১:২৬ পিএম, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, সোমবার | | ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

ডাক্তার রোগীর সম্পর্ক

০৬ ডিসেম্বর ২০১৭, ১২:৫৭ পিএম | মুন্না


এসএনএন২৪.কম : ডাক্তার-ডাকাত ! দারুন আদ্যমিল, তাইনা ? খুব খুশি ? পেশাজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ডাক্তারদের বিরুদ্ধে, ঠিকতো ? ডাক্তারদের বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ সেটা আপনি রোগী কিংবা রোগীর স্বজনের অবস্থান থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। 

ডাক্তারদের অবস্থানে নিজেকে দাঁড় করিয়ে কখনো উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন, আসল বাস্তবতা কি ? সামগ্রিক অভিযোগুলো নিশ্চয়ই এ জাতীয়, ডাক্তাররা টাকা ছাড়া কিছু বোঝে না, রোগীর দিকে না তাকিয়ে ওষুধ কোম্পানির দিকে তাকিয়ে ওষুধ প্রেসক্রাইবড করে, অপ্রয়োজনীয় অনেকগুলো টেষ্ট দেয়, নিজের মালিকানাধীন কিংবা কমিশন প্রাপ্ত ডায়গণিষ্টিক থেকে টেষ্ট না করালে সে রিপোর্ট দেখে না পর্যন্ত। 

এটা কি বিশ্বাস হয়, এদেশের অনেক ডাক্তার রোগীর আর্থিক দৈণ্যাবস্থার কথা শুনে পকেটের টাকা দিয়ে ওষুধ কিনে দেন, চিকিৎসার পুরোটা ফ্রিতে করে দেয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে, রাত-বিরাতে রোগীর পাশে দাঁড়ান, বন্ধু-বান্ধবদের কাছে সাহায্য ভিক্ষা করে তা দিয়ে আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ান, বন্যা-দুর্যোগে দুর্দশাগ্রস্থদের চিকিৎসার জন্য সংসার-পেশা ফেলে দেশের অঁজোপারাগাঁয়ে মেডিকেল ক্যাম্প বসান।  এমন অনেক ডাক্তারকে হয়তো আপনিও চেনেন।  ডাক্তারের খারাপটুকু যখন চোখে বিঁধেছে তা যেমন ধারণ করে গালাগালি করে যাচ্ছেন তেমন করে কি ভালোটুকুর প্রশংসা করেছেন ?

দু’চারজন খারাপ মানুষের জন্য একটি সম্প্রদায়কে জবাদিহীতার কাঠগোড়ায় দাঁড় করানো বুদ্ধি প্রসূত সিদ্ধান্ত হবে না ।  আমরা কিংবা আমাদের বাবা-মা-সন্তান, আত্মীয়-পরিজন যখন অসুস্থ হয় তখন খোদাকে ডাকার আগে ডাক্তারকে ডাকি।  এটা নীরেট বাস্তবতা।  সুস্থ অবস্থায় কেউ কোনদিন ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছে এমন পাগল ভবে বিরল।  আমরা যারা তৃতীয় বিশ্বের মানুষ তারা অসুস্থ হয়ে আধমরা না হওয়া পর্্যন্ত ডাক্তারের কাছে যাইনা। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবতা হচ্ছে, দু’হাজারের অধিক মানুষের জন্য একজন ডাক্তার ।  তার মধ্যে আবার ভিআইপিদের জন্য ডাক্তারদের সংখ্যা একটু বেশি বরাদ্ধ হওয়ায় যাদের রোগ-শোক বেশি সেই ক্ষেত-খামারের মানুষের জন্য হাজার পাঁচেকের জন্যে একজন ডাক্তার বরাদ্ধ আছে কিনা সন্দেহ।  রোগীর আশা, ডাক্তারের কাছে যাবে আর মাজ্যিকের মত ভালো হয়ে যাবে।  কিন্তু ডাক্তারের কাছে তো তেমন আলাদিনের চেরাগ নাই। 

আমি যে শহরে থাকি এই শহরের শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজটি গোটা বরিশাল বিভাগবাসীর জন্য চিকিৎসার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান।  চিকিৎসা প্রদানের জন্য এর শয্যার সংখ্যা যত তার চেয়ে ১০-১৫ গুন বেশি রোগী এখানে সব সময়েই থাকে।  ভাবতে পারেন, ডাক্তার-নার্সদের জন্য এটা কতবড় চাপ।  তবুও তোম সামলাচ্ছেন। 

ডাক্তারদেরও তো সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন থাকে, পরিবার-সমাজ থাকে।  রাষ্ট্র অক্ষম ভেবে মানুষের রোগ বৃদ্ধির প্রকোপ তো আর কমে থাকে না।  কাজেই ডাক্তারদের বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ তোলা হচ্ছে বা তোলা হয় তার সিঁকি পরিমানও অপরাধের গন্ডিতে বিচারভূক্ত করা কষ্টকর হবে।  মনের জ্বালা মেটাতে ডাক্তারদেরকে গালাগালি-হাতাহাতি করা যায় বটে কিন্তু সমাধানের পথ এখনো অনেক দূরে। 

একটু উন্নত সেবা পাবার আশায় সাধারণত রোগী এবং তাদের স্বজন ডাক্তারের প্রাইভেট সান্নিধ্য চান।  বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশে বিশেষত উন্নত দেশসমূহে এ প্রথাকে ভালো চোখে দেখা না হলেও আমাদের এটা নিত্যাকার চিত্রে দাঁড়িয়েছে ।  দেশের ডাক্তারের সংখ্যা নেহায়েত কম নয় কিন্তু বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞের সংখ্যা হাতেগোনা হওয়ায় একেকজন ডাক্তারকে তাদের নিজস্ব চেম্বারে বসে শত রোগীকে সেবা দিতে হয়। 

ডাক্তারের কাছে যারা উপস্থিত হন তাদের প্রায় প্রত্যেকেই আধমরা।  কাজেই সবাই চান একটু আগে দেখাতে।  অনেকে আবার দূরদূরান্ত থেকেও আসেন ।  কেউ কেউ সিরিয়াল রক্ষাকারীদের টাকা-পয়সা নিয়েও সাদাসাদি করেন ।  অথচ যিনি সিরিয়ালের প্রথম দিকে তিনিও যেমন রোগী আবার যিনি সিরিয়ালের শেষের দিকে তিনিও তেমন রোগী।  ডাক্তারের সাক্ষাৎ পেতে দেরী হচ্ছে বলে, অনেকে এ দোষও ডাক্তারের কাঁধে চাপিয়ে দিতে পিছপা হন না! তাছাড়া বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানীর প্রতিনিধিদের যন্ত্রনাটা তো থাকেই। 

বিভিন্ন অভিযোগ সত্ত্বেও স্বীকার করতে হবে, ওষুধ শিল্পে বাংলাদেশ প্রভূত উন্নতি করেছে; অন্তত রপ্তানিতে।  চিকিৎসা সেবায় এখন অবধি সন্তুষ্টি কতোটা হয়েছে তা নিরূপন করতে নিরপেক্ষ দৃষ্টি ভঙ্গীর দরকার ।  বাংলাদেশের যারা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ এবং যারা সরকারের উচ্চমহলের কর্তৃপক্ষ তাদের শারীরীক চেকাপের জন্য বারবার বিদেশ গমন হয়তো আমাদের দেশের চিকিৎসা সেবার মানের দৈণ্যতা প্রকাশ করে।  

সামান্য একটু অসুস্থ হলেই যারা বিদেশমূখী হয় তারা দেশের চিকিৎসেবার মানে চুনকালী দিচ্ছেন নিশ্চয়ই।  তারা যদি দেশের অভ্যন্তরে চিকিৎসাগ্রহনমুখী হতেন তবে নিশ্চিতভাবে চিকিৎসবা সেবার মানের উন্নতি হতে বাধ্য হত এবং ডাক্তারদের বিরুদ্ধেও দেশবাসীর অভিযোগ উত্থাপনের পাল্লাটা একটু হালকা হত। 

চিকিৎসা সেবার কিছুটা করুণ পরিস্থিতির জন্য এককভাবে ডাক্তারদের দায়ী করে গেলে সেটা সমাধানের পথে হাঁটা হবে না ।  দেশে উৎপাদিত নিত্য-প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোর মধ্যে ৫০-৬০ ভাগ ভেজাল কিংবা শুধু আটা-চিনির মিশ্রন বলে বিভিন্ন গবেষণার ফল মিডিয়ায় বহুবার প্রকাশ হয়েছে।  ব্যবসায়ীরা যখন রাষ্ট্রের হর্তা-কর্তা তখন এসব থেকে বললেই বের হয়ে আসা মুশকিল বটে তবে দেশের জাতীয় স্বার্থে ব্যবস্থা গ্রহন করা আবশ্যক ।  কঠোর নীতিমালা না থাকলে শুধু ডাক্তার নন বরং সকল পেশাজীবীদের সাথে সাধারণ মানুষের দূরত্ব বাড়তে থাকবে।  ইতিহাস বলে, প্রতিটি বিপ্লব জনরোষের বিস্ফোরণ থেকেই ঘটেছে। 

পেশাগত কিংবা ব্যবসায়িক ইথিক্স না থাকলে এবং না মানলে মানুষে মানুষে সুসম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভবপর হবে না।  সাধারণ মানুষকেও সংযমী হতে হবে।  রোগের লক্ষ্মন দেখা দেয়ার প্রারম্ভে চিকিৎসা নিয়ে অকাল মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।  কবরে এক পা বাড়িয়ে ডাক্তারের দ্বারস্থ হলে এবং ডাক্তার রোগী বাঁচাতে না পারলে ডাক্তার-নার্সকে শারীরকভাবে লাঞ্ছিত, হাসপাতাল-ক্লিনিক ভাঙচুর নিশ্চয়ই শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। 

ডাক্তারদেরও দেমাগ ঠান্ডা রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা দেখাতে হবে।  তারা যে মানুষগুলো নিয়ে কারবার করেন তারা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।  মরণ পথযাত্রী স্বজন নিয়ে স্বজনের মানসিকতা কিছুটা বিপর্যস্ত থাকেই।  কাজেই স্বান্তনার যতোটুকু দিয়ে তাদেরকে শান্ত রাখা যায় সে চেষ্টা অব্যাহত থাকা নৈতিক দায়িত্ব বলেই মনে রাখি।  কথা এটা নয় যে, জনগণের টাকায় তারা ডাক্তার হয়েছে বরং জনগণের প্রয়োজনের তাগিদেই রাষ্ট্র যোগ্যদেরকে যাচাই করেই ডাক্তার বানিয়েছে।  মাঝে মাঝে ডাক্তারদের কর্মবিরতি দেখি।  বুঝিও, মানুষের সেবার মানসিকতায় থাকা তাদের প্রতি অনাচার না হলে তারা কর্ম বিরতিতে যান না। 

তবে এক বা কিছু মানুষের দোষে বা ভুলে দেশের লাখ লাখ রোগী ও তাদের স্বজনদেরকে জীবনের অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়ে যাতে দুর্ভাবনা সৃষ্টি না করা হয় তার বিণীত অনুরোধ থাকবে।  ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অন্যায়ের প্রতিবাদ কোনভাবেই রোগীকে জিম্মি করে হওয়াটা সঙ্গত নয়।  ডাক্তার কিংবা রোগী, দোষ যে পক্ষের হোক তার নিষ্পত্তির জন্য আইন ও নীতিসিদ্ধ অন্য যে কোন পথে চলা যেতে পারে কিন্তু কোন রোগীর জীবন যাতে বিপন্ন হওয়ার শঙ্কা না জাগে।  রোগী-ডাক্তারের মধ্যে সুসম্পর্ক হোক, কামনা করি।  ডাক্তার কোনভাবেই ডাকাত নয় বরং আজও জনতার ভগবান বলেই স্বীকৃত।  পারস্পারিক সহযোগীতার বোধটুকু অবশিষ্ট থাকুক, চিরকাল-চিরায়ত।  ডাক্তাররাও সুস্থ থাকুক, থাকুক রোগীরাও। 

লেখক : রাজু আহমেদ, কলামিষ্ট