৪:০৩ এএম, ২১ জুলাই ২০১৮, শনিবার | | ৮ জ্বিলকদ ১৪৩৯


ঝালকাঠির নারীদের সবুজ বিপ্লবে স্বচ্ছলতা

০৭ জানুয়ারী ২০১৮, ০৫:০১ পিএম | জাহিদ


মোঃ রাজু খান, ঝালকাঠি প্রতিনিধি : ঝালকাঠির নবগ্রাম, গাভারামচন্দ্রপুর, পোনাবালিয়া, বাসন্ডা ও কীর্তিপাশা ইউনিয়নের ৩৬ গ্রামে কান্দিতে সবজী আবাদ করে সবুজ বিপ্লব ঘটিয়েছে নারীরা।  প্রায় ৪ হাজার নারী এ মৌসূমী কৃষি কাজে প্রতিবছরই সফলতা এনে স্বচ্ছলতা অর্জন করেন। 

স্থানীয় ভাবে এসব সবজীকে বলা হয় লতা কৃষি।  নারীদের ফলানো এই সবজী হাটে নিয়ে বিক্রি করছে পুরুষরা।  শীতকালীন সবজী আবাদের পাশাপাশি বছরের ১২ মাস এই উৎপাদিত মৌসুমী সবজী বিক্রি করে জীবন জীবিকা চলে শতশত চাষীর।  তবে সড়ক পথে কিছু কিছু সড়ক চলাচলের অনুপযোগী এবং বাঁশের সাঁকো থাকায় ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষকরা।  কারন উৎপাদিত সবজী সরাসরি সড়ক পথে নিয়ে যেতে না পারায় বাধ্য হয়ে বাড়িতে বসেই পাইকারদের কাছে কম মূল্যে হাটেই বিক্রি করতে হচ্ছে। 

পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিওর সুদের জালে জড়িয়ে পড়ায় এসব চাষীরা ব্যাংক ঋণ নিতে পারছেনা।  তাই কৃষক বান্ধব এই সরকারের কৃষি ঋণের সুযোগ থেকেও এরা বঞ্চিত হচ্ছে।  তাদের অভিযোগ চাষীদের জন্য সরকারী বরাদ্দ কৃষি সামগ্রী ও উপকরণ থেকেও বঞ্চিত এরা।  এলাকা ভিত্তিক চেয়ারম্যান ও মেম্বরদের নেক নজরে থাকা কিছু ব্যক্তিরাই এসব সুবিধা পেয়ে থাকে। 

শীতকালীন সবজী লাউ, কুমড়া, জালি, মূলা, শালগম, ফুলকপি, বরবটি, করলা, সীম, আলু, বোম্বাই মরিচ, কচু, পালন ও লালশাকসহ এমন কোন সবজী নেই যা এসব গ্রামে ফলানো হয়না।  বিষমুক্ত এসব সবজী আবাদ করে লাভবান হওয়ায় এক প্রকারে ধান আবাদ ছেড়েই দিয়েছেন চাষীরা।  কাঁদিতে সবজীর পাশাপাশি আখ, আমড়া, পেপে ও পেয়ারার আবাদ করেও লাভবান হচ্ছে তারা। 

এব্যাপারে নবগ্রাম ইউনিয়নের দক্ষিণ কাফুরকাঠি গ্রামের চাষী রনজীৎ ও সন্ধ্যা রানি জানান, আমাদের নিজেদের জমি না থাকায় অন্যের জমিতে কাজ করে ফসল ফলাই।  বিনিময়ে মালিকের কাছ থেকে পাওয়া পারিশ্রমিক দিয়েই চলছে সংসার।  একই গ্রামের চাষী সুধীর চন্দ্র বড়াল বলেন, আমারা বাৎসরিক লীজ নিয়ে জমিতে সবজী আবাদ করছি।  এনজিও থেকে সুদে টাকা এনে এই কাজ করায় মূনাফার বেশির ভাগই তারা হাতিয়ে নিয়ে যায়।  তবে সড়ক পথের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় ন্যায্য মূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি। 

শতদশকাঠি গ্রামের অপর চাষী সুকেশ হালদার জানান, এবছর ১০ কাঠা জমিতে করলা আবাদ করে ইতিমধ্যেই ১৭ হাজার টাকা পেয়েছি।  আরো ৩০ হাজার টাকা মূল্যের করলার ফলন পাবো বলে আশা করছি।  দক্ষিণ কাফুরকাঠি গ্রামের চাষী মানবেন্দ্র মিস্ত্রী জানান, আমাদের জমি না থাকায় বাড়ির আঙ্গিনায় সবজী আবাদ করেছি।  ইতিপূর্বে বিভিন্ন এনজিও থেকে সূদে টাকা এনে সূদের জালে জড়িয়ে পরায় নিঃস্ব হয়েছি। 

কাফুরকাঠি গ্রামের কৃষাণী কুসুম বালা জানান, আমরা বাড়ির উঠানে বিভিন্ন সবজীর চারা উৎপাদন করে জমিতে আবাদ করায় চারা ক্রয়ের অর্থের সাশ্রয় হয়।  অপর কৃষাণী কাজল হালদার জানান, আমি কাঁদি কুপিয়ে আলু ও কচু লাগাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি।  এই এলাকার জমি নিঁচু থাকার কারণে কোথাও ধানের আবাদ না করায় কাঁদিতেই বারো মাস সবজী আবাদ করছি। 

নিজেদের আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকায় সূদে টাকা এনে আমাদের আবাদ করতে হচ্ছে।  ব্যাংকে গেলে জমির পর্চা বা দলিলসহ বিভিন্ন কাগজ লাগে।  আমাগো জমি না থাকায় এসব কাগজ দিতে পারিনা বলেই সূদে টাকা আনতে বাধ্য হচ্ছি।  ডুমুরিয়া গ্রামের সুরেন হালদার বলেন, স্থানীয় হাটের পাইকারদের কাছে আমরা জিম্মী।  কারন আমাদের এ এলাকার সাথে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম নৌকা।  তাই বাগান থেকে নৌকায় সবজী নিয়ে হাটে গেলে পাইকারদের দরেই দিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছি। 

যদি সড়ক পথে এসব সবজী শহরে নিয়ে যেতে পারতাম তাহলে দাম বেশী পেতাম।  এই এলাকার সড়ক পথের দূরাবস্থার কারনে বর্ষা মৌসুমে শিক্ষার্থীরাও বিদ্যালয়ে যেতে পারেনা বলে জানান বরিশাল বিএম কলেজের মাষ্টার্সের ছাত্রী মেঘলা ও স্বরুপকাঠি কলেজের অনার্সের ছাত্রী লক্ষী। 

ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শেখ মোঃ আবু বকর সিদ্দিক জানান, ঝালকাঠির প্রত্যন্ত এলাকায় শীতকালীন সবজি চাষ একটি দৃষ্টান্ত।  চাষের শুরুর দিকে নারী-পুরুষ উভয়ে মিলে কাজ করেন।  পরে পুরুষরা বাজারজাত করণে এবং নারীরা পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকেন।  সবমিলিয়ে জেলার ৩৬ টি গ্রামের প্রায় ৪ হাজার নারী এ কৃষি কাজে সফল হয়ে থাকেন।  কৃষি বিভাগ থেকে তাঁদের যাবতিয় পরামর্শ এবং সাধ্যমত সহযোগিতা করা হয় বলেও জানান কৃষি বিভাগের এ শীর্ষ কর্মকর্তা। 



keya