৩:৫৫ পিএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, বৃহস্পতিবার | | ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৪০




চালের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা

০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৪৫ এএম | জাহিদ


একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ শেষ হতে না হতেই চালের বাজারে উত্তাপ ছড়িয়েছিল, যা নিয়ে পত্রপত্রিকায় নানাভাবে খবরও প্রকাশিত হচ্ছে।  আমন মৌসুমের ধান কাটা-মাড়াই সবে শেষ হয়েছে।  আবার আমনের ফলনও ভালো ছিল। 

এ অবস্থায় চালের বাজারদর বাড়ার তো কথা নয়।  কিন্তু এটাই সত্য, চিকন চালের বাজার কেজিপ্রতি ৩-৪ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল।  যা নিয়ে গত ১০ জানুয়ারি খাদ্য ভবনে সদ্য শপথ নেওয়া খাদ্যমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে চালকল মালিক সমিতি ও ঢাকার চাল ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মতবিনিময় হয়।  

মতবিনিময়কালে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, আপনাদের বেশিরভাগই উত্তরবঙ্গের মানুষ।  আমরাও দুই মন্ত্রী উত্তরবঙ্গের।  তাই আপনাদের কাছে দাবি, আমাদের ইজ্জত রাখবেন।  খাদ্যমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপকালে চালকল মালিকদের তরফে বলা হয়, সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে ঘিরে কয়েকদিন পরিবহন সংকটের কারণে চালের সরবরাহ কিছুটা কমে আসে।  ফলে কেজিতে ২-১ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।  এ মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক।  স্বল্প সময়ের মধ্যে চালের বাজার স্থিতিশীল হবে মর্মেও ব্যবসায়ীরা আশ্বস্ত করেন। 

বাস্তবেও যে কোনো পণ্যের সরবরাহ কমলে দাম বাড়ে, এটাই স্বাভাবিক।  নির্বাচনকে ঘিরে পরিবহন সংকটে চাল সরবরাহ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।  ফলে চালের বাজারমূল্য কিছুটা বেড়েছে।  অবশ্য এ জন্য অনেকেই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট অতি মুনাফালোভীদের দায়ী করছেন।  আবার সরকারের তরফেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।  যেন কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কেউ মূল্য বৃদ্ধি করতে না পারে।  অতিমুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ীদের কবলে পড়ে সাধারণ ভোক্তার গলাকাটার অভিযোগকে যেমন উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, তেমনি মূল্য বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ উদঘাটন করে প্রতিকারে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলে ভোক্তার কষ্টও লাঘব হবে না। 

প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশ।  আর মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন খাদ্য।  বৃহৎ এই জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।  এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বাধীনতা-উত্তর ৪৭ বছরে যে হারে মানুষ বেড়েছে, সে হারে খাদ্য উৎপাদনও বেড়েছে।  তা না হলে ১৬ কোটি মানুষের মুখের আহার জোগান দেওয়া সম্ভব হতো না।  এর পরও প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- অতিবৃষ্টি, আগাম বন্যার কারণে ফলন বিপর্যয় হলে খাদ্য ঘাটতি হয়ে থাকে।  আর খাদ্য ঘাটতি হলে বিদেশ থেকে সরকারি-বেসরকারিভাবে খাদ্যশস্য আমদানি করে তা সামাল দেওয়া হয়।  

যেমন ২০১৭ সালে উজান থেকে আসা পানির ঢলে আকস্মিক বন্যার কারণে চার জেলার হাওরের আধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেলে ফলন বিপর্যয় ঘটে।  সে সময় বাড়তি মূল্যে সাধারণ ভোক্তাদের চাল কিনে খেতে হয়েছে।  কিন্তু এই মুহূর্তে তো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা ফলন বিপর্যয়ের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি, এর পরও কেন চালের মূল্য বেড়েছে? যা নিয়ে খোদ খাদ্য মন্ত্রণালয়ও উদ্বিগ্ন।  যদিও সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, চালের বাজার স্থিতিশীল আছে, উদ্বিগ্নের কোনো কারণ নেই।  

আমরাও মনে করি, চালের বাজারদর যে কোনো মূল্যেই স্থিতিশীল রাখতে হবে।  কারণ দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা বেশি।  চালের বাজার বৃদ্ধি হলে সাধারণ ভোক্তার কষ্ট বাড়ে।  এ-ও যেমন সত্য, তেমনি দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, সক্ষমতাও বেড়েছে, আবার রুচিবোধেরও পরিবর্তন হয়েছে। 

ফলে এখন মানসম্মত চকচকে মরাদানা, ভাঙাদানামুক্ত চিকন চালের চাহিদা বেড়েছে।  অর্থাৎ মানুষের মধ্যে চিকন চালের কদর এখন অনেক বেশি।  যেমন- মিনিকেট, কাটারি, নাজিরশাইলজাতীয় চালের চাহিদা বেশি।  কিন্তু চিকন চাল প্রস্তুত করতে হলে চিকন ধানের প্রয়োজন হয়।  

প্রকৃত অর্থে যে পরিমাণ চিকন চালের চাহিদা বেড়েছে, সে অনুপাতে মিনিকেট, কাটারি, নাজিরশাইল জাতীয় চিকন ধানের উৎপাদন বাড়েনি।  আর গুটি, সুমন স্বর্ণার চাষাবাদ যেমন বেড়েছে, এসব ধান থেকে প্রস্তুতকৃত চালের দামও মিনিকেট, কাটারি থেকে সব সময়ই কম থাকে। 

এখনো চিকন চালের চেয়ে বিআর-২৮, স্বর্ণা ও লতা চাল তুলনামূলক কম মূল্যেই বিক্রি হচ্ছে।  অথচ কাটারি ও মিনিকেটজাতীয় ভালো মানের চিকন চাল পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে কিছুটা বাড়তি মূল্যে বিক্রি হলেও ইতোমধ্যেই চিকন চালের মূল্যও কমেছে।  

বাস্তব এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে সার, বীজ, কীটনাশকসহ প্রয়োজনে প্রণোদনা দিয়ে মিনিকেট, কাটারি, নাজিরশাইলজাতীয় চিকন ধানের উৎপাদন বাড়াতে হবে।  পাশাপাশি ধানচাষিদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।  এ জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়কে মোটা ও চিকন ধান, চালের আলাদা মূল্য নির্ধারণ করে চাল ও ধান সংগ্রহ করতে হবে।  অর্থাৎ চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।  তা হলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা অনেকাংশেই দূর হবে।  ফলে অতিমুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা কারসাজি করার সুযোগও পাবেন না। 

দুই কোটি জনগোষ্ঠীর মেগাসিটি এখন ঢাকা।  বিপুল পরিমাণ এসব মানুষের খাদ্য চাহিদায় মোটা চালের চেয়ে চিকন চালের চাহিদা বেশি থাকে।  ফলে রাজধানীতে তুলনামূলক চালের দাম একটু বেশিই থাকে।  বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলে সরকার খোলাবাজারে কম দরে চাল বিক্রি করায় নিম্ন আয়ের ভোক্তারা সে চাল কিনে খান।  কিন্তু এ সময়ে ঢাকাসহ গোটা দেশে ওএমএসে চাল বিক্রি বন্ধ আছে।  চালের মূল্য বৃদ্ধির এটাও একটি অন্যতম কারণ। 

আবার দেশে দুই পদ্ধতির মিল মেশিনারিজে ধান ছাঁটাই করে চাল উৎপাদন হয়ে থাকে।  একটি হচ্ছে মান্ধাতা আমলের এঙ্গেলবার্ক হলার, অন্যটি হচ্ছে অটোমেটিক পদ্ধতির চালকল।  গোটা দেশে প্রায় ১৫-১৬ হাজার হাসকিং মিল চাতালে আগে ধান, ভাপাই সিদ্ধ করে ছাঁটাই করা হতো।  ফলে বাজারে চালের ব্যাপক সরবরাহও ছিল।  এখন রুচিবোধের পরিবর্তন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে ভাঙা, মরাদানামুক্ত চাল অধিকাংশ মানুষই কিনে খায়। 

আবার সরকারের খাদ্য বিভাগও এখন মরাদানা, ভাঙাদানামুক্ত রাবার পলিশারে ঘষা চকচকে চাল সংগ্রহ করে।  ফলে গোটা দেশের বিপুল পরিমাণ হাসকিং মিল চাতালের অধিকাংশই এখন বন্ধ হয়ে গেছে।  পক্ষান্তরে গোটা দেশে সর্বোচ্চ প্রায় এক হাজার অটোমেটিক চালকলে প্রস্তুতকৃত চাল গোটা দেশের ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী চাল প্রস্তুত করে বিপণন করছে।  এ অবস্থায় অটোমেটিক চালকলগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশেই বৃদ্ধি পেয়েছে।  

অর্থাৎ চালের বাজারে এখন আর হাসকিং মিল চাতালের চাল সেভাবে বিক্রি হচ্ছে না।  ফলে আগে বাজারে চাল প্রস্তুতকারীদের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা ছিল, তা আর এখন নেই।  সঙ্গত কারণে অটোমেটিক চালকলের প্রস্তুতকৃত চালে পুরো বাজার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।  এ অবস্থায় গোটা দেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠা হাসকিং চালকলশিল্পকে পুনর্জীবিত করতে সরকারকে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত। 

স্বল্প সুদে, দীর্ঘমেয়াদে সহজ শর্তের ঋণে হাসকিং মিলগুলোকে আধুনিকায়ন করা দরকার।  তা হলে আধুনিক হাসকিং মিলে প্রস্তুতকৃত চাল বাজারে বিপণন হবে।  ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণে অটোমেটিক চালকলগুলোর আধিপত্য রোধ করা অনেকাংশেই সম্ভব হবে।  

আর যদি সরকার চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তা হলে ভোক্তার কষ্ট লাঘবে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এক সময় বাধ্য হয়েই শুল্কমুক্ত সুবিধায় চাল আমদানির সুযোগ দেবে।  আবার চাল আমদানির পরিমাণ বাড়লে ভোক্তার কষ্ট লাঘব হবে সত্য, কিন্তু উৎপাদকের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে। 

অর্থাৎ কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে না।  অনেকটা শাখের করাতের মতো অবস্থা।  স্পর্শকাতর ধান-চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে বাস্তব অবস্থার ওপর ভিত্তি করে সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।  

যেমন ২০১৭ সালে হাওরখ্যাত অঞ্চলের আধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেলে সরকার ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় চাল আমদানির সুযোগ দেয়।  ফলে প্রায় ৩৯ লাখ টন খাদ্য সরকারি-বেসরকারিভাবে আমদানি হয়।  তখন কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।  কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আবার সরকার চাল আমদানির ওপর ২৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে।  

যদিও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চাল উৎপাদন বেড়েছে।  গত আমন মৌসুমে চাল উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৫৬ হাজার টন।  গত বোরোতে চাল উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৭০ হাজার টন ও আউশে চাল উৎপাদন হয়েছে ২৭ লাখ টন।  সব মিলে চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৫৯ লাখ টন, যা বর্তমান চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি।  তা হলে চালের মূল্য বাড়ে কী করে? বাস্তব পরিসংখ্যানে গরমিল আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা জরুরি। 

পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, প্রকৃত অর্থে চাহিদার তুলনায় চিকন চালের সরবরাহ কম থাকায় মূল্য কিছুটা বাড়লেও মোটা চালের মূল্য বাড়েনি।  সরকার যদি আমন মৌসুমের সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার অবশিষ্ট তিন লাখ টন চাল আর না কেনে, তা হলে মোটা চালের বাজার আরও কমে আসবে।  আর চিকন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সব অটোমেটিক চালকলকে বাধ্যতামূলকভাবে চালু রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে।  

পাশাপাশি সরকারিভাবে মনিটরিং বাড়াতে হবে।  শুধু চালকলেই নয়, চালের পাইকারি বাজারের ওপরও নজরদারি বাড়াতে হবে।  কেউ যেন বাড়তি মুনাফার লোভে নিয়মের বাইরে চাল মজুদ রাখতে না পারে।  তা হলে চালের মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব হবে।