৮:০৯ এএম, ২২ আগস্ট ২০১৮, বুধবার | | ১০ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯


ছেলের বাংলাটা আসে না!

২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১২:১৫ পিএম | সাদি


এসএনএন২৪.কম : সম্প্রতি শুদ্ধ বাংলা ব্যবহার করে অনুষ্ঠান উপস্থাপনার জন্য দেশের রেডিও স্টেশনগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম।  মন্ত্রী মহোদয় টেলিভিশন গুলোকে বাদ রেখেছেন, বাদ রেখেছেন বিজ্ঞাপন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও।  ব্যানার, বিলবোর্ড কিংবা নিয়ন বাতি এইসব নিয়ে কোন নির্দেশনা নেই।  সর্বত্র শুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চা করার অর্থ কিন্ত ইংরেজি শিক্ষায় অনীহা নয়। 

আমাদের বাংলা ভাষায় অনেক ইংরেজি শব্দ রয়েছে কিন্তু প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে বিজ্ঞাপনে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার মোটেও শুভ লক্ষণ নয়।  তবে আমি সাধুবাদ জানাতে চাই তথ্য প্রতিমন্ত্রীকে, তিনি আমাদের ডিজ্যুস প্রজন্মের বাংলা ও ইংরেজী ভাষার মিশ্রণে যে এক নতুন বাংরেজি ভাষার প্রচলন শুরু হয়েছে রেডিওতে সেটি বন্ধে নির্দেশনা জারি করেছেন।  তবে শুধু গণমাধ্যমেই নয়, আমাদের নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় আদৌকি আমরা বাংলা ভাষার প্রতি যথেষ্ট সম্মানটা দেখাতে পারছি?

গত বছর বিবিসি হিন্দির ফেইসবুক লাইভ সংলাপে একটি ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছিলো সেই ভিডিওটি দেখে রীতিমত বিস্মিত হয়েছি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ প্রজন্মের একি হাল! বাংলাদেশে সংবাদ সংগ্রহে আসা বিবিসি হিন্দির রিপোর্টারের হিন্দিতে করা প্রশ্নের উত্তরে প্রায় সকল শিক্ষার্থী হিন্দিতে উত্তর দিয়েছেন!

এদের মধ্যে একজন আবার মিডিয়া স্টাডিজ ও জার্নালিজমের শিক্ষার্থীও ছিলেন।  তিনিও বিবিসি হিন্দির প্রতিবেদককে আধা হিন্দি আধা ইংরেজিতে উত্তর দিয়েছেন।  বিবিসি হিন্দির সেই ফেইসবুক সংলাপের বিষয় ছিলো, গুলশানে জঙ্গি হামলায় জড়িতরা যেহেতু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তাই ঢাকার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই ঘটনার পর কি ভাবছেন তা নিয়ে।  প্রশ্ন করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক দেখলেন সবাই হিন্দিতে উত্তর দিচ্ছে, তখন রিপোর্টার যেন আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠলেন।  প্রতিবেদক কৌতুহলবশত জানতে চাইলো শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে বসে কেমন করে হিন্দি ভাষা রপ্ত করলো?

ইউল্যাবের তরুণীদের সহাস্য উত্তর ছিলো তাদের বাসায় সারাদিন স্টারপ্লাস, সনি, স্টার জলসা চলে, সেখানেই তারা হিন্দি শিখেছেন। 

বিবিসি হিন্দির প্রতিবেদক চাইবেন তার উত্তরদাতারাও যেন হিন্দিতে কথা বলেন কারণ তার দর্শক ও শ্রোতারা হিন্দি ভাষার।  কিন্তু উত্তরদাতা শিক্ষার্থীরা যদি ওই প্রতিবেদকের প্রথম প্রশ্নের উত্তর বাংলায় কিংবা ইংরেজিতে দেওয়া শুরু করতেন তাহলে প্রতিবেদক অবশ্যই দুঃখিত বলে দ্বিতীয় প্রশ্নটি ইংরেজিতে করতে বাধ্য হতেন। 

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা তাদের মাতৃভাষা বাংলা কিংবা আন্তজার্তিক ভাষা ইংরেজি কেন বেছে নিলেন না সেটি নিয়ে নিশ্চয়ই ভাবনার অবকাশ রয়েছে।  নিজের ভাষার প্রতি তরুণদের এমন অনিহা এবং অশ্রদ্ধাবোধের জন্য দায়ী কি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাকি শিক্ষা ব্যবস্থা সেটি নিয়ে হয়তো বিশ্লেষকদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে কিন্তু এই চিত্র শুধু ইউল্যাবের শিক্ষার্থীদের নয়, এই চিত্র তরুণ থেকে শুরু করে বৃদ্ধ কম বেশি সব বয়সের বাঙালির মধ্যে বিদ্যমান।  ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নয় আমাদের অনেকেই কোন ভারতীয় আর পাকিস্তানি পেলে যেন কতটা হিন্দি আর উর্দূ বলতে পারদর্শী সেটা বুঝিয়ে দিতে চান নিজের ভাষাকে অশ্রদ্ধা করে। 

বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেসকল ভারতীয় কিংবা উর্দূভাষী নাগরিক কাজ করেন, ঢাকায় তাদের সাথে বাংলাদেশের অনেক সহকর্মী হিন্দি ও উর্দূতে কথা বলেন।  ইংল্যান্ডের চিত্র যদি বলি সেটা আরো ভয়াবহ! বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশন প্রতি বছর সেরা রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের বিসিএ এ্যাওয়ার্ড দিয়ে থাকে।  এই এ্যাওয়ার্ডের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করার সুবাদে প্রতি বছর ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরের সেরা রেস্টুরেন্ট নিয়ে ডক্যুমেন্টারী তৈরি করতে গিয়ে দেখেছি, যে সকল বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টে পাকিস্তানি ও ভারতীয় কর্মচারি আছেন তাদের সাথে রেস্টুরেন্ট মালিক থেকে শুরু করে ওয়েটার আর শেফরা সবাই হিন্দি বা উর্দূতে কথা বলে। 

শুধু রেস্টুরেন্টে নয়, লন্ডনের রিটেইল সপ ও ফাস্টফুড সপগুলোতে যে সকল বাঙালিরা কাজ করেন তাদেরকেও আমি দেখেছি ভারতীয় ও পাকিস্তানিদের সাথে হিন্দিতে কথা বলতে।  ভারতীয় ও পাকিস্তানিরাও বাঙালি পেলেই অনুমতি ছাড়া হিন্দি বলা শুরু করে দেয়, তাদের ধারণা বাঙালিরা হিন্দি জানে তাই তাদের সাথে ইংরেজি না বলে হিন্দিতে কথা বলাই উত্তম।  কিন্তু পাকিস্তানি ও ভারতীয়দের এই ধারণাটা তৈরিতে আমরাই কী প্রতিনিয়ত সহায়তা করছি না?

আমি হিন্দি বা উর্দূতে ফ্লুয়েন্ট না, তবে ৮০ শতাংশ বুঝি, কিন্তু আমার সাথে যখনই কোন পাকিস্তানি বা ভারতীয় হিন্দি বা উর্দূতে কথা বলে আমি তাদের কে স্যরি বলে তাকিয়ে থাকি এবং বিনয়ের সাথে বলি ‘প্লিজ স্পিক ইংলিশ অর বাংলা। ‘ একাধিক ভারতীয় আর পাকিস্তানিীর সাথে আমার এই বিষয়ে বিস্তর আলাপও হয়েছে।  ভারতীয়দের বক্তব্য হলো, ‘বাংলাদেশের দর্শকরা তো হিন্দি মুভির দারুন ভক্ত, অন্য সব বাঙালিরাতো হিন্দি পারে তুমি পারো না কেন?‘

আমি বিশ্লেষণে না গিয়ে ইংরেজিতে বলি, ‘আই এ্যাম কমফোর্টেবল ইন ইংলিশ অর বাংলা। ‘ এই উত্তরটিই তাদের জন্য যথেষ্ট।  তবে পরিচিত কোন পাকিস্তানি আর ভারতীয় আমার সাথে দ্বিতীয়বার হিন্দী আর উর্দূ বলেনা।  পাকিস্তানি নাগরিক ওয়ালিদ, পেশায় একজন আর্কিটেক্ট আর ভারতীয় নাগরিক ভূপেন্দ্র আইটি ইঞ্জিনিয়ার।  দু'জনের সাথেই আমার দীর্ঘ দিনের যোগাযোগ, দু‘জনই কর্মসূত্রে লন্ডনে আছেন।  তাদের সাথে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলাপ করলাম।  ‘আচ্ছা, তোমরা কেন একজন বাঙালি দেখলেই সরাসরি হিন্দিতে কথা বলো?

আমরা তো কোন পাকিস্তানি কিংবা ভারতীয় দেখলে বাংলায় কথা বলি না।  ওয়ালিদ হেসে জবাব দিলো, ‘উর্দূ ভাষার সাথে হিন্দির অনেক মিল আছে বাঙালিরা হিন্দিতে পারদর্শী আর বাংলাদেশ তো একটা সময় পাকিস্তানের অংশ ছিলো উর্দূ বাঙালিদের কাছে আসলে অপরিচিত ভাষা নয়। ‘ ভূপেনের জবাব হলো, ‘হিন্দী ভাষাভাষির পর বাঙালিরাই হিন্দি ফিল্মের সবচেয়ে বড় দর্শক, হিন্দি বাঙালিদের সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজে পরিণত হয়েছে।  তাছাড়া বাংলাদেশে হিন্দি চ্যানেলগুলো খুব জনপ্রিয়। ‘

ভূপেন্দ্র আর ওয়ালিদের কথার সূত্র ধরে আরেকটি বাস্তব চিত্র দেই।  লন্ডনের সিনে ওয়ার্ল্ডে যে সকল হিন্দি মুভি মুক্তি পায়, এই মুভির দর্শকদের বড় একটা অংশই বাঙালি।  আরো ভয়ঙ্কর তথ্য হলো, ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের অধিকাংশই বাংলা বলতে পারে না কিন্তু তারা হিন্দিতে বেশ সাবলীল। 

একাধিক ভাষা জ্ঞান থাকা দোষের কিছু নয়, তাই বলে নিজের মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে নয়।  ২০০৭ সালে ফ্রান্সে একটা বিজনেস সেমিনারে গিয়েছিলাম।  সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম আমাদের সেমিনারটি যেখানে হচ্ছে তার পাশেই বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম।  হাতে যেহেতু কিছু সময় আছে তাই ভেবেছিলাম ল্যুভর মিউজিয়ামে মোনালিসা‘র ছবিটা অন্তত দেখে যাই! আমি আমার সহকর্মীকে নিয়ে কমপক্ষে ৬-৭ জন ফ্রেঞ্চ পথচারির কাছে ইংরেজিতে জানতে চাইলাম মিউজিয়ামটা কোথায়।  সবাই মাথা নেড়ে ‘না‘ বললো।  আমি বিরক্ত হয়ে সেখানকার একজন বাঙালিকে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপারটা কি।  ফ্রান্সে লোকে ইংরেজি বলেনা নাকি পারে না?

আমাদের গাইড বললো, ফ্রেঞ্চদের মধ্যে জাতীয়তাবোধের চেতনা প্রবল।  তারা সহজে ইংরেজি বলেনা।  ইউরোপিয়ানদর মধ্যেও এমন জাতীয়তাবাদের চেতনা লক্ষণীয়।  ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ, জার্মান চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মার্কেল কিংবা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন কখোনোই নিজেদের দেশের ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় পাবলিকলি বক্তৃতা করেন না।  তার অর্থ এই নয় ওঁলাদ, মার্কেল বা পুতিন ইংরেজি জানেন না।  প্রত্যেকেই বিশুদ্ধ ইংরেজি জানেন। 

ভবানী প্রসাদ মজুমদারের ‘বাংলাটা ঠিক আসেনা‘ কবিতার মতই যদি হয় আমাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা।  তাহলে নিজের ভাষার প্রতি আমাদের আর শ্রদ্ধা থাকলো কোথায়?

তানভীর আহমেদ: কারেন্ট এফেয়ার্স এডিটর, চ্যানেল এস টেলিভিশন লন্ডন।  ইউকে প্রতিনিধি, একাত্তর টেলিভিশন। 
tvjournalistuk@gmail.com