৭:৩৩ পিএম, ১৮ জুন ২০১৮, সোমবার | | ৪ শাওয়াল ১৪৩৯

South Asian College

ননসেন্স আর সেন্সলেস

২৯ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৭:৫৯ পিএম | সাদি


এসএনএন২৪.কম : ব্যাংক খাতে অনিয়ম-বন্ধের দাবিতে সিপিবি-বাসদ এবং গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা যৌথভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছে।  যা হয়, তাদের কর্মসূচিতে লোক বেশি ছিল না।  বাংলাদেশ ব্যাংক অভিমুখে তাদের মিছিলটি পুলিশ আটকে দেয় দৈনিক বাংলা মোড়েই।  সেখানেই বক্তব্য দিয়ে শেষ হয় তাদের কর্মসূচি।  আমরা জানি বাংলাদেশে বামদের সমর্থক কম।  তাই তাদের সব কর্মসূচিই ব্যর্থ হয়।  ব্যর্থ মানে, তাদের কোনো দাবিই আদায় হয় না। 

সুন্দরবনের পাশে রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন বন্ধে বামরা অনেক চিৎকার করেছে, কাজ হয়নি।  কিন্তু আসলেই কি তাদের সব আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে? আমি মনে করি, নিছক দাবি আদায় হওয়া না হওয়ায় দাবি বা আন্দোলনের সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ভর করে না। 

সুন্দরবনের ক্ষতি করে রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা যে ঠিক হচ্ছে না, এটা কাউকে না কাউকে বলতে হবে।  নইলে উত্তর প্রজন্ম আমাদের অভিশাপ দেবে, বলবে, সেই সময়ে ন্যায্য কথা বলার মত একজন লোকও ছিল না।  ব্যাংক খাতে যে নজিরবিহীন অনিয়ম-দুর্নীতি আর লুটপাট চলছে; সংখ্যায় যত কমই হোক, ঠেকানো যাক আর না যাক; কাউকে না কাউকে এর প্রতিবাদ করতে হবে। 

বামদের প্রতিবাদ হয়তো এই অনিয়ম-লুটপাট বন্ধ করতে পারবে না।  কিন্তু এই প্রতিবাদে আমাদের সামষ্টিক গ্লানি কিছুটা কমে আসে।  যাক, কেউ না কেউ প্রতিবাদ তো করলো।  তবে বামদের ঘেরাও কর্মসূচি নিয়ে লেখা আজকের উদ্দেশ্য নয়।  বামদের এই কর্মসূচি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়াই আমাকে লিখতে বাধ্য করছে। 

সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বলতা রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন।  স্বীকার করেছেন ব্যাংক খাতে দুর্নীতির কথাও। 

কিন্তু বামদের আন্দোলন প্রসঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।  অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা আছে, দ্যাটস অল।  কিন্তু তাদের (সিপিবি) তো কোনো অস্তিত্ব নেই।  তারা ননসেন্স।  কিছুই করে না।  দুই-চারজন নেতা আছে, তাদের তো বাঁচতে হয়।  বাঁচার জন্যই এগুলো লালপতাকা...। ’

দুর্নীতির তথ্য আসা প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘হ্যাঁ, তা আসছে।  এগুলো নিয়ে প্রশ্ন হতে পারে।  এমনকি ঘেরাও হতে পারে।  কিন্তু যেটা হচ্ছে, সেটা তাদের ছেলেখেলা। ’ অর্থমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়াটা আমি ঠিক বুঝিনি।  তার কথার মানে কি এই যে, বামদের এই অল্প লোকের ছেলেখেলা মার্কা ঘেরাও নিয়েই তার আপত্তি।  কয়েকশ লোক না করে কয়েক লাখ লোকের ঘেরাও করলে বুঝি অর্থমন্ত্রী খুশি হতেন। 

তবে অর্থমন্ত্রী নিজে ব্যাংক খাতে দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনার কথা স্বীকার করলেও তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করাটা ‘ননসেন্স’ হবে কেন? দুই-চারজন নেতা থাকায় সিপিবিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন অর্থমন্ত্রী।  কিন্তু প্রশ্নটা হলো, তারা যে দাবিতে আন্দোলন করছেন, সেটা যৌক্তিক না অযৌক্তিক। 

আন্দোলনে মানুষ কয়জন সেটা নিশ্চয়ই বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়।  ১০ লাখ লোক নিয়ে ঢাকায় এসে হেফাজতে ইসলাম অযৌক্তিক দাবি করলেই কি তা মেনে নিতে হবে? সংখ্যাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো দাবির ন্যায্যতা।  আপনারা নিশ্চয়ই ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে মাত্র একজন ছাত্রের অনশনের শক্তিটা ভুলে যাননি। 

এই ছাত্রটি একাই কিন্তু ২৭ বছর ধরে মুখ বন্ধ করে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে মুখ খুলতে বাধ্য করেছিল।  অবশ্য স্বৈরাচার এরশাদের সহযোগী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ন্যায্যতার বিষয়টি নাও বুঝতে পারেন।  স্বৈরাচার হঠাতে গণঅভ্যুত্থান লাগে, ন্যায্যতার কথা তারা বোঝে না। 

আবুল মাল আব্দুল মুহিত নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি শুনেছেন, তবে অনুধাবন করেননি।  করলে সংখ্যা নিয়ে সিপিবিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন না।  বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এমনকি আমি এ পর্যন্তও বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব। ’ এটাই হলো ন্যায্যতার কথা। 

মাননীয় অর্থমন্ত্রী আপনার সময়ে সোনালী ব্যাংকে লুট হয়েছে, বেসিক ব্যাংকে সাগরচুরি হয়েছে।  আপনার সহকর্মী লাইসেন্স নিয়ে ফারমার্স ব্যাংক গিলে ফেলেছে।  এসবই তো সত্যি।  আপনি বিভিন্ন সময়ে স্বীকার করেছেন, কিন্তু ব্যবস্থা নিতে পারেননি। 

আপনি না পারলেও হাইকোর্টের নির্দেশে বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে দুদক তলব করেছে।  ফারমার্স ব্যাংক প্রায় দেউলিয়া করেও স্রেফ পদত্যাগ করে পার পেয়ে যাচ্ছেন ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর।  মাননীয় অর্থমন্ত্রী আপনার কাছে চার হাজার কোটি টাকা কোনো টাকাই নয়। 

কিন্তু আমাদের কাছে অনেক টাকা, সিপিবির কাছে অনেক টাকা।  কারণ এই টাকা আমার-আপনার ট্যাক্সের টাকা।  অর্থমন্ত্রী সিপিবি নেতাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন।  অবশ্য মানুষকে অবহেলা করা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা তার পুরোনো অভ্যাস।  কথায় কথায় তিনি সবকিছুকে ‘রাবিশ’ বলে উড়িয়ে দিতে চান।  কিন্তু সিপিবিকে ‘ননসেন্স’ বললে আসলে অর্থমন্ত্রীকেই ‘সেন্সলেস’ মনে হয়।  সেন্স থাকলে তিনি সিপিবিকে এভাবে হেলা করতে পারতেন না। 

আমার ধারণা ক্যারিয়ার আমলা আবুল মাল আব্দুল মুহিতের হয়তো বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সিপিবির অবদানের কথা, শোষণহীন সমাজ গড়তে তাদের ত্যাগের কথা জানাই নেই।  স্বাধীনতার পর দেশ গঠনে বঙ্গবন্ধুর পাশেই ছিল সিপিবি।  খালি একটা কথা বলি, ৭৫এর ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নির্মম হত্যার পর রাজপথে প্রথম প্রতিবাদে সামনের কাতারেই ছিল সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন।  তখনও কিন্তু রাজপথে মানুষ বেশি ছিল না। 

সিপিবির ‘দুই-চারজন’ নেতাই কিন্তু সেই প্রতিবাদ সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।  তখন তারা প্রতিবাদ করেছিলেন বলেই, আজ আমাদের গ্লানি কিছুটা হলেও কম।  তখন কোথায় ছিলেন আবুল মাল আব্দুল মুহিত? সিপিবি হয়তো লাখ লাখ লোক নিয়ে আপনার অব্যবস্থাপনা-দুর্নীতির প্রতিবাদ করতে পারে না।  কিন্তু তারা কিন্তু সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। 

রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের এই সময়ে সিপিবি এখনও মরুদ্যান।  নেতা দুই-চারজন হতে পারেন, কিন্তু সিপিবি নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাস্তানি, টেন্ডারবাজির অভিযোগ করতে পারবেন না।  তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনীতি করে না, রাজনীতি করে ন্যায্যতার জন্য, বৈষম্যহীন সমাজের জন্য, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, সমাজতন্ত্রের জন্য। 

লোক কম বলে হয়তো আপনি তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে পারবেন; কিন্তু তাদের দাবির ন্যায্যতা উপেক্ষা করতে পারবেন না।  কেউ যদি ন্যায্য কথা বলেন, একজন হলেও তার কথা আপনাকে শুনতে হবে।  বামদের পেছনে না লেগে অর্থমন্ত্রী যদি ব্যাংক খাতে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা-লুটপাটের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেন; তাহলে ভালো হতো। 

তাহলে আর এই দুই-চারজন নেতাকে কষ্ট করে ছেলেখেলা খেলতে মাঠে নামতেই হতো না। 

প্রভাষ আমিন: সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ। 
probhash2000@gmail.com