৬:৩০ পিএম, ৫ এপ্রিল ২০২০, রোববার | | ১১ শা'বান ১৪৪১




ছায়াদের ঘর-সংসার

৩০ নভেম্বর -০০০১, ১২:০০ এএম | মোহাম্মদ হেলাল



// কাজী আলিম-উজ-জামান //


আমার দুই তরুণ বন্ধু সদ্য বিয়ে করেছেন।  শম্পাকে অবশ্য আমি চিনতাম না।  শামীমই পরিচয় করিয়ে দিল।  পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় শামীম চোখে-মুখে এমন একটা আভা ফুটিয়ে তুলল, যেন সে বেশ লজ্জা পাচ্ছে।  আমি ঠিক বুঝলাম না।  এটুকু বুঝলাম যে শম্পা তার সাধারণ বন্ধু নয়।  বিশেষ বন্ধু। 

এরপর অবশ্য শম্পার সঙ্গে আমার দু’দিন দেখা হয়েছে।  বসুন্ধরা শপিং মল থেকে বের হচ্ছেন।  সঙ্গে এক ভদ্রলোক, আর একটা মেয়ে।  মেয়েটিকে দেখে বুঝতে অসুবিধা হলো না যে সে শম্পার বোন।  বোঝা গেল, সাথের ভদ্রলোক শম্পার বাবা। 

‘খুব কেনাকাটা হলো!’

‘না, আমরা সিনেমা দেখতে এসেছিলাম।  বেশ ভালো ছবি।  আপনি দেখতে পারেন। ’

আমি আশপাশে শামীমকে খুঁজতে লাগলাম।  কিন্তু শামীম নেই।  ভাগ্যিস আমি শামীমের কথা জানতে চাইনি।  বাবার সামনে বেশ বিব্রত হতো মেয়েটি। 

তো সেদিন আমি বইমেলায় যাচ্ছি।  হাইকোর্টের মাজার পার হয়ে হাঁটছি দোয়েল চত্বরের দিকে।  হঠাত্ দেখি, উল্টো দিকে ওরা রিকশায় করে কোথায় যেন যাচ্ছে।  শম্পা পরেছে গাঢ় নীল পাড়ের আকাশি রঙের শাড়ি।  পাশে শামীমকে একটা পাঞ্জাবিতেই বেশি মানাত।  গলায় হাতের সামান্য কাজ করা হলে আরেকটু সুন্দর হতো।  কিন্তু আমাকে হতাশ করে শামীম পরেছে স্ট্রাইপ দেওয়া সাদা শার্ট।  কেতাবি প্যান্ট।  চিকন কালো বেল্টে ইন করা।  সুচালো কালো জুতো।  যেন প্রাইভেট অফিসের কোনো বড়বাবু বা মেজবাবু।  তবে পোশাক বড় কথা নয়।  বেশ সম্পন্ন চেহারা।  দেখতে ভারি সুন্দর লাগছিল দুজনকে। 

ট্রাফিক সিগন্যাল পড়েছে।  আমাকে দেখে হাত-ইশারা করল দুজনই। 

‘ভাইয়া, বিয়েতে আসেননি।  এখন আমাদের বাসায়ও আসলেন না। ’

‘আজই যাব, তোমরা যাও।  আমি বইমেলা ঘুরে রাতে আসছি। ’

সবুজ বাতি জ্বলে উঠল।  আস্তে ওদের রিকশা মিলিয়ে গেল আমার দৃষ্টির সীমানা থেকে।  দোয়েল চত্বরে পৌঁছানোর আগে রাস্তার পাশে নার্সারির সামনে দাঁড়িয়েছিলাম খানিকটা সময়।  কী দারুণ সব গাছ।  কোনো গাছে ঝুলছে আম, কোথাও ঝুলছে পেয়ারা।  কত রঙের ফুল ফুটেছে। 

আমার মনে ভাবনা এল, এই পেয়ারাগাছটি যিনি কিনে নেবেন, প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় গাছটির গোড়ায় পানি ঢালতে ভুলে যাবেন না তো? তারপর তিনি যখন পরিবার নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাবেন, দু-চার দিনের জন্য, গাছটির যত্ন করার জন্য কাউকে বলে যাবেন তো।  যদি তিনি ভুলে যান! কী হবে গাছটির বা এই কচি পেয়ারাগুলোর।  যা-ই হোক, যিনি কিনবেন, তিনি যেন বাড়িতে নিয়ে গাছটিকে আলোয় রাখেন।  খাদ্য তৈরির জন্য সূর্যের আলো প্রয়োজন হবে গাছটির। 

দোয়েল চত্বরে পৌঁছানোর আগেই মুঠোফোনে টিকটিক শব্দ।  বন্ধু মানুর মেসেজ।  বইমেলায় আসতে পারছে না।  পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে গবেষণায় ব্যস্ত।  নতুন ডকুমেন্টারির প্রস্তুতি।  আমি আর কী করি! যাই তবে শম্পা-শামীমের বাসায়। 

ওরা সদ্যবিবাহিত দম্পতি।  আমি আশা করেছিলাম, ওরা এমন একটি বাড়িতে থাকবে, বাড়িটি হবে একতলা।  যখন ওদের বাচ্চা-কাচ্চা হবে, তখন নাহয় দোতলা-তিনতলা করবে।  এখন একতলাই ভালো।  বাড়ির ডান দিকে থাকবে দুটি পেঁপেগাছ।  তাতে সারা বছর পেঁপে ধরবে।  পাখিতে খাবে, ওরাও খাবে।  পাখিতে খেয়ে ফুটো করে দেওয়ার পর ওরা বুঝতে পারবে, পেঁপেটি পেকেছে।  সামনে একচিলতে ফাঁকা জায়গা থাকবে।  সেখানে একটি বেতের টেবিল, সঙ্গে দুটি চেয়ার।  শামীম এসে বসার পর শম্পা চায়ের কাপ হাতে পাশে বসবে।  আর অমনি শামীম বকা দিয়ে বলবে, তুমি এখানে বসলা কেন! সব কাজ শেষ? শম্পার হাসি মিলিয়ে যাওয়ার আগেই শামীম বলবে, আচ্ছা ঠিক আছে, এসেছ যখন বসো।  তবে শুনে রাখো, ন্যাকামি আমি একদম পছন্দ করি না।  তারপর শামীম নিজের ঘন কালো চুলের মাথাটি এগিয়ে দিয়ে বলবে, খুব চুলকাচ্ছে, দেখো তো কোনো চুলটুল পাকল কি না।  ঠিক তখনই শম্পা ঝামটা মেরে জবাব দেবে, যাও ভাগো, ন্যাকামি আমি একদম পছন্দ করি না।  আর তখনই মিনুর মা ভেতর থেকে ডাক দেবে, ‘ভাইসাব আসেন।  বাথরুমে গরম পানি দেওয়া হইছে। ’

শম্পা আর শামীমের বাড়িতে পুকুর থাকার দরকার নেই।  আর এত জায়গাও নেই বাড়িতে।  বেশি ফুলের গাছেরও বা কী প্রয়োজন।  দরকার নেই গোলাপের।  দরকার নেই গন্ধরাজের।  রাতের বেলা সাপ আসে গন্ধ শুঁকতে।  সাপ খুব ভয় পায় ওরা দুজনই।  শম্পা তো তেলাপোকা, গুবরে পোকা—সব পোকাকে ভয় পায়।  কয়েকটি বেলিগাছ আর কামিনী থাকলেই যথেষ্ট।  থাকতে পারে একটা বুড়ো শিউলিগাছও। 

এই তো সামান্য চাওয়া।  ওদের বাড়ি থেকে বাজারটা বেশি দূরে না হওয়াই ভালো।  শামীম সকাল-সকাল গিয়ে কাঁচাবাজার, সবজি তাজা দেখে কিনে আনতে পারবে।  মাঝেমধ্যে নাহয় শম্পাও যাবে।  নিজের পছন্দমতো একটি-দুটি আইটেম কিনে আনবে।  দোকানদার যা দাম চাইবে, শম্পা তা-ই দিয়ে আসবে না; দামদর করবে।  যদি কিছু টাকা বাঁচাতে পারে, শামীম নিশ্চয়ই খুশি হবে। 

কিন্তু ওরা আমাকে যে ঠিকানা দিল, তাতে তো আমার ভাবনায় যে বাড়ি আমি বানিয়েছি, তার সঙ্গে মিল হচ্ছে না।  সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির কাছাকাছি একটি ফ্ল্যাটে ওদের নতুন সংসার।  আমি নিশ্চিত, ওরা এখনো পৌঁছাতে পারেনি।  তাহলে আমি বরং আগেই চলে যাই।  এ তো দেখছি গগনচুম্বী ভবন।  নিচ থেকে তাকালে মনে হয়, ভবনটা যেন ওপরের দিকে বেশ বাঁকানো।  আমার ভীষণ ভয় হয়।  নিচে গাড়ি রাখার বিরাট জায়গা।  অন্তত শ খানেক গাড়ি তো ধরবেই এখানে।  তিন জন সিকিউরিটি গার্ড বসে আছেন।  একজন এই ভর বিকেলবেলা ঝিমুচ্ছেন।  বাকি দুজনের মনে হয় ডিউটি কেবল শুরু হলো।  আমাকে তারা কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না।  ১৭ তলায় কেমনে উঠব।  লিফট তো আছেই, আবার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না।  এ হাঁটার অভ্যাস আমার ভালোই আছে। 

সিঁড়ি বেয়েই উঠলাম।  একটা ব্যাপার বেশ ভালো লাগল।  সিঁড়িগুলো বেশ ধোয়ামোছা।  প্রথম দু-তিনতলায় সারি সারি টব।  দুই দিন পরপর নাকি এই টবগুলো পরিবর্তন করা হয়।  ভালো উদ্যোগ।  গাছগুলো রোদের আলো পেলেই হলো।  শামীম আর শম্পার ফ্ল্যাটে বিরাট তালা।  কোনটা ওদের ফ্ল্যাট, চিনতে অসুবিধা হলো না।  কারণ, নাম লেখা রয়েছে। 

আমি ভেতরে গিয়ে বসলাম।  বাহ্, বেশ ভালো।  সাজানো-গোছানো।  আমি ড্রয়িং রুমে বসি।  বেশ চায়ের তৃষ্ণা পেল আমার।  ওদের রান্নাঘরে যাব কি? জিনিসপত্র থাকলে চা বানিয়ে খেতে আর অসুবিধা কী।  দুধ, চিনি আর টি-ব্যাগ পেলেই তো হলো।  আবার ভাবছিলাম, একে তো ওরা বাসায় নেই।  এর মধ্যেই এসে পড়েছি।  আবার নিজে গিয়ে চুলা জ্বালিয়ে জিনিসপত্র ঘেঁটে চা বানিয়ে খাব? কিন্তু নেশাটা এমন বেশি পেয়ে বসেছে, রান্নাঘরে না গিয়েও পারছি না।  শেষ পর্যন্ত রান্নাঘরে গেলাম।  বেশ বড়সড় না হলেও গোছানো রান্নাঘর।  চায়ের কেটলি খুঁজে পেয়েছি।  আগে চুলা জ্বালাই।  তারপর কেটলিতে সামান্য পানি দিয়ে বসিয়ে দেবো।  পানি বেশি দেওয়ার দরকার হবে না।  কারণ, চা তো খাব আমি একা।  ওরা কখন আসে না আসে! পানি ফুটে গেছে।  বলক এসেছে।  তো এবার পাতি ঢেলে দিই।  আমি একটু কড়া চা খাই।  তবে পাতি বেশি পড়লে আবার চা তিতা হয়ে যায়। 

ছোটবেলায় আমি চা বানিয়ে বড় কাপের নিচে পিরিচ দিয়ে আব্বাকে দিতাম।  আব্বা প্রায় দিনই মুখে নিয়ে বলতেন, কী বানিয়েছিস, থুথু, তিতা।  এখন অবশ্য অনেকেই আমার চায়ের তারিফ করে।  এখন আব্বাকে দিলে আব্বা বলবেন, খুব ভালো হয়েছে, রাতে আরেক কাপ দিস। 

যে-ই আমি চা বানিয়ে নিয়ে সোফায় বসেছি, অমনি শামীম আর শম্পা খলবল করে ঘরে ঢুকল।  এ বাসায় আর কেউ থাকে না।  ওরা দুজনই।  সে তুলনায় বাসাটা বেশ বড়ই।  দুটি বড় বড় ঘর।  একটা বড় বারান্দা।  আলো-হাওয়ায় ভরপুর। 

শম্পা বেশ লম্বা মতোন মেয়ে।  হালকা বলা যাবে না।  বেশ একহারা গড়ন।  বিয়ের পরে সাধারণত মেয়েরা একটু মুটিয়ে যায়।  শম্পার তেমন না হলেই ভালো।  একবার শরীর ভারী হয়ে গেলে কমানো বেশ মুশকিল।  বেশ ভালো বউ পেয়েছে শামীম।  শামীমও স্বাস্থ্যবান।  শ্যামলা মতো চেহারা।  উচ্চতা মাঝারি।  শম্পার চেয়ে ইঞ্চি দুয়েক বেশি হবে।  সেই হিসেবে শম্পাও ভালো বর পেয়েছে বলতে হবে। 

ঘরে ঢুকেই টিভি অন করল শামীম।  ক্রিকেট খেলা চলছে।  ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ।  টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল।  চার-ছক্কা হাঁকানোর আগেই আউট হয়ে গেলেন ক্রিস গেইল। 

শম্পা ভেতরের কক্ষ থেকে শামীমকে ডাকছে।  কিন্তু শামীম ক্রিকেটে মগ্ন।  গলার চেইনটা খুলতে পারছে না শম্পা।  দুই হাত পেছনে নিয়ে কয়েকবার চেষ্টা করে।  কিন্তু আজ হাতটা যেন অনেক ভারী।  পেছনে গেলেও সঠিক জায়গাটা খুঁজে পাচ্ছে না।  আয়নার সামনে দাঁড়িয়েও চেষ্টা করেছে।  কিন্তু পারেনি।  এখন দুটি উপায় আছে।  শামীম যদি একটা ছোট আয়নায় পেছনের দৃশ্য সামনে মেলে ধরে, তবে শম্পা হয়তো এ জট খুলতে পারবে।  অথবা শামীম নিজেই খুলে দিতে পারে।  এখন সে কীভাবে সাহায্য করবে, এটা তার ব্যাপার। 

‘আচ্ছা, আসছি বাবা’ বলে ভেতরের রুমে যায় শামীম।  আমি এই ড্রয়িং রুমে বসে দেখতে পাই, চেইন খোলার সময় শামীম শম্পার ফোলা ফোলা নরম মসৃণ পিঠে ছোট ছোট কামড় বসায়। 

‘এই ডাকাত, সরো।  ডাকাতি করার জন্য তোমাকে ডেকেছি এই সন্ধ্যায়?’

‘আহ্, খুলছি তো!’

‘তাড়াতাড়ি করো।  চা বানাতে হবে। ’

‘জোরাজুরি করলে ভেঙে যেতে পারে।  ভালো করে দেখে কাজটা করতে হবে। ’

‘আজ রাতে কী খাবে?’

‘তুমি যা খাওয়াবে। ’

‘যা-ই খাও, করতে হবে তো আমাকে। ’

‘রেডি করা কিছুই নেই, যা এখনই খাওয়া যাবে। ’

‘দুজনই বাইরে ছিলাম, কখন খাবার রেডি করে রাখলাম। ’

‘না, মানে এমন কিছু খাবার আছে না, যা সব সময় রেডি থাকে, যেকোনো সময় খাওয়া যায়। ’

‘যেমন?’

‘এই যেমন বিস্কুট, টোস্ট, কেক, পিনাটস। 

‘এগুলো খেয়ে তো পেট ভরবে না।  রাতও কাটবে না। ’

‘তুমি ঠিকই বলেছ।  তবে মানুষের খিদে জিনিসটা তো হঠাত্ করে আসে।  তাই একটা কিছু খাওয়া তো লাগেই। ’

শম্পার একটা স্বভাব হলো, বারবার ঘর মোছা।  হাতে সময় থাক বা না থাক, ঘর ঝাঁট দেওয়ার পর নিজেই মুছতে শুরু করবে।  আজও তা-ই করল। 

আমি চা বানানোর পর কেটলি, হাঁড়ি ধুয়ে রেখেছিলাম কি না মনে করতে পারলাম না।  যা-ই হোক শম্পা হয়তো ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি।  নিজের বিছানাপত্র, ঘর, বারান্দা, দেয়াল, ব্যালকনি—সব সাফসুতরো রাখতে চায় শম্পা, এটুকু বুঝলাম।  কোথাও এতটুকু নোংরা ও দেখতে পারে না।  গা রি রি করে। 

শামীমও দারুণ একটা ছেলে।  ঘরের কাজে খুব একটা হেল্প করতে পারে না যদিও—এই যে এখন যেমন শম্পা ঘরে ঢুকেই চা বসিয়ে ঘরদোর সাফ করতে বসে গেছে।  আর শামীম সোফায় আধশোয়া হয়ে ক্রিকেটে মগ্ন।  হাতে ওর দামি স্মার্টফোন। 

আমার তো ওদের নতুন সংসারের কাণ্ডকারখানা দেখতে দারুণ লাগছে।  অবশ্য শামীমের একটা বিশেষ কাজ হলো আউটডোর প্ল্যানিং।  সপ্তাহে না পারলেও মাসে অন্তত দুই বার ওরা ঘুরতে যাবে।  ঢাকার মধ্যে বা আশপাশে।  একই জায়গায় একাধিকবার যেতে হলেও ওদের আপত্তি নেই।  শম্পা মনে করে, প্রতিবারই নতুনভাবে জায়গাটিকে জানা হয়। 

অবশ্য সেই নতুনত্ব হয়তো সবার কাছে ধরা পড়ে না।  কারও কারও কাছে ধরা পড়ে।  নতুন কিছু দেখার চোখও সবার থাকে না।  এ ব্যাপারে শম্পার সঙ্গে শামীমও একমত।  কোথাও একটা জায়গায় গেলাম।  ধুমধাম করে একটি গাড়ি নিয়ে সাইটসিংগুলো দেখে নিলাম।  ছবি তুললাম, ফেসবুকে শেয়ার করলাম।  এই তো।  এ রকম ট্যুর ওদের দুজনেরই অপছন্দ।  এই তো গত সপ্তাহে ওরা হবিগঞ্জ শহরে বেড়িয়ে এল।  বন্ধুরা কেউ কেউ বলেছিল, ওখানে যাস না।  বিশেষ কিছু দেখার নেই ওই শহরে।  কিন্তু ওরা গিয়েছিল।  বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি বসে ছিল খোয়াই নদীর তীরে।  মনু আর খোয়াই দুই বোন।  মনু বড়, খোয়াই ছোট।  যৌবনের কিছুটা এখনো নিজের সঙ্গে রাখতে পেরেছে মনু।  খোয়াই পারেনি।  অনেকটা লাইফ সাপোর্টে। 

বেশি ছবি তোলা একদম পছন্দ করে না শম্পা।  শামীম জোরাজুরি করলে দু-একটা।  তবে, সেটা অবশ্যই পোজ দেওয়া যাবে না।  দেখা বা বলার ফাঁকে তুলে নিলেই হলো।  আমি উঁকি দিয়ে দেখলাম মুঠোফোন থেকে কী যেন ডায়েরিতে টুকে নিচ্ছে শামীম।  রওনা, যাত্রাবিরতি, পৌঁছানো, পাশে সময় লেখা।  এটা দেখে আমার বুঝতে বাকি রইল না যে নতুন কোনো ট্যুর প্ল্যান করছে শামীম। 

‘এই যা’—ধুম করে উঠে পড়ল শম্পা।  ‘চা যে চুলায় একবার তো মনে করতে পারো।  দেখো তো পানি শুকিয়ে কী হলো। ’

‘স্যরি, আমি তো এদিকে ব্যস্ত।  খেয়াল করতে পারিনি। ’ আত্মসমর্পণ করলে কিছু বলার থাকে না।  শম্পাও কিছু বলতে পারল না। 

আমার সত্যিই মজা লাগছিল ওদের কাণ্ড দেখে।  খুব আনন্দ পাচ্ছিলাম।  ভাবছিলাম, সবে তো এক মাস।  যৌথ জীবনের কেবল শুরু।  তরুণ বয়সের একটি ছেলে, তরুণ বয়সের একটি মেয়ে।  কয়েক মাস বা কয়েক বছর পরে হয়তো ওদের সন্তানাদি হবে।  একটি বা দুটি।  এর বেশিও হতে পারে।  যেমন আমার বন্ধু মিলনের তিনটি মেয়ে।  শেষ দুটি যমজ। 

হঠাত্ আমার কী যে হলো, আমি শম্পার কোলে একটি শিশুকে দেখলাম।  নিজেকে আড়াল করে সন্তানকে স্তন্য দিচ্ছে শম্পা।  না, এ আমার ভুল।  এক মাস মাত্র বিয়ে হয়েছে।  বাচ্চা কোথায় পাবে। 

আচ্ছা শম্পা যদি শামীমকে বিয়ে না করে অন্য কাউকে করত, তাহলে কী হতো! অথবা শামীম যদি অন্য কোনো মেয়েকে করত? কী হতো!

রাত তো অনেক হলো।  অনেকক্ষণ ধরে ওদের ঘরে বসে আছি।  ওরা নবদম্পতি।  অনাহূতের মতো এভাবে বসে থাকা ঠিক নয়।  তা ছাড়া ওরা এখন দরজা বন্ধ করে শুতে যাবে।  আমি একা একা এখানে বসে থেকে কী করব।  তার চেয়ে বরং চলে যাই। 

শেষবারের মতো আমি ওদের ঘরের দিকে তাকালাম।  বেশ একধরনের প্রশান্তির অনুভূতি হলো আমার।  সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসার সময় টবে যে সতেজ গাছগুলোকে দেখেছিলাম, সেগুলোকে বেশ ফ্যাকাশে মনে হলো; যেন অনেক দিন একটা ফোঁটা পানি পড়েনি।  বুকের ভেতর কে যেন কামড় দিল।  চিন চিন ব্যথা অনুভব করলাম। 

২.

বইমেলায় বেশ ঘোরাঘুরি হলো।  লাইনে দাঁড়িয়ে অটোগ্রাফ নিলাম জাফর ইকবাল স্যারের।  বইকেনা হলো বেশ কয়েকটি।  বাংলা টু বাংলা ডিকশনারি।  মানু না এলে তো এতক্ষণ ঘোরাঘুরি হতো না। 

রাতে বাসায় ফেরামাত্রই বউয়ের ঝাড়ি।  তোমার মোবাইল কই? কোথায় ফেলে রেখে এসেছ?

‘আরে বলো কি!’ পকেটে হাত দিলাম।  ফোন নেই। 

আজ মেলায় ভিড় ছিল বটে।  কিন্তু ফোন খোয়া যাবে, এমন হওয়ার কথা নয়। 

ঠিক তখনই আমার ফোন থেকে বউয়ের ফোনে ফোন এল।  বউ ফোন ধরলে ওপাশ থেকে শম্পা বলল, ‘ভাবি ভাইয়া ফোনটা রেখে গেছেন আমাদের বাসায়।  ভাইয়াকে বলবেন সকালে এসে নিয়ে যেতে। ’

বউ আমার দিকে বক্র চোখে তাকালেন।  কিন্তু আমি কোনোভাবেই মনে করতে পারলাম না, কবে কখন শম্পা-শামীমদের বাসায় গিয়েছিলাম। 

সম্পাদনায় : রফিকুল ইসলাম-৬, এসএনএন২৪.কম


keya