৯:৩৩ এএম, ১৯ আগস্ট ২০১৮, রোববার | | ৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৩৯


জানাযায় হাজারো মানুষের ঢল

না ফেরার দেশে চলে গেলেন দানবীর আব্দুল আউয়াল

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৪:৫৯ পিএম | জাহিদ


আলফাজ সরকার আকাশ, শ্রীপুর (গাজীপুর) : গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার অন্যতম বিদ্যাপীঠ আব্দুল আউয়াল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও দানবীর আলহাজ্ব আব্দুল আউয়াল সরকার সোমবার রাত ৩ টায় শেষ নি:স্বাস ত্যাগ করেন।  এই শিক্ষানুরাগী ১৯৩৩ সালে ময়মনসিংহের ভালুকা থানার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের জামিরদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন।  তাঁর পিতা ছিলেন হাফেজ এলাহী বক্স মাতা মোছা. আয়মন নেছা। 

শৈশব থেকেই শিক্ষার প্রতি তাঁর ছিল অতি আগ্রহ।  যদিও তিনি ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার সুযোগ পান কিন্তু শিক্ষার আলো ছড়ানোর জন্য তাঁর চেষ্ঠা ছিল মরণের পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত।  ১৭ বছর বয়সেই পরিবারের ইচ্ছায় আরেক শিক্ষানুরাগী মোছা. জোবেদার খাতুনের সঙ্গে প্রণয়সুত্রে আবদ্ধ হন।  দাম্পত্য জীবনে ৩ ছেলে ও ১ মেয়ে সন্তানের জন্ম দেন।  ব্যাক্তিগত জীবনে একজন সৌখিন কৃষক হলেও বাস্তবিক জীবন সংসার ছিল স্বচ্ছ ও নীতি আদর্শে ভরপুর। 

৯০এর দশকে কোনো একসময় তাঁর স্ত্রী জোবেদা আউয়াল বেড়ানোর উদ্দেশ্যে বাপের বাড়ীতে যান।  মধ্যরাতে স্বপ্নে দেখেন তাদের নার্সারীতে (বর্তমানে যাহা কলেজ মাঠ) অনেক ছাত্র-ছাত্রীদের কোলাহল।  ঘটনাচক্রে একই রাতে আব্দুল আউয়াল সরকারও নিজের বাড়িতে থেকে একই স্বপ্ন দেখেন।  পরদিন উভয়েই উভয়কে স্ব-স্ব স্বপ্নের কথা বলেন।  এই ঘটনা শুনে অনেকেই আশ্চার্যন্বিত হন।  পরবর্তীতে এলাকার গনমানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠা ও তাঁর ৩ একর জায়গায় গড়ে উঠে আজকের আব্দুল আউয়াল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজটি।  একারনে অনেকেই এই কলেজকে “স্বপ্নের কলেজ” বলে আখ্যায়িত করেন। 

বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ছোট ছেলে আতাউর রহমান( খোকন) সরকার বলেন, বাবা যা চেয়েছিল তার সবই পেয়েছেন।  তার চাওয়ার মধ্যে সর্ববৃহত ছিল কলেজটির প্রতিষ্ঠা ও সুনাম।  তিলতিল করে গড়ে তোলা এই কলেজ আজ গাজীপুরের অন্যতম বিদ্যাপীঠ।  কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এক এক করে প্রায় ৪০ বিঘা জমি বিক্রি করতে হয়েছে।  ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত অনেক চেষ্ঠা করেও যখন এমপিও ভুক্ত হচ্ছে না তখন তিনি মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন এবং পরবর্তীতে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে পড়েন।  যদিও এর পরের বছরই( ১৯৯৮)এমপিওভুক্তি ঘোষনা আসে। 

প্রতিষ্ঠাতার স্মৃতি চারন করতে গিয়ে কলেজের প্রথম দিকের অধ্যক্ষ খায়রুল আলম মল্লিক জানান, প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে কলেজের শিক্ষকদের যখন বেতন দেওয়া যেতনা তখন তিনি শিক্ষকদের বাড়ী যাওয়ার সময় দেখা হলে পকেটে দু’শো টাকা থাকলে সমুদয় টাকাই দিয়ে দিতেন। 

আব্দুল আউয়ালের ছোট ভাই ও তেলিহাটি ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল বাতেন সরকার বড় ভাইয়ের স্মৃতিচারন করতে গিয়ে বলেন, কলেজ নিয়ে রাত দিন পরিশ্রম করেছেন তিনি।  জীবনের প্রত্যেক বিষয়কেই কলেজের সাথে সম্পৃক্ত রেখেছেন।  তাঁর মৃত্যুতে আমি হারিয়েছি আমার অভিভাবককে কিন্তু দেশ হারিয়েছে একজন মহান দানবীরকে। 


এ ব্যাপারে আব্দুল আউয়াল কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি নিজের জীবনের চেয়েও কলেজকে ভালোবাসতেন।  তাঁর মৃত্যু ভুলার নয়।  আমরা আমাদের অভিভাবককে হারালাম এবং আব্দুল আউয়াল কলেজ হারালো তার প্রাণকে।  এ উপলক্ষ্যে কলেজে  আগামী ৩দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। 

এব্যাপারে আব্দুল আউয়াল সরকারের বাল্য বন্ধু এবং কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব আব্দুল আউয়াল বেপারী জানান, বাল্যকাল থেকেই তাঁর আচরণ সকলের দৃষ্টি ফেরাতো, তিনি ছিলেন ন্যায়-নিষ্ঠ, স্পষ্টভাষী এবং দানের এক মহিরুহ।  তাঁর কাছে সহযোগীতা চেয়ে খালি হাতে ফিরেছে এমন নজির খোঁজে পাওয়া দুস্কর।  কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য আমি সহ সমাজের প্রায় লোকের কাছেই তিনি একাধিক বার গিয়েছেন।  মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর স্বপ্ন, ইচ্ছে সবই ছিল এই কলেজকে ঘিরে।  তাঁর কলেজের সামনেই বাড়ী বানিয়েছেন শুধু সব সময় কলেজকে সামনে থেকে অবলোকন করার জন্য।  তিনি অসুস্থ্য অবস্থাতেও নিয়মিত বাড়ীর বেলকনিতে বসে বাইনোকুলার ব্যবহার করে কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের দেখে শান্তি পেতেন। 

এ বিষয়ে গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব এ্যাডভোকেট রহমত আলী বলেন, কলেজের জন্য ওনি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন।  এ কলেজ বর্তমান অবস্থানে আনতে কঠোর শ্রম ও স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়েছে তাঁকে।  আল্লাহ যেন উনাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন।