৭:১৯ পিএম, ১৭ জুলাই ২০১৯, বুধবার | | ১৪ জ্বিলকদ ১৪৪০




প্রাণের মেলায় চেয়ে থাকি নতুন প্রাণের দিকে

২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:৫৯ এএম | জাহিদ


শেষ মাঘের এইসব দিনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে বেশ হতশ্রী দেখায়।  কেননা শীতের শেষে পাতা ঝরে গেলে বিবর্ণ গাছে প্রাণের কোনো চিহ্নই থাকে না আর।  কিন্তু প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ করে না।  হয়তো এ জন্য সুষমাহীন বিষণ্ন বৃক্ষ দেখে নাগরিকদের যে দীর্ঘশ্বাস, তা দূর করার উপায় মেলে বইমেলার বইয়ের পাতায়। 

অপ্রতিরোধ্য পুঁজিতন্ত্রে বৃক্ষের পাতা এখনো বিপণনযোগ্য হয়ে ওঠেনি।  অন্যদিকে বইয়ের পাতার রঙ, গন্ধ, নির্যাস, শব্দ- সব মিলিয়ে বই বিপণনযোগ্য পণ্য।  দুয়ের এই অমিল সত্ত্বেও বৃক্ষের সঙ্গে বইয়ের মিলও কম নয়।  বৃক্ষগুলোর মধ্যে যেমন হালকা ছায়ার বৃক্ষ আছে, ঘন ছায়ার বৃক্ষ আছে- বইয়েরও তেমনই। 

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ডম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ বইটির কথা ধরা যাক।  টানা ৮০টি দুর্দিন পার করে একটি মাছও জালে তুলতে না পারা পরাজিত স্যান্টিয়াগো শেষ পর্যন্ত পাঠকের কাছে হয়ে ওঠে জয়ের প্রতীক।  এই বইয়ে জয়-পরাজয়ের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব জাগানিয়া প্রেরণাদায়ী বাক্যগুলো যে কোনো নিঃসঙ্গ পরাজিত মানুষের পরম সহায়।  বই এমনই বিমূর্ত বন্ধু।  বইয়ের চরিত্রগুলো পাঠকের অজান্তে কখনো সাহস, কখনো শক্তি কখনো উৎসাহদাতা।  দারিদ্র্য, দুর্ভাগ্য ও নিঃসঙ্গতম জীবনে বৃদ্ধ স্যান্টিয়াগোর বন্ধু কেবল উড়ন্ত মাছ, পাখি আর ডলফিন।  দুর্দিনে এগুলোই তাকে বিশাল হাঙরের আক্রমণের মুখে টিকে থাকার সাহস জুগিয়েছে।  

স্যান্টিয়াগো নামের কিউবান এই জেলে কখন পাঠকের অবচেতনে বন্ধু হয়ে ওঠে, কখন যে শিখিয়ে দেয় মানুষের মৃত্যু আছে কিন্তু পরাজয় নেই-এর মতো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া বাক্য।  স্যান্টিয়াগো আমাদের কাছে পরিণত হন অসীম ধৈর্য ও অপরাজেয় মনোবলের প্রতীকে।  চিরদিনের জন্য দিশাহারা সংগ্রামী মানুষের প্রতীক। 

এ বইটি জামগাছের ঘনছায়ার মতো আশ্রয়দানকারী।  আবার কোনো কোনো বই চাকুয়াকড়ই গাছের মতো হালকা ছায়াদানকারী।  সেসব কোন বই, তা না হয় না-ই বললাম।  তবু তো বই এবং এই বইয়ের লেখকও তার বইটির প্রকাশের উপলক্ষ বলে বইমেলাটিকে প্রাণের মেলা ভাবেন।  বইমেলা প্রাণের মেলা হয়ে ওঠার পেছনে সিংহভাগ কৃতিত্ব এই নতুন লেখকদের। 

প্রতিষ্ঠিত ও প্রবীণ লেখকদের বইমেলা নিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হওয়ার সুযোগ নেই।  তাদের প্রাপ্তির ঝুলি ইতোমধ্যেই পূর্ণ হয়ে উপচে পড়েছে।  কিন্তু নতুন ও অপ্রতিষ্ঠিত লেখক, যিনি প্রকাশক, পাঠক কিংবা সমালোচক- কারো কাছেই খুব আদরনীয়, সমাদৃত নন।  তারপরও তার কাছে বইমেলা প্রাণের মেলাই।  ‘প্রাণের মেলা’ শব্দটি নতুন লেখকের মুখেই সবচেয়ে বেশি মানিয়ে যায়। 

জটিল এই রাজধানীর জটিলতর নাগরিকের প্রাণ ওয়েব পেজে, না আপডেটেড আইপ্যাডে, নাকি হোম স্ক্রিন ট্যাবডঅ্যাপে, নাকি অন্য আর কোনো স্মার্ট ডিভাইসে এ প্রশ্নও এসে যায়।  কিন্তু কোনো নতুন লেখকের প্রাণ যে বইয়ের এ মেলাতেই, এতে সন্দেহ নেই। 

দুই

সৃজনশীলদের জন্য এই নগরে নিত্য কত আয়োজনই তো থাকে! চলচ্চিত্রকারদের জন্য আছে চলচ্চিত্র উৎসব।  নৃত্যশিল্পী, সংগীত শিল্পীদের জন্য কত বিচিত্র সব আয়োজন! সব পেশাজীবীরই মিলিত হওয়ার, নিজেকে প্রকাশ করার মিলন উৎসব আছে।  কিন্তু এসব আয়োজনের কোনোটির সঙ্গেই ‘প্রাণ’ শব্দটি যুক্ত হয়নি।  তা হলে বইমেলা কী করে প্রাণের মেলা হয়ে উঠল? এর একটি কারণ হতে পারে, পেশা হিসেবে লেখকসত্তা উদযাপনযোগ্য কোনো আনন্দ নয়- না পরিবারে, না পরিচিত পরিসরে।  পরিচিত পরিসরে কারো লেখক হয়ে ওঠাটা কাছের মানুষের কাছে একরকম দুশ্চিন্তার বিষয়। 

কেউ গানের শিল্পী হয়ে উঠলে পরিবার তাকে নিয়ে গর্ব করে।  আবৃত্তি কিংবা গ্রুপ থিয়েটারের মতো অলাভজনক পেশাতেও সমাজ কখনো কখনো সম্ভাবনা দেখতে পায়।  কিন্তু যে লেখক প্রতিষ্ঠা পাননি সমাজে, তার চেয়ে অবহেলিত পেশাজীবী আর কেউ নেই।  বছরের বাকি ১১ মাস অবহেলিত, নিগৃহীত, অবাঞ্ছিত এই নতুন লেখক একমাত্র বইমেলা কেন্দ্র করেই নিজেকে প্রকাশের সুযোগ পান।  সমচিন্তার মানুষের সঙ্গে লেখকের সাক্ষাৎ হয়, সম্ভবত এ মেলাই তার জন্য সবচেয়ে স্বস্তিকর এলাকা। 

যে সমাজে সবাই ধন-সম্পদের সাধনায় লিপ্ত, জ্ঞানসাধনা যে সমাজের কাছে কলুর বলদের ঘানিটানা সমতুল্য কাজ- ওই সমাজে লেখক যে বিপন্নসত্তা হবে, এ আর আশ্চর্য কী! এর ওপর তিনি যদি এমিল জোলার মতো ড্রাইফুস মামলার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হন, দস্তয়ভস্কির মতো নির্বাসিত লেখক হন কিংবা পুশকিনের মতো মেহনতি মানুষের কথা বলতে চান- তা হলে তার দুর্দশা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়।  কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতা অনুকরণে বলা যায়, ‘জিহ্বা তো দিয়েছি শিকলের প্রতিটি আংটায়..,’। 

তবে লড়াইয়ের ভাষা সাহিত্যের মধ্যে কণ্ঠস্বর খুঁজে পেলে পাঠক পেতে পারেন একজন সুকান্ত ভট্টাচার্য, সৌমেন চট্টোপাধ্যায় কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।  বাংলা ভাষায় এমন ভাগ্য কদাচিৎ মেলে অবশ্য।  বেশি মেলে আইয়ুব খানের রাজত্বকালে তার কৃপাদৃষ্টিলাভের জন্য লেখা ‘ফ্রেন্ড নট মাস্টার’জাতীয় বইয়ের অনুবাদ।  একই সঙ্গে বেতার-টিভিতে এ জাতীয় বইয়ের প্রশংসার প্রতিযোগিতা। 

তিন

বইমেলা চলাকালীন ‘বইপ্রেমিক’ শব্দটি ঘুরেফিরে আসে বারবার।  মাইক্রোফোন হাতে টেলিভিশনের নবীন সঞ্চালক মেলায় যারই দেখা পান, তাকেই বইপ্রেমী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।  সঞ্চালকের উচ্চারণ অনুযায়ী বইপ্রেমিকের সংখ্যা এতশত হলে মন্দ হতো না।  লেখকের দুঃখও ঘুচে যেত।  কিন্তু মুশকিল এই যে, ওই বইপ্রেমিকদের প্রেমিক হিসেবে কখনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় না।  তারা যা পড়েন, তা মহৎ সাহিত্য কিনা- তা বিবেচনা করার পরোয়া করেন বলে মনে হয় না। 

প্রশ্ন উঠতে পারে, বই-ই তো পড়ছেন, আর দশটা গৃহস্থালির ভোগ্যপণ্য তো আর কিনছেন না? এসব প্রশ্নের উত্তর হলো, ক্ষতি আছে।  সব কিছুই শিখতে হয়।  পাঠক হওয়ার জন্যও শিখতে হয়।  পাঠক হিসেবে উত্তীর্ণ হতে হয়।  গড় পাঠক যেসব বই কিনছেন, সেসব বইয়ের কোনো চরিত্র তাদের ঘোরগ্রস্ত করে রাখার ক্ষমতা রাখে কিনা? ঘুরেফিরে এসব চরিত্রের সঙ্গে পাঠকের দেখা হয় কিনা? বইটি তার মানসিক ভিত গড়ে দিল কিনা? এতদূর যদি নাও ভাবি, তা হলে অন্তত এটুকু দাবি তো করা যেতেই পারে- বইটি তাকে ভাবাতে পারছে কিনা?

সাহিত্যকে শিল্পগুণ দিয়ে বিচার করার পাঠকের সংখ্যা কমছে, ক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে।  ক্রেতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া মানেই পাঠকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া নয়।  তা ছাড়া ‘বইপ্রেমী’ শব্দটির মধ্যে ভিন্নতর ব্যঞ্জনাও রয়েছে।  কেবল হাত দিয়ে বই ছুঁয়ে দেখা মানেই বইপ্রেমী নয়, প্রেম দীর্ঘ ও গভীর সাধনার বিষয়।  একমাত্র সাধক পাঠকই বইপ্রেমী বিশেষণ পাওয়ার দাবিদার। 

চার

এবার বইমেলার পারিপাট্য, সুবিন্যাস ও স্থাপত্যরীতির বিস্তর প্রশংসা শুনেছি।  কিন্তু কেবল কারিগরি সুব্যবস্থাপনাই বইমেলার প্রাণ নয়, বইমেলার প্রাণ বই-ই।  এটি পিডিএফ কিংবা ই-বুক নয়, বইমেলার প্রাণ নির্মম পরিহাসের বিষয় হবে যদি ওই প্রাণ যথাযথ মূল্যায়ন না হয়। 

পাঁচ

রাজা মিডাসের স্পর্শে সব কিছু স্বর্ণে রূপান্তরের গল্প আমরা জানি।  পুঁজিতন্ত্রও রাজা মিডাসের মতো যা কিছু স্পর্শ করে, তা পণ্যে পরিণত হয়- এটি ঠেকানোর কোনো উপায় আপাতত নেই।  কিন্তু আপাতত এটুকুই দাবি- যে পণ্যটির উপযোগিতাবাদ সবচেয়ে বেশি, সেটিই যেন পাঠকের হাতে পৌঁছায়।  মহৎ বইগুলো যেন পাঠক চিনতে শেখেন। 

ছয়

পাপুয়া নিউগিনির মানস দ্বীপে অস্ট্রেলিয়ার আটক কেন্দ্রে কয়েক বছর ধরে ইরানি কুর্দি সাংবাদিক ও শরণার্থী বেহরুজ বুচানি বন্দি অবস্থাতেই হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা রচনার মাধ্যমে তৈরি করেছেন ‘নো ফ্রেন্ডস বাট দ্য মাউন্টেনস : রাইটিং ফ্রম মানস প্রিজন’ নামক বই।  বইটির জন্য মূল্য বিচেনায় অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে দামি পুরস্কার ‘ভিক্টোরিয়ান প্রাইজ ফর লিটারেচার’ পেয়েছেন। 

সাগরপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কীভাবে শরণার্থীরা অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান এবং দেশটি কীভাবে কিছুতেই শরণার্থীদের বসবাসের অনুমতি দেয় না, তা নিয়ে লেখা কাহিনি।  ‘ভিক্টোরিয়ান প্রাইজ ফর লিটারেচার’ পুরস্কারের অর্থমূল্য ৯০ হাজার মার্কিন ডলার।  অচেনা বেহরুজকে অভিনন্দন।  ভালো হয়- যদি আমাদের বইমেলাতেও অপরিচিত অখ্যাত অপ্রতিষ্ঠিত কিন্তু ভালো লেখাগুলো মূল্যায়িত হয়।