১০:৪৬ এএম, ২১ জানুয়ারী ২০১৮, রোববার | | ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

নিম্নমানের ওষুধ বাজারে

১০ নভেম্বর ২০১৭, ১০:০২ এএম | রাহুল


এসএনএন২৪.কম : জনবল সঙ্কটে ওষুধ প্রশাসন,ওষুধের গুণগত মান নিয়মিত পরীক্ষা হচ্ছে না,২৭ হাজার নমুনার ওষুধের মধ্যে গত বছর ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয় ১৩ হাজার ১৯৩টি নমুনা,একজনেই করছেন ১৫ জনের কাজ সরকার পরীক্ষিত মান নয়,কোম্পানির নিজস্ব পরীক্ষাগারের মানে ওষুধ বাজারজাত হচ্ছে নিম্নমানের ওষুধে সয়লাব সারাদেশ। 

ফলে মারাত্মক ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য।  গুণগতমানের কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই বাজারে রয়েছে ১৪ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ।  অ্যালোপ্যাথিক, হোমিও, আর্য়ুবেদিক ও ইউনানিসহ দেশে মোট ৭শ’ ১৯টি ওষুধ কোম্পানি রয়েছে।  এসব কোম্পানিগুলোর বাজারজাত করা ওষুধের শতকরা প্রায় ৭০ ভাগেরই মান পরীক্ষা করা যাচ্ছে না।  সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর বলছে, জনবল সঙ্কটের কারণে সবগুলো ওষুধের মান পরীক্ষা সম্ভব হচ্ছে না।  শুধুমাত্র ওষুধ কোম্পানি তাদের নিজস্ব পরীক্ষাগারে মান পরীক্ষার ওপর নির্ভর করেই ওষুধ বাজারজাত করছে।  বিদেশে ওষুধ প্রশাসনের কাজগুলো ভিন্ন ভিন্ন বিভাগ পরিচালিত করছে বাংলাদেশে তা হচ্ছে না। বাংলাদেশে একই ব্যক্তিকে ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ, পরিদর্শন, লাইসেন্স বিতরণসহ অফিসের অন্য কাজও করতে হচ্ছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে বাজারে ১ হাজার ২শ’ প্রকার ওষুধের রয়েছে প্রায় ২৭ হাজার ব্র্যান্ড।  এর মধ্যে গত বছর ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা হয় ১৩ হাজার ১৯৩টি নমুনা।  বর্তমানে পরীক্ষা ছাড়া বাজারে রয়েছে ১৪ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ।  দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মেসীর সংখ্যা ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৮০টি।  এর মধ্যে অনুমোদন ছাড়া অসংখ্য রয়েছে।  ওষুধ প্রশাসন ৬১ হাজার ৯৪৫টি ফার্মেসী পরিদর্শন করতে পেরেছে।  জনবল না থাকায় ৬১ হাজার ৭৩৫টি পরিদর্শন করা সম্ভব হয়নি।  শুধু ফার্মেসী মনিটরিং নয়, জনবল সঙ্কটের কারণে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সকল কার্যক্রমে বিঘœ ঘটছে।  ২০১৫ সালে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ৯ হাজার ৮১২টি নমুনা পরীক্ষা করা হলেও ১৮ হাজার ব্যান্ডের ওষুধ পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি।  এছাড়া লাইসেন্স পরিদর্শন মাঠ পর্যায়ে ওষুধের নমুনা সংগ্রহ, কারখানা পরিদর্শন, মোবাইল কোর্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) গোলাম কিবরিয়া ইনকিলাবকে বলেন, বর্তমানে তাদের কাজের পরিধি অনেক বেড়েছে।  নতুন ওষুধ কারখানা স্থাপনে প্রকল্প মূল্যায়ন ও অনুমোদন, জৈব-অজৈব ওষুধের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন, ওষুধের বিদ্যমান ও নতুন বেসিসি অনুমোদন, কারখানা পরিদর্শন, কাঁচামাল আমদানির অনুমোদন, প্রি মার্কেটিং ও পোস্ট মার্কেটিং পর্যায়ে ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাব টেস্ট, মান-নিয়ন্ত্রণ, লেভেল ও কার্টন অনুমোদন, নতুন ওষুধের নিয়ন্ত্রণ, খুচরা মূল্য নিবন্ধন, আমদানিকৃত ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল কাস্টমস থেকে ছাড়করণে প্রত্যয়নপত্র প্রদান, আমদানিকৃত ওষুধের নিবন্ধন প্রদান, ওষুধ রফতানির লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন, পাইকারি ও খুচরা ওষুধ বিক্রি, ফার্মেসী মনিটরিং এবং ভেজাল ও মানহীন ওষুধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান, এছাড়া অধিদপ্তরের নিজস্ব কাজ রয়েছে।  অধিদপ্তরের এ কর্মকর্তা আরো বলেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাটিতে প্রকট জনবল সঙ্কট রয়েছে।  বর্তমানে ১ম শ্রেণীর কর্মকর্তা-১১৮, দ্বিতীয় শ্রেণীর ২৫টি তৃতীয় শ্রেণীর ১১৫টি, ৪র্থ শ্রেণীর ১১২ সহ মোট-৩৭০টি পদ রয়েছে, এর মধ্যে ১ম-২৩, ২য়-১০, ৩য়-৩৯, ৪র্থ-১৫টিসহ মোট-৮৭টি পদ শূন্য রয়েছে। 

ওষুধের মান রক্ষাকারী ল্যাবরেটরিতে ৬০ পদের মধ্যে ১৮টি শূন্য রয়েছে।  বিদেশে ওষুধ প্রশাসনের কাজগুলো ভিন্ন ভিন্ন বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশে তা হচ্ছে না, বরং একই ব্যক্তি ওষুদের মান নিয়ন্ত্রণ, পরিদর্শন, লাইসেন্স বিতরণের কাজ করছেন।  এত কিছুর পর তাকে অফিসের কাজও করতে হচ্ছে।  কিন্তু আমাদের জনবল বাড়েনি, প্রতি জেলায় ১ জন কর্মকর্তা রয়েছে, আমাদের পরিদর্শক রয়েছে ৬৭ জন।  এর মধ্যে জেলা পর্যায়ে ৫৭ জন এবং প্রধান কার্যালয়ে ১০ জন।  এই অল্প সংখ্যক পরিদর্শক দিয়ে সারা দেশ কন্ট্রোল করা মোটেই সম্ভব নয়।  দেশে ১৬৬টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ কারখানা রয়েছে।  এসব প্রতিষ্ঠান বছরে ২০ হাজার ৪০৬টি টাকার পণ্য ও কাঁচামাল উৎপাদন করে।  ২৬৭টি ইউনানী ২০৭ আয়ুর্বেদিক এবং ৭৯টি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ তৈরী প্রতিষ্ঠানে ৮৫০ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন করছে।  বর্তমানে যে পরিমাণ ওষুধ আছে তার শতকরা ৭০ ভাগ পরীক্ষা করা সম্ভব নয়।  শুধুমাত্র ওষুধ কোম্পানি তাদের নিজস্ব মান পরীক্ষার ওপর নির্ভর করেই ওষুধ বাজারজাত করছে। 

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, স্বাস্থ্য খাতের জনবল সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন পদে এ মুহূর্তে ২ হাজার লোক নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।  যেহেতু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।  সেহেতু এখানে লোকবল দরকার প্রস্তাবের চেয়েও ৫ গুণ বেশি। সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নোমান বলেন, ওষুধ বিক্রির জন্য ড্রাগ লাইসেন্স নিয়ে ফার্মেসী খুলতে হয়।  প্রতিটি ফার্মেসীতে একজন ফার্মাসিস্ট থাকার বিধান রয়েছে।  সেখানে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রিরও নিয়ম নেই।  কিন্তু অনেক অদক্ষ লোক ফার্মেসী খুলে ওষুধের ব্যবসা করছেন।  তারা অনেক সময় চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে লেখা ওষুধের নাম ঠিকমতো বুঝতে পারেন না। 

নির্দিষ্ট ওষুধের বিপরীতে অন্য ওষুধ দিয়ে দিচ্ছে ক্রেতাদের।  এলাকার অনেক ফার্মেসীর দোকানদার নিজেই ডাক্তার বনে যান।  অনেক ওষুধ নির্ধারিত তাপমাত্রার মধ্যে রেখে বিক্রি করতে হয়।  কিন্তু ফার্মেসীগুলোতে সব ধরনের ওষুধ রাখার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকলেও রাখা হয়।  অনেক ফার্মেসীতে ফ্রিজও নেই।  কিন্তু ফ্রিজেই সংরক্ষণ করতে হয় এ ধরনের ওষুধ বিক্রি করতে দেখা যায়।  এতে করে ওষুধের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়।  যা ব্যবহার করার পর রোগী ভালো হবার পরিবর্তে তার জীবন আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।  অনেক ফার্মেসী নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি করে।  বিশেষ করে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা সংলগ্ন জেনারেল হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য ক্লিনিকগুলোতে রোগীদের নিম্নমানের ওষুধ দেয়া হয়। 

ওইসব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা ঘুরে বেড়ান।  তারা বিভিন্নভাবে চিকিৎসক ও ফার্মেসী মালিকদের ম্যানেজ করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানীর ওষুধ চিকিৎসাপত্রে লিখতে বাধ্য করে।  এ জন্য অসাধু চিকিৎসকগণ ওইসব ওষুধ কোম্পানি থেকে বিভিন্ন ধরনের লোভনীয় উপহার সামগ্রী-উপঢৌকন এবং নগদ অর্থ গ্রহণ করেন।  কোন কোন ওষুধ কোম্পানি বিনোদনের জন্য চিকিৎসকদের বিদেশেও নিয়ে যান। সংসদ সদস্য নোমান আরো বলেন, অনেক মাদকসেবী প্রভাব খাটিয়ে ফার্মেসী খুলে বসেন।  তারা সেখানে বিভিন্ন ধরনের মাদক সংরক্ষণ করে নিজেরাও সেবন ও গ্রহণ করেন। 

তিনি আরো বলেন, দেশে অপচিকিৎসা বেড়ে গেছে।  এগুলো সঠিকভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে না।  নোমান আরো বলেন, স্বাস্থ্য সেবা তৃণমূলে পৌঁছে দিতে প্রয়োজনে ওষুধ প্রশাসনে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ করতে হবে।  তিনি বিষয়টি জাতীয় সংসদে তুলে ধরবেন। 

Abu-Dhabi


21-February

keya