৩:১৭ এএম, ২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার | | ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

পাবনা মানসিক হাসপাতাল বিশেষায়িত কোন বিশেষণে?

১০ অক্টোবর ২০১৭, ০৮:৪০ এএম | ফখরুল


এসএনএন২৪.কমঃ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘বিদায় অভিশাপ’ কবিতায় ‘কচ ও দেবযানী’র কথোপকথনের এক পর্যায়ে দেবযানীর মুখে বলিয়েছেন, ‘রমণীর মন সহস্রবর্ষেরই, সখা, সাধনার ধন।  ’ শুধু রমণী নয়, যে কোনো মানুষের মনই বড় বিচিত্র। 

আর তাই কথায় আছে,—

“মানুষের মন

কভু সচেতন, কভু অচেতন

তবু তার সন্ধান পেয়েছে ক’জন

কে হয়েছে কবে কার সুজন স্বজন।  ”

আবার কারও মতে, ‘মন থেকেই হয়তো মানুষ নামের উত্পত্তি।  ’ তাই মনকে বাদ দিয়ে মানুষের পূর্ণতা কল্পনা করা যায় না।  কবিতায় আছে, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’, আবার পড়েছি ‘সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের হাতেই জগতের কল্যাণের ভার’ আর এই কল্যাণের জন্য প্রয়োজন একটি সুন্দর ও সুস্থ মন।  আমরা জানি, মানবদেহের মধ্যেই মনের অবস্থান।  মন অসুস্থ হয়ে যখন মানসিক অবস্থা অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে, তখনই আমরা বলি—মাথা খারাপ, পাগল কিংবা মানসিক রোগী। 

মস্তিষ্কের এই রোগ মানুষের চিন্তাশক্তি, অনুভূতি এবং আচরণকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে এবং কাজ করার অযোগ্য করে তোলে।  এই রোগে মানুষের আচার-আচরণ, কথাবার্তা, চিন্তা-ভাবনা সব কিছুই অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে।  এক সময় মানসিক রোগীকে বলা হতো জিনে বা ভূতে ধরেছে।  কেউ বলতেন অশুভ আত্মা ভর করেছে।  নিরাময়ের জন্য নির্ভর করতেন ঝাড়-ফুঁক, ওঝা কিংবা পানি পড়ার ওপর। 

আমরা বলি, ‘ভালো মনের মানুষ চাই, কালো মনের নয়’।  অথচ মনের সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তা না করলেও আমরা অনেকেই শরীরের সৌন্দর্য নিয়ে বড়ই চিন্তিত।  অথচ মন ভালো থাকলেই শরীর ভালো থাকে।  নানান কারণে মানুষ মানসিক রোগে ভুগছেন।  নানান অনিয়ম, অসঙ্গতি, সম্পত্তি, সংঘাত, সাংসারিক জটিলতা, পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতায় অনেকের মনেই দুশ্চিন্তা এবং ক্ষোভ জন্মায়।  সৃষ্টি হয় মানসিক অস্থিরতা ও অশান্তির।  ঘটে মানসিক বিপর্যয়। 

জন্ম নেয় নানান নামের নানান মনোরোগ—সিজোফ্রেনিয়া, মুড ডিসঅর্ডার, বিষণ্নতা, প্যানিক ডিসঅর্ডার, ইনসমনিয়া, মাদকাসক্তি ইত্যাদি ইত্যাদি।  এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সারা দেশে মোট মানসিক রোগীর সংখ্যা ২ কোটি ২৪ লাখ ৭০ হাজার।  এর মধ্যে গুরুতর মানসিক রোগী হচ্ছেন ১৪ লাখ এবং লঘু মানসিক রোগী ১ কোটি ১৭ লাখ ৬০ হাজার।  আর জনসংখ্যা অনুযায়ী ২ লাখ ১৪ হাজার মানুষের জন্য একটি মাত্র শয্যা রয়েছে।  দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এই রোগে ভুগলেও চিকিৎসা ক্ষেত্রে এর অবস্থান অনেক পেছনে। 

ফলে মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষগুলো নিজেরা যেমন কষ্ট পান, তেমনি কষ্ট পায় তাদের পরিবার।  এই মানসিক রোগীদের চিকিৎসার প্রয়োজনেই ১৯৫৭ সালে পাবনা জেলার হেমায়েতপুরে চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে তোলা হয়েছে, ‘পাবনা মানসিক হাসপাতাল’।  আমরা আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং দেশের দর্শনীয় স্থানগুলোতে গিয়ে ইত্যাদি ধারণের ধারাবাহিকতায় এবার গিয়েছিলাম গাঙ্গেয় প্লাবন ভূমির অন্তর্গত গুরুত্বপূর্ণ জেলা পাবনাতে। 

ধারণ স্থান ছিল আমাদের দেশের শতাব্দী পেরিয়ে আসা একমাত্র ইস্পাত নির্মিত সর্ববৃহৎ রেল সেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজের সামনে।  অর্থাৎ আমাদের মঞ্চের পেছনে ছিল রেল সেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ আর সামনে সড়ক সেতু লালন শাহ ব্রিজ।  প্রাচীন আর বর্তমানের দুই পাশাপাশি নিদর্শন এবং পাশে বহমান গঙ্গা নদীর ধারা মিলিয়ে প্রাকৃতিক ও মানবীয় কীর্তির এক চমৎকার দর্শনীয় স্থান।  উল্লেখ্য, এই গঙ্গা নদীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩০ কিলোমিটার।  যেটি গোয়ালন্দের কাছে যমুনা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পদ্মা নাম ধারণ করেছে। 

এই গঙ্গাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ ‘গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প’ সংক্ষেপে জিকে।  আমরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের যেখানেই যাই চেষ্টা করি সেই স্থানের গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা বা বিষয়গুলোকে তুলে ধরতে।  যেহেতু মানসিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য ‘পাবনা মানসিক হাসপাতাল’ একটি প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী হাসপাতাল, তাই আমরা ইত্যাদির টিম নিয়ে গিয়েছিলাম এই বিশেষায়িত হাসপাতালটিতে।  চিত্তক্ষোভ, চিত্তদাহ বা চিত্তচাঞ্চল্য থেকে চিত্তপ্রশান্তির প্রত্যাশায় অনেকেই এই হাসপাতালে আসেন চিত্ত চিকিৎসকের কাছে পরামর্শ লাভের আশায়। 

এক সময় হাসপাতালটি ১১১ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত থাকলেও পাবনা মেডিকেল কলেজকে ৩০ একর জমি হস্তান্তর করার ফলে বর্তমানে ৮৮ একর জায়গাজুড়ে এর অবস্থান।  হাসপাতালের পুরো স্থানজুড়ে রয়েছে ১০টি ভবন।  যেখানে মোট ওয়ার্ড সংখ্যা ১৮টি।  শয্যা রয়েছে ৫০০টি।  এর মধ্যে ১৫০টি শয্যা অর্থের বিনিময়ে এবং ৩৫০টি শয্যা বিনামূল্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়।  সব সময়ই রোগীতে পূর্ণ থাকে এই হাসপাতাল।  দেশে কী হারে মানসিক রোগীর সংখ্যা বাড়ছে তা বোঝা যায় এই বিশেষায়িত হাসপাতালটিতে গেলে।  হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসেন চিকিৎসাপ্রত্যাশী দুই শতাধিক রোগী। 

এসব রোগীর জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি।  পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অধিকাংশ রোগীকেই ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বহির্বিভাগ থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।  কেবল জটিল রোগীদের ভর্তি করা হয় হাসপাতালে।  কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভর্তি হওয়া রোগীরা কী এখানে প্রকৃত এবং প্রয়োজনীয় সুচিকিৎসা পাচ্ছেন? এই হাসপাতালের প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থা, সেবার মান এবং পরিবেশ কী মানসিক রোগীকে সুস্থ করার জন্য যুগোপযোগী?

আমরা গিয়েছিলাম পুরুষ এবং মহিলাদের জন্য নির্ধারিত বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে।  প্রথমেই যাই পুরুষদের একটি ওয়ার্ডে।  যেখানে ১৫/২০ বছরের পুরনো রোগীরাও আছেন।  অবাক করার মতো বিষয় হলো, আমাকে দেখা মাত্রই সবাই বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন।  কেউ আমার নাম ধরে, কেউবা আবেগাপ্লুত হয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি বলে চিৎকার করে উঠলেন।  কেউ আবার ইত্যাদির সূচনা সংগীত গাইতে শুরু করলেন।  কেউ ভিজিটিং কার্ড চাচ্ছিলেন। 

তাদের উচ্ছ্বাস দেখে আমি অভিভূত হয়ে গেলাম।  যারা ইত্যাদির এই পাবনা পর্ব দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই এ বিষয়গুলো দেখেছেন।  তাদের সঙ্গে কথা বলে আমার মনেই হয়নি তারা রোগী এবং তাদের হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন আছে।  এখান থেকে নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের ওয়ার্ডে গেলাম।  এই ওয়ার্ডের নাম ‘অ্যাডমিশন ওয়ার্ড’।  এই ওয়ার্ডে রোগীদের কোনো খাট দেওয়া হয় না।  রাতের বেলায় ঘুমানোর জন্য ম্যাট্রেক্স ও চাদর দেওয়া হয়।  কারণ হাসপাতালে ব্যবহৃত লোহার তৈরি খাট দিলে রোগীরা যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটাতে পারেন। 

যদিও বিদেশে এ ধরনের ওয়ার্ডে দেয়ালে প্যাড দেওয়া থাকে, যাতে রোগীরা দেয়ালে কোনো আঘাত না পান।  এরপর গেলাম মহিলাদের ওয়ার্ডে।  সেখানে আমাকে চিনতে পেরে অনেকেই এগিয়ে এসে অভিযোগ করলেন, ভাই আমরা অনেক অসুবিধায় আছি।  জানতে চাইলাম, কিসের অসুবিধা? বললেন, খাওয়ার অসুবিধা।  নিরামিষ, ডাল এসবই নাকি নিয়মিত খাবার।  কোনো কোনো বেলায় ব্রয়লার মুরগি দেওয়া হয়, তাও আবার এক টুকরা।  মাছ দিলে তার আকৃতি থাকে খুবই ছোট। 

মানুষ যে কতটা অসহায় সেটা বোঝা যায় যখন সে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে।  রোগীদের বিভিন্ন অভিযোগকে অনেকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেন; কিন্তু রোগীদের সব অভিযোগ, ক্ষোভ আর কষ্টের কথাগুলো যে পাগলের প্রলাপ নয়, নির্মম সত্য তা বোঝা গেল হাসপাতালের রান্নাঘরে গিয়ে।  যারা ইত্যাদির গত পর্ব (পাবনায় ধারণকৃত) দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই হাসপাতালের ডাল আর সবজির চেহারা দেখেছেন।  ডাল নয়, যেন ডাল রংয়ের পানি। 

বিশাল এক ডেকচিতে ডাল থাকলেও বড় একটি চামচ দিয়ে ডেকচি থেকে ডাল তুলতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়েছি।  একজন রোগীর চার বেলা খাবারের জন্য এখানে সরকারি বরাদ্দ মাত্র ১২৫ টাকা।  এই দুর্মূল্যের বাজারে ১২৫ টাকায় চার বেলা খাবারের মান কেমন হতে পারে তা হাসপাতালের ডাল এবং হাসপাতালে ভর্তি ৪৭২ জন রোগীর জন্য রান্না করা সবজির পরিমাণ দেখেই বোঝা গেছে।  তার ওপর রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ।  তারপর আবার বিশেষায়িত হাসপাতাল বলে অন্যান্য হাসপাতালের মতো এখানে বাইরে থেকেও খাবার অনুমোদিত নয়।  রোগীর ওষুধ-পথ্যসহ সমস্ত দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। 

নিম্নমানের খাবারের কারণে এখানে ভর্তি হওয়া রোগীরা অল্প দিনের মধ্যেই ভুগতে থাকেন পুষ্টিহীনতায়।  এ ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক তন্ময় প্রকাশ বিশ্বাসের কাছে জানতে চাইলে, তিনি নিজেও রোগীদের খাবার নিয়ে তার অসন্তুষ্টির কথা জানান এবং অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন।  এ ব্যাপারে তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগ করেছেন বলেও জানান।  কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি।  তন্ময় বিশ্বাস জানান, ‘রোগীদের জন্য ১২৫ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ট্যাক্স এবং ভ্যাটের কারণে সেখানে টিকে মাত্র ১০০ টাকা।  ১০০ টাকায় যেভাবে খাওয়ানো যায় সেটাই তারা খাওয়াচ্ছেন’।  আর এই খাবার খেয়ে কষ্ট পাচ্ছেন অসহায় রোগীরা। 

শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে।  ধাপে ধাপে দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা দেওয়ার পর একজন মানসিক রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।  এসব ধাপের মধ্যে একটি হচ্ছে পরিবেশ ও বিনোদন।  অর্থাৎ মানসিক রোগীদের জন্য প্রয়োজন মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ।  ফুলের বাগান এবং স্বস্নেহে হৃদ্যতামূলক পরিচর্যা।  কিন্তু এই বিশাল কম্পাউন্ডের বিশেষায়িত হাসপাতালটিতে কোনো ফুলের বাগান নেই।  নেই সৌন্দর্য বর্ধণের কোনো প্রচেষ্টাও।  অথচ ফুলের বাগানে বিচরণও মানসিক উত্কর্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।  এ ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক জানালেন, তাদের জনবল নেই।  সে কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নাকি কাঙ্ক্ষিত মানের সৌন্দর্য বর্ধন এবং হাসপাতালের আগাছা কর্তন সম্ভব হচ্ছে না। 

রোগীদের জন্য নির্ধারিত আরও কিছু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখলাম—কেউ গাইছেন, কেউ হাসছেন, কেউ কেউ এমনভাবে আমার সঙ্গে কথা বলছেন যেন আমাকে অনেকদিন ধরে চিনেন।  বেশ আন্তরিক পরিবেশে কথা হচ্ছিল আমাদের মধ্যে।  তাত্ক্ষণিকভাবে রোগীদের এসব কর্মকাণ্ড দেখলে যে কেউ ভাবতে পারেন, এরা বোধহয় খুবই আনন্দে আছেন।  কিন্তু এদের কথাবার্তা বা অভিযোগগুলো শুনলে মনে হবে, তারা খুব একটা ভালো নেই।  মানসিকভাবে অসুস্থ বলে এরা হয়তো প্রতিবাদ করতে পারেন না।  হাসপাতাল পরিচালক জানালেন, রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকও নেই এই হাসপাতালে। 

বর্তমান অবস্থায় কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ জন চিকিৎসক প্রয়োজন।  তাহলে রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে।  শুধু তাই নয়, হাসপাতাল ভবনের অবস্থাও ভালো নয়।  জায়গায় জায়গায় ছাদের সিমেন্ট-বালি খসে পড়েছে।  যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।  তিনি বলেন, প্রতিটি বিষয়ে বহুবার যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও কোনো সমাধান হচ্ছে না।  আর কর্তৃপক্ষের নীরবতায় শাস্তি পাচ্ছেন হাসপাতালে অবস্থানরত এই মানসিক ভারসাম্যহীন অসহায় মানুষগুলো।  এসব দেখে স্বভাবতই প্রশ্ন আসে—পাবনা মানসিক হাসপাতাল একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল।  কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—হাসপাতালটি বিশেষায়িত কোন বিশেষণে?

এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য, যেহেতু এখানে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা করা হয় তাই এখানে রোগীদের সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্সসহ সবারই কাজে নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে।  রোগীদের দ্বারা প্রায়ই তাদের নাজেহাল কিংবা শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়।  হাসপাতালে রোগীদের দ্বারা কর্মচারীদের ছুরিকাহতের মতো ঘটনাও ঘটেছে।  কর্মচারীরা আমাদের জানালেন, এখানে কাজের ঝুঁকি আছে কিন্তু ঝুঁকি ভাতা নেই। 

ঝুঁকি থাকার কারণে শূন্য পদ থাকলেও অনেকে এখানে আসতে চান না।  যেহেতু এই হাসপাতালটি বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং এর রোগীরাও স্বাভাবিক নয়, তাই প্রতি মুহূর্তে এখানে কর্মরত সবাইকে একটা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হয়।  সে জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকি ভাতা দেওয়া প্রয়োজন। 

‘মানুষের জন্য মানুষ’—এই সত্যটা বোধহয় আমরা ভুলে গেছি।  কোনো মানসিক রোগী একটু সুস্থ কিংবা স্থিতিশীল হয়ে উঠলে চিকিৎসকরা আশা করেন, সে হয়তো তার পারিবারিক পরিবেশে গেলে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবেন।  কিন্তু দুঃখের বিষয় এদের অনেককেই পারিবারিক পরিবেশে নেওয়ার কোনো উপায় নেই।  কারণ আগে হাসপাতালে ভর্তির সময় অধিকাংশ রোগীর অভিভাবকই ভুল ঠিকানা দিয়ে যেতেন। 

বর্তমানে রোগীর নাগরিকত্ব সনদ এবং অভিভাবকের জাতীয় পরিচয়পত্র জমা নেওয়ার কারণে এ সমস্যা খুব একটা নেই।  তবে পুরনো রোগীর বেলায় সমস্যাটা প্রকট।  বিশেষ করে ১০/১৫ বছরের পুরনো রোগীরা আপন ঠিকানায় যেতে ব্যাকুল হলেও ভুল ঠিকানার জন্য যেতে পারছেন না।  আমরা নিজেরাও বেশ কটি ঠিকানায় যোগাযোগ করে কোনো স্বজনকে খুঁজে পাইনি।  আবার কিছু কিছু রোগী আছেন যাদের ঠিকানা ঠিক থাকলেও স্বজনরা নিতে গড়িমসি করেন। 

আসলে রোগীদের যারা রেখে যান তারা তাকে যেন চিরদিনের জন্যই রেখে যেতে চান।  তাই দিয়ে যান ভুল ঠিকানা, যাতে সে আর কখনো ফিরতে না পারে।  যা তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথে অন্তরায়।  অথচ এই রোগীও একজন মানুষ।  একটি জীবন্ত প্রাণ, হয়তো সেই জীবনেরও আছে কোনো বেদনা আর হতাশার কথা।  তাই বলতে ইচ্ছে করে—

‘মানসিকভাবে অসুস্থ জন তাকে যদি বলো দুস্থ

তুমিও তো পর্যুদস্ত, তুমিও তো নও সুস্থ

হায়রে মানুষ কিসের মানুষ

কী সে তার বিশেষত্ব

না রইলে মনুষ্যত্ব।  ’

আমরা চাই এসব রোগীর স্বজনরা যেন হাসপাতালে ভুল ঠিকানা দিয়ে অসহায় মানুষগুলোর সঙ্গে আর প্রতারণা না করে।  আমরা চাই এই বিশেষায়িত হাসপাতালটি যেন সবার সার্বিক সহযোগিতায় এই মানুষগুলোকে সঠিক সেবা দিতে পারে।  সুস্থ হয়ে তারা যেন ফিরে যেতে পারেন আপন ঠিকানায়। 

লেখক : গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়ন কর্মী।