৫:২৩ পিএম, ১৫ অক্টোবর ২০১৮, সোমবার | | ৪ সফর ১৪৪০


ঝালকাঠিতে কাঠের উপর বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি নন্দন ভাস্কর্য তৈরী করলেন নারায়ন মিস্ত্রি

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৭:০৫ পিএম | সাদি


মোঃ রাজু খান, ঝালকাঠি প্রতিনিধি : বাঁশপট্টি নিবাসী নারায়নচন্দ্র মিস্ত্রি।  শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র ৮ম শ্রেণি পাশ।  ৯ম শ্রেণিতে উঠলেও এসএসসি’র জন্য রেজিস্ট্রেশনের টাকা জোগার করতে না পারায় তার ভাগ্যে আর পড়াশোনা জোটেনি।  নারায়ন মিস্ত্রির পিতা নগেন মিস্ত্রিও পেশায় ছিলেন কাঠ মিস্ত্রি।  তিনি কোন কারুকাজ না জানলেও ওই সময় নৌকা ও ছোট ঘর তুলতে বেশ পারদর্শী ছিলেন।  বাধ্য হয়েই পিতার সাথে কাঠমিস্ত্রির সাথে কাজে বের হন নারায়ন। 

কাঠের উপর কারু কাজে তার দৃষ্টি সুক্ষ থাকায় তিনি আর নৌকা ও ঘর তোলার সীমানা পাড়ি দিয়ে হয়ে ওঠেন আধুনিক মিস্ত্রি।  তিনি তৈরী করছেন সোফা সেটসহ কাঠের উপর নানা কারু কাজে পারদর্শি মিস্ত্রি।  তিনি দৈনিক ৬ শত টাকা বেতনে কাজ করে থাকেন।  সংসারে তার গৃহিনী স্ত্রী, উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে অধ্যায়নকারী মেয়ে, সদ্য উচ্চমাধ্যমিক অতিক্রমকারী ছেলে ও মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনারত ছোট মেয়ে রয়েছেন।  এদের সার্বিক খরচ জোগাতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মিস্ত্রি হিসেবে দিন মজুরের কাজ করেন নারায়ন মিস্ত্রি। 


রতে প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে কাঠের উপর স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য তৈরীতে কাজ করেন তিনি।  শুধু বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে ভাস্কর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি আরো কাঠের উপর ভাস্কর্য তৈরী করছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, প্রাকৃতিক প্রেমী কবি জীবনান্দ দাস, বাঙালী কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঝালকাঠির জীবন্ত কিংবদন্তি বর্তমান সরকারের শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি, ঐতিহ্যবাহী ডাকপিয়ন, গ্রামীণ চিত্রের উপরেও ভাস্কর্য তৈরী করছেন।   আমাদের প্রতিনিধি‘র সাথে কথা বলতে গিয়ে এমনটাই বর্ণনা দেন কাঠমিস্ত্রি নারায়ন চন্দ্র মিস্ত্রি। 

তিনি জানান, কাঠমিস্ত্রির কাজ করার সময় বিভিন্ন ভাস্কর্য দেখে উদ্ভুদ্ধ হই।  চট্টগ্রাম থেকে চান্দি কাঠ অর্ডার দিয়ে কিনে এনে তার উপর কারুকাজ করছি।  দিনে তো সময় পাই না, তাই রাতে প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে কারুকাজ করি।  একেকটি ভাস্কর্য তৈরী করতে ১ সপ্তাহ সময় লাগে।  ৩৬ ইঞ্চি-২৪ ইঞ্চি এবং ১৬ ইঞ্চি-১৪ ইঞ্চি, এ দুটি আকারে ভাস্কর্য তৈরী করি।  এতে ছবির আকার ভেদে ৪ শ টাকা থেকে সাড়ে ৮শ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।  বিক্রি করি ৬ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত।  মাস চারেক পূর্বে ঝালকাঠির উন্নয় মেলায় স্টলে অংশ গ্রহণ করে পুরস্কারও অর্জন করেন তিনি। 

নারায়ন মিস্ত্রি শুধু কাঠের উপরেই ভাস্কর্য তৈরীতে ব্যস্ত থাকেন না।  তিনি একজন শিক্ষানুরাগীও।  ছোট বেলায় তিনি টাকার অভাবে পড়াশোনা করতে না পারায় কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে গড়ে তুলেছেন ৪ লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ২ হাজারের বেশি বই নিয়ে একটি ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার।  যার নামও দিয়েছেন তার নিজ নামে “নারায়ন মিস্ত্রি গ্রন্থাগার”।  তিনি জানান, ছোট বেলায় টাকার অভাবে পড়াশোনা করতে না পারায় নিজ উদ্যোগে লাইব্রেরী স্থাপন করেছি।  দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বই সংগ্রহ করেছি।  দিনাজপুর শহর থেকেও প্রায় ১শ কিলোমিটার দূরে কান্তাজির মন্দিরে গিয়েও বই এনেছি।  এখানে পাঠকদের জন্য বসে বই পড়ার সুব্যবস্থা রয়েছে।  এছাড়াও হোমডেলিভারী রয়েছে।  প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে বাইসাইকেলে করে পাঠকদের বাসায় বই পৌছে দেয়া এবং পূর্বে দেয়া বইগুলো ফেরত এনে থরে সাজিয়ে রাখতে ২ ঘণ্টা সময় ব্যয় করি।  এর পরে কাঠের উপর ভাস্কর্য তৈরীর কারুকাজে বসি। 


বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রথমে পরীক্ষামূলক একটি ভাস্কর্য তৈরী করি।  তাতে সফল হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে শুরু করি।  গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী অর্ডার করলে আমি ভাস্কর্য তৈরী করে সাপ্লাই দেই।  ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জানান, বঙ্গবন্ধুর ছবিটার কাজ শুরু করেছি বেশ কিছু দিন পূর্বে কিন্তু বরিশালে বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে একটা অনাকাঙ্খিত ঘটনায় স্তব্দ হয়েছিলাম।  তাই কাজও থেমে ছিলো।  এখন কাজটা শেষ পর্যায়ে শুধু বঙ্গবন্ধুর বাম গালে তিলক লাগানোর কাজ করছি। 

অভিযোগ প্রকাশ করে তিনি জানান, সম্প্রতি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে নামধারী বেশ কিছু সংগঠনকে সহায়তা দেয়া হলেও আমার লাইব্রেরীর জন্য কোন সহযোগিতা পাইনি। 

ঝালকাঠি পৌর প্যানেল মেয়র মাহবুবুজ্জামান স্বপন বলেন, বাঁশপট্টির নারায়ন মিস্ত্রির কারুকাজ অনেক দৃষ্টি নন্দন।  তিনি যেসব ভাস্কর্যের কাজ করছেন এতে খ্যাতনামা ভাস্কর্য শিল্পি হবার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন প্যানেল মেয়র স্বপন। 

জেলা প্রশাসক  মোঃ হামিদুল হক জানান, নারায়ন মিস্ত্রি নামের একজন কারুশিল্পি রয়েছেন।  যিনি অতি সুক্ষ ভাবে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীসহ খ্যাতনামা ব্যক্তিদের ভাস্কর্য তৈরীতে পারদর্শী।  তিনি তার মেধা শুধু কারু শিল্পি ও ভাস্কর্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন নি।  তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে রয়েছে লাইব্রেরীও।  যার মাধ্যমে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছেন।  তাকে সরকারীভাবে বিশেষ অনুদান পাইয়ে দেবার ব্যবস্থা করা হবে।  আমি তার সর্বাঙ্গিন মঙ্গল কামনা করি বলেন জেলা প্রশাসক।