১০:১২ এএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | | ২৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

পোপের মিয়ানমার সফর আমাদের শব্দের গুরুত্ব বুঝিয়েছে

০২ ডিসেম্বর ২০১৭, ০২:০৫ এএম | সাদি


এসএনএন২৪.কম : এ সপ্তাহে মিয়ানমারে পোপ ফ্রান্সিসের তিন দিনের সফর চলতি বছর ফের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ কেড়েছে এমন একটি বিষয়ের দিকে, যাকে কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘জোরপূর্বক বিতাড়ন’র ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছে। 

২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর রোহিঙ্গাদের ছোট্ট একটি গ্রুপের হামলাকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী পোড়ামাটি নীতির অভিযান চালিয়েছে, যাতে বহু হতাহতের পাশাপাশি জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।  আগস্ট মাস থেকে ৬ লাখের বেশি মানুষ গৃহহারা হয়েছেন এবং তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে গেছেন। 

এ সংকটকে আরও জটিল করার জন্য মিয়ানমারের কর্মকর্তারা কেবল কোনো ধরনের অন্যায় সংঘটনের বিষয়টিই অস্বীকার করে থেমে থাকেনি, একইসঙ্গে দীর্ঘদিন থেকে দেশটির সরকারের নীতি হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গাদের বোঝাতে তাদের নামটিও ব্যবহার না করে বিপরীতে তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করা। 

রোহিঙ্গা মানবাধিকারকর্মীরা বছরের পর বছর ধরে বলে আসছেন, দেশটির এ নীতি হচ্ছে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে ভয়ানক বৈষম্য চালানোর জন্য সরকারের পদ্ধতিগত প্রচারণা নীতির অংশ। 

রোহিঙ্গা নিধনে সামরিক বাহিনীর অভিযানে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা, ধর্ষণ, এমনকি গোটা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।  জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা জেইদ রাইদ আল-হুসাইন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বলেছেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিপীড়ন ‘জাতিগত নিধনের উদাহরণ (টেক্সটবুক এক্সামপল ওন এথনিক ক্লিনজিং)’। 

মিয়ানমারের এসব নীতির কারণে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে দেশটির সরকার ও কার্যত নেতা, নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চি।  সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন নীতিকে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ, এমনকি সমালোচনা পর্যন্ত করতে অস্বীকার করার কারণে মানবাধিকার রক্ষার অক্লান্ত কর্মী হিসেবে তার মর্যাদা নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে। 

চলমান প্রচণ্ড এ উত্তেজনার মধ্যে চলতি সপ্তাহের শুরুতে পোপ ফ্রান্সিস মিয়ানমার সফরে গেছেন।  যদিও তুলনামূলকভাবে পোপের দায়িত্বকাল এখনও খুব বেশি হয়নি ফ্রান্সিসের, মানবজাতির সব সদস্যের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে পরস্পরের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে টিকে থাকার বিষয়ে তিনি কিন্তু ক্রমাগতভাবে আহ্বান করে যাচ্ছেন।  গত কয়েক মাস ধরে মিয়ানমারের সংকট নিয়ে তিনি বক্তব্য দিচ্ছেন, ‘আমাদের রোহিঙ্গা ভাইবোন’ বলে রোহিঙ্গাদের ভোগান্তির প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। 

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, তার মিয়ানমার সফরের সময় পোপ সরাসরি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন, এমনকি ব্যবহার করেননি ‘রোহিঙ্গা’ পরিভাষাটিও।  যাহোক, দেশে (ভ্যাটিকান) ফিরে যাওয়ার আগে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ছোট্ট একটি গ্রুপের সঙ্গে পোপের সাক্ষাতের কথা রয়েছে। 

বসনিয়া ও রুয়ান্ডার মতো রোহিঙ্গাদের বেলায়ও সহিংসতার নিন্দার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আন্তরিক ও অকৃত্রিম মনে হচ্ছে এবং সমস্যাটির সমাধানে তারা একটি উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন বলে মনে হচ্ছে।  যেমন, যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নীতির তীব্র নিন্দা করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে, ‘যারা এসব গণহত্যার পেছনে দায়ী তাদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে’। 

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য কয়েক মিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সৌদি আরব।  কিং সালমান হিউম্যানিটারিয়ান এইড অ্যান্ড রিলিফ সেন্টার (কেএস রিলিফ) রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের প্রয়োজনীয় সহায়তার পরিমাণ নির্ধারণের জন্য একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে। 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এ সংকটের ওপর মনোযোগ টানার বিষয়টি নিয়মিত ধরে রাখা।  এছাড়া ব্যক্তিগত পর্যায়ের ও বাড়িঘরের নিরাপত্তাসহ জাতিগত এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টির মৌলিক অধিকারগুলো অস্বীকার বন্ধে প্রতিনিয়ত মিয়ানমার সরকারকে আহ্বান জানিয়ে যাওয়া উচিত সবার। 

বিশ্বের যে কোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সত্য হতে পারে- কেবল কর্মকাণ্ড ও নির্যাতন-নিপীড়নই নয়, শব্দের ব্যবহারও একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ, পোপের সফর সেদিকেই আলোকপাত করছে।  এ কারণেই মিয়ানমারের গির্জার কর্মকর্তাদের প্রতি উপদেশের সময় তিনি রোহিঙ্গা পরিভাষাটি ব্যবহার করা থেকে বিরত থেকেছেন। 

সন্দেহ নেই, নিজের সফরে পোপ কূটনৈতিক স্পর্শকাতরতাকে বিবেচনায় নিয়েছেন এবং নিজের অতিথিদের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণ ঘটাতে চাননি।  কিন্তু তার অর্থ এই নয়, মিয়ানমার কর্মকর্তাদের ওইসব বিষয় অস্বীকারের সুযোগ দেয়া হচ্ছে, যা জাতিসংঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্টসহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থাও ভালোভাবে নথিভুক্ত করেছে। 

রোহিঙ্গাদের ভোগান্তি ও তাদের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত বৈষম্য বন্ধের আহ্বান ধীরে ধীরে কাঠামোবদ্ধ করে ফেলা কোনোভাবেই উচিত হবে না।  এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, রোহিঙ্গা সংকটটিকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের বৈশ্বিক অভিযানের অংশ হিসেবে আকৃতি দেয়া যেন না হয়। 

এটি পুরোপুরি নিখুঁতভাবে বোধগম্য, মুসলিম হওয়ার কারণেই মুসলিম দেশগুলোর নেতারা রোহিঙ্গাদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করবেন।  তবে সন্ত্রাসবাদী ও উগ্রপন্থী গ্রুপগুলোকে রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে তাদের মিথ্যা উদ্দেশ্যের সঙ্গে মিলিয়ে একেও যেন জটিল করা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। 

চরমপন্থী ও সন্ত্রাসীরা দীর্ঘ সময় ধরে বলে আসছে, বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে এবং এ কারণেই আল-কায়দা ও আইএস মুসলিমদের রক্ষায় লড়াই করছে।  মিসরের সিনাই উপত্যকার আল-রাওদা মসজিদে সাম্প্রতিক হামলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এমন দাবি আর সত্য হতে পারে না।  আইএস, আল-কায়দা ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি বর্বর যুদ্ধ শুরু করেছে। 

চলুন, রোহিঙ্গা সংকটকে প্রাকৃতিকভাবে পুরোপুরি ধর্মের কারণে হচ্ছে চিহ্নিত করে তাদের উদ্দেশ্যকে সত্যায়ন করা থেকে বিরত থাকি।  নিপীড়িত এ মানুষগুলোর সর্বশেষ যে বিষয়টি প্রয়োজন তা হল চরমপন্থী হয়ে পড়া তরুণরা বিভিন্ন দেশ থেকে সহিংস কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য রোহিঙ্গাদের কাছে যেন যেতে না পারে তা নিশ্চিত করা।  অন্যথায় পরিস্থিতি আরও খারাপই হবে। 

আরব নিউজ থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম
ফাহাদ নাজের : কলামিস্ট, ন্যাশনাল কাউন্সিল অন ইউএস-আরব রিলেশন্সের আন্তর্জাতিক বিষয়ক ফেলো