৯:০১ পিএম, ২২ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার | | ২২ সফর ১৪৪১




জনপ্রিয় হয়ে যাওয়াটা এখন সম্ভবই না: ইমদাদুল হক মিলন

৩০ নভেম্বর -০০০১, ১২:০০ এএম | মোহাম্মদ হেলাল


এসএনএন২৪.কম ডেস্ক : বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলন।  দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে গল্প, উপন্যাস, নাটকে বাংলাদেশের গদ্যপ্রতিভায় আসামান্য স্বাক্ষর রেখে চলেছেন এই কথাকার।  তার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে এসেছে সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ বাংলা ও বাঙালির নানান চিন্তা-গভীরতা।  সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি সঞ্জয় ঘোষ

আপনার ব্যক্তি ও পরিবার জীবন নিয়ে বহুবার বহু জায়গায় কথা বলেছেন।  সেসবের বাইরে নতুন কিছু জানতে চাই আজ।  আপনি সব সময় বলেন, লেখক জীবনের শুরুতে আপনার চিন্তাই ছিল জনপ্রিয় হবেন এবং হয়েছেনও।  তার মানে, কী করে জনপ্রিয় হতে হয় তা আপনি জানেন।  কীভাবে জনপ্রিয় হওয়া যায়?

এখনকার সঙ্গে ব্যাপারটা কতটা মিলবে, তা জানি না।  যখন শুরু করলাম, ধর ১৯৭৩ সালের দিকে তো শুরু করলাম।  তারপরও দু-তিন-চার বছর আমাকে ভাবতে হলো, আমি কোনদিকে যাব লেখক হিসেবে।  সাহিত্য ব্যাপারটা কী, কেমন লেখা উচিত, একজন লেখকের চিন্তা-চেতনা কোন পর্যায়ের হতে পারে; এবং তার জীবনের দৃষ্টিকোণটা কেমন, কোথায় সে পৌঁছাতে চায়, এ রকম কিছু চিন্তাতো লেখকদের থাকে।  কিন্তু আমি তখন পর্যন্ত এ জিনিসগুলো ভাবিনি।  আমার শুধু তখন মনে হতো, পত্র-পত্রিকায় ছাপার অরে আমি আমার নামটা দেখব এই লোভেই আমি দীর্ঘদিন লিখেছি।  সাহিত্য কী, কেমন সেগুলো আমার মাথায় আসেনি। 
কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে পঁচাত্তর-ছিয়াত্তরের দিকে আমার মনে হলো, একটা লেখকের কাজ তো এটা হতে পারে না! যে, সে কেবল পরিকল্পনাহীন লিখে যাবে।  কিংবা খবরের কাগজে যেনতেনভাবে লেখার সাথে তার নামটা ছাপা হবে এটাও লেখকের চিন্তা হতে পারে না।  সেই সময়ে আমি দু’রকম করে ভাবতে শুরু করলাম।  এবং ভাবার সাথে সাথে আমি পড়াশোনার মধ্যেও ঢুকেছি।  অন্তত বাংলা সাহিত্যটা কী, কেমন, কারা বড় লেখক এসব দেখতে শুরু করেছি। 

রফিক আজাদের সঙ্গে ততদিনে পরিচয় হয়ে গেছে

হ্যাঁ।  সে বিষয়ে পরে আসছি।  তো সেই চিন্তাভাবনা আর পড়াশোনার সাথে লেখায়ও একটা পরিবর্তন আনতে পারছি।  একজন ভালো বা প্রকৃত লেখক একটু জীবনঘেঁষা হবেন, এটাই স্বাভাবিক।  তিনি মানুষের জীবনের কথা বলবেন, সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনার কথা বলবেন; রাষ্ট্রের কথা বলবেন। 
এর আগেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়ে গেছে।  মুক্তিযুদ্ধের মতো এত বড় একটা বিষয় আমার হাতে আছে।  আমি গ্রামে জীবন কাটিয়েছি।  গ্রামের মানুষদের দেখেছি এই যে অবস্থা, এটা তো আমার লেখায় আসতে পারে।  এসব ভেবে ভেবে, কিছুটা প্রস্তুতি আমার ভেতরে চলতে লাগল।  আমি দু-একটা গল্প লিখলাম গ্রাম-জীবন নিয়ে, যেগুলো একটু অন্য রকমের লেখা।  পাশাপাশি এটাও আমার মাথায় আছে, আমি একজন জনপ্রিয় লেখক হতে চাই।  লেখকের জনপ্রিয়তা মানে হলো তার লেখা বেরোলে অনেক মানুষ পড়বে, লেখা নিয়ে মানুষ কথা বলবে বা পাঠক উদ্বেলিত হবে।  সেটার জন্য কী করণীয়? প্রথমেই ভাবলাম, আমাদের দেশে গল্প-উপন্যাস বা বই কারা পড়ে! শুরুতেই মনে হলো, ছাত্রদের মধ্যে একটা বিশাল শ্রেণি আছে যারা পড়ে; গৃহবধূরাও পড়ে।  তাদের মনোযোগ আকর্ষণে আমার কী ধরনের গল্প লেখা উচিত? তো তরুণদের নিয়ে যখন আমি ভাবলাম তাদের স্বপ্ন, আকাঙ্খা, সংকট; তাদের প্রেম-ভালোবাসা গল্পে আসা উচিত।  আমি সে রকমই একটা অবস্থা তৈরি করলাম।  ফলে এক ধরনের রোমান্টিক গল্প লিখতে শুরু করলাম।  আমি প্রেমের গল্প লিখতে শুরু করলাম।  প্রেমের গল্পগুলোতে একটা সর্বজনীনতা আছে।  সব শ্রেণির পাঠক প্রেমের গল্পের প্রতি একটু ঝুঁকে থাকে।  একজন বয়স্ক পাঠকও প্রেমের গল্প পড়ে হয়তো ভাববে আমিও তো এমন একটা জীবন কাটিয়ে এসেছি! একজন গৃহবধূর মনে একটা দোলা লাগবে।  একজন তরুণী বা একজন যুবকের মনে একটু দোলা লাগবে।  আমি এই নিয়ে লিখতে শুরু করলাম।  একেবারে সেই সময়কার ধর পঁচাত্তর-ছিয়াত্তর-সাতাত্তর; ঐ সময়কার তরুণদের জীবন-যাপনটা আমি ধরার চেষ্টা করলাম।  এবং আমার বয়সটাকে আমি আমার লেখাতে নিয়ে আসার চেষ্টা করলাম।  আমার বয়সী যারা, তাদের যেন লেখাগুলো ভালো লাগে।  যাতে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে।  লেখাগুলো যেন সবাই পড়ে। 
এসব করে যখন আগাচ্ছিলাম, ঠিক সেই সময়েই রফিক আজাদের সাথে আমার পরিচয়।  রফিক আজাদ আমার চিন্তার জগৎটাকে বদলে দিলেন।  একজন লেখক শুধু প্রেমের গল্প লিখবে এটা তো হতে পারে না!

হ্যাঁ, সেসব বিষয়ে আসব তবে মূল প্রশ্নটা ছিল আপনি ভেবেছেন জনপ্রিয় হবেন, লিখেছেন এবং সত্যি জনপ্রিয় হতে পেরেছেন।  সেই সফলতার সূত্রগুলো আসলে কী? এই সময়ে দাঁড়িয়ে কী মনে হয়?

হুম্, এ বিষয়ে যদি আরও একটু ব্যাখ্যা করি ধর, আমার সময়ে জীবনাচরণ, বিশেষ করে তরুণ সমাজের যে চিন্তা-চেতনা ছিল, এখনকার সময়টা কিন্তু সে রকম না।  আমি যেভাবে জনপ্রিয় হওয়ার কথা ভেবেছি এবং কিছুটা অর্জন করেছি; এখনকার লেখকরা সেভাবে কতটা পারবেন, সে জায়গাটাতে আমার একটুখানি দ্বিধা আছে।  কারণ হচ্ছে, সময়টা বদলেছে।  তরুণ শ্রেণির চিন্তা-ভাবনা, স্বপ্নের জগৎটা বদলেছে।  গৃহবধূদের চিন্তা বদলেছে।  সার্বিকভাবে সময় মানুষকে আনেকটা বদলে দিয়েছে। 

মানে এখনকার জনপ্রিয়তার চিন্তা, কৌশল একেবারেই অন্য রকম হয়ে গেছে। 

একেবারেই তাই।  আমি সেটাই বোঝাতে চাচ্ছিলাম যে, আমি যেভাবে শুরু করেছিলাম, সেভাবে সময়ই এখন শুরু করতে দেবে না।  যেমন, আমার সময়ে একটি মেয়ের সাথে একটি ছেলের কথা বলাই খুব কঠিন ব্যাপার।  তাকে আমি বোঝাবো কী করে যে, তাকে আমার ভালো লাগে! এবং বহু মানুষেরই বাসায় তখন ফোন ছিল না।  ল্যান্ডফোন একটু উচ্চবিত্তদের বাড়িতে থাকত।  তারপর, আমি ফোন করলেই যে আমার মনের মানুষটি ধরবে, তাও না।  তাই আমাদের চিঠি লেখা ছাড়া উপায় ছিল না।  আবার সেই চিঠিও সেই মেয়েটার হাতে পৌঁছানো খুব জটিল ব্যাপার।  হয়তো তার বাড়ির কাজের মানুষটাকে পাঁচটা টাকা দিয়ে বলা যে, চিঠিটা পৌঁছে দিও।  এই যে জটিলতা ছিল, এখন তো অবস্থাটা তা না।  এখন যোগাযোগের অভাবনীয় এবং বাহারি সব মাধ্যম। 

সে সময়ের এসব জটিলতা ও উপাদান নিয়েই আপনি জনপ্রিয় হতে পেরেছেন।  তবে এখনকার লেখকরা যোগাযোগের এত সুবিধাজনক সময়ে দাঁড়িয়ে, এই সময়টাকে নিয়ে কতখানি জনপ্রিয় হতে পারছেন?

আসলে খুব চট করে জনপ্রিয় হয়ে যাওয়াটা এখন সম্ভবই না।  আমি যেভাবে এগিয়েছিলাম, সেভাবে এগোলেও এখন আর সম্ভব না।  এখনকার পরিপ্রেক্ষিতটাই বদলে গেছে।  পাঠকদের চিন্তা চেতনাও বদলে গেছে।  আগের মতোই এখনও অনেক লেখক লিখছেন।  কিন্তু সত্তরের দশকের লেখক হিসেবে আমি বা আমার কিছুটা আগে হুমায়ূন আহমেদ; বা আমার একটুখানি আগে জাফর ইকবাল।  জাফর ইকবাল জগৎটাই যদিও আলাদা; শুধু শিশু-কিশোরদের নিয়ে তিনি লেখেন, তার জায়গাটা ভিন্ন।  কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তার একটা বিশাল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন; বা আমিও দ্রুতভাবে কিছু পাঠক তৈরি করেছি।  আমরা যে পদ্ধতিতে গিয়েছিলাম, এখন সে পদ্ধতিতে এগিয়ে জনপ্রিয় হওয়া যাবে না।  এখনকার পুরো ব্যাপারটাই অন্য রকম।  এই সময়ের প্রজন্মকে ধরার জন্য ধর তাদের ফেসবুক, তাদের জীবন সে জীবনটার ভেতরে ঢোকা, তারা কী চায় সেটা ভেবে আগানো এই হচ্ছে আমার সময়ের সাথে ব্যবধান। 
তা তো অবশ্যই।  সময়কে ধারণ করতে না পারলে সে সময়ে দাঁড়িয়ে জনপ্রিয় হওয়াটাও কঠিন। 

আরেকটা ব্যাপার হলো, জনপ্রিয়তার আরও একটা দিক আছে।  আমরা যে সময়ে শুরু করলাম, সে সময়ে আমাদের হাতে একটা মাত্র টেলিভিশন চ্যানেল এবং গুটিকয়েক পত্রিকা।  কিন্তু এখনকার জগৎ তো বিস্তৃত।  আমরা, ধর, টেলিভিশনে হুমায়ুন আহমেদের আহমেদ বা ইমদাদুল হক মিলনের একটা নাটক হলে দর্শক যেন আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে বসে থাকত।  হুমায়ুন আহমেদের কোথাও কেউ নেই, এইসব দিনরাত্রি, অয়োময়, বহুব্রীহি বা আজ রবিবার এই যে নাটকগুলো; অথবা ধর, আমি সংশপ্তকের নাট্যরূপ দিয়েছিলাম বা আমার বারো রকম মানুষ এসব নাটক মানুষকে যে পর্যায়ে আলোড়িত করেছিল, এখনকার নাটকে সেসব সম্ভব না। 
 
যদিও উত্তরের কিছুটা আপনি বলেছেন; আমার প্রশ্ন হচ্ছে এখন তো সুযোগ অনেক বেশি, তবু কেন হচ্ছে না?

এখন সুযোগ বেশি বলেই কঠিন হয়ে গেছে ব্যাপারটা।  এ কারণে কঠিন হয়েছে যে, মানুষ নানা কিছু নিয়ে ব্যস্ত।  তরুণ সমাজ ফেসবুক-ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে গেছে; কম্পিউটার-টেলিভিশনের মাধ্যমে এখন সারাবিশ্বে হাতের মুঠোয় চলে এসেছে সেসব নিয়ে জীবনের অনেকটা সময় ব্যাস্ত থাকতে হচ্ছে।  মানুষের চাহিদা আগের চেয়ে বহুগুণ বিস্তৃত।  যেখানে আমাদের সময় পত্রপত্রিকা, বই ও টেলিভিশন আর তো কিছু ছিল না।  আর ছিল রেডিওর গান, নাটক।  সে জায়গাগুলো এখন তো আর সেভাবে নেই। 
তাহলে আমাদের জনপ্রিয়তার চিন্তাটাকেই কি বাদ দেওয়া উচিত? নাকি নতুনভাবে ভাবতে হবে?
অবশ্যই।  এই সময়ে যদি কোনো লেখক লিখে জনপ্রিয় হতে চান, তাকে খুবই অন্যরকমভাবে চিন্তাভাবনা করতে হবে।  আমার লেখা কেন পাঠক কিনবে, পড়বে সেটা গবেষণা করে তাকে বের করতে হবে।  চট করে শুধু লিখে জনপ্রিয় হয়ে যাওয়ার দিন শেষ। 
জনপ্রিয় সাহিত্যকে মানুষ একটু অন্যভাবে দেখে। 

অন্যভাবে মানে কী; একদম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে।  এটা একদম পরিষ্কার।  তবে কি জনপ্রিয় সাহিত্য শিল্পমানোত্তীর্ণ হতে পারে না?

আমি পৃথিবীর অন্য দেশের কথা বাদ দিলাম; বাংলা সাহিত্যেই অনেক জনপ্রিয় সাহিত্য কালোত্তীর্ণ হয়েছে।  তুমি কি দেবদাস উপন্যাসটিকে কালোত্তীর্ণ বলবে না! যেটা নিয়ে ছয়টা সিনেমা হয়েছে।  এবং বাঙালি জাতি কোনোদিন দেবদাস উপন্যাসটিকে ভুলবে না।  এমনকি গত একশ’ বছর ধরে তো বটেই, শরৎচন্দ্রের লেখাগুলো এখনও জনপ্রিয়তার তুঙ্গে।  শরৎচন্দ্রের চরিত্রহীন, পথের দাবী বা শ্রীকান্ত এসব উপন্যাসের ধারেকাছেও তো নেই দেবদাস।  দেবদাস হচ্ছে তার খুবই অবহেলায় লেখা, একেবারে সাদামাটা একটা প্রেমের গল্প।  তবু এটি বহু বহু বছর ধরে বাঙালিকে মোহিত করে রেখেছে এবং আরও করবে। 

তরুণদের জন্য লিখলেন, গৃহবধূদের জন্য লিখলেন।  তারা কী চায় সেটা জানতেন কীভাবে?

আসলে এটা আমার মনে হয়েছে।  তা ছাড়া আমার মা-খালাদের দেখতাম, তারা পাড়ার পাঠাগার থেকে বই এনে পড়ছে; শরৎচন্দ্রের বই পড়ছে।  বা যারা স্কুল-কলেজে পড়ে তারা বিভিন্ন লেখকের প্রেমের গল্প পড়ছে।  তখন সমরেশ বসু খুব জনপ্রিয়। 
এই যে এসব দেখে দেখে আমার মনে হয়েছে, প্রেমের উপন্যাস মানুষ পড়বেই।  দেবদাস মানুষ পড়বেই।  তাই আমি হিসেবটা করেছিলাম এই জায়গাতেই।  যে কারণে দীর্ঘদিন পর্যন্ত মানুষ বলত, ও তো শুধু প্রেমের গল্প লেখে।  আমার একটা দুর্নামই হয়ে গিয়েছিল প্রেমের গল্পের লেখক। 

আপনার লেখার প্রস্তুতিটা কখন কীভাবে হলো? পারিবারিক কোনো অনুপ্রেরণা?

না, আমার পরিবারের কেউ কোনোদিন সাহিত্য করেনি।  আমার গল্প বানানোর একটা প্রবণতা শুরু থেকেই ছিল।  মাওয়ার কাছে মেদিনীমণ্ডল গ্রামে নানীর কাছে যখন থাকতাম, আমার নানী বানিয়ে বানিয়ে অনেক গল্প বলতেন।  রূপকথার গল্পের বই থেকে পড়ে শোনাতেন।  সেখান থেকে আমার ভেতরে একটা গল্পের জগৎ তৈরি হলো এবং গল্প বানানোর একটা কৌশল হয়তো আমার নিজের মধ্যেও তৈরি হয়ে গিয়েছিল।  যার ফলে আমাদের বাড়িতে যখন একটা পা-ভাঙা বানর এসে বসত একটা দেয়ালে, আমার ভাইটা তাকে একটু খেতে দেয় এটুকুই তো একটা গল্প।  কিন্তু এটাকে বানানোও তো একটা বড় ব্যাপার।  সেই ব্যাপারটা তো তৈরি হয়েছিল। 

যে লেখক একদিন শুধু নাম ছাপা হওয়ার লোভে যেনতেনভাবে লেখা শুরু করেছিল, পরবর্তীকালে সে-ই এত গভীর অভিনিবেশ নিয়ে কীভাবে লিখতে শুরু করল?

আগেই কিছুটা বলেছি, একটা পর্যায়ে মনে হলো, একজন লেখক শুধু নাম ছাপানোর জন্য লিখতে পারে না।  শুধু লেখার জন্য লিখে যাবে এটা তো হতে পারে না।  তার একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকবে, লেখালেখিতে তার স্থায়ী একটা জায়গা করার ব্যাপার থাকবে।  তার লেখা পড়ে মানুষের চিন্তার একটা জায়গা তৈরি হবে।  এই জিনিসগুলো আমাকে ধরিয়ে দিতে লাগলেন রফিক আজাদ।  যার ফলে, ১৯৭৭ সালে আমার যে প্রথম বই ‘ভালোবাসার গল্প’ বেরুলো; বারোটা প্রেমের গল্প।  কিন্তু পরের বছর আমার দ্বিতীয় যে বইটি বেরুলো তার নাম ছিল ‘নিরন্নের কাল’।  তাহলে দেখ, একজন লেখকের প্রথম বইয়ের নাম যদি হয় ভালোবাসার গল্প, তার পরের বই ‘নিরন্নের কাল’ হয় কী করে! যারা ভালোবাসার গল্প বা হালকা চটুল ধরনের গল্প পড়বে, তারা তো নিরন্নের কাল কথাটার অর্থই বুঝবে না।  নিরন্নের কাল বইটা আবার একেবারেই গ্রামের নিরন্ন, খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের গল্প।  এই সময়ে একজন লেখক আমাকে খুব প্রভাবিত করেছে।  সেই লেখকের নাম সমরেশ বসু।  সমরেশ বসুর নাম আজকালকার পাঠক অনেকে মনে রাখেনি।  কিন্তু মানিক-তারাশঙ্কর-বিভূতি এই তিনজনের পরে সবচাইতে বড় বাঙালি লেখক মনে হয় সমরেশ বসু।  তিনি একাধারে প্রচুর চটুল লেখা লিখেছেন।  সেটা লিখেছেন তার জীবিকার জন্য।  আবার একাধারে গঙ্গা, বিবর, বিটি রোডের ধারে, বাঘিনী; তারও পরে তিনপুরুষ কিংবা বিজন বিভুঁই বা শিকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে, দেখিনাই ফিরে বা তাঁতিদের নিয়ে ‘টানাপোড়েন’ এই যে একজন লেখক নিজেকে দুটো ভাগে ভাগ করে ফেললেন; এই ব্যাপারটা আমার মধ্যে কাজ করেছিল।  সমরেশ বসু জীবন যাপন করতেন এমনভাবে যে, এক সময় তাকে ডিম বিক্রি করতে হয়েছে মাথায় করে।  একটা ফ্যাক্টরিতে তাকে কাজ করতে হয়েছে শ্রমিক হিসেবে।  তো এ রকম একজন মানুষ তার জীবনকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে জীবিকার জন্য যখন লিখছেন, তখন দু’রকম লেখা লিখছেন।  এক রকম চটুল লেখা লিখছেন, যেগুলো দিয়ে সিনেমা-নাটক হচ্ছে, প্রচুর পয়সা আসছে।  আবার তিনি গঙ্গাও লিখছেন।  তার গঙ্গা বিবর বা তার যে লেখাগুলোকে আমরা স্থায়ী লেখা মনে করি, এ লেখাগুলো তিনি লিখলেন তার লেখক-দায়িত্ব থেকে।  সমাজ, রাষ্ট্র আর মানবজীবনের প্রতি তার দায়িত্ব থেকে।  আর এটা একজন লেখকের থাকা উচিত।  এই সমরেশ বসু পড়তে পড়তে আমি বদলে গেলাম।  এবং রফিক আজাদ আমার চিন্তার জগৎটাকে বদলে দিলেন। 

আপনি বলেছিলেন, একজন লেখকের বই এমন হওয়া উচিত যে তা কালকে অতিক্রম করে যাবে।  সে অর্থে আপনার বইগুলো কি কাল অতিক্রম করে যাচ্ছে? নিজের জনপ্রিয় ধারার ভেতর থেকে কোন বইগুলোকে আপনি কালোত্তীর্ণ মনে করেন?

কালোত্তীর্ণ কোন লেখা হবে না হবে এটা এইকালে বসে কোনো লেখক বলতে পারবেন না।  এবং আমি আমার নিজেকে নিয়ে একদম পরিষ্কার।  আমার মৃত্যুর পর আমার কোনো লেখা পড়া হবে কি-না এ পর্যন্ত আমি ভাবি-ই না।  কিন্তু আমি যতক্ষণ বেঁচে আছি, আমি চাইব যে আমার লেখা মানুষ পড়ুক।  আমি ভালো লিখি কি মন্দ লিখি, আমার জীবদ্দশায় দেখে যেত চাই যে আমার লেখা লোকে পড়ছে, সেটা নিয়ে কথা বলছে, খারাপ লেখার জন্য আমাকে গাল দিচ্ছে এবং আমার ভালো লেখার জন্য প্রশংসা করছে।  কিন্তু আমার মৃত্যুর পরে এই লেখা মানুষ পড়বে নাকি ফেলে দেবে এটা নিয়ে আমি ভাবি না।  তবে একটা জিনিস আমি মনে করি, ছেলেবেলায় দেখেছি আমার নানীর কাছে কিছু পুরনো বই ছিল।  যেমন ধর, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্রের কিছু বই, রবীন্দ্র-নজরুলের কিছু বই এবং মীর মোশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু।  এই বইগুলোতে অনেক সময় পোকায় ধরত।  আমার নানী করতেন কি শীতকালে বইগুলো রোদে মেলে দিতেন।  আমি কোনো কারণ ছাড়াই কেন জানি মাঝেমধ্যে বইগুলোর সামনে গিয়ে বসে থাকতাম।  সে বইগুলো থেকে একটা গন্ধ আসত।  এর অনেক পরে যখন আমি নিজে লিখতে শুরু করলাম, একটা সময় আমার মনে হতো, ভালো বইয়ের গন্ধ অনেকটা কাল অতিক্রম করে যায়।  আমার খুব স্বপ্ন যে, আমার কোনো একটি বই অন্তত ও-রকম একটা জায়গায় পৌঁছাক। 
সেটি কোন বই আমি জানি না।  তবে আমাকে যদি একটি বইয়ের কথা বলা হয় আমি ‘নূরজাহান’-এর কথা বলবো।  যে বইটিতে আমি খুব চেষ্টা করেছি আমার যেটুকু মেধা, আমার যেটুকু সাধ্য তা দিয়ে আঠারো বছর ধরে আমি উপন্যাসটি লিখেছি।  বাংলাদেশ তথা এ উপমহাদেশের মৌলবাদ এবং মৌলবাদী শক্তি কী করে আমাদের সমাজের মহৃলে ঢুকে গেছে, কীভাবে ভণ্ড মাওলানা ফতোয়া দিয়ে গ্রামের নিরীহ মানুষকে অত্যাচার করছে, কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে পরেও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এই পুরো বিষয়টাকে আমি ধরার চেষ্টা করেছি।  এবং তার মধ্য দিয়ে বিশেষ একটি অঞ্চল, বিক্রমপুর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাটাকে আমি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। 
এ উপন্যাসটি লেখার পর আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, হ্যাঁ আমার জীবদ্দশায় এ উপন্যাসটি বিশাল বিশাল পুরস্কার পেয়েছে, ভারতের আনন্দ পাবলিশার্স বইটি প্রকাশ করেছে।  বাংলাদেশেও বইটির একাধিক সংস্করণ বেরিয়েছে; মাঝে মাঝে মনে হয় যে, হ্যাঁ আমি একটি উপন্যাস লিখতে পেরেছি, যার কথা বোদ্ধাজনেরা বলেন বা মনে রাখেন।  যেমন আমি প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে গিয়েছিলাম।  প্রধানমন্ত্রী এই বইটি আগে পড়েছেন, দেখলাম বইটার কথা তার মনে আছে।  প্রেস কাবের সভাপতি শফিক ভাই আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি একদিন সারাদিন প্রেস কাবে যাইনি নূরজাহান বইটি পড়ার জন্য।  আমি সারাদিন ধরে বইটা পড়েছি। ’ আমার কাছে এগুলোকে অনেক বড় পুরস্কার মনে হয়।  জীবদ্দশায় যখন এ রকম কথা শুনি, মনে হয় লিখে কিছুটা হলেও মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছি। 

একজন লেখকের জীবনটা আসলে কেমন, এই বাংলাদেশের বাস্তবতায় সাহিত্যিক জীবনটাকে কীভাবে দেখেন?

আমরা যে সময়ে শুরু করলাম, সে সময়ে, ধরো সদ্য স্বাধীন দেশ।  কিছু ছেলে আমরা লেখা শুরু করেছি, আমাদের অগ্রজ কিছু লেখক আছেন।  তখন আমাদের বাজারটা দখল করে আছে একেবারেই ভারতীয় সাহিত্য।  বইয়ের দোকানগুলো তাদের বইতে ভর্তি।  আমাদের পত্রপত্রিকা কম, লেখক কম।  তাদের বইয়ের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি।  একটা স্বাধীন দেশে কিছু লেখক মুক্তিযুদ্ধ, একটা স্বাধীন চেতনা নিয়ে যখন শুরু করলেন ধীরে ধীরে আমাদের জগৎটা বড় হতে লাগল।  তবে তখনও আমরা জানি যে, সাহিত্যিক মানে হচ্ছে একটা ছেঁড়া ছাতা, জীর্ণ পাঞ্জাবি।  বইয়ের প্রুফলিপি নিয়ে প্রকাশকদের দুয়ারে দুয়ারে ঘোরা।  প্রকাশকরা সেইভাবে টাকা দেয় না।  বই বিক্রি হয় না।  অনাহারী, দুঃখী জীবন।  ওই সময়টাতে কলকাতার দু-চারজন বাঙালি লেখক ছাড়া কেউ লিখে জীবন ধারনের কথা ভাবতেও পারে না।  আবার ওখানেও যারা লিখে জীবিকা নির্বাহ করতেন তাদের জীবনব্যবস্থাটিও খুব সুখের না।  তো ওই অবস্থায় যখন আমাদের দেশে ধীরে ধীরে জায়গাটা তৈরি হতে লাগল তখন আমি যে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি লিখে জীবন ধারণ করব।  লিখে জীবন ধারণ করার সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী একটা সিদ্ধান্ত ।  কারণ, তখন শওকত ওসমান বা শামসুর রাহমানের বইও দুইশ’, পাঁচশোর বেশি কপি বিক্রি হয় না।  সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-এর বই বা আবু ইসহাকের কিছু বই বিক্রি হয়।  সেখানে একজন তরুণ লেখক লিখে জীবন ধারণ করবে চিন্তাই করা যায় না।  তখন কেউ করেও না সেটা।  আমি যখন শুরু করলাম, তখন একটা গল্প লিখে কুড়ি টাকা বা দশ টাকা পাওয়া যায়।  উপন্যাস লিখলে তিনশ’ টাকা পাওয়া যায়।  প্রকাশকরা বই ছাপেন না।  এই ধরনের একটা পরিস্থিতি।  তার মানে লেখক জীবনটা ওই সময় বাংলাদেশে হৃদয়বিদারক।  এখন আমাদের হাতে প্রচুর পত্রপত্রিকা।  প্রকাশনার জগৎ এখন অনেক বড় হয়েছে।  অনেক রকম টেলিভিশন।  এখন কিন্তু লিখে জীবন ধারণ করা কিছুটা সহজ।  আবার কঠিনও।  কঠিনটা এ কারণে যে, শুধু বই লিখে তুমি জীবন ধারণ করতে পারবে না।  তোমাকে নাটক লিখতে হবে।  তোমাকে টেলিভিশনে ঢুকতে হবে।  নানা জায়গায় না লিখলে এখনও কঠিন।  শুধু বই লিখে জীবন ধারণ করাটা বাংলাদেশে এখনও প্রায় অসম্ভব। 

সেই সময়ে টেলিভিশন নাটক যারা লিখেছেন, তাদের একটা সাহিত্য চরিত্র ছিল।  তাদের গল্প-উপন্যাস ছিল।  এখনকার অবস্থাটা এমন হয়ে গেল কেন?

টেলিভিশনে তখন নাটক কে কে লেখেন? টেলিভিশনে নাটক লেখেন সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল্লাহ আল মামুন, সেলিম আল দীন, আমজাদ হোসেন, আতিকুল হক চৌধুরী, মামুনুর রশীদ এদের কিন্তু একটা সাহিত্যের ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল।  তাদের প্রত্যেকেই কিন্তু মূলত লেখক।  তখন সাহিত্যিকরাই টেলিভিশন নাটক লিখতেন।  এখন টেলিভিশনে কিন্তু একধরনের অসাহিত্যিকরা লেখেন।  অবস্থাটা বদলে গেছে। 

তাহলে কি আমরা সিঁড়ি দিয়ে উপরে না গিয়ে নিচেই চলে গেলাম?

আমাদের সাহিত্যের জায়গাটা আসলে অনেকটা বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে।  আমি গত বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ বছর ধরে লিখছি।  হুমায়ুন আহমেদ লিখেছেন।  জাফর ইকবাল লিখছেন।  তারপর যদি আমরা জনপ্রিয় লেখকের দিকে তাকাই মনে হবে যে, আনিসুল হক জনপ্রিয় লেখক।  কিন্তু এই চারজন ছাড়া আর কই? তাহলে এই চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরে চারজন লেখকই শুধু জনপ্রিয় হলো!

তাহলে ভবিষ্যৎটা আসলে কী?

সাহিত্যের জায়গাটা আগের মতো নেই এটা আমি নিশ্চিত; এবং সাহিত্যের পাঠকও আগের মতো নেই।  সাহিত্যের প্রতি পাঠকদের আগ্রহ কমেছে।  এই আগ্রহ কমার কয়েকটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছি একটা সময় আমি বাংলাবাজারে গিয়ে নিয়মিত বসতাম।  প্রতিদিনই দেখতাম সব লেখকেরই কিছু না কিছু বই বিক্রি হচ্ছে।  প্রত্যেক মাসেই কোনো না কোনো লেখকের বই  বের হচ্ছে।  এখন যে অবস্থাটা হয়েছে, বইয়ের প্রকাশনাটা হয়ে গেছে মেলাকেন্দ্রিক।  ফেব্রুয়ারির আগে আগে তড়িঘড়ি করে বই লেখা ও প্রকাশ হয়, কিছু বই কারও কারও বিক্রি হয়।  এ অবস্থাটা এমন হয়েছে যে, এক মাসে ভালোই বই বিক্রি হয়।  সারা বছর আর কোনো খবর নেই।  এটাতো হতে পারে না।  মানে আমাদের পাঠকদের মধ্যে এক ধরনের হুজুগ তৈরি হয়েছে, মেলাকেন্দ্রিক।  আর সারা বছর বই কেনার খোঁজ নেই, পড়ারও খোঁজ নেই।  অনেক পাঠক আছে এমন তারা বই কিনে নিয়ে যায়, পরে দেখা যায় যে, তারা বইটা পড়ে না।  এই যখন অবস্থা দেশটার, সাহিত্যের অবস্থাটা খুব ভালো নয়।  লেখকের নাম আমরা অনেক করতে পারব।  কিন্তু প্রকৃত অর্থে কয়টা ভালো বই লেখা হয়, কয়টা ভালো বই বিক্রি হয়, তা গবেষণার বিষয়।  কিন্তু বছরে অন্তত পঞ্চাশ-একশ’টা ভালো বই সৃষ্টি হোক।  আর সব মিলিয়ে কোথায় যেন আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে একটা খরা চলছে।  একটা শূণ্যতা চলছে।  তবে আমি আশাবাদী, এই খরা হয়তো প্রকৃতির নিয়মে একদিন কেটে যাবে।  এ শূন্যতার গোপনে হয়তো অনেক লেখক তৈরি হচ্ছেন।  আবার জাতীয়ভাবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও একটা ধাক্কা দিতে হবে। 

এই দুর্দিনের জায়গা থেকে বাঙালি কি একদিন সত্যি উঠে দাঁড়াতে পারবে? সেই আশা শক্তি আমাদের আছে?

রবীন্দ্রনাথের সেই ‘রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি’ এই কথার সাথে আমি আর একমত না।  যে বাঙালি নয় মাস যুদ্ধ করে একটা দেশকে স্বাধীন করেছে।  যে জাতির ত্রিশ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে দেশের জন্য সেই বাঙালিকে গাল দেওয়া বা ছোট করে দেখার অবকাশ এখন আর নেই।  বাঙালি বহু কিছু অর্জন করেছে।  একজন বাঙালি লেখক নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন।  দু’জন বাঙালি অর্থনীতিবিদ নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন।  বাঙালির এইটুকু এইটুকু ছেলেরা ক্রিকেট খেলে পৃথিবীর বড় বড় দলকে তছনছ করে দিয়েছে।  বাঙালি মেয়েরা হিমালয় জয় করেছে।  একটি বাঙালি ছেলে দু’বার অস্কার পেয়েছে এনিমেশনের জন্য বাঙালিকে কোথায় তুমি আটকে রাখবে? বাংলাদেশের মতো একটি দেশ গার্মেন্ট শিল্পে সারা পৃথিবীকে মাতিয়ে দিয়েছে।  আমাদের ওষুধ শিল্প আগামী পাঁচ বছরে কোথায় যায় তা তুমি দেখতে পাবে।  বাঙালিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার অবকাশ আর নেই।  এবং আমার বলতে কোনো দ্বিধা নেই, যে জাতির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ জন্মান, যে জাতির মধ্যে নজরুল জন্মান, যে জাতির মধ্যে বঙ্গবন্ধুর মতো মানুষ জন্মান সে জাতিকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।  সেটা আমারা এখন বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখতে পাই।  তবে শিল্প-সাহিত্যের জায়গাটায় একটা খরা চলছে এটা আমি বারবারই বলছি।  তবে সে খরাও কেটে যাবে।  বাঙালি কিন্তু অনেক কিছু অতিক্রম করে এ জায়গায় এসেছে।  রবীন্দ্রনাথের পরে কিন্তু অনেক শহৃন্যতা সাহিত্যে ছিল।  মানিক-তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ আর জীবনানন্দের পরেও অনেক শূণ্যতা ছিল।  সে শূণ্যতাগুলো ধীরে ধীরে কেউ না কেউ এসে পূরণ করেছে।  আমি নিশ্চিত যে, মানিক-তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ বা সতীনাথ ভাদুড়ী, সমরেশ বসু তাদের অনেক লেখাই আছে, যেগুলো ফরাসি, রুশ বা পৃথিবীর যে কোনো বড় ভাষায় লেখা হতো ওই লেখক নোবেল প্রাইজ পেতেন।  আমাদের দুর্বলতা হচ্ছে, আমরা বাংলার বাইরে এই লেখাগুলো পৌঁছে দিতে পারিনি। 

এবার বলুন, আপনার নাম মিলন; কিন্তু আপনার গল্পের প্রেমের চরিত্রগুলোর মধ্যে মিল হতো না কেন?

আসলে তেমন কোনো কারণ নেই।  আসলে আমি একটা জিনিস মনে করি যে, ব্যর্থ প্রেমের গল্পগুলো মানুষের বেশি মনে থাকে।  যেমন ধরো দেবদাস।  প্রেমে ব্যর্থ হওয়া, প্রেমিকাকে না পাওয়া বা তার সঙ্গে একটা বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া এ ব্যাপারগুলো হয়তো প্রেমের গল্পের আবেদনটাকে একটু স্থায়ী করে।  আর কিছু না। 

শৈশবে গ্রামে ছিলেন, গ্রামের মানুষদের নিবিড়ভাবে দেখা এবং তাদের ভাষা ও জীবনাচরণ আপনার গল্পে কীভাবে প্রতিফলিত করেন।  এসব বিষয়ে জানতে চাই। 

মানুষ দেখার অভ্যাস আমার।  গ্রামটাকে এবং গ্রামের মানুষদের নিবিড়ভাবে দেখার অভ্যাস আমার এখনও আছে।  এটা ছেলেবেলা থেকেই তৈরি হয়ে গেছে।  আমি মানুষ খুব দেখি।  একটা মানুষের হাঁটার দিকে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনোভাব, প্রবণতা পর্যন্ত দেখা যায়।  তবে সে চোখটা তৈরি হতে হয়।  আমি যখন গ্রাম নিয়ে লিখতে শুরু করলাম, আমার এমন একটা অনুভূতি তৈরি হলো ধরো একটা গ্রামের মানুষ তার ভাষায় কথা বলছে।  তার ভাষার ভেতরে আমি একটা নিজের ভাষা ঢুকিয়ে দিলে সেটাকে আরোপিত মনে হবে, তাই আমি তার ভাষাতেই বলার চেষ্টা করেছি। 

লেখকের মৌলিক গুণগুলো কেমন হওয়া উচিত?

লেখকের আসল গুণ হওয়া উচিত একজন লেখক প্রথমে একজন ভালো পাঠক হবেন।  এ জায়গাটায় আমাদের এ সময়ের লেখকদের মধ্যে একটু ঘাটতি আছে।  এই সময়কার অনেক লেখককে আমি দেখেছি যে, তারা পাঠক হিসেবে ততটা ভালো না।  ভালো পাঠক হলেই মূলত, লেখকের কাছে চিন্তার দরজাগুলো খুলবে।  সাহিত্যের দরজাগুলো খুলবে।  একজন ভালো পাঠকই প্রথম আবিষ্কার করবেন যে, ধরো ‘ঢোরায় চরিত মানস’ উপন্যাসটি কোন ভাষায় লেখা হয়েছে।  কেন ওই ভাষাটিকে লেখক ব্যবহার করেছেন।  ভালো পাঠক হলেই বোঝা যাবে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কেন বাক্য লম্বা করে লিখেছেন।  কীভাবে হাসান আজিজুল হক একটা বাক্যের মধ্য দিয়ে পুরো একটা সিচুয়েশন বুঝিয়ে দিচ্ছেন।  এই জিনিসগুলো ভালো পাঠক না হলে ধরা সম্ভব নয়।  একজন ভালো পাঠক হলে সাহিত্যের মহৃল রহস্যটা আবিষ্কার করতে পারবেন এবং তার কী লেখা উচিত সেটাও তিনি বুঝতে পারবেন।  একজন লেখকের আসলে এটাই হওয়া উচিত। 

নিজের সফলতা নিয়ে কতটুকু সন্তুষ্ট? ব্যর্থতাগুলো নিয়ে কিছু বলবেন?

শোনো ব্যর্থতাটাই তো বেশি।  কোনো মানুষ জীবনে একেবারে চূড়ান্তভাবে সফল এটা সেই মানুষটি কোনোদিনও বলতে পারেন না।  আর মানুষের সফলতাটা এক অর্থে আপেক্ষিক।  আমি যাকে সফলতা মনে করছি, আরেকজন মানুষ সেটাকে সফলতা নাও মনে করতে পারেন।  আমি যদি ভাবি আমি এই হয়ে গেছি, সেই হয়ে গেছি, আমার এতগুলো বই বেরিয়েছে কিন্তু আরেকজন মানুষের কাছে তাতে আসলে কিছুই যায় আসে না।  তবে আমি যেটা মনে করি আমার সফলতা না, আমি যে কাজটি করেছি গত বিয়াল্লিশ তেতাল্লিশ বছর ধরে, সেই কাজটার মধ্যে থাকার চেষ্টা করেছি।  আমি যে কাজটা করেছি, খুব আন্তরিক এবং সৎভাবে করার চেষ্টা করেছি।  হ্যাঁ, এখন কেউ বলতে পারেন, এত সৎভাবে কাজ করে এত বাজার চলতি, এত ফালতু লেখা তুমি কেন লিখেছ? একজন পাঠক বলতেই পারেন যে, আমার অনেক ট্র্যাশ লেখা আছে।  আমাকে যদি কেউ বলে তোমার কোন লেখাগুলো তুমি ফেলে দেবে? আমার মনে হয় আমি নব্বই ভাগ লেখা ফেলে দেব আমি নিজেই।  এই যে লেখাগুলো লিখেছি, কেউ কেউ বলবেন যে, আবর্জনা বাড়ানো হয়েছে।  কিন্তু আমি যদি মনে করি কচু গাছ কাটতে কাটতে মানুষ যেমন ডাকাত হয়, আমি এ আবর্জনা তৈরি করতে করতে লেখক হওয়ার চেষ্টা করেছি।  পেরেছি কিনা জানি না।  আর যদি ব্যর্থতার কথা বলো, ব্যর্থতায় তো ভর্তি।  জীবনে কী এমন সফলতা আছে! কত রকমের ব্যর্থতা।  ধরো, এতগুলো দিন ধরে আমি যা লিখলাম, এত না লিখে তো এর উল্টোটাও আমি করতে পারতাম যে, আমি কুড়ি-পঁচিশটা উপন্যাস লিখব, একদম বেঁছে বেঁছে লিখব।  সেটাও তো হতে পারত।  এটা ভাবলেই তো মনে হয় আমি ব্যর্থ একজন মানুষ। 

রফিক আজাদের সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকেই মূলত ক্লাসিক সাহিত্যগুলো পড়তে শুরু করলেন, সাহিত্য সম্পর্কে জানতে শুরু করলেন।  তখন আপনার প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’ লেখা হচ্ছে

‘যাবজ্জীবন’ লিখতে গিয়েই তার সঙ্গে আমার পরিচয়।  বিচিত্রাতে একটা গল্প ছাপা হলো ‘না সজনী’ নামে।  পরের সপ্তাহে গেছি বাংলা একাডেমিতে।  রফিক আজাদ সেই রুমে ঢুকে রশিদ হায়দারকে বলছেন, আচ্ছা ইমদাদুল হক মিলন ছেলেটা কে রে? ছেলেটার একটা লেখা পড়লাম, ভালোই।  আমি তখন রশিদ হায়দারের সামনে বসা।  রশিদ ভাই বলছেন, এই তো মিলন! রফিক ভাই আমাকে ডাকলেন, এই মিয়া এদিকে আসো।  রফিক ভাইয়ের ব্যাপারটাই ছিল এ রকম।  ডেকে বললেন, তোমার লেখাটা আমি পড়ছি।  ভালোই তো।  তো তুমি আমাকে একটা গল্প দিও উত্তরাধিকারের জন্য।  তো আমি একটা গল্প লিখতে গিয়ে দেখি লেখাটা আর শেষ হয় না, লেখাটা ক্রমশ বড়ই হয়ে যাচ্ছে।  ওদিকে রফিক আজাদ ডেট দিয়েছেন! আমি যতখানি লেখা হয়েছে, আমার হাতে লেখা আঠারো পৃষ্ঠা নিয়ে গেলাম।  গিয়ে বললাম, লেখা তো শেষ হয় না।  তো রফিক ভাই বললেন, রেখে যাও আমি পড়ে দেখি।  পরের সপ্তাহে আমি আবার গেছি তিনি বললেন, তুমি এ লেখাটা জোর করে ছোট কইরো না, লেখাটা যেভাবে হচ্ছে সেভাবেই লেখ।  আমি লেখাটা ছাপব।  লেখাটা উনি দেড় বছর ধরে ছেপেছেন।  এই দেড় বছরের মধ্যে উনি আমাকে তৈরিও করলেন।  সাহিত্য হচ্ছে আসলে গুরুমুখী বিদ্যা।  কেউ না কেউ তোমাকে পথটা দেখাবে।  আর নিজে থেকে যদি তোমাকে দেখতে হয়, তবে সাহিত্যটা পড়ে দেখতে হবে।  অনেক লেখকের ক্ষেত্রে মিরাকল ঘটে।  তো রফিক আজাদ আমাকে গুরুর মতো দেখালেন সাহিত্যটা আসলে কি।  পুরো আঠারো মাস। 

তার মানে যাবজ্জীবন লিখতে লিখতেই আপনার সাহিত্য জগতের আসল শুরুটা হয়ে গেল

হ্যাঁ বলতে গেলে যাবজ্জীবন থেকেই শুরু।  এখন তোমাকে এক্কেবারে আমার নিজে থেকে একটা কথা বলি।  প্রত্যেক লেখকের জীবনে একজন মানুষ থাকেন, যে  সবকিছু দিয়ে তাকে আগলে রাখে।  তাকে মানসিক সহায়তা দেয়।  তার চিন্তার জগৎটাকে গুছিয়ে দেয়।  রফিক আজাদ আমাকে সেইভাবে তৈরি করেছেন। 
কিন্তু গত একত্রিশ বছর ধরে, একজন মানুষ সেভাবেই আমার মনের জায়গাটাকে আগলে রেখেছেন।  আমার সাহিত্যের জায়গাটিকে, আমার চিন্তার জগৎটাকে আগলে রেখেছেন।  ছায়ার মতো তিনি আমার সঙ্গে আছেন। 

কে সে?

বিস্তারিত তার কথা বলব না, ধরে নাও আমার একজন আমার একজন স্বপ্নের মানুষ।  তিনি কখনও দেশে থাকেন, কখনও বিদেশে থাকেন।  আমার বয়সের কাছাকাছি একজন মানুষ।  তিনি এমনভাবে আমার চিন্তার জগৎটিকে, সাহিত্য আর চিন্তার জগৎটিকে, আমার বেঁচে থাকার জায়গাটিকে তিনি আগলে রেখেছেন।  এই মানুষটির কাছে আমি খুব কৃতজ্ঞ। 
এসএনএন২৪.কম/মিম