৪:৫৯ পিএম, ২৪ নভেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | | ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

ঝালকাঠিতে ২ বিচারক হত্যা দিবস আজ

১৩ নভেম্বর ২০১৭, ০৫:২৯ পিএম | রাহুল


মোঃ রাজু খান, ঝালকাঠি প্রতিনিধি: ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর দিনটি ছিল সোমবার। 

সকাল ৮ টার দিকে আমার দোকানে এসে এক লোক রুটি কলা খেয়ে ঝালকাঠিতে থাকার হোটেল আছে কিনা জানতে চায়।  শহরের মধ্যে হোটেল আছে বলে তাকে জানানো হয়।  কিছুক্ষণ পরে সকাল ৯ টার দিকে বিকট একটি শব্দ হয়।  থাকে সাজানো দোকানের মালামাল পড়ে এলোমেলো হয়ে যায়।  মাংস পোড়া গন্ধ আসতে শুরু করে।  কাকগুলো মাংস পোড়া গন্ধ পেয়ে ডাকাডাকি করতে থাকে।  চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়।  দৌড়ে গিয়ে দেখি বিধ্বস্ত গাড়ি, ৩ জন লোক গুরুতর আহত অবস্থায় রয়েছে।  তাদেরকে উদ্ধার করলে ঘটনাস্থলেই ক্ষতবিক্ষত ১জনকে মৃতাবস্থায় পাওয়া যায়।  বাকি ২ জনকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে  নেয়া হয়।  তখন চিনতে পারি এদের মধ্যে ২ জন ঝালকাঠির বিচারক এবং আমার দোকান থেকে অপরজন রুটি কলা ক্রেতা ঘাতক মামুন। 

কথাগুলো বললেন প্রত্যক্ষদর্শী পূর্ব চাঁদকাঠি এবাদুল্লাহ জামে মসজিদ সংলগ্ন ব্যবসায়ী ও কলেজ ছাত্র জোবায়ের হোসেন।  বর্তমানে সে ঝালকাঠি শহর ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।  তিনি আরো জানান, জেএমবির বোমা বিস্ফোরিত স্থানে স্মৃতি চিহ্ন রক্ষার্থে  কোন রকম কোন নাম ফলক বা ভিত্তি ফলক স্থাপন করা হয়নি।  শুধু মাত্র ১৪ নভেম্বর আস্লে ঘটনাস্থলে একটি পুষ্পস্তবক অর্পণ করে দোয়া-মোনাজাত করা হয়।  তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, ১৪ নভেম্বর সকাল ৯ টার দিকে সরকারি বাসা থেকে ঝালকাঠি আদালতের সহকারী বিচারক সোহেল আহমেদ ও জগন্নাথ পাড়ে কর্মস্থলে যাবার পথে তাদের বহনকারী মাইক্রোবাস অপর বিচারক আউয়াল হোসেনের বাসার সামনে অপেক্ষা করতে থাকে। 

এসময় জেএমবি সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য ইফতেখার হাসান আল মামুন তাদেরকে একটি লিফলেট পরতে দিলে তারা বিব্রতবোধ করে ফিরিয়ে দেয়।  ইতিমধ্যে মামুন তাদেরকে লক্ষ করে বোমা ছুঁড়লে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোটা ঝালকাঠি শহর।  ঘটনাস্থলেই মারা যান বিচারক সিনিয়র সহকারী জজ সোহেল আহম্মেদ এবং গুরুতর আহত অবস্থায় বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যু হয় বিচারক সিনিয়র সহকারীর জজ জগন্নাথ পাঁড়ের।  এ সময় তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটি বিধ্বস্ত হয়।  আহত অবস্থায় ধরা পড়ে হামলাকারী, জেএমবি সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য ইফতেখার হাসান আল মামুন।  সারাদেশের মানুষ এ ঘটনায় হতবাক হয়ে যান।  এরপর পর্যায়ক্রমে জেএমবির শীর্ষ নেতারা আটক হয়।  জঙ্গিদের ঝালকাঠিতে এনে তাদের উপস্থিতিতে জেলা জজ আদালতে চাঞ্চল্যকর এ মামলার বিচারকার্য চলে। 

তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজা তারিক আহমেদ ২০০৬ সালের ২৯ মে এজাহার ভুক্ত আসামি সুলতানকে বাদ দিয়ে ৭ জনকে ফাঁসির আদেশ দেন।  উচ্চ আদালতে সে রায় বহালের পর দেশের বিভিন্ন জেলখানায় ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ ৬ শীর্ষ জঙ্গির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।  এরা হলেন- জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান, সেকেন্ড ইন কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই, সামরিক শাখা প্রধান আতাউর রহমান সানি, উত্তরাঞ্চলীয় সমন্বয়কারী আবদুল আউয়াল, দক্ষিণাঞ্চলীয় সমন্বয়কারী খালেদ সাইফুল্ল¬াহ ও বোমা হামলাকারী ইফতেখার হাসান আল মামুন।  সর্বশেষ অন্য সাজাপ্রাপ্ত আসাদুল ইসলাম আরিফের ২০১৫ সালের ১৬ অক্টোবর রাতে খুলনার কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। 

২৯ মার্চ শীর্ষ জঙ্গিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার ২০ দিন পর মামলা পরিচালনাকারী তৎকালীন সরকারি কৌসুঁলী হায়দার হোসেনকে ২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল এশার নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পরক্ষনেই মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঝালকাঠি জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান রসুল জানান, নিহত বিচারকদ্বয়ের স্মরণে তাদের নামে জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের হলরুমটির নামকরণ করা হয়।  তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় আজ মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থলে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও দোয়া-মোনাজাত।  বিকেলে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সোহেল আহম্মেদ ও জগন্নাথ পাঁড়ে হলরুমে দোয়া ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।  এছাড়াও সন্ধ্যায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে আজ সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে মোমবাতি প্রজ্বলন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।