১:৩১ এএম, ১৯ জুলাই ২০১৯, শুক্রবার | | ১৬ জ্বিলকদ ১৪৪০




নান্দাইলে প্রসুতি নারীদের ভরসা প্রশিক্ষিত সাফি

১৬ জুন ২০১৯, ১২:০০ পিএম | নকিব


মোঃ শাহজাহান ফকির, নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি: ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার মুশুলী ইউনিয়নের পালাহার গ্রামের প্রশিক্ষিত ধাত্রী সাফি নামটি এখন প্রসুতি নারীদের মুখে মুখে। 

সকলেই তাকে সাফি আপা বলে ডাকে।  বহু বছর আগে মুশুলী ইউনিয়ন পরিষদে সাফি আক্তার তিন মাস ধাত্রিবিদ্যায় প্রশিক্ষণ নেন। 

পরে জেলা শহরে ব্র্যাকের উদ্যোগে পনের দিনের আরেকটি প্রশিক্ষণ দেন তিনি।  কিছু দিন একটি সংস্থায় কাজ করলেও একপর্যায়ে সংস্থাটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।  তখন তিনি নিজের এলাকায় অন্তঃসত্ত¡া নারীদের সহায়তা করতে থাকেন।  পালহার গ্রামের হাবিবুর রহমানের স্ত্রী রেহেনা।  রেহেনার মেয়ের বয়স দুই মাস।  এটাই তাঁর প্রথম সন্তন।  অন্তঃসত্ত্বা  হওয়ার পর থেকে তাঁর মনে ছিল এক অজানা আশঙ্কা।  প্রসবের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ততই তাঁর দুশ্চিন্তা বাড়ছিল। 

তখন এলাকার ‘সাফি আপা’ এগিয়ে আসেন।  তাঁর সহায়তায় নিরাপদে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়।  রেহেনা বলেন, ‘প্রথমবার মা হওয়ার সময় প্রত্যেক নারী শঙ্কায় থাকেন।  কিন্তু সাফি আপার মতো একজনের সহায়তা পেলে কোনো শঙ্কাই আর থাকে না। ’ একই গ্রামের গৃহবধূ মরিয়ম বেগমের ১৫দিন আগে সন্তান হয়েছে।  তিনি বলেন, ‘সাফি আপার সহায়তায় সুস্থ সন্তান জন্ম হয়েছে।  আপদ-বিপদ, ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও তিনি ছুটে আসেন।  তিনি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য যেন এক আশীর্বাদ। ’ তিনি একজন প্রশিক্ষিত ধাত্রী। 

তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি গ্রামের নারীদের সন্তান প্রসবে সহায়তা করেন।  এ জন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিক নেন না।  এমনকি এ কাজের জন্য তিনি কোনো উপহারও নিতে চান না।  খুশি হয়ে কেউ কেউ তাকে শাড়ি-কাপড় উপহার নিয়ে থাকেন।  সংগ্রামী জীবন ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার স্বীকৃতি হিসেবে এখন পর্যন্ত কোনো সম্মাননা সাফি আক্তার পায়নি।  সম্প্রতি পালাহার গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নানা বয়সী শিশুরা সাফিকে জেডি, চাচি, নানি, ফুপাম্মা বলে ডাকছে।  রহিমার সঙ্গে তাদের রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই।  সন্তান জন্মের সময় সহায়তা করার কারণে শিশুদের পরিবারের সঙ্গে সাফির আত্মিক বন্ধন গড়ে উঠেছে। 

এলাকার ২০-২৫ জন গৃহবধূর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সন্তান জন্মের সময় তাঁদের প্রত্যেকের পাশে ছিলেন সাফি।  সাফি আক্তারের ছোট একটি বসতঘর রয়েছে।  ঘরের মেঝে কাঁচা ও স্যাঁতসেঁতে।  ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায় দুপাশে জীর্ণ দুটি ছোট খাট।  এক পাশে একটি শোকেস।  এর ভেতরে কাচের কিছু তৈজসপত্র ও কাপড় রয়েছে।  ছেলেদের নিয়ে তিনি থাকেন।  পাঁচ ছেলে একটি ঢাকায় একটি গামের্ন্সে চাকরি করেন।  আরেকজন স্থানীয় আমলীতলা বাজারে চায়ের স্টল দিয়ে কোন মতে সংসার চালায়।  অন্যরাও কোন মতে কাজ করে চলছে।  স্বামী মারা গেছেন।  দুই মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন।  এখনো তিনি সেই কাজ করে চলেছেন।  তার হাতে প্রায় ১২শত নবজাতকের জন্ম হয়েছে। 

সাফি আক্তার বলেন, ‘সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে অন্তঃসত্বা নারীদের সুষম খাবার খেতে বলি।  শারীরিক কোনো সমস্যা দেখা দিলে তাঁদের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাই।  নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সন্তান প্রসবে সহায়তা করি।  কোনো জটিলতা দেখা দিলে প্রসূতিকে সরাসরি সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাই। ’ সাফি আক্তারের প্রয়াত স্বামী আবুল কাশেম একজন দিনমজুর ছিলেন।  তিনি বলেন, ‘সব সময় মানুষের জন্য কাজ করেছি।  বড় পরিসরে সেবা করার মানসিকতা আছে।  সাদাসিধা জীবন যাপন করেন সাফি আক্তার।  তিনি বলেন, ‘আমি টাকাপয়সার প্রয়োজনে এই কাজ করি না।  নবজাতকের মুখ দেখে অনেকে আমাকে টাকা দিতে চান।  দামি কাপড় ও গয়না দিতে চান।  আমি তা নেই না। 

আমার ছেলেরা পরিশ্রম করে যা রোজগার করে তা দিয়েই সংসার চলে যায়। ’ সাফি সম্পর্কে স্থানীয় ইউপি সদস্য মেজবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া ইকবাল বলেন, সাফি আমার গ্রামের এক কৃতি মহিলা।  নির্লোভ কর্মতৎপরতা সাফিকে এক অন্য রকম উচ্চতায় নিয়ে গেছে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সেবায় তিনি নিবেদিতপ্রাণ।  সাফির কর্মের মূল্যায়ন করতে গিয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের গ্রামীণ সমাজে সাফি আক্তারের  মতো নারীদের বিশাল অবদান রয়েছে।  সাফির কাজ ও তাঁর সংগ্রামী জীবন সমাজে নজির স্থাপন করছেন।  তিনি সমাজের নি:সার্থ মানুষের উদাহরণ।