১১:৩৪ এএম, ১৮ অক্টোবর ২০১৮, বৃহস্পতিবার | | ৭ সফর ১৪৪০


জিয়া ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা

নথি জাল, বাদীর বিরুদ্ধেই ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি খালেদার আইনজীবীদের

০৪ জানুয়ারী ২০১৮, ১১:৩৯ এএম | জাহিদ


এসএনএন২৪.কম : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিপক্ষে তদন্ত কর্মকর্তা জাল দলিল বানিয়ে তা উপস্থাপন করেছেন বলে দাবি করেছেন খালেদার আইনজীবীরা।  এ কারণে যাঁরা এই মামলা করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে আদালতে দরখাস্ত দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। 

আদালতে এ মামলায় যুক্তিতর্ক শুনানির ষষ্ঠ দিনে বুধবার খালেদা জিয়ার পক্ষে তাঁর প্যানেল আইনজীবীদের অন্যতম সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, জাল নথির সপক্ষে আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা ছাড়া আরো পাঁচজন সাক্ষী। 

আর আদালতে শুনানি শেষে খালেদা জিয়ার প্যানেলের আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা এই দুর্নীতি মামলার যেসব নথিপত্র দেওয়া হয়েছে সেগুলো বানোয়াট, এগুলো দিয়ে মামলা হতে পারে না।  যাঁরা এই মামলা করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আদালতে দরখাস্ত দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। 

রাজধানীর বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের প্যারেড মাঠে নির্মিত অস্থায়ী এজলাসে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতে মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি হয়।  সংশ্লিষ্ট বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান এই শুনানি গ্রহণ করেন।  খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতেই ওই শুনানি হয়। 

বৃহস্পতিবার ফের শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে।  আজও খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক শুনানি করবেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী।  আজ যুক্তি উপস্থাপন শেষে মামলাটির শুনানি শেষ হওয়ার কথা।  এরপর রায় ঘোষণার জন্য মামলাটি অপেক্ষমাণ রাখা হতে পারে বলে জানা গেছে। 

বুধবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ওই আদালতে হাজির হন খালেদা জিয়া।  বিকেল ৩টা পর্যন্ত শুনানি শেষে কার্যক্রম মুলতবি ঘোষণার পর খালেদা জিয়া আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন। 

এর আগে শুনানিতে মামলার এজাহারের তারিখ, অনুসন্ধানের তারিখ ও অভিযোগপত্র দেওয়ার সময় উল্লেখ করে তাঁর আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, আইনের বিধান অনুযায়ী ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্তকাজ শেষ করার কথা।  অথচ ৩৯৫ কার্যদিবস সময় নেওয়া হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে জাল দলিল তৈরি করা হয়। 

এ ছাড়া রুলস অব বিজনেস, সচিবালয় নির্দেশমালা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কার্যবিবরণীর বিভিন্ন ধারা তুলে ধরে সাবেক এই অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আইনের বিধান অনুযায়ী যেভাবে অতিরিক্ত নথি তৈরির কথা, তা সেভাবে করা হয়নি।  নথির গতিবিধি-সংক্রান্ত বিধানও অনুসরণ করা হয়নি।  এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী সাবেক মুখ্য সচিব কামালউদ্দিন সিদ্দিকীর ব্যক্তিগত সচিব সৈয়দ জগলুল পাশার এতিম তহবিলসংক্রান্ত নথি দেখার কোনো এখতিয়ারই ছিল না। 

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নথি জব্দ করতে হলে ক্ষমতপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুমতি নিতে হয় বলে আদালতকে জানান মোহাম্মদ আলী।  তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নথি জব্দের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনুমতি নেওয়া হয়নি।  এর কারণ জাল নথি তৈরি করা হয়েছে।  তদন্ত কর্মকর্তাসহ কয়েকজন সাক্ষী মিলে জাল নথি তৈরি করেছেন।  সাদা কাগজের ওপর হাতে লেখা এসব নথি কেন আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে আদালতের কাছে সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি। 

মামলার সাক্ষী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তখনকার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মাজেদ আলীর জবানবন্দি ও জেরা পড়ে শোনান সাবেক এই অ্যাটর্নি জেনারেল।  তিনি দাবি করেন, জেরার জবাবে মাজেদ স্বীকার করেছেন, এতিম তহবিলসংক্রান্ত নথি কে ঘষামাজা করেছেন, তা বলতে পারবেন না।  তিনি (মাজেদ) নিজে কোনো নথি তৈরি করেননি। 

মামলার সাক্ষী সাবেক মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীর জবানবন্দি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব তৌহিদুর রহমান খানের জবানবন্দি ও জেরা পড়ে শোনান মোহাম্মদ আলী।  তিনি বলেন, ‘সৈয়দ জগলুল পাশার অতিরিক্ত নথি খোলার কোনোর সুযোগ নেই। 

এদিকে আদালতে শুনানি শেষে খালেদা জিয়ার প্যানেলের আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি, যে নথি দেখিয়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, সেটি জাল।  এখানে কারো কোনো স্বাক্ষর নেই।  আবার যখন এই ঘটনার কথা বলা হয়েছে, তখন দেশ ছিল মন্ত্রিপরিষদশাসিত।  কিন্তু নথিতে লেখা আছে রাষ্ট্রপতির ত্রাণ তহবিল।  আবার এই নথিতে ঘষামাজা আছে। 

তবে বিএনপি নেতাদের দাবিকে কৌশল হিসেবে আখ্যা দিয়ে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল।  সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওনারা একটা কৌশল অবলম্বন করে এই কথাগুলো বলছেন।  ওনারা আগে বলতেন কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই, নথি নেই, এখন বলছেন নথি আছে, তবে এগুলো বানানো।  তবে আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ দিয়ে মামলা করেছি।  আর নথিগুলা পুরোপুরি সঠিক। 

বুধবার শুনানিতে খালেদা জিয়ার আইনজীবী হিসেবে আদালতে আরো উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, সানাউল্লাহ মিয়া, মো. মাসুদ আহমেদ তালুকদার, নুরুজ্জামান তপনসহ শতাধিক আইনজীবী। 

এর আগে এ মামলায় খালেদা জিয়ার দুজন আইনজীবী তাঁদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন।  তৃতীয় আইনজীবী সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন অব্যাহত রেখেছেন। 

এ মামলায় গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন।  যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে তিনি আদালতের কাছে এ মামলায় খালেদা জিয়া ও তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ছয় আসামিরই সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চেয়েছেন। 

গত ২০ ও ২১ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার পক্ষে আবদুর রেজাক খান যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।  শেষ না হওয়ায় আদালত আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য ২৬, ২৭ ও ২৮ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেন।  ২৬ ও ২৭ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তাঁর আইনজীবী আবদুর রেজাক খান। 

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুদক। 

২০১০ সালের ৫ আগস্ট খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপপরিচালক হারুন আর রশিদ।  ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। 

এ মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী (প্রথমে সাক্ষী ছিলেন) ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান। 

বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি : রাজধানীর হাইকোর্টের সামনে বুধবার বিকেলে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে।  জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিশেষ জজ আদালতে হাজিরা শেষে বের হয়ে যাওয়ার সময় হাইকোর্টের সামনে তাঁর গাড়িবহর পৌঁছালে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েকজনকে পুলিশ লাঠিপেটাও করে।  এ সময় পুলিশ কয়েকজনকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে চাইলে নেতাকর্মীরা বাধা দেয়।  শিক্ষা ভবনের সামনে শিক্ষা চত্বরে উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় এ এলাকায় বেশ কিছুক্ষণ যান চলাচল বন্ধ থাকে।  তবে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।