৯:০৪ পিএম, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | | ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

দেশেই লিভার ট্রান্সপ্লান্ট

১৯ নভেম্বর ২০১৭, ০৮:০২ এএম | রাহুল


এসএনএন২৪.কম : কোনো ব্যক্তির রোগাক্রান্ত লিভার অপসারণ করে সেই স্থানে দাতা ব্যক্তির সম্পূর্ণ অথবা আংশিক সুস্থ লিভার প্রতিস্থাপন করাকে লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন বলা হয়।  সারা বিশ্বেই সফলভাবে হচ্ছে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের মতো চিকিৎসা। 
আমাদের দেশে ২০১০ সালে সফলভাবে প্রথম লিভার ট্রান্সপ্লান্ট হয়। 

যখন লিভার ট্রান্সপ্লান্ট

দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগ অথবা স্বল্পমেয়াদি মারাত্মক লিভার রোগের কারণে কোনো ব্যক্তির লিভারের কার্যকারিতা একেবারে কমে গেলে অথবা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট বা প্রতিস্থাপনের কথা বিবেচনা করা হয়।  সাধারণত যেসব রোগের কারণে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট দরকার হয় সেগুলো হলো—হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি ভাইরাসজনিত লিভার সিরোসিস, প্রাইমারি স্কেরোজিং কোলেনজাইটিস, প্রাইমারি বিলিয়ারি সিরোসিস, মেটাবোলিক ডিস-অর্ডার এবং শিশুদের বিলিয়ারি অ্যাটরেশিয়া (পিত্তনালি শুকিয়ে যাওয়া) ইত্যাদি।  এ ছাড়া ভাইরাল ইনফেকশন অথবা কোনো ওষুধ বা মদ্যপানের কারণে হঠাৎ স্বল্পমেয়াদি লিভার ফেইলিওর হলেও অনেক ক্ষেত্রে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের প্রয়োজন হতে পারে।  কোনো কোনো প্রাথমিক লিভার ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট  করা হয়। 

ধরন

সাধারণত দুটি উৎস থেকে দান করা লিভার নেওয়া হয়। 

১. মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট : এ ক্ষেত্রে কারো ব্রেইন ডেথ (জীবন রক্ষাকারী সাপোর্টগুলো সরিয়ে নেওয়ার পরও কারো যখন আর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে না) ঘোষণার পর রোগীর দেহ থেকে লিভার অপসারণ করা হয়। 

২. জীবিত ব্যক্তির দেহ থেকে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট : এ ক্ষেত্রে একজন জীবিত সুস্থ ব্যক্তি লিভারের একটি অংশ (ডান অথবা বাঁ দিক) তাঁর কোনো নিকটাত্মীয়কে দান করতে পারেন। 

দাতা

১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কোনো সুস্থ ব্যক্তির রক্তের গ্রুপ গ্রহীতার রক্তের গ্রুপের সঙ্গে মিললেই তিনি তাঁর লিভারের একটি অংশ ওই ব্যক্তিকে দান করতে পারবেন। 
লিভারদাতা হিসেবে কোনো ব্যক্তির যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য লিভার ট্রান্সপ্লান্ট টিম ওই ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিভিন্ন ল্যাবরেটরি টেস্ট করিয়ে থাকেন এবং এসব ক্ষেত্রে দাতার শারীরিক নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয়।  দান করার পর দাতার অবশিষ্ট লিভার তাঁর দেহে আবার বাড়তে থাকে।  এটি ছয় থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে তাঁর আগের সম্পূর্ণ কর্মক্ষমতা ফিরে পায়।  গ্রহীতা আবার তাঁর আগের দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারেন।  এটি মূলত নির্ভর করে, ট্রান্সপ্লান্ট-পূর্ববর্তী রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং লিভার রোগের কোন পর্যায়ে ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়েছে  তার ওপর। 

প্রক্রিয়া

কিডনি দানের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ লিভার বা যকৃৎ দান।  কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের ক্ষেত্রে দুটি কিডনির যেকোনো একটি দিতে হয়।  কিন্তু লিভার প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে দাতার লিভারের পুরোটা নয়, বরং সামান্য অংশ নিলেই হয়।  খুব দ্রুতই (৪ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে) কেটে নেওয়া অংশ আবার আগের মতো হয়ে যায়। 

দুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অপারেশন থিয়েটারে দুই দল অভিজ্ঞ লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন কাজ করেন, একদল চিকিৎসক রোগাক্রান্ত লিভারের অংশ অপসারণ করেন।  এ সময় রক্ত সরবরাহ যন্ত্রের সাহায্যে লিভারের রক্ত দেহের অন্যান্য অঙ্গে প্রবাহিত করা হয়।  চিকিৎসকদের অন্য দলটি দাতার দেহ থেকে সুস্থ লিভারের অংশবিশেষ অপসারণ করে তা প্রতিস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করে থাকে।  এরপর দান করা লিভারের অংশ রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়।  রোগীর রক্তনালিগুলো ও পিত্তনালি পুনঃসংযোগ করে পুরো লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন করতে সময় লাগে সাধারণত ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা। 

সফলতা

জীবিত ব্যক্তির দেহ থেকে সফল লিভার ট্রান্সপ্লান্টের পর একজন গ্রহীতার এক বছর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৮৫ শতাংশ, পাঁচ বছর বাঁচার সম্ভাবনা ৬৯ শতাংশ এবং ১০ বছর বাঁচার সম্ভাবনা ৬১ শতাংশ।  এই সাফল্য বয়স্কদের চেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে আরো বেশি। 

খরচ

সারা বিশ্বেই লিভার ট্রান্সপ্লান্ট অনেক ব্যয়বহুল একটি চিকিৎসা পদ্ধতি।  বিভিন্ন দেশে লিভার ট্রান্সপ্লান্টে ৪০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকার মতো খরচ হয়।  সেখানে বাংলাদেশে অনেক কম খরচে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট বা যকৃৎ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। 

সতর্কতা

ট্রান্সপ্লান্ট-পরবর্তী সময় গ্রহীতা খুব সহজেই বিভিন্ন ইনফেকশনে আক্রান্ত হতে পারেন।  ইমিউনোসাপ্রেস্যান্টস ও অন্যান্য ওষুধও এ ক্ষেত্রে গ্রহীতার ইনফেকশনে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়।  এ ছাড়া এসব ওষুধ গ্রহণের ফলে গ্রহীতার উচ্চ রক্তচাপ, ওজন বেড়ে যাওয়া, রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস, হাড়ে দুর্বলতা এবং কিডনির ক্ষতি  হতে পারে। 

দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রণালীতে শৃঙ্খলা বজায় রাখাই হলো নতুন লিভারকে সুস্থ রাখার চাবিকাঠি।  নতুন লিভার রিজেকশন, ইনফেকশন অথবা রক্তনালি ও পিত্তনালির কোনো সমস্যার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে কি না তা পরীক্ষার জন্য গ্রহীতাকে নিয়মিত একজন লিভার ট্রান্সপ্লান্ট বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে।  পরিকল্পিতভাবে সুষম খাবার খেলে এবং খাবারে চর্বির পরিমাণ কমিয়ে দিলে, মদ সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চললে সুস্থ থাকা সম্ভব।  নারীদের ক্ষেত্রে ট্রান্সপ্লান্টের পর প্রথম এক বছর গর্ভধারণ এড়িয়ে চলতে হবে। 

রিজেকশন প্রতিরোধের জন্য ট্রান্সপ্লান্টের পরপরই গ্রহীতাকে ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ দিতে হয়।  প্রথম কয়েক মাস এসব ওষুধে খরচ একটু বেশি হলেও এক বছরের মধ্যে একটি বা দুটি ওষুধ এবং দুই-চার বছরের মধ্যে মাত্র একটি ওষুধে খরচ কমে আসে, যা আজীবন চালিয়ে যেতে হয়।  এ ক্ষেত্রে নিয়মিত পরীক্ষার সাহায্যে লিভারের কার্যকারিতা এবং রক্তে ওষুধের মাত্রা দেখে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। 

দেশেই চালু হচ্ছে স্বয়ংসম্পূর্ণ লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টার

লিভার ট্রান্সপ্লান্টের জন্য দক্ষ জনবল এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতির প্রয়োজন।  বারডেম হাসপাতালে ১৯৯৯ সালে প্রথম হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়াটিক সার্জারি শুরুর মাধ্যমে বাংলাদেশে লিভার ট্রান্সপ্লান্টের উদ্যোগ নেওয়া।  ২০১০ সালের জুন মাসে বারডেম হাসপাতালে প্রথম সফল লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন হয় এবং বিশ্বে লিভার ট্রান্সপ্লান্টকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকৃতি লাভ করে।  ওই লিভার দলের প্রধান লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন ছিলাম আমি।  তখন ঢাকা শহরের স্বনামধন্য চারটি হাসপাতাল থেকে যন্ত্রপাতি আনতে হয়েছিল।  বারডেমেই দ্বিতীয়বারের মতো সফল লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করি ২০১১ সালের আগস্ট মাসে।  এরপর বারডেম হাসপাতাল ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টার তৈরির কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়।  বর্তমানে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট ইউনিটটি ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।  এরই মধ্যে ভারতের বিখ্যাত লিভার ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন সুভাষ গুপ্তর সম্পৃক্ততায় ভারতে ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।  আশা করছি শিগগিরই অন্যান্য দেশের তুলনায় কম খরচে বাংলাদেশেই নিয়মিতভাবে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট কার্যক্রম সম্ভব হবে। 

Abu-Dhabi


21-February

keya