৮:০২ পিএম, ২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার | | ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

South Asian College

প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকার

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৪:৫৬ পিএম | সাদি


এসএনএন২৪.কম : শিশুদের জীবন গড়নে বাবা মায়ের ভূমিকার পাশাপাশি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  বাবা মা সহ পরিবারের সদস্যগণ অনেক ক্ষেত্রেই এই ভূমিকা পালন করতে পারেন না।  এক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব ও অবহেলাই অনেকাংশে দায়ী।  গরীব ও নিরক্ষর পরিবারগুলোতে সচেতনতার অভাব ও অবহেলা সবথেকে বেশি পরিলক্ষিত হয়।  তারা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে করণীয় ভূমিকা পালণ করেন না বিধায় শিশুরা অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, কুসংস্কার ইত্যাদির মধ্যে বড় হয়।  ফলে তাদের বিকাশ হয় ক্ষতিগ্রস্থ, তারা একটা অস্বাভাবিক পরিবেশে হয়ে উঠে বড়। 

প্রতিবন্ধিতা একটি সামাজিক প্রতিবন্ধক।  এ প্রতিবন্ধকতা থেকে প্রতিবন্ধী শিশুরাও মুক্ত নয়।  পরিবার ও সমাজের বিভিন্ন নিয়মকানুন, প্রথা ও কুসংস্কার তাদের করে ফেলে আচ্ছন্ন।  একজন অপ্রতিবন্ধী শিশুর চেয়ে প্রতিবন্ধী শিশুর উপর আরোপিত হয় কয়েকগুণ সমস্যা।  তার শারীরিক বা মানসিক বা ইন্দ্রিয়গত সমস্যাই তাকে পেছনে ফেলে দেয় কয়েক গুণ।  এ সমস্যাগুলোর জন্য একটি শিশু দায়ী না হলেও তার উপর চাপানো হয় দায়ভার।  ফলে এ শিশুটি হয় চরম অবহেলার শিকার। 

এ অবহেলা তাকে বঞ্চিত করে মৌলিক চাহিদা যথা: অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা হতে প্রতিবন্ধিতা একটি বিকাশমান ধারণা।  প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ‘প্রতিবন্ধিতা’ অর্থ যেকোন কারণে ঘটিত দীর্ঘমেয়াদী বা স্থায়ীভাবে কোন ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত বা ইন্দ্রিয়গত ক্ষতিগ্রস্থতা বা প্রতিকূলতা এবং উক্ত ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পরিবেশগত বাধার পারস্পরিক প্রভাব, যার কারণে উক্ত ব্যক্তি সমতার ভিত্তিতে সমাজে পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণে বাধাপ্রাপ্ত হন। 

প্রতিবন্ধিতাকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত, ইন্দ্রিয়গত ক্ষতিগ্রস্থতা এবং প্রতিকূলতার ভিন্নতা বিবেচনায়, প্রতিবন্ধিতার ধরনসমূহকে ১১ ভাগে ভাগ করা হয়েছে, অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারস, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা, দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা, বাক প্রতিবন্ধিতা, বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা, শ্রবণ-দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা, অন্যান্য প্রতিবন্ধিতা। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রতিবন্ধী শিশুরা যেন অন্যান্য শিশুদের মতই সমানভাবে সকল মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা উপভো করতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য তার সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।  প্রতিটি শিশুকে সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করার জন্য সহযোগিতা করতে হবে। 

সমাজের একটি বড় অংশ হলো শিশু।  আমাদের শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী অনুর্ধ্ব ১৮ (আঠার) বৎসর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসেবে গণ্য হয়।  শিশুকাল মানুষের জীবনে অত্যনত গুরুত্বপূর্ণ সময়।  এ সময়টা হলো পূর্ণাঙ্গ জীবন গড়নের প্রাথমিক ধাপ।  এ ধাপে মূলভিত্তি তৈরি না হলে জীবনের পরবর্তী ধাপগুলোতে অসম্পূর্ণতা থেকেই যায়।  এ সময়টাতে পরিচর্যার মাধ্যমে জীবনকে শানিত না করলে পরবর্তী পুরো জীবনেই তার প্রভাব থাকে বিদ্যমান। 

একজন প্রতিবন্ধী শিশুর বাবা, মা ও পরিবারের সদস্যগণ ভাবেন প্রতিবন্ধী সন্তানের কোন ভবিষ্যৎ নেই, তাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।  তাকে আবদ্ধ ঘরেই কাটাতে হবে জীবনটা।  তাই এ প্রতিবন্ধী শিশুটির উপর তারা বিনিয়োগ করতে চান না।  ফলে তার শিক্ষা, চিকিৎসা সহ মৌলিক চাহিদাগুলোর যোগান থাকে না তার জীবনে।  ফলে শিশুকাল থেকেই শিশুটি উপলব্ধি করতে পারেন তার উপর আরোপিত বৈষম্য সম্পর্কে।  এ বৈষম্যের উপলব্ধি তার জীবনকে বিষিয়ে তুলে, যার ফলে তার জীবনটা ধাবিত হয় অস্বাভাবিকতার দিকে।  যদিও সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে ও অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।  তারপরও শহর থেকে দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এর ব্যাপকতা অনেক।  এ অবস্থার উন্নয়নে আরো অনেক বেশি কাজ করতে হবে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে। 

আমরা যেকোন সময় উপরের যেকোন ধরনের প্রতিবন্ধিতার শিকার হতে পারি।  এই প্রতিবন্ধিতা একটি জীবনকে জটিল ও কঠিন করে তোলে।  বাবা মা সহ পরিবার এবং সমাজ এই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে তাদের সহযোগিতার হাত স¤প্রসারিত না করলে তাদের জীবন হয়ে উঠবে দুর্বিসহ।  অথচ সমাজের সকল স্তরের মানুষ তাদের চলাফেরা, লেখাপড়া, খেলাধুলা ইত্যাদিতে সহযোগিতা করলে তাদের জীবনের কষ্টগুলো অনেকাংশে কমে যায়।  তাদের যদি মূলস্রোতধারায় সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয়া যায় তখন তাদের আত্মসম্মান, মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস অনেকগুণ বেড়ে যায়।  ফলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ তাদের জীবন বিকাশের পথগুলো খুঁজে পায়।  এর ফলে তাদের পরিবার ও সমাজের উপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে যায়।  তারা আত্মনির্ভরশীল হয়ে সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা পালন করতে পারে। 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে উন্নয়নশীর দেশগুলোতে প্রতিবন্ধিতার হার ১৫%।  সে হিসেব মোতাবেক আমাদের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ধরা হলে ২ কোটি ২৫ লক্ষ জন প্রতিবন্ধিতার শিকার।  এ বিরাট অংশকে উন্নয়নের বাইরে রেখে সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।  রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই এই অংশকে উন্নয়নের মূলস্রোতধারায় নিয়ে আসতে হবে।  অবশ্যই সকল শিশুকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে হবে এবং সমান গুরুত্ব দিতে হবে।  কোন ভাবেই প্রতিবন্ধী শিশুদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না। 


লেখকঃ আবছার উদ্দিন অলি, সাংবাদিক ও গীতিকার