান্য।  আমি এইখানে ষাইট বছরের বৃদ্ধকে তিরিশ বছরের জোয়ান বানাইয়া দেয়- এমন কোনো টনিক লইয়া হাজির হই নাই।  আমি আপনাদের সামনে স্বপ্নে পাওয়া কোনো তাবিজ-কবজ বা অত্যাশ্চর্য কোনো মলম-মালিশও বিক্রি করতে আসি নাই।  প্রশ্ন করতে পারেন- তাইলে কী করতে আসছি? হ্যাঁ, আমার সামনে এই যে কিছু বোতল দেখতেছেন, এই বোতলের মেডিসিন একশ’ একটা রোগ ভালো করে না। 

তবে আপনারা যে মাটির ওপর পা রাইখা দাঁড়াইয়া আছেন, সেই মাটিতে হাত রাইখা বলতেছি, যদি কারও হাতে-পায়ে, ঘাড়ে-পিঠে, মাথায়-পেটে বা শরীরের অন্য জায়গা-বেজায়গায় কোনো প্রকারের টিউমার থাকে, আমারে মাত্র আধাঘন্টা টাইম দিবেন; আমার এই ওষুধ খাওয়ার পর আধাঘন্টা এইখানে বসবেন, তারপর পাকা তেঁতুলের খোসার ওপরে চাপ দিলে সেইটার মধ্য থেইকা যেইভাবে বিচি বাইর হইয়া আসে, সবার চোখের সামনে আমি আপনার টিউমারের সব দূষিত পদার্থ সেইভাবে বাইর কইরা দিব।  চ্যালেঞ্জ।  যদি এই ধরনের সমস্যা কারও মধ্যে থাকে, দয়া কইরা চুপ থাকবেন না। 

শরীরের মধ্যে টিউমার পুইষ্যা রাইখা যারা অপারেশন করতে ভয় পাইতেছেন কিংবা মুম্বাই-কলকাতা-দিল্লী-মাদ্রাজ, থাইল্যান্ড-সিঙ্গাপুর যাওয়ার কথা ভাবতেছেন, তাদের প্রতি রিকোয়েস্ট- আপনাদের কোথাও যাওয়ার দরকার নাই, শুধু একবার আওয়াজ দেন।  আছেন কেউ?

মজমার মধ্যে গুঞ্জন উঠল।  অন্ধকার তাড়াতে মজমার দু’পাশে খুঁটিতে স্বল্প আলোর দু’টি বাল্ব জ্বালানো হয়েছে।  আধো আলো-আধো অন্ধকারে কুড়িল বিশ্বরোডের পাশে রাতের এ পরিবেশ যেন অদ্ভূত এক রহস্যের চাদরে ঢাকা পড়েছে। 

পাশের রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের শব্দ ছাপিয়ে হারমোনিয়ামে নতুন সুর উঠতেই একজনকে হাত উঠাতে দেখা গেল।  দুলাল কবিরাজ ইশারায় তাকে কাছে আসতে বললেন।  পাজামা-পাঞ্জাবি, টুপি-দাড়ি সজ্জিত লোকটা কাছে আসতেই জিজ্ঞেস করলেন-
: ভাই, আপনের নাম?
- জিয়াউল হক। 
: কী করেন?
- বিটিসিএল গুলশান এক্সচেঞ্জে চাকরি করি। 

: কোথায় সমস্যা?
জিয়াউল হক মাথার টুপি খুলে ফেলতেই তার ন্যাড়া মাথা দৃশ্যমান হল।  ন্যাড়া মাথার সামনের দিকে মাঝারি সাইজের গোল আলুর মতো একটা বস্তু শোভা পাচ্ছে।  জিয়াউল হককে একটা চেয়ারে বসিয়ে বোতলের ওষুধ পান করানো হল।  দুলাল কবিরাজ বললেন-

: যাদের হাতে ঘড়ি বা মোবাইল ফোন আছে- টাইম দেখেন।  ঠিক আধাঘন্টা পরে এই ভাইয়ের মাথায় টিউমারের ‘ট’ও থাকবে না। 

গান-বাজনা ও দুলাভাই-শ্যালিকাদের রঙ্গ-তামাশায় আধঘন্টা পার হল।  দুলাল কবিরাজ ছোট্ট একা কাঁচি ও কিছু তুলা হাতে নিয়ে জিয়াউল হকের সামনে দাঁড়ালেন।  অভিনব ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে ভেবে পকেট থেকে স্মার্ট ফোন বের করলাম।  দূর থেকে অস্পষ্ট দেখাচ্ছিল, তাই ভিড় ঠেলে কাছে গিয়ে ভিডিও ধারণ শুরু করতেই পেছনে চেয়ারে বসে থাকা এক মটু সামনে এসে দাঁড়াল।  মটু মিয়া জিজ্ঞেস করল-
: ভাই, আপনে কী করতেছেন?
- ভিডিও করতেছি। 
: ভিডিও কইরা কী হবে?
- টিউবে দিব। 
: টিউবে দিবেন? টিউবে তো হাওয়া থাকে।  আপনে ছবি ঢুকাবেন কেমনে?
- আমি সাইকেল-রিকশা, বাস-ট্রাকের টিউবের কথা বলি নাই।  এইটা হইল ইন্টারনেটের ইউটিউব। 
: ইন্টারনেট? ইন্টারনেটে কেন দিবেন? আপনের মতলব কী?
- মতলব শুভ।  কোনো প্রকারের ডিগ্রি ছাড়াই কবিরাজসাব মাত্র আধাঘন্টায় মানুষের শরীর থেইকা টিউমার অপসারণ করতেছেন, বিষয়টা ইন্টারনেটে দিলে সারা বিশ্বে হৈচৈ পইড়া যাবে।  আমার ধারণা, এইজন্য তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারও পাইয়া যাইতে পারেন। 
: ওনার ডিগ্রি নাই- এই কথা কে বলছে আপনেরে? উনি যেসব ডিগ্রি অর্জন করছেন, তা দশমিনিটেও বইলা শেষ করা যাবে না।  আর আপনের কি ধারণা, উনি পুরস্কার বা টাকা-পয়সার জন্য এই কাজ করেন?
- তাইলে?
: উনি ওনার ওস্তাদের নির্দেশে রাস্তায় রাস্তায় ঘুইরা সাধারণ মানুষের সেবা করেন।  যাক, কথা সেইটা না; ফোন লইয়া বাসা পর্যন্ত যাওয়ার ইচ্ছা আছে? যদি থাকে, তাইলে আগে যে জায়গায় খাঁড়া ছিলেন, ঠিক সেইখানে গিয়া খাঁড়ান।  যান। 
খুবই অপমানজনক কথাবার্তা।  এসব ক্ষেত্রে আর দশজন ভদ্রলোক যা করে, আমিও তাই করলাম।  নীরবে অপমান হজম করে ডাইনে-বামে আড়চোখে তাকিয়ে এ ঘটনার কোনো সাক্ষী রইল কিনা, তা দেখে নিয়ে স্থানত্যাগ করলাম। 
বাতাস ভর্তি বেলুন ফুটো করলে যেভাবে সেটার ভেতর থেকে বাতাস বের হতে থাকে, জিয়াউল হকের টিউমার থেকে সেভাবে পুঁজমিশ্রিত রক্ত বের হচ্ছে।  এক সময় দেখা গেল, সেখানে যে কোনো টিউমার ছিল, তা বোঝার কোনো উপায় নেই।  চোখের সামনে এমন জাদুকরী কারবার দেখে নিজের মাথায় হাত রাখলাম।  আমার কপালের ইঞ্চিখানেক ওপরে মটরশুটির মতো

একটা বস্তু পয়দা হয়েছে।  ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে ১০ টাকার টিকিট কেটে ডাক্তারের সামনে হাজির হওয়ার পর তিনি এটাকে সিস্ট (পুংঃ) হিসেবে অভিহিত করে মাথায় ব্যবহারের জন্য ভ্যালকিন শ্যাম্পু, দুই ধরনের মলম ও ওষুধপত্র দিলেন।  বাসায় এসে অভিধানে দেখলাম, সিস্টের বাংলা করা হয়েছে পুঁজকোষ, জলকোষ ইত্যাদি।  কোষ-তুষ যাই হোক না কেন, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, কোর্ট-কাচারি ও উকিল-মোক্তারের আদেশ মানতে আমরা বাধ্য।  এ বোধ থেকে আঙুলের কড়ের সমান ভ্যালকিন শ্যাম্পুর একটা বোতল ৫০০ টাকায় কিনলাম।  বাকি ওষুধ কিনতে গিয়ে একটা মলম নিয়ে সমস্যায় পড়লাম।  ঢাকার ছোট-বড় অনেকগুলো ফার্মেসির বিক্রেতারা মলমটি সনাক্ত করতে পারলেন না।  চলে আসার সময় ডাক্তার সাহেবের একটা ভিজিটিং কার্ড চেয়ে এনেছিলাম।  কার্ডে থাকা মোবাইল নম্বরে ফোন করে সমস্যার কথা বলতেই ডাক্তার সাহেব রেগে গিয়ে বললেন-
: ফার্মেসিতে তো সব মূর্খ বসা থাকে।  দুর্গাবাড়ি রোডের লক্ষ্মী ফার্মেসিতে যান, ওখানে পাবেন। 

প্রেসক্রিপশনে লেখা ওষুধ নির্দিষ্ট একটা দোকান ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যাবে না- এর মানে কী? নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনো গড়বড় আছে।  আমির খান অভিনীত পিকে সিনেমায় এ ধরনের গড়বড় সামনে রেখে লোকজনকে ‘ইয়ে রং নাম্বার হ্যায়’ উচ্চারণ করতে দেখা যায়।  আমিও ওই ডাক্তাদের উদ্দেশে একই সংলাপ আওড়ানোর পর সরকারি সেক্টরকে সেলাম জানিয়ে প্রাইভেট সেক্টর অভিমুখে পা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। 
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ময়মনসিংহ শহরের সবচেয়ে নামকরা চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে খাতায় নাম লেখানোর পর চিকিৎসকের সহকারী বললেন-
: ৫০০ টাকা দেন। 
- কেন?
: সিরিয়াল নেয়ার সময় ফিফটি পার্সেন্ট অগ্রিম পরিশোধ করতে হয়। 

নিজের টুকটাক চিকিৎসা ছাড়াও স্বজন-পরিজনসহ অন্যদের চিকিৎসার প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছি।  কিন্তু সিরিয়াল নেয়ার সময় মোট ফি’র অর্ধেক টাকা পরিশোধ করতে হয়, এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনও হইনি।  সহকারীর উদ্দেশে বললাম-
: ভাই, আমি তো ফ্ল্যাট বুকিং দিতে আসি নাই- যে অগ্রিম দিতে হবে। 
- কী করবেন! ডাক্তার সাহেব এই নিয়ম করছেন। 
নিয়ম-অনিয়ম যাই হোক, ঠেকা আমার।  চাহিদা পূরণ করার পর ৮ নম্বর রোগী হিসেবে আমাকে রাত আটটার দিকে নেক্সাস হাসপাতালের ৪র্থ তলায় চলে আসার নির্দেশ দেয়া হল। 

পাছে দেরি হয়ে যায়, এজন্য সাড়ে সাতটার দিকে নেক্সাস হাসপাতালে হাজির হলাম।  হাসপাতালের পরিবেশ দেখে আমি অভিভূত।  পুরো হাসপাতাল কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।  ছোটবেলায় ময়মনসিংহ শহরে অধ্যাপক প্রভাকর পুরকায়স্থ কিংবা অধ্যাপক শেখ নেসারউদ্দিনের মতো চিকিৎসকদের ঘুপচি একটা ঘরে বসে রোগী দেখতে দেখেছি।  ওইরকম একটা পরিবেশে তারা যে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, রোগীদের সঙ্গে যেরকম ব্যবহার ও আচরণ করেছেন, সুসজ্জিত ঠাণ্ডা ঘরে বসেও আজকালকার ডাক্তাররা তা করতে পারছেন না।  এর কারণ কী?

ডাক্তার সাহেব এলেন রাত দশটার পরে।  সহকারীর কাছে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে তিনি জানালেন-
: উনি দুপুরে অন্য একটা ক্লিনিকে রোগী দেখেন তো; আজ ওখানে রোগীর খুব চাপ ছিল। 
আমি যখন ডাক্তারের সামনে যাওয়ার সুযোগ পেলাম, তখন ঘড়িতে রাত পৌনে বারোটা।  তিনি তার নিজের একটি লেজার সেন্টার থাকার কথা জানালেন এবং আমার সমস্যা সমাধানের জন্য সেখানে গিয়ে লেজার চিকিৎসা গ্রহণের উপদেশ দিলেন।  আর দিলেন কয়েক পদের ওষুধ।  ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করার সময় এক চাচার সঙ্গে খাতির হয়েছিল।  চলে আসার সময় তিনি বললেন-
: আপনে তো পার পাইলেন! আমার কী দশা হবে?
জবাবে বললাম-
: আপনে একটা নফল রোজা করার নিয়ত কইরা ফেলেন। 
- এই কথা বলতেছেন কেন?

: যে অবস্থা দেখতেছি, তাতে মনে হইতেছে- আপনের সিরিয়াল আসতে আসতে রাইত দুইটা-আড়াইটা বাজবে।  বাসায় যাইয়া পতইরা খাইয়া নফল রোজার নিয়ত বাইন্ধা ঘুম দিবেন।  উঠবেন একেবারে জোহরের নামাজের আগে। 
অতিশয় ব্যস্ত, দেশী-বিদেশী অনেক ডিগ্রি, খেতাব ও পুরস্কারপ্রাপ্ত ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন বাসা পর্যন্ত নিলাম না, ড্রেনে ফেলে দিলাম।  ১ হাজার টাকা জলে গেছে।  ওষুধ কিনে আরও দেড়-দুই হাজার টাকা জলে ফেলার কোনো মানে হয় না। 
আজ দুলাল কবিরাজের কারবার দেখে মনে হচ্ছে, এইবার আসল লোকের দেখা পেয়েছি। 

অপারেশন করার আগে ডাক্তাররা রোগীর একান্ত আপনজনের কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিয়ে থাকেন।  এই মুহূর্তে আমার সঙ্গে কেউ নেই।  লিখিত না হোক, অন্তত মৌখিক অনুমতি নেয়া দরকার।  লবণ বেগকে ফোন করে বিস্তারিত জানালাম।  লবণ বেগম শীতল গলায় বলল-
: ফুটপাতের ক্যানভাসার দিয়া যদি টিউমার ভালো করা যাইত, তাইলে সরকার একেকজন ডাক্তার তৈরির জন্য প্রতিবছর লাখ লাখ টাকা খরচ করত না।  আজকাল সিনেমায় এর চাইতেও আচানক কারবার বিশ্বাসযোগ্যভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হয়, বাস্তবে যা হয়ত কোনোদিনই করা সম্ভব না।  তাসিনের আব্বু! তোমারে একটা কথা বলি?
- কী?

: জীবনে অনেক প্রকার গাধা দেখছি।  কিন্তু তুমি হইলা একটা বিরল প্রজাতির গাধা।  যে লোকের টিউমার অপসারণ করা হইছে- সে যে কবিরাজের নিজস্ব লোক না এবং তার মাথার টিউমার যে আর্টিফিশিয়াল না, এইটা বোঝার মতো জ্ঞান-বুদ্ধি আল্লাহ তোমারে দেয় নাই, আর মনে হয় দিবেও না।  এখন ওইখানে আর এক সেকেন্ড সময়ও নষ্ট না কইরা জলদি বাসায় আসো। 

নারীজাতির সব আদেশ পালন করতে হবে, সংবিধানে এমন কোনো কথা লেখা আছে কি? লবণ বেগমের আদেশ অগ্রাহ্য করে মাথার ক্যাপ খুলে ন্যাড়া মাথা নিয়ে দুলাল কবিরাজের সামনে দাঁড়ালাম।  সমস্যার কথা বলার সময় মটু মিয়া তার কানে কানে কী যেন বলল! দুলাল কবিরাজ মাথা নাড়তে নাড়তে আমার মাথার বস্তুটা কিছুক্ষণ টিপেটুপে বললেন-
: ভাই, অনেক দেরি কইরা ফেলছেন।  এখন আর আমার পক্ষে এইটার চিকিৎসা করা সম্ভব না। 
- কেন!
: আপনের এইটার ভিতরে চর্বি ঢুইক্যা গেছে।  যেসব টিউমারের মধ্যে চর্বি জইম্যা যায়, সেইখানে আমার ওষুধ কোনো কাজ করে না। 

সম্পাদনায়: রফিকুল ইসলাম: ৫, এসএনএন২৪.কম