৬:০২ এএম, ২০ নভেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার | | ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০




দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছেনা দক্ষিণের লঞ্চ যাত্রীদের

০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৭:৫৯ এএম | জাহিদ


দেলোয়ার হোসাইন, পিরোজপুর প্রতিনিধি :  যুগ যুগ ধরে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ নদী পথে লঞ্চ যোগে রাজধানী ঢাকা , চাঁদপুরসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করে আসছেন।  কিন্তু দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছেনা তাদের।  বিআইডব্লিউটিএসহ আইন প্রয়োগকারি সংস্থা বহু চেষ্টা করেও যেন বাগে আনতে পাড়ছেনা বেসরকারি লঞ্চ মালিক, চালক ও কর্মচারিদের। 

বেপরোয়া ভাবে প্রতিযোগিতা মূলক লঞ্চ চালনা, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে রোটেশন প্রথায় লঞ্চ পরিচালনা, ধারণ ক্ষমতার তুলনায় কয়েকগুন যাত্রী ও মালামাল বোঝাই, দুই ঈদের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুন ভাড়া আদায়, উৎসবকেন্দ্রিক ডেক ও কেবিন বাণিজ্য।  এক শ্রেণির দালালদের কাছ থেকে ডেক (তৃতীয় শ্রেণি) যাত্রীদের ছিট বা স্থান কিনে লঞ্চে অবস্থান করাসহ নানান দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে লঞ্চ যাত্রীদের। 

এ অঞ্চলে যখন সড়ক পথে যাতায়াত ব্যাবস্থা তেমন উন্নত ছিলোনা তখন থেকেই মানুষ লঞ্চ ও স্টিমার যোগে গন্তব্যে যাতায়াত করতেন।  তখন বিলাশ বহুল বড়  নৌযান বলতে রাষ্ট্রীয় স্টিমারকে বুঝাত।  এখন ব্যক্তি মালিকানাধীন বড় বড় লঞ্চ দক্ষিনাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের জন্য সুযোগ করে দিয়েছে।  তবে সে সুযোগটুকুর অপব্যবহার করছেন এক শ্রেণির অসাধু লঞ্চ মালিক ও তাদের নিয়োজিত লোকজন। 

এ অঞ্চলে ট্রেন লাইন নেই ,সড়ক পথে তীব্র যানজট সে ক্ষেত্রে কম পয়সায় নৌপথে শান্তির যাত্রা প্রত্যাশা করে থাকেন অগনিত যাত্রী।  কিন্তু অতি মুনাফা খোর মালিক ও চালকদের কারণে সে শান্তির যাতায়াত আতঙ্ক ও বেদনায় পরিণত হয়।  বেপরোয়া চালানোর কারণে মাঝ নদীতে গভীর রাতে যাত্রীরা হন আতঙ্কিত ঘটে দুর্ঘটনা।  পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার বাসিন্দা মো. বাচ্চু গত ২১ আগস্ট লঞ্চ থেকে মেঘনায় পড়ে নিখোঁজ হন। 

একটি সূত্রে জানাগেছে গার্মেন্টস কর্মী বাচ্চু ঈদুল আযহা উপলক্ষে স্বজনদের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য লঞ্চে চড়ে বাড়ি আসার সময় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে লঞ্চ থেকে নদীতে পড়ে যান।  গত ১২ জুন মঙ্গলবার দুপুরে পিরোজপুরের কাউখালী ও নেছারাবাদ উপজেলার আমড়াঝুড়ি এলাকায় সন্ধ্যা নদীতে ঢাকাগামী লঞ্চ অগ্রদূত প্লাসের ধাক্কায় গাছ বোঝাই একটি স্টীল বডি ট্রলার ডুব যায়। 

সে সময় লঞ্চের আঘাতে ট্রলার চালক মোঃ হাইউলের (৩০) বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।  সে হাইউল এখন পঙ্গু।   দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার লাখ ,লাখ মানুষ প্রতিনিয়ত লঞ্চযোগে নিজ নিজ গন্তব্যে যাতায়াত করতে গিয়ে কোন কোন স্থানে পল্টুন ছাড়াই লঞ্চে উঠতে হয়।  বৃদ্ধ, বৃদ্ধা ও শিশুদের কোথাও কোথাও সিড়ি ছাড়াই লঞ্চে তোলা হয়।  স্থানী যাত্রীদের মাধ্যমে জানাগেছে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালীতে পল্টুন নাথাকায় যাত্রীগণ কষ্ট করেই লঞ্চে ওঠেন। 

জেলার পিরোজপুর সদর উপজেলার হুলারহাটে পল্টুন থাকলেও তুষখালী থেকে ঢাকাগামী লঞ্চ সেখানে নোঙ্গর না করে অনতিদুরে বেকুটিয়া ফেরিঘাট এলাকার পশ্চিমপ্রান্তে নদীর চরে লঞ্চ নোঙ্গর করে যাত্রী ওঠা  -নামার ব্যবস্থা করে থাকেন লঞ্চ কর্তৃপক্ষ।  ঝালকাঠী শহর সংলগ্ন গাবখান সেতুর কাছে পল্টুন নেই।  এক তথ্যে জানাগেছে ভোলা জেলার লাল মোহন উপজেলার কাশেমগঞ্জ লঞ্চঘাটে পল্টুন না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন যাত্রীরা।  একই জেলার চরফ্যাশন উপজেলার বেলুয়া লঞ্চ ঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ।  জোয়ারের পানিতে পল্টুনের সিড়ি তলিয়ে যায়।  এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন লঞ্চ যাত্রীরা।  শিশু ,নারী ও অসুস্থ ব্যক্তিরা লঞ্চে ওঠা নামা করতেগিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। 

এক তথ্যে জানা গেছে এখান থেকে লঞ্চে ওঠতে হলে বাড়ি থেকে যাত্রীদের আলাদা কাপড় আনতে হয়।  যা পরিধান করে লঞ্চে আরহন করতে হয়।  অন্যথায় ভিজা পোষাকেই গন্তব্যে যেতে হয়।  বে পরোয়া লঞ্চ চালানোর কারণে গত ২৭ আগস্ট দুপুরে ভান্ডারিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া  যাত্রী বোঝাই লঞ্চ অভিযান-৭ খরো স্রোতা কঁচা নদীর মাঝে অগ্রদূত প্লাস লঞ্চটিকে ধাক্কা দেয়।   সে ধাক্কায় অভিযান-৭ লঞ্চের পাশের একাংশ ফেটে যায়। 

এ সময় মাঝ নদীতে যাত্রীরা চরম আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েন।   এক পর্যায় অধিকাংশ যাত্রী লঞ্চ থেকে নেমে যান।  ২৫ আগস্ট প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ডুবতে বসে ছিলো ঢাকা- পটুয়াখালী রুটের কুয়াকাটা-২ ও হাতিয়া –ঢাকা রুটের লঞ্চ ফারহান-৪।  বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার চেয়ারম্যান মাহবুব উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম) সাংবাদিকদের বলেছেন যাত্রীবাহী লঞ্চ দুর্ঘটনা কবলিত হওয়ার পর  তিনি কঠোর  সিদ্ধান্ত দিলেও লঞ্চ মালিক ও অন্যদের সদিচ্ছা না থাকায় তা বাস্তবায়িত হয়না।  লঞ্চে ধারণ ক্ষমতার চার গুন যাত্রী বহন করার অভিযোগ নতুন নয়। 

বিশেষ করে দুই ঈদের সময় এমন ভাবে যাত্রী তোলা হয় যাতে তিল ধারণে ঠাই থাকেনা।  লঞ্চের ছাদেও শত শত যাত্রী ওঠান হয়।  যারা রাতে সোয়াতো দুরের কথা বসেও যাতায়াত করতে পারেনা।   ঢাকা থেকে আসা আর ফেরার সময় দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাওয়া লাগে।  বিআইডবিøউটিএ ও জেলা প্রশাসন অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করার ব্যাপারে বিভিন্ন সময় নির্দেশনা দিলেও তা উপেক্ষা করে চলেন মালিক পক্ষ।  গত ২৬ আগস্ট অতিরিক্ত যাত্রীলওয়ার অপরাধে বরিশালের দুই লঞ্চ সুপারভাইজারকে কারাদন্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমান আদালত। 

পারাবাত লঞ্চের সুপারভাইজার সেলিম আহমেদ ও টিপু লঞ্চের সুপারভাইজার লিটু দাসকে তিন দিন করে  বিনাশ্রম কারাদন্ড পাশাপাশি দুইশ টাকা করে জরিমানা প্রদানের আদেশ করেছেন বরিশাল জেলা প্রশাসনের নির্বাহী  ম্যাজিস্ট্রেট রিপন বিশ্বাস ও মোজাম্মেল হক চৌধুরী।  ঈদুল আযহার দুই/তিন দিন পুর্ব থেকে উপকূলীয় জেলা সমুহের মানুষ যারা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়নগঞ্জসহ অন্যান্য স্থানে থাকেন তারা স্বজনদের সাথে ঈদ উৎযাপন করতে আসা শুরু করেন। 

আবার কর্মস্থলে যখন যাওয়া শুরু করেন তখন তাদের কষ্টের আর সীমা থাকেনা।  ভাড়া গুনতে হয় প্রায় দ্বিগুন।  এর পরও লঞ্চের স্টাফরা ডেকের স্থান দখল করে যাত্রীদের কাছে বিক্রি করে।  যাত্রীরা বাধ্য হয়ে স্টাফদের কাছথেকে রাতে শুয়ে বিশ্রাম নেওয়ার জায়গাটুকু কিনে নেন।  অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে তাও পাওয়া স্বপ্নের মতো।  ওই সিন্ডিকেটের কাছথেকে স্থান ও আয়াতনের ওপর ভিত্তি করে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় কিনতে হয় ডেকের স্থান।  ভুক্তভোগী যাত্রীগণ বার বার অভিযোগ করলেও মিলছেনা সমাধান।  কেবিন আর ডেক বাণিজ্য ওপেন সিক্রেট। 

মালিক, চালক ও সুপারভাইজার বিষয়টি জানলেও কোন পদক্ষেপ নেননা।  অবশ্য লঞ্চ মালিকগণ জানিয়েছেন তারা দুই ঈদ ছাড়া অন্য সময়ে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় কম ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করে থাকেন।  এ দিকে ১৭/১৮ ঘন্টার পথে যাত্রাকালীন সময়ে লঞ্চের কেন্টিন বা হোটেলে রাতের খাবার খেতে গিয়ে বিরাম্বনায় পড়তে হয় যাত্রীদের।  অধিক মূল্যে ভাত, সবজী, মাছ - গোস্ত কিনে খেতে হয়। 

লঞ্চের দোকানের চা- পান ও বিস্কুট টোস্ট দ্বিগুন মূল্যে কিনে খেতে বাধ্য হন যাত্রীগণ।  লঞ্চে বিশুদ্ধ পানির অভাব প্রকট।  কোন কোন লঞ্চে শৌচাগারের অবস্থাও নাজুক।  যাত্রী সেবার মানের প্রতি যেন উদাশিন কর্তৃপক্ষ। 



keya