১২:৫৫ পিএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | | ২৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৮

South Asian College

ছোট কাঁধে বড় দায়িত্ব

০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৭:৪১ এএম | এন এ খোকন


এসএনএন২৪.কম : মায়ের ডাকে যার ঘুম ভাঙার কথা, সে তার মাকে ঘুমে রেখেই চলে যাচ্ছে নিজের দায়িত্বে।  এ দায়িত্ব তাকে কেউ দেয়নি।  বাস্তবতাই বলে দিচ্ছে স্কুলে নয় তাকে যেতে হবে কাজে।  যে সময় তার স্কুলে যাবার কথা সে সময় গাড়ি মুছা গামছা কাধে নিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে বলছে ‘ওইঠা পড়েন নইলে দেরী অইয়া যাইব। ’

ছেলেটির নাম শাওন হাওলাদার।  বয়স মাত্র ১০ বছর।  সে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার কাজলা এলাকায় মায়ের সঙ্গে থাকে।  প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠে সে স্কুলের শিক্ষার্থীদের ডেকে গাড়িতে তুলে।  এরপর গাড়ির ( লেগুনা) পেছনে দাঁড়িয়ে থেকে শিক্ষার্থীদের স্কুলে পৌঁছে দেয়।  এরপর শুরু হয় তার ব্যস্ততা।  সারাদিন লেগুনায় হেলপারি করে।  কোনদিন রাত ১১টায়, কোনো দিন ১২ টায় বাসায় ফিরে।  এটাই তার জগত।  এভাবে চলছে তার জীবন। 

শাওনের সঙ্গে আলাপকালে সে জানায়, দুই বছর আগে তার বাবা অন্যত্র বিয়ে করেছে।  এরপর থেকে তার বাবা সংসারে খরচ দেয় না।  এ কারণে এক বছর ধরে সে এ কাজ করছে।  প্রতিদিন ভোরে স্কুলে শিক্ষার্থী পৌঁছে দিলে প্রতিমাসে সে ১৫০০ টাকা পায়।  এছাড়া মাঝে মধ্যে শিক্ষার্থীরা দুচার টাকা দেয়। 

আর সারাদিন লেগুনায় ডিউটি করলে হাজিরা পায় ১০০ টাকা এবং দুপুরে খাবার বাবদ পায় ৫০ টাকা।  এই দিয়ে চলে মা ছেলের সংসার। 

শাওনের মা হাফেজা আক্তার।  তার সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, শাওনের বাবার নাম ইসমাইল হাওলাদার।  সে লেগুনা গাড়ি চালাতো।  তাদের বাড়ি বরিশাল।  ঢাকায় একই এলাকায় তারা থাকতো।  সেই সুবাদে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক হয়।  একপর্যায়ে দুইজন বিয়ে করে।  তাদের ঘরে শাওনের জন্ম হয়।  শাওনের জন্মের পরপরই তার বাবা অন্য নারীর দিকে নজর দেয়।  একই সঙ্গে জুয়া খেলে, গাঁজা ও মদের নেশা করে।  এ নিয়ে প্রতিদিন সংসারে ঝগড়া হতো। 

শাওনের বাবা একদিন ঝগড়া করে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।  এক মাস পরে বাসায় ফিরে।  বাসায় এসে বলে সে অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করেছে।  এরপর আবার সে বাসা থেকে চলে যায়।  মাঝে মধ্যে ফোন করে কথা বলে, আসে।  কিন্তু সংসারের খরচ দেয় না। 

হাফেজা বলেন, ‘এরপর থেকে আমি মানুষের বাসায় কাজ করি।  পোলাডা তার বাপের বন্ধুর গাড়িতে ডিউটি করে।  যা পায় তা দিয়ে সংসার চলে।  কি করুম, আমরা তো গরীব মানুষ।  ছেলেডারে লেখাপড়া করাইতে পারুম না।  তাই ছোট সময় থেকেই কাজে দিয়ে দিলাম। ’

শুধু শাওনই নয়, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় গিয়ে দেখা গেছে, তার মতো অনেক শিশু লেগুনায় হেলপার হিসেবে কাজ করছে।  তাদের অনেকেই কাজ করে সংসার চালাচ্ছে। 

মালিবাগ মৌচাক মার্কেটের বিভিন্ন দোকানে শাওনের মতো বয়সের অনেককে কাজ করতে দেখা গেছে।  মৌচাক মার্কেটের পিছনে আনারকলি মার্কেটে বিক্রমপুর ট্রেডার্সে (কাপড়ের দোকান) আলাপ হয় টুটল নামের একজন শিশুর সঙ্গে।  তার বয়স হবে ৯ থেকে ১০ বছর। 

টুটুল জানায়, তাকে প্রতিমাসে ১ হাজার টাকা বেতন দেয়া হয়।  প্রতিদিন সকাল ১০টায় দোকানে আসে।  দোকান থেকে রাত ৮ টায় বের হয়।  এর মধ্যে দোকানে দুপুরের খাবার, সন্ধ্যায় চা বিস্কুট খায়।  কি কাজ করে জানতে চাইলে সে জানায়, দোকানে মাঝে মধ্যে পানি আনতে হয়, খাবার পর প্লেট পরিস্কার করতে হয়, চা আনতে হয়।  এছাড়া মাঝে মধ্যে কাস্টমারদের ডাকাডাকি করতে হয়। 

টুটুলর আরো জানায়, দোকান মালিকের বাসা মুগদা।  আমাদের বাসা মালিকের বাসার কাছাকাছি।  মা মালিকের বাসায় কাজ করে।  আর তাই সহজেই দোকানে চাকরিটা হয়েছে । 

বাবা কি করে জানতে চাইলে টুটুল বলে, ‘বাবা রিকশা চালাতো।  কিন্তু বর্তমানে সে অসুস্থ থাকায় মা তাকে দোকানে কাজ করতে পাঠিয়েছে।  তার এক বড় বোন আছে।  কিন্তু তার বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সে স্বামীর বাড়িতে থাকে। ’

বিক্রমপুর ট্রেডার্সের কর্ণধার মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আসলে এমন শিশুদের তো কাজে নেয়া ঠিক না।  ছেলেটির মা আমাদের বাসায় কাজ করে।  অনেকদিন অনুরোধ করার পর ছেলেটিকে (টুটুল) আমার দোকানে কাজের জন্য নেই।  যেহেতু সে কোনো কাজে পারদর্শী না, তাই আমার এখান থেকে কাজ শিখছে।  মাস শেষে তাকে অল্প কিছু খরচ দেই।  এছাড়া তার খাবার ও পরনের পোশাকও আমরা দিয়ে থাকি। ’

যে বয়সে একজন শিশুর স্কুলে যাবার কথা, সেই বয়সে শাওন ও টুটুলের মতো অনেককে ছোট্ট কাঁধে পরিবারের দায়িত্ব তুলে নিচ্ছে।  এসব শিশুরা বড় হয়ে মানসিকভাবে অনেক রুক্ষ্ণ আচরণ করে।  কখনও তারা হিংসা, বিদ্বেষে জড়িয়ে পড়ে।  অনেকে আবার অপরাধ জগতে পা বাড়ায় বলে জানিয়েছেন শিশু বিশেষজ্ঞরা । 

এ সম্পর্কে শিশু মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিশু স্বাস্থ্য বিকাশ কেন্দ্রের ইনচার্জ অধ্যাপক ডা. ওয়াহিদা খানম বলেন, ‘আসলে যেসব শিশু পরিবারের দায়িত্ব নেয় তাদেরকে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়।  একদিকে তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্য দিকে পারিবারিক গন্ডিতে না থাকার কারণে তারা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।  তাছাড়া তাদের মানসিক বিকাশ ঠিক মতো হয় না।  শিশুকালে যদি কেউ সংসার চালানোর দায়িত্ব নেয় তখন তার মানসিক চাপ থাকে অনেক বেশি।  এসব কারণে তারা অনেক রোগেও আক্রান্ত হয়ে থাকে। ’

যারা শিশুকাল থেকে পরিবারের দায়িত্ব নেয় তাদের মানসিক বিকাশ সম্পর্কে ডা. নিশাত নাহার বলেন, ‘যেসব শিশু বিভিন্ন মার্কেটে দোকানে কর্মরত তারা ছোটবেলা থেকে হিসাব নিকাশ করতে শিখে।  অর্থের জন্য তারা যেকোনো অপরাধ করতেও শিখে।  এসব শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ব্যবহার অনেকটা রুক্ষ্ণ ও আক্রমণাত্মক হয়ে থাকে। ’