২:২২ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০




জনমনে উদ্বেগ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:২৪ এএম | মাসুম


এসএনএন২৪.কম : নানা আলোচনা-সমালোচনা আর বিতর্কের মধ্যে বুধবার রাতে জাতীয় সংসদে যে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল পাস হলো, সেখানে কার্যকর কোনো বিরোধিতা ছিল না।  কেবল বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারি কিছু সমালোচনা করেছেন এবং তিনিও এই আইনটি তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারার চেয়ে আরো বেশি ভীতি ছড়াবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন। 

সংসদে বিবেচনার জন্য আনার আগে নিয়ম অনুযায়ী এই বিলটি যাচাই-বাছাই করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।  তারা বিলটির বিষয়ে সিনিয়র সাংবাদিকদের মতামতও নিয়েছে।  কিন্তু সেই মতামতের কোনো প্রতিফলন আইনে নেই।  অবশ্য বিলটি পাসের সময় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী  দাবি করেছেন, এই আইন নিয়ে সাংবাদিকরা যেসব মতামত ও আপত্তি দিয়েছিলেন সেগুলো বিবেচনা করা হয়েছে।  তিনি বরং পাল্টা প্রশ্ন রাখেন, সাংবাদিকরা কী করে তা ভুলে গেলেন? মন্ত্রীর এই বক্তব্য নাকচ করে সিনিয়র সাংবাদিক, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সদ্য সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল গণমাধ্যমকে বলেছেন, মন্ত্রী সংসদকে ভুল তথ্য দিয়েছেন।  সংসদকে বিভ্রান্ত করেছেন।  কেননা এই আইনের বিভিন্ন ধারার বিষয়ে সাংবাদিক সমাজ যে ৩২টি সুপারিশ দিয়েছিলো, তা মানা হয়নি। 

এ আইনের একটি বড় সমালোচনার জায়গা বিতর্কিত (কালা কানুন বলে খ্যাত) অফিশিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্টকে অন্তর্ভুক্ত করা।  ৩২(১) ধারায় বলা হয়েছে, অফিশিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্টের আওতাভুক্ত কিছু অপরাধ করলে বা করতে সহায়তা করলে অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা জরিমানা হবে। 

অফিশিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্টের গণবিরোধি চরিত্র নিয়ে নাগরিকদের ভীতি ও উদ্বেগ দূর করতে তথ্য অধিকার আইন করা হলেও সেই সিক্রেসি অ্যাক্টই যখন নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন এর উদ্দেশ্য নিয়ে কারো সন্দেহ থাকে না। 

তথ্য অধিকার আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘তথ্য প্রদানে বাধা সংক্রান্ত বিধানাবলী এই আইনের বিধানাবলীর সহিত সাংঘর্ষিক হইলে, এই আইনের (তথ্য অধিকার আইন) বিধানাবলী প্রাধান্য পাইবে। ’ অর্থাৎ সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে যে অফিশিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট সবচেয়ে বড় বাধা ছিল, তথ্য অধিকার আইন সে বাধা দূর করলেও এখন নতুন করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সেই বিধান সংযুক্ত করার মাধ্যমে দুটি আইনকে মুখোমুখি করা হয়েছে।  ভবিষ্যতে জাতীয় সম্প্রচার আইন প্রণীত হলে তার সাথেও এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংঘর্ষিক হবে বলে ধারণা করা যায়। 

মাননীয় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী অবশ্য একটা ভালো পয়েন্ট তুলেছেন যে, ‘যদি ব্রিটিশ আমলের আইন—এই অজুহাতে অফিশিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট মন্দ হয় তাহলে ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) কী করে চলে?’ এই তর্কটাই হওয়া উচিত যে, আমরা ব্রিটিশ আমলের এসব আইনের লিগ্যাসি আর কতদিন বহন করব ?  বাংলাদেশ যখন একটি উপনিবেশ ছিল ,  পরে যখন আরেকটি দেশের অংশ ছিল ,  সেই বাস্তবতা আর রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এক নয়।  ১৯৭২ সালে যখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করা হলো, তারপরই আমাদের সব আইন বাংলাদেশের বাস্তবতার উপযোগী করে প্রণয়ন করা প্রয়োজন ছিল।  কিন্তু তা হয়নি।  সময়ে সময়ে কিছু আইনে সংশোধন এসেছে ঠিকই।  কিন্তু অধিকাংশ সময়ই এসব সংশোধনীর উদ্দেশ্য ছিল আইনকে আরো বেশি শক্ত করা।  আরো বেশি গণবিরোধী করা।  আরো বেশি নিবর্তনমূলক করা।  আইনকে জনবান্ধব করার উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়েছে খুব সামান্য ক্ষেত্রেই। 

সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বাংলায় রায় লেখার যে বিপ্লবী এবং কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, পরে সেটির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি।  এখনো যেসব যুক্তিতে ইংরেজিতে রায় লেখা হয়, তাও ওই ব্রিটিশ আইনের লিগ্যাসি বহনের কারণেই।  তার মানে আমাদের আইন-কানুন ও বিচারব্যবস্থা থেকে ব্রিটিশভূত তাড়ানোর লড়াইটা শুরু করা যায়নি। 

ফলে আমরা যখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অফিশিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্টের অন্তর্ভুক্তিতে নাগরিকদের উদ্বেগ দেখি, তখন সেই সুযোগে সমস্ত আইন-কানুন ও বিচারব্যবস্থা বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশি  বান্ধব করার দাবিটাও জোরালো করা দরকার। 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে নাগরিকদের উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ এখানেও তথ্যপ্রযুক্তি আইনরে ৫৭ ধারার আলোকে একটি বিধান রাখা হয়েছে যার দোহাই দিয়ে নাগরিকদের হয়রানির করার সুযোগ স্পষ্টই বহাল থাকল।  আইনে বলা হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যমে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ; মানহানিকর তথ্য প্রকাশ; ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত; আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তি তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার ইত্যাদি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।  প্রশ্ন হলো, কোন কথাটি মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, মানহানিকর এবং কোন তথ্যে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটবে—তার মানদণ্ড কী? এটি তো ব্যাখ্যার বিষয়।  কিন্তু সেই ব্যাখ্যার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।  আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যে ধারণা—তাতে এই আইনের যাচ্ছেতাই প্রয়োগ ঠেকানো সম্ভব নয়। 

এ আইনে সংবাদপত্র, ব্লগ ও ফেসবুককে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে।  অথচ এটি একেবারেই বাস্তবসম্মত নয়।  আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ যদি রাজনীতি, ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে কোনো বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে, তাহলেও এ আইনের আলোকে সেটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে।  ফলে যে ভিন্নমতকে বলা হয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এবং প্রধান শর্ত—সেটি প্রকাশের পথ চিরতরে রুদ্ধ হবে।  সম্ভবত আইনের এটিও একটি উদ্দেশ্য। 

এ আইন নিয়ে সাংবাদিকদের মূল উদ্বেগের কারণ, তাদের শঙ্কা এ আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার টুটি চেপে ধরবে।  যদিও আইনের খসড়া হওয়ার পরে আইনমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলে, এ আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথে বাধা হবে না।  আমাদের দেশে এমনিতেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিমাণ যথেষ্ট কম।  এর মধ্যেও যারা এই সাহসী কাজটি করেন ,  তাদের জন্যই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নতুন অন্তরায় বলে মনে করা হচ্ছে। 

এ রকম বাস্তবতায় সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে, আইনের যেসব ধারা নিয়ে সাংবাদিক ও নাগরিকদের উদ্বেগ আছে ,  সেগুলো পরিষ্কার করার জন্য দ্রুত এ আইনের একটি বিধিমালা করা হোক যেখানে অফিশিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্টের দোহাই দিয়ে সরকারি কর্মচারীরা তথ্য গোপনের সুযোগ না পান।  তা ছাড়া এই আইনে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করলে সেখানে সাংবাদিকদের রক্ষাকবচ কী আছে—তাও খোলাসা করা দরকার।  না হলে অনলাইন সাংবাদিকতা, ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগ তো বটেই, বড় বড় অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানি সাংবাদিকতা বলে আর কিছু থাকবে না।  কারণ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকেই কারাগারে যাওয়ার ঝুঁকি নেবেন না। 

এই আইনের অপপ্রয়োগের শিকার হয়ে কোনো নাগরিক গ্রেপ্তার হওয়ার পর উচ্চ আদালত থেকে হয়তো জামিন পাবেন কিংবা খালাসও পাবেন—কিন্তু সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হতে তাকে শারীরিক, আর্থিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে যে ভীষণ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে—সেই ক্ষতিপূরণ তাকে কে দেবে?

বলা হয়, একটি আইন কেমন তা নির্ভর করে আইনটি কে প্রয়োগ করছে—তার উপর? একই আইন নানাজনের ওপর নানাভাবে প্রয়োগের সুযোগ থাকে।  এটা ছুরির মতো।  আপনি এটি দিয়ে ফল কাটতে পারেন ,  মানুষের গলাও কাটতে পারেন।  অর্থাৎ আইন প্রয়োগের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ইনটেনশন বা উদ্দেশ্য যদি হয় অসৎ তাহলে তারা যেকোনো কিছুকেই ধর্মীয় উসকানি বা গুপ্তরবৃত্তির ছাঁচে ফেলে যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারবে।  কিন্তু যদি তার উদ্দেশ্য সৎ হয় তখন অনেক ছোটখাট বিষয়ও ওভারলুক করা সম্ভব। 

লেখক : আমীন আল রশীদ

সাংবাদিক। 



keya