১২:৩২ পিএম, ২১ নভেম্বর ২০১৮, বুধবার | | ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০




নাটোরের সিংড়া আসনে আ’লীগ চায় জয় ধরে রাখতে: বিএনপির চাই পুনরুদ্ধার

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৪৪ পিএম | মাসুম


মোঃ রাশেদুল ইসলাম, নাটোর প্রতিনিধি : মৎস্য ও শস্য ভান্ডার খ্যাত চলনবিল অধ্যুসিত সিংড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত নাটোর-৩ আসনে নির্বাচনী হাওয়া বইছে।  তবে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভোট নিয়ে শঙ্কাও বিরাজ করছে।  ইতিমধ্যে বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকায় সরব হয়ে উঠেছেন।  অনেকেই প্রকাশ্যে মাঠে না থাকলেও কৌশলে প্রচারণা চালাচ্ছেন।  যোগ দিচ্ছেন মৃত ব্যক্তির জানাযা, খেলা-ধুলাসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে।  অনেকে গণসংযোগের ছবি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছেড়ে দিচ্ছেন। 

সম্ভাব্য প্রার্থীদের ছবি সংবলিত পোষ্টার, ব্যানার ও ফেসটুন  ঝুলছে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে।  চলছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা ও ভাল-মন্দের বাচ-বিচার।  এই আসনটি বরাবরই ছিল বিএনপির দখলে। 

বিশেষ করে নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০০১ সালের নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটিতে জয়লাভ করে বিএনপির প্রার্থীরা।  হঠাৎ ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির দূর্গে প্রথম আঘাত করে দখলে নেন আওয়ামীলীগের উদীয়মান নেতা এ্যাড. জুনাইদ আহমেদ পলক।  আর আগামী নির্বাচনেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী অ্যাড. জুনাইদ আহমেদ পলক এই আসনের শক্তিশালী প্রার্থী।  তবে বিএনপিও ছাড় দিতে নারাজ, তাদের হারানো দূর্গ ফিরে পেতে কৌশলে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। 

নাটোর-৩ আসনে ১৯৯১ সালের ভোটে বিজয়ী হন জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক কাজী গোলাম মোর্শেদ।  পরের দফায় ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রæয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির প্রয়াত নেতা অ্যাড. আবুল কালাম আজাদ।  ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে ফের বিজয়ী হন কাজী গোলাম মোর্শেদ।  ২০০১ সালের ভোটেও এমপি হন গোলাম মোর্শেদ।  কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোটের হিসাব পাল্টে যায়।  ঝড়োগতিতে এই আসনে আঘাত হেনে বিজয় ছিনিয়ে নেন আ’লীগের তরুণ নেতা অ্যাডভোকেট জুনাইদ আহমেদ পলক।  সর্বশেষ নির্বাচনে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনেও পলক বিজয়ী হন।  বর্তমানে এই আসনে ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৭৬ হাজার  ৪০০ জন। 

আসনটিতে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের মূল্যায়ন না করা এবং প্রতিমন্ত্রী পলকের সাথে সিংড়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফিকের নীতিগত মতবিরোধ তৈরি হওয়ায় আওয়ামীলীগ কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছে।  এদিকে বিএনপির সাবেক সফল মেয়র ও ম্যাব মহাসচিব অধ্যাপক শামিম আল রাজির আকস্মিক মৃত্যুতে এই আসনে বড় ধরণের শূন্যতায় ভুগছে বিএনপি।  বর্তমানে বিএনপিতে প্রকাশ্যে কোন কোন্দল না থাকলেও ভেতরে ভেতরে রয়েছে অন্তরদ্বন্দ। 

নাটোরের এই আসনে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন গত দশম সংসদে নাটোর জেলার চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে একমাত্র সরাসরি ভোটে প্রতিদ্বদ্বীতা করে বিজয়ী হওয়া সংসদ সদস্য অ্যাড. জুনাইদ আহমেদ পলক। 

তিনি জানান, দলীয় সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানে অংশ হিসেবে সিংড়ার মাটিতে দুইশ’ চব্বিশ কোটি টাকা ব্যায়ে একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ডিজিটাল হাব গড়ে তোলা হচ্ছে।  আগামী তিন বছরে এর নিমাণ কাজ শেষ হলে সেখানে এই এলাকার প্রায় বিশ হাজার বেকার যুবকের কর্ম সংস্থান সৃষ্টি হবে।  এছাড়াও চলনবিলের সিংড়া-বারুহাস-তাড়াশ ডুবন্ত সড়ক সহ তিনি এলাকায় শত শত কোটি টাকা ব্যায়ে অসংখ্য ব্রীজ, কালভাট নিমাণসহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি করেছেন।  বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী পলক মোটর সাইকেলে চরে প্রতিটি পাড়া মহল্লায় ঘুরে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানও করছেন। 
এদিকে এই আসন থেকে পরপর দু’বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা না করে একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। 

এবং সম্প্রতি সিংড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুল ইসলামের শোক দিবস উপলক্ষ্যে সাটানো পোস্টার প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলায় মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চাপা ক্ষোভ।  তাই আসনটিতে ইতিমধ্যে পলকের বিকল্প হিসাবে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফিককে ভাবছেন অনেক সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। 

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শফিক ১৯৯৬ সালে গোল-ই আফরোজ সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ও ১৯৯৮ সালে একই কলেজের ভিপি নির্বাচিত হন।  চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার আগে ২০০৯ সালে তিনি সিংড়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয়েছিলেন।  তাছাড়া আ’লীগের দীর্ঘ রাজনীতিতে একজন পরিচ্ছন্ন ও ভদ্র, নম্র হিসেবেও এলাকার তার যথেষ্ট সুখ্যাতিও রয়েছে। 

উপজেলা চেয়ারম্যান শফিক বলেন, সিংড়ার আ’লীগ পরিবারগুলো খুবই অবহেলিত।  তাদেরকে কোন মূল্যায়ন করা হয় না।  এখানে বিতর্কিত ব্যক্তিদের প্রাধান্য দেয়া হয়। 

এছাড়া আ’লীগের মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন সাবেক এমপি মরহুম আশরাফুল ইসলামের সুযোগ্য সন্তান নাটোর নবাব সিরাজ উদ-দৌলা কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সিংড়া উপজেলা আ’লীগের সাবেক ১নম্বর যুগ্ন সম্পাদক অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম দুলু।  শহিদুল ইসলাম দুলু বলেন, তার পিতা মরহুম আশরাফুল ইসলামের হাত ধরেই সিংড়ার আ’লীগের জন্ম হয়।  তার পিতা নাটোর জেলা আ’লীগের সভাপতি সিংড়া উপজেলা আ’লীগের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।  এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন বিশ্বস্ত সহচর ছিলেন।  বর্তমানে সিংড়ার ত্যাগী নেতা-কর্মীরা অবহেলিত।  তাই তৃর্ণমূল নেতা-কর্মীদের দাবির মুখে তিনি মনোনয়ন পাবেন বলে আশা করছেন। 

এসব বিষয়ে উপজেলা আ’লীগের সভাপতি অ্যাড. ওহিদুর রহমান শেখ বলেন, এই আসনে আবারও প্রতিমন্ত্রী অ্যাড. জুনাইদ আহমেদ পলক একক প্রার্থী।  তবে বড় দল হিসেবে নেতৃবৃন্দের মধ্যে কোন বিষয় নিয়ে বিরোধ থাকতেই পারে, সেটা সাময়িক বিরোধ।  আর এখানে বিএনপি চলছে একটি জোড়াতালি কমিটি দিয়ে তাই এই আসন আমাদের দখলেই থাকবে বলে তিনি জানান। 

অন্যদিকে বিএনপিতে প্রার্থী হতে হাফ ডজন প্রার্থী মাঠে নেমেছেন।  দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে রয়েছেন- জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সিনিয়র সহ-সভাপতি, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক কাজী গোলাম মোর্শেদ।  বাবা পাকিস্তান পার্লামেন্ট সেক্রেটারী কাজী আবুল মসউদ এবং চাচা জাতীয় পরিষদ সদস্য কাজী আব্দুল মজিদের পরিবার থেকে আসা এই রাজনীতিবিদ সংসদ সদস্য থাকাকালে প্রায় ৪০টি বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভ‚ক্তি, রাস্তাঘাট নির্মাণ, বিদ্যুতায়নসহ অবহেলিত চলনবিল এলাকায় উন্নয়ন করেছেন।  অপর বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন- জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক, সিংড়া উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সালিশ বিশেষজ্ঞ এডভোকেট এম ইউসুফ আলী। 

দীর্ঘ দুইযুগ থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকারী বর্তমান সভাপতি ও জেলা জাতীয়তাবাদী আইজীবী ফোরামের সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান মন্টু।  সিংড়া থানা বিএনপির সদস্য ও দমদমা পাইলট স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম আনু।  সিংড়া থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান পৌর বিএনপির সভাপতি দাউদার মাহমুদ।  উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম হোসেন।  নব্বইয়ের দশকে সিংড়ার মেধাবী তরুণ ছাত্র নেতা এম ইউসুফ আলী জার্মানী থেকে আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।  ইউসুফ আলী বলেন, মরহুম অধ্যাপক শামিম আল রাজির অবর্তমানে তাঁর শূণ্যস্থান পূরণে নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পাশে দাড়িয়েছেন।  মিথ্যা মামলায় বিএনপির আটক নেতা-কর্মীদের মুক্ত করতে তিনি কাজ করছেন।  তিনি চলনবিলের অবহেলিত ও নির্যাতিত জাতীয়বাদী জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিতে চান। 

নির্বাচনী ভাবনা নিয়ে কথা হয় বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী মজিবুর রহমান মন্টুর সঙ্গে।  তিনি বলেন, প্রয়াত নেতা আবুল কালাম আজাদ ও শামিম আল রাজির অবর্তমানে শক্ত হাতে সিংড়া বিএনপির হাল ধরেছেন।  তিনি আরো বলেন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর নির্দেশে সিংড়া বিএনপি সংঘবদ্ধ।  তবে কিছুটা অন্তর দ্বদ্ব চলছে। 

এদিকে মহাজোটের ওয়াকার্স পাটির জেলা সম্পাদক মন্ডলীর ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতির নাটোর জেলার সভাপতি এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মিজান প্রাথী হবেন।  তিনি দাবী করেন, দীঘ ত্রিশ বছর ধরে কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন মহাজোট সেইসব বিবেচনা করে তাকেই মনোনয়ন দিবে। 

এছাড়াও মনোনয়ন চাইবেন উপজেলা জাতীয় পাটির সভাপতি প্রকৌশলী আনিসুর রহমান এবং নাটোর জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক বেলাল উজ্জামান।  আগ্রহী প্রাথীরা ইতোমধ্যেই প্রচার-প্রচারণায় মাঠে নেমে গেছেন।