২:২৪ পিএম, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, মঙ্গলবার | | ৪ সফর ১৪৪২




ডিরেক্টর ও পতাকা

৩০ নভেম্বর -০০০১, ১২:০০ এএম | মোহাম্মদ হেলাল


 

// তাসমিয়াহ্ আফরিন মৌ //

আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখেই মনে হয় আমার ডিরেক্টর সেদিকে চোখ দিলেন।  তার মুখ থেকে বের হয়ে গেল একটা উচ্চারণ, “বাহ্”।  আমি তার চিফ অ্যাসিস্টেন্ট।  ফলে, তার বাকি কথাটা বুঝতে আমার আর সমস্যা হলো না।  এই সিনেমায় এই রকম একটা শট দরকার তার। 

ট্রেনটা থামতেই বাচ্চাটা গাছ বাওয়ার মত নেমে এলো।  বেশ একটা হিরো ভাব।  তাকে ডাকিয়ে আনতেই মুড আরো বেড়ে গেলো তার। 

ডিরেক্টর তাকে বললেন, এমন একটা শটে অ্যাকটিং করতে চায় কিনা সে? শিশুটির চোখ চকচক করে উঠে। 

সে বলে ওমুক সিনেমায় তমুক নায়ক এভাবেই অ্যাকটিং করেছে।  আর সে যেহেতু বড় হয়ে নায়ক হতে চায়, ফলে অবশ্যই সে এই অভিনয়টা করে দিতে পারবে।  বিনিময়ে তাকে টাকা না দিলেও চলবে।  সিনেমার শো এর সময় তাকে বেশ কয়েকটা টিকিট দিতে হবে। 

ডিরেক্টর শিশুটির ক্ষুদ্র দেহে পাকা বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে অবাক হলেন।  তারমধ্যে ছেলেটা টোকাই ধরণের।  যা হোক এ আব্দার মেনে নেয়া যায়।  এই মুহূর্তে তো অবশ্যই। 

আমার দিকে তাকাতেই শিশুটিকে আমি কাছে এনে বুঝিয়ে দিলাম কী করতে হবে।  ডিরেক্টরের কাছে জানতে চাইলাম কোথায় শ্যুটিং স্পট। 

জানালেন, কিছুটা সামনেই প্রায় শুকিয়ে যাওয়া নদীটার উপর যে ব্রিজ, সেখানেই ট্রেনটি দ্রুত বেগে ছুটে ঢুকে যাবে আর মাথায় দাঁড়িয়ে থাকবে শিশুটি।  ব্রিজে ঢুকার পর পরই শিশুটি ফ্রেম আউট হবে।  আর তার হাতে থাকবে বাংলাদেশের পতাকা।  মাথার উপর দু’হাত ছড়িয়ে রেখে পতাকা ধরে রাখবে সে আর পতপত করে উড়ে বেড়াবে স্বাধীন দেশের নিশান। 

লোকেশন শুনে চিন্তায় পড়ে যাই।  ব্রিজে চলন্ত ট্রেনের উপর শিশুটির হাইট নিরাপদ নয়।  প্রথমে রিস্ক কতটুকু তা হিসাব কষে নেবার দরকার আছে।  তাছাড়া কোনো কিছুর সাথে বাঁধা না থাকলে সে পড়ে যেতে পারে।  যতই অভ্যস্ত হোক না কেন চলন্ত ট্রেনে দাঁড়িয়ে থাকার ব্যপারে। 

আমার মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিলো না।  যদিও আমার ডিরেক্টর আমার কাছে দেবতুল্য।  তিনি যা বলবেন, আমি তাই সর্বশক্তি দিয়ে করার চেষ্টা করি।  কিন্তু মানুষের জানের বিষয়ে এই ঝূঁকি নেবার ক্ষমতা কি আমার আছে?

ডিরেক্টরকে অনুরোধ করি বাচ্চাটার কোমরে দড়ি দিয়ে ট্রেনের ছাদে বেঁধে শ্যুটিংটা করতে, এই অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে আমার আধা ঘন্টা সময় লাগবে।  কিন্তু তিনি হেসেই উড়িয়ে দেন আমার কথা। 

পরের ট্রেনটা স্টেশন থেকে ছাড়বে আর পনেরো মিনিটের মধ্যে।  এরপর ট্রেন আসবে আবার দু’ঘন্টা পর।  শ্যুটিং-এ সময় বাড়লেই খরচ বাড়ে।  আমার অপরিপক্ক চিন্তার জন্য বিরক্তও হন তিনি। 

শিশুটিকে প্রোডাকশন ম্যানেজারের সাথে স্টেশনে রেখে বাকি টিম নিয়ে ডিরেক্টর লোকেশনের কাছে যেতে থাকেন। 

রওনা দেবার সময় শিশুটি এসে আমার চিন্তা দূর করার চেষ্টা করে।  বলে, ট্রেন ব্রিজে ঢোকার সময়ই ট্রেনের ছাদে শুয়ে পড়বে সে।  কতবার করেছে এমন! যদিও গেল বছর তার এক বন্ধু মারা গেছে এভাবে।  কিন্তু সে বোকা ছিলো। 

ক্যামেরা সেট হতে হতেই আমি ব্রিজের উপর ঘুরে আসি।  আমার আশংকা এবার নিশ্চিত চোখে দেখতে পায় কিছু মুহূর্ত পর কী হতে যাচ্ছে।  ব্রিজের উপরে আড়াআড়ি পিলারগুলো দেখেই চোখের হিসাবে বুঝতে পারি শিশুটি দাঁড়িয়ে থাকলে বাড়ি খাবে, ছিটকে যাবে এবং মরে যাবে। 

আমি ডিরেক্টরের কাছে ফিরে এসে আবারো একই কথা বলি তাকে।  বলি এভাবে শ্যুটিং না করতে আর না হলে লোকেশন পরিবর্তন করতে।  ডিরেক্টর ভ্রু কুঁচকে তাকান।  বলেন, এভাবে তুমি ফিল্ম ডিরেক্টর হতে পারবা না।  শ্যুটিং মানেই রিস্ক, জানো না?

সবকিছু রেডি।  দু’মিনিটের মধ্যেই ট্রেনটা চলে আসবে ক্যামেরার ফ্রেমে।  স্টেশন থেকে প্রোডাকশন ম্যানেজার মোবাইল ফোনে সংযুক্ত ডিরেক্টরের সাথে।  শিশুটিকে ট্রেনের ছাদে উঠিয়ে দেয়া হয়েছে পতাকাসহ।  ক্যামেরা রোল দিয়ে রাখা যেনো কিছুতেই ফসকে না যায় এই দৃশ্য। 

আমি ফিল্ম স্ক্রিপ্ট আর অন্যান্য কাগজপাতি, ওয়াকি টকিসমেত শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি।  ট্রেনটা আসে।  আসতেই থাকে।  ডিরেক্টর অ্যাকশন বলে উঠেন পুরো ইউনিটকে।  ক্যামেরা চলছে।  ট্রেন আসছে।  শিশুটি বুক টান টান রেখে, পতাকা মাথার উপর তুলে চলন্ত ট্রেনের মাথায় দাঁড়ানো।  ব্রিজ নিকটবর্তী হয়। 

অনেকগুলো শব্দ একসাথে হয়।  পানিতে কিছু পড়ে, ট্রেনের গমগম শব্দ আর ডিরেক্টরের “কাট”।  কেমন যেনো স্লোমোশনে একটা লাল সবুজ একটা পতাকা উড়ে উড়ে শুকিয়ে যাওয়া নদীটার পানিতে এসে পড়ে।  আরো কিছু ভাসে।  আমি কি বুঝতে পারি সেগুলো কী?

ডিরেক্টর চুপ করে দাঁড়ানো।  আমি তার সামনে দাঁড়াই।  চোখে চোখ রাখি।  বলি, আপনি আমার ডিরেক্টর, তাই থুতু দিলাম না।  কিন্তু আপনাকে আজ ত্যাগ করলাম।  হাতের সকল কিছু ছুঁড়ে ফেলে চলে যেতে থাকি। 

সম্পাদনায় : রফিকুল ইসলাম-১৬, এসএনএন২৪.কম