১২:৫৯ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার | | ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০


চিকিৎসার রাজনীতি

০৮ অক্টোবর ২০১৮, ০৪:৪৯ পিএম | সাদি


এসএনএন২৪.কম : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে যেদিন (শনিবার) বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয় তার পরদিন, অর্থাৎ যেদিন বেগম জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তের কথা জানান বিএসএমএমইউর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুন- সেদিন (রোববার) বিকেলে চিকিৎসকদের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘চিকিৎসার চেয়ে মহৎ কোনো পেশা নেই।  কারণ যখনই আমরা রোগে কষ্ট পাই, ডাক্তারের শরণাপন্ন হই। ’

তিনি রোগীদের প্রতি নিবেদিত থেকে সেবা দিতে চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানান।  খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক কিংবা আইনের দৃষ্টিতে তিনি যত বড় অপরাধীই হোন না কেন, তিনি এখন একজন সত্তুরোর্ধ নারী এবং নানা রোগে আক্রান্ত।  তার সুচিকিৎসার জন্য দেশের একমাত্র মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার তাকে ভর্তি করলেও এই ইস্যুতে বিতর্ক ও রাজনীতি পিছু ছাড়ছে না। 

যে আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতির কারণে ১৯৯৬ সালে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি হয়নি তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এবং তাদের তীব্র আন্দোলনের মুখে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়।  কিন্তু সেই আওয়ামীলীগই আবার দেড় দশক পরে সংবিধান থেকে সেই ব্যবস্থা তুলে দেয়।  এখন সেই বিএনপিও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি নয়।  এ কারণে তারা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে।  অর্থাৎ বিরোধী দলে থাকলে আমাদের দলগুলো যে ব্যবস্থা পছন্দ করে, সরকারে গেলে সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। 

বেগম জিয়াকে যেদিন এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, সেদিন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেছেন, হাসপাতাল যেন রাজনীতির মাঠ না হয়।  কিন্তু রাজনীতির অভিযোগ এসেছে বিএনপির তরফেই।  খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ৫ সদস্যের যে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে, সেখানে আওয়ামী লীগপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠনস্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) দুজন ডাক্তার রয়েছেন বলে বিএনপি নেতাদের অভিযোগ।  অবশ্য সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ নাকচ করে বিএসএমএমইউর পরিচালক বলেছেন, মেডিকেল বোর্ডে স্বাচিপ বা ড্যাবের (বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন) কার্যনির্বাহী কমিটির কোনো সদস্য নেই। 

বস্তুত বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসা নিয়ে শুরু থেকেই একধরনের রাজনীতি চলছে এবং দুঃখজনকভাবে সেটি দুপক্ষের তরফেই।  বিএনপি তার অসুস্থতার বিষয়টি অনেক বেশি সামনে এনে একদিকে যেমন আদালতের সহানুভূতি পেতে চেয়েছে তেমনি জনগণেরও।  বেগম জিয়া কারাগারে অসুস্থ, সরকার তার সুচিকিৎসা দিচ্ছে না- এই কথা বলে যত সহজে নেতাকর্মীদের মনে সরকারবিরোধী অনুভূতিজাগিয়ে তোলা যায়-খালেদা জিয়া সুস্থ থাকলে সেটি কঠিন। 

বরং তার এই অসুস্থতার ইস্যুটি এত বেশি ফোকাস করা হয়েছে যে, তার অপরাধ, মামলা, বিচার, জামিন ইত্যাদি গৌণ হয়ে গেছে।  সরকারও জানে যে, খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়টি নিয়ে বিএনপি বেশিকথাবার্তা বললে এটি আখেরে তাদের রাজনৈতিক সুবিধা দেবে- ফলে সরকারের মন্ত্রীরা শুরু থেকেই বলছিলেন, খালেদা জিয়া অতটা অসুস্থ নন।  বরং কারাগারের ভেতরেই তার পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। 

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে রাজনীতি কিংবা বিতর্ক শুরু হয় মূলত বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতাল ইস্যুতে।  গুলশানে তার বাসভবনের কাছে অবস্থিত এই হাসপাতালে তিনি আগে চিকিৎসা নিতেন এবং এই হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তিনি ছিলেন।  ফলে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই তার আইনজীবী ও দলের পক্ষ থেকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে তার চিকিৎসার দাবি জানানো হয়।  কিন্তু সরকার বারবারই বলে আসছে যে, কোনো বেসরকারি হাসপাতালে তার চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয়। 

সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় বেসরকারি হাসপাতালে বেগম জিয়ার চিকিৎসা সম্ভব নয়- এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্টও।  যদিও সরকার বরাবরই দাবি করে আসছে যে, খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসায় তারা আন্তরিক।  এমনকি বিএসএমএমইউতে রাজি না হলে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তিরও প্রস্তাব দেয়া হয়।  কিন্তু বেগম জিয়া ইউনাইটেডে অনঢ় থাকেন। 

বিষয়টি নিয়ে অবশেষে উচ্চ আদালতকেই সিদ্ধান্ত দিতে হয়।  আদালতের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বেগম জিয়াকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয় এবং এই হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল জলিল চৌধুরীর নেতৃত্বে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়।  বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বদরুন্নেসা আহমেদ, রিউমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল হক, কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সজল ব্যানার্জী এবং অর্থোপেডিক বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নকুল কুমার দত্ত।  মেডিকেল বোর্ডের সাথে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. মামুন রহমানও রয়েছেন।  কিন্তু বিএনপির অভিযোগ, ৫ সদস্যের মেডিকেল বোর্ডে দুজন সরকারপন্থি সংগঠন স্বাচিপের সঙ্গে যুক্ত। 

এখন প্রশ্ন হলো, ধরা যাক ওই দুই চিকিৎসক আসলেই স্বাচিপের সঙ্গে যুক্ত।  তাতে কি তারা খালেদা জিয়ার চিকিৎসা করা থেকে বিরত থাকবেন? একজন চিকিৎসকের কাছে যখন একজন রোগী আসেন, চিকিৎসক কি তার রাজনৈতিক পরিচয় দেখে সেবা দেন? আমাদের ডাক্তাররা কি এতই অমানবিক বা এতটাই নীতিহীন? নিশ্চয়ই না। 

আবার এও ঠিক যে, যেহেতু অন্যান্য পেশার মতো চিকিৎসকরাও রাজনৈতিক দলে বিভক্ত এবং বেগম জিয়া একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব- সুতরাং মেডিকেল বোর্ড গঠনে সরকারের আরও বেশি সতর্ক থাকা উচিত ছিল যাতে এ নিয়ে বিএনপি কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ না পায়।  বেগম জিয়া একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তার ও তার দলের বিপুল জনসমর্থনও রয়েছে।  সে কারণে যে মামলায় এবং যে অভিযোগে তারা সাজা দেয়া হয়েছে, সেটিকে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে বিশ্বাস করা লোকের সংখ্যাও অনেক (যদিও আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই রায় দিয়েছেন)। 

ফলে খালেদা জিয়ার অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন, যেহেতু তিনি কারাবন্দি এবং যেহেতু তিনি অনেক দিন ধরেই জটিল আর্থ্রাইটিসসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত- ফলে তার প্রতি বিএনপি তো বটেই, নির্দলীয় লোকের একটি অংশেরও সহানুভূতি রয়েছে।  সুতরাং এখন তার চিকিৎসার ইস্যুতে সরকারের এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া উচিত নয়, যাতে এটি কারো কাছে মনে হয় যে, সরকার তার চিকিৎসায় অবহেলা করছে বা তার সুচিকিৎসার ব্যাপারে আন্তরিক নয়।  কারণ এই ধারণাটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে গেলে তাতে খালেদা জিয়া এবং তার দলই রাজনৈতিক সুবিধা পাবে। 

প্রশ্ন হলো, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে কেন এই রাজনৈতিক বিতর্ক উঠছে? উত্তর সহজ।  সেটি হলো আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট।  রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে আস্থাহীনতা- তা থেকে চিকিৎসাও মুক্ত নয়।  নয় বলেই বিএনপি বা খালেদা জিয়ার সন্দেহ- তার পছন্দের হাসপাতাল ও ডাক্তার ছাড়া তার সুচিকিৎসা হবে কি না। 

যে আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতির কারণে ১৯৯৬ সালে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি হয়নি তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এবং তাদের তীব্র আন্দোলনের মুখে সংবিধান সংশোধন করেনির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়।  কিন্তু সেই আওয়ামী লীগই আবার দেড় দশক পরে সংবিধান থেকে সেই ব্যবস্থা তুলে দেয়।  এখন সেই বিএনপিও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি নয়।  এ কারণে তারা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে।  অর্থাৎ বিরোধী দলে থাকলে আমাদের দলগুলো যে ব্যবস্থা পছন্দ করে, সরকারে গেলে সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। 
লেখক : সাংবাদিক।