২:৫১ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০




জোটের রাজনীতি, আসন্ন নির্বাচন ও বিএনপির দায়

২৫ অক্টোবর ২০১৮, ০৯:৩৪ এএম | মাসুম


এসএনএন২৪.কম : দেশে নির্বাচন আসন্ন।  এখন সময় সুস্থ নির্বাচনী প্রতিযোগিতার, রাজনৈতিক দলগুলোর এখন ভোটার মনোরঞ্জনে কাজ করার কথা, এ লক্ষ্যে নতুন নতুন কৌশল প্রণয়নের কথা।  অথচ দলগুলো ব্যস্ত জোট গঠন ও ভাঙনে—যা আরও অনেক আগে হতে পারত।  একটি দেশে অনেক ছোট দল থাকা, দল ভাঙা, নতুন নতুন দল গড়া, জোট গঠন করা, পাল্টা জোট গঠন করা ইত্যাদি রাজনীতি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মোটেই সুস্থ রাজনীতি ব্যবস্থার লক্ষণ নয়। 

নির্বাচনের ঠিক আগে এ ধরনের জোটের ভাঙা-গড়া একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার লক্ষণ প্রকাশ করে।  আসলে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা অথবা অল্পসংখ্যক দল থাকে। 

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়।  একটি হচ্ছে, বিরাজনীতি বা দেশে সুস্থ রাজনীতি চর্চার অভাব; আর অন্যটি হচ্ছে, এমন একধরনের শাসনব্যবস্থা, যা প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজের ভাষায়, ‘আপাতদৃষ্টে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করা হলেও তা যে বড়জোর দৃশ্যত গণতান্ত্রিক, কিন্তু মর্মবস্তুর দিক থেকে কর্তৃত্ববাদ...। 

এ ধরনের শাসনকে গণতন্ত্র-বিষয়ক গবেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা “হাইব্রিড রেজিম” বা দো-আঁশলা ব্যবস্থা বলে বর্ণনা করে থাকেন, যার প্রধান ভিত্তি হচ্ছে বলপ্রয়োগ। ’ এর একটি অন্যটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। 

আগামী মাসে দেশে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা হতে পারে।  এ নির্বাচন সম্পর্কে আপাতদৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের নির্বাচনী প্রস্তুতি এখনো প্রতিভাত হচ্ছে না।  বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি যাবে না, সে বিষয়ে দলটির নেতা-কর্মী, রাজনীতি বিশ্লেষক এবং সাধারণ জনগণ পুরোপুরি অন্ধকারে আছে বলে মনে হচ্ছে।  বলা বাহুল্য, বিএনপি নির্বাচনের বাইরে থাকলে তা হবে আওয়ামী লীগের জন্য চরম আনন্দের খবর। 

সরকারের কৌশল হচ্ছে, হামলা-মামলায় বিএনপিকে পর্যুদস্ত করে রাখা।  লক্ষণীয়ভাবে তীব্রতা বাড়লেও এ ধরনের হামলা–মামলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো কৌশল নয়।  বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালেও আওয়ামী লীগকে এ ধরনের সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়েছে।  এমনকি ২১ আগস্টের মতো ভয়াল ঘটনারও সম্মুখীন হতে হয়েছিল দলটিকে।  তারপরও আওয়ামী লীগ সমস্যার মোকাবিলা করতে সম্মুখীন হয়েছিল।  কিন্তু মনে হচ্ছে, বিএনপি কোনোভাবেই সমস্যার মোকাবিলা করতে পারছে না।  প্রশ্ন হলো কেন নয়?

১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং পরবর্তী সময়ে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল, তখন আওয়ামী লীগের রাজনীতি লক্ষ করলে দেখা যাবে যে দলটির রাজনীতির মূল উপজীব্য বিষয় ছিল ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা।  শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা হিসেবে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে তাঁর রাজনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের ‘ভোট ও ভাতের অধিকার’ সুনিশ্চিত করা।  অন্যদিকে গত প্রায় এক যুগ ধরে বিরোধী দলে থাকা বিএনপি শুরুতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করলেও এটা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে যে তারা আসলে জনগণের ভোটের অধিকারের জন্য আন্দোলন করছে।  এখন দলটির রাজনীতি পুরোপুরি পরিবারকেন্দ্রিক এবং দলটির দাবিদাওয়া পরিবার ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।  যেমন দলটির নেতারা নির্বাচনের চেয়েও দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে বেশি আগ্রহী। 

তাঁরা প্রকাশ্যে দাবি করছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া বিএনপি কোনোভাবেই নির্বাচনে যাবে না।  একটি জাতীয় রাজনৈতিক দল যার ঐতিহ্য আছে, একাধিকবার গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকার গঠন করা এবং যে দলটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল; সে রকম একটি দলের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অবশ্যই গণতন্ত্রের জন্য কাজ করা।  কেবল পরিবারের সদস্যদের মুক্তি অথবা দণ্ডপ্রাপ্ত নেতার নেতৃত্ব ধরে রাখার মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক দলের গুণগত মান নিম্নমুখী হয়ে পড়ে।  নানাবিধ কারণে সম্প্রতি দলটির দাবিদাওয়ার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।  বিগত চার বছর জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে অথবা ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে দলটির কোনো কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি। 

একটি রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কেমন হবে, তা কেবল সরকারের ওপর নির্ভর করে না।  দমন–পীড়ন, ক্ষমতা দখল করে রাখা রাষ্ট্র ও সরকারের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।  এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য দেশে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দায় অনেক।  পাশাপাশি দেশের সুশীল সমাজের দায়ও কম নয়।  কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, গত দুই দশকে দেশের সুশীল সমাজ যেমন ব্যর্থ হয়েছে রাজনীতিকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে, ঠিক একই রকমভাবে ব্যর্থ হয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। 

একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন যেকোনো দেশে যেকোনো ক্ষমতাসীন দলের জন্য আতঙ্কের কারণ।  সংগত কারণেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ চাইবে না, বিএনপি নির্বাচনে আসুক।  কিন্তু বিএনপির অস্তিত্বের স্বার্থে আর দেশের ক্ষয়িষ্ণু গণতান্ত্রের স্বার্থে নির্বাচন বর্জনের কোনো সুযোগ নেই।  সম্ভবত এ ব্যাপারে কেউ ভিন্নমত পোষণ করবে না যে ২০১৪ সালে নির্বাচনে অংশ না নেওয়া বিএনপির একটি বড় ভুল ছিল।  এ ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তির ব্যাপারে বিএনপির উচিত সতর্ক হওয়া। 

কিন্তু জাতীয় নির্বাচন এত সন্নিকটে যে হঠাৎ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিলেও বিএনপির পক্ষে ভালো কিছু করা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়বে।  খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপি কীভাবে দলীয় মনোনয়ন দেবে, তা পরিষ্কার নয়।  নির্বাচনী প্রচারণায়ই–বা কে নেতৃত্ব দেবে? বিএনপি কার্যত এখন নেতৃত্বহীন একটি দল।  খালেদা জিয়া কারাবন্দী ও অসুস্থ আর অন্যদিকে তারেক জিয়া দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি।  এ সংকটে নির্বাচনের মতো জটিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মতো দলীয় নেতৃত্ব দলটিতে নেই।  কিন্তু এ সংকট থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র উপায় হলো দলকে নির্বাচনমুখী করা। 

বড় বড় সভা-সমাবেশের বদলে নেতা-কর্মীদের ভোটারদের কাছে পাঠানো দরকার।  নিজেদের দলের সাফাই গাওয়ার চেয়ে ভোটারদের কেন ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে, সে বিষয়ে প্রচারণা চালানো দরকার।  নতুন ধারার রাজনীতি চালু করা দরকার, যার মূল ভিত্তি হতে পারে জনকল্যাণ, সুশাসন তথা জনগণের মুক্তির রাজনীতি।  বিএনপি যদি পরিবর্তন চায়, তাহলে পরিবারের বাইরে এসে জনগণের জন্য দলীয় রাজনীত উন্মুক্ত করতে হবে।  দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। 

অন্যথায় দেশে আজকের মতো ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ থাকবে যাতে বিএনপি ‘অস্তিত্বের সংকটে’ পড়লে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।  দেশের বর্তমান ধারার রাজনীতির পরিবর্তনে বিএনপির দায় অনেক।  কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি আসলেই জন–দাবির গুরুত্ব উপলব্ধি করে?

লেখক : ড. মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম, অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি–বিষয়ক গবেষক।