৫:১০ পিএম, ২৪ নভেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | | ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

জেলা প্রশাসক যখন প্রতারণার শিকার

১০ নভেম্বর ২০১৭, ১১:৫৭ এএম | মুন্না


হাবিব সরোয়ার আজাদ, সিলেট প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক এক নারী কতৃক প্রতারণার শিকার হলেন।  শুধু জেলা প্রশাসক নন ওই নারীর প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকার্তাও।  প্রতাণার বিষয়টি ধরা পড়ার পর পান্না বেগম নামের ওই নারীকে শুক্রবার তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। 

সে সদর উপজেলার অচিন্তপুর গ্রামের জুয়েল মিয়ার স্ত্রী ও পৌর শহরের ওয়েজখালীর বাসিন্দা।  বিষয়টি জানাজানির পর নানা মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়ে খোদ জেলা প্রশাসকই যখন প্রতারণার শিকার তখন সাধারন মানুষ সাহায্য সহায়তা আদায়কারীদের নিকট প্রতিনিয়ত কতটুকুই বা প্রতারণার হাত থেকে নিরাপদ রয়েছেন।     

জানা গেছে, সদর উপজেলার পান্না বেগম প্রায় দু’মাস পুর্বে নিজের এক সন্তান আগুনে পুড়ে গেছে জানিয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারতার নিকট থেকে চিকিৎসার নামে ১০ হাজার টাকা নেয়ার পর ওই দিন বিকেলেই শিশুটি মারা গেছে বলে ওই নারী ইউএনওকে অবগত করে। 

পরদিন পান্না তার দ্বিতীয় সন্তানের খাদ্য নালিতে মারবেল পাথর আটকে গেছে জানিয়ে চিকিৎসার সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের নিকট থেকে ১৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।  জেলা প্রশাসকের সমনে থানা ওই সময় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, এর আগের দিন ওই মহিলার ১ শিশু সন্তান অগ্নিদগন্ধ হয়ে মারা গেছে। 

এমন করুণ অবস্থায় জেলা প্রশাসক মর্মাহত হয়ে সিভিল সার্জনের সঙ্গে কথা বলে শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএমজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দেন।  কিন্তু ওই নারী অ্যাম্বুলেন্সে না গিয়ে অন্য গাড়িতে যাবেন বলে আরো ২ হাজার টাকা নেন ইউএনও’র নিকট থেকে।  ওই দিন বিকেল ৪টার দিকে ওই নারী মোবাইল ফোনে জেলা প্রশাসক ও ইউএনওকে জানায় গাড়িতে সিলেট যাওয়ার পথেই তার দ্বিতীয় শিশুটিও মারা গেছে। 

এ দু’ ঘটনার আরো দু’দিন পর ফের ওই নারী জেলা প্রশাসকের নিকট উপস্থিত হয়ে জানায়, তার তৃতীয় শিশু সন্তানটি নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্টে ভ’গছে, সদর হাসপাতালে ভর্তিকৃত সন্তানটি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে।  জেলা প্রশাসক সদর হাসপাতালে ভর্তিকৃত ওই শিশুর চিকিৎসার বিষয়ে খোঁজ নিতে ও তার দেখভাল করতে সিভিল সার্জনকে ফোন দিয়ে অনুরোধ করেন। 

পরে ওই নারী মোবাইল ফোনে জেলা প্রশাসককে জানায় এ সন্তানকেও সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় হাসপাতাল গেইটেই শিশুটি মারা গেছে।  পরপর তিন তিনটি শিশু সন্তানের মৃত্যুর বিষয়টি জেনে জেলা প্রশাসক ওই নারীর প্রতি আরো সদয় হন। 

তৃতীয় বাচ্চার বিষয়ে ওই নারী জেলা প্রশাসককে ঘটনার দিন দুপুরে মোবাইলে ফোন দিলেও তিনি একটি আলোচনায় সভায় অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখছিলেন বলে ফোন রিসিভ করতে পারেননি।  শিশুটির মৃত্যুর খবর শুনে জেলা প্রশাসকের ধারণা হয়, তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করতে না পারার কারনে হয়ত শিশুটি বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে।  এমন হৃদয় বিদারক ঘটনায় জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলামের নির্দেশে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা  ওই নারীকে আবারো ঘর নির্মাণের জন্য ৪ বান্ডিল ঢেউটিন ও নগদ ৬ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। 

এদিকে টানা তিনবার সহায়তা পেয়েও ধমেননি পান্না।  বৃহস্পতিবার ফের বন্ধকী জমি ছড়ানোর কথা বলে ৪র্থ বারের মত সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট পুন:রায় ১০ হাজার টাকা সাহায্য চায়। 

এতেই বিপক্তি ও সন্দেহ দেখা দিলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাকে নিজের গাড়িতে করে পান্নার বসত বাড়িতে নিয়ে যান এবং জমি দেখাতে বলেন। 

শহরের ওয়েজখালি এলাকায় বসবাসকারী ওই নারীর বসতবাড়ি গিয়ে ইউএনও দেখেন আদৌ তার তিন সন্তান মারা যায়নি তার ৫ সন্তানই জীবিত, এমনকি স্বামীও রয়েছে।  প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে সদর মডেল থানা পুলিশকে খবর দিয়ে পান্না বেগমকে আটক করিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। 

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রতারণার দায়ে বৃহস্পতিবার রাতে পান্না বেগমকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করলে সদর মডেল থানা পুলিশ শুক্রবার সকালে তাকে জেলা কারাগারে প্রেরণ করে।  পান্নার স্বামী জুয়েল মিয়া জানান, তার স্ত্রীর  প্রশাসনের সাথে  এমন প্রতারণার  বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। 

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান শুক্রবার বলেন, প্রথমবারের মত এমন প্রতারণা আমি দেখলাম  প্রশাসন পর্যায়ে এধরণের প্রতারণা করার মতো সাহস করতে পারে বলে আমার জানাই ছিল না।