১১:৩১ পিএম, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, রোববার | | ৭ রবিউস সানি ১৪৪০




প্রধানমন্ত্রীর অভিমানটা বোধগম্য নয়!

১৩ এপ্রিল ২০১৮, ০৪:৪৪ পিএম | নকিব


এসএনএন২৪.কম :  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণের জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।  ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা আপনার প্রতি।  পাশাপাশি একথাও সবিনয়ে বলতে চাই- আপনার পাহাড়সম ব্যক্তিত্বের বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি মেনে নিতে আমাদের কষ্ট হয়। 

দেশ যখন নানা সময়ে বিভিন্ন সংকটের মুখোমুখি হয় তখন এদেশের মানুষ আপনার দিকেই চেয়ে থাকে।  সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে মানুষের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, যে কোনো সংকটের সমাধান কেবল আপনিই দিতে পারেন এবং হয়ও তা। 

কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ছাত্ররা তো কোটা ব্যবস্থার বাতিল চায়নি, চেয়েছিল সংস্কার।  আপনি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে পুরো কোটা ব্যবস্থাই বাতিলের কথা বললেন।  কেন বললেন সেটি যেমন একটি প্রশ্ন তেমনি আপনার কথাগুলোর মধ্যেও এক ধরনের রাগ ছিল ক্ষোভ ছিল অভিমান ছিল, সেটিও আমাদেরকে অনেক বেশি অবাক করেছে; করেছে প্রশ্নবিদ্ধ।  কারণ আপনি রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি।  অনুরাগ কিংবা বিরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কিছু না করতে আপনি সংবিধানের কাছে দায়বদ্ধ।  আপনি যদি মনে করে থাকেন কোটা ব্যবস্থা সত্যিই প্রশাসনকে তুলনামূলকভাবে বেশ খানিকটা মেধাশূন্য করে তুলছে তবে তো আপনার বক্তব্য স্বাভাবিক থাকার কথা ছিল।  তাই বুঝি আপনার অভিপ্রায়কে তাৎক্ষণিকভাবে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিতে আমাদের কষ্ট হয় বৈকি। 

কোটা সংস্কার নিয়ে আলোচনা চলছে দিনের পর দিন ধরে, তারই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক এই আন্দোলনের জন্ম।  এক সময় কেউ কেউ এ কথা প্রচারের চেষ্টা করলেন যে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা মেনে নিতে না পারায় স্বাধীনতা বিরোধীদের একটি অংশ কোটা সংস্কার আন্দোলনে ইন্ধন দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে।  কিন্তু আমার কাছে মনে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানিত করল, তরুণ প্রজন্মের মুখোমুখি করল অত্যুৎসাহী ওই মানুষগুলোই, দালালি যাদের সব সময়ের পেশা, কথায় কথায় যারা মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করে নিজেদের ফায়দা হাসিল করে চলেছে। 

স্বাধীনতাবিরোধী মুষ্টিমেয় কিছুসংখ্যক কুলাঙ্গার ছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ কোনো সুবিধায় কারোর কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।  সাম্প্রতিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরাও মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করে কেউ একটা কথা বলেননি।  মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের সন্তানদের জন্য সরকারি চাকরিতে কোটা রাখার ক্ষেত্রেও কারোর আপত্তি ছিল না।  এক্ষেত্রে প্রথম বিপত্তিটা অবশ্য দেখা দিল মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের জন্যও বিশেষ কোটা রাখার সিদ্ধান্তে।  তারপরও কোটা বিরোধীরা এই বিষয়টিকে আলাদা করে সামনে আনেননি।  জেলা কোটা, উপজাতি কোটা, মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ সামগ্রিক অর্থেই সরকারি চাকরিতে যে ৫৬ ভাগ জায়গা কোটাতে দখল হয়ে আছে তার বিরুদ্ধে সংগঠিত বৃহৎ আন্দোলনটি শুরু হলো মাত্র কয়েকদিন আগে ‘সাধারন ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের’ ব্যানারে।  তারপরও মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ অসম্মান করেননি।  অথচ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সেই ছাত্রদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ পেলো আপনার খানিকটা অভিমান; খানিকটা ক্ষোভ। 

কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনটা শুরু থেকেই ছিল অহিংস এবং শান্তিপূর্ণ।  ওই ছাত্র প্রতিনিধিরাই তো আপনার ওপর আস্থা রেখে আপনার দলের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলে আন্দোলন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  কিন্তু তার পরপরই যখন ওরা শুনল আন্দোলনকারীদের অধিকাংশকে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে সম্বোধন করেছেন আপনার কেবিনেটের একজন অতি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তখন পরিবর্তন হলো ছাত্রদের সিদ্ধান্তের। 

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কি আসলেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রজন্ম।  এই তরুণরাই তো জন্ম দিয়েছিল ইতিহাস জাগানিয়া গণজাগরণ মঞ্চের।  মানুষ তার অধিকারের কথা জানাতে গেলেই কেন ‘রাজাকারের বাচ্চা’ হয়ে যাবে তা আমরা বুঝি না! তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এটুকু বেশ বুঝি- হাইব্রিড কিংবা দলে অনুপ্রবেশকারীদের জন্যই বারবার আপনাকে, আপনার পরিবার এবং আপনার দলকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় সবচেয়ে বেশি। 

তারপরও আন্দোলনটা ছিল শান্তিপূর্ণ।  এক অর্থে পুরো দেশবাসীরই সমর্থন ছিল তাতে।  হঠাৎই কেন পুলিশকে আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হলো? সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে যুদ্ধংদেহী মনোভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হয়ে কেন তাদের অশান্ত হতে বাধ্য করল?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে ন্যক্কারজনক হামলার বিচার আমরা প্রতিটি বিবেকবান মানুষই দাবি করি।  কিন্তু এর দায়ভার পুরোটা আন্দোলনকারী ছাত্রদের ওপরে চাপালেন কেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? উপাচার্যের বাসভবন যেভাবে ভাঙচূর করা হয়েছে তা স্পষ্টত ঘোলা পানিতে যারা মাছ শিকার করতে চান তাদের কাজ।  এর দায়দায়িত্ব যদি ছাত্রদের ওপরেই ফেলতে চান তবে পুলিশ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কেন বাদ থাকবে আন্দোলনকে সহিংস রূপ দেওয়ার জন্য?

আমার কেন যেন মনে হচ্ছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের সাধারণ মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়ে যাচ্ছে কোনো না কোনোভাবে বুঝে কিংবা না বুঝে।  রাষ্ট্র যে মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান দিতে পারেনি এ কথা সত্য।  তাদের জন্য যতটুকু যা করা হয়েছে তার অধিকাংশই আবার আপনার হাত দিয়ে এসেছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এ কথাও সত্য।  কিন্তু তাদের সন্মান জানাতে গিয়ে সেই সূর্যসন্তানদেরই স্বপ্ন- একটা ‘স্বনির্ভর আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থার কাঠামোই’ যেন ভেঙে না যায় সেটিকেও বিবেচনায় রাখতে হবে অবশ্যই। 

আমি হলপ করে বলতে পারি, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান আর তাদের নাতি-নাতনিদের জন্য একটু বেশি সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্তের পর থেকেই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে ব্যাপকভাবে।  আর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার জন্য কথিত সার্টিফিকেট পাওয়ার আবেদনের যে হিড়িক তাতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা যেমন লজ্জা এবং কষ্ট পাচ্ছেন তেমনি অতিসাধারণ মানুষের মাঝেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এক ধরনের অসম্মানবোধ তৈরি হচ্ছে।  অথচ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা কত অসহায়, একেবারেই শান্ত চুপচাপ সবকিছুতে!

সবশেষে বলতে চাই জাতীয় সংসদে দেওয়া আপনার বক্তব্যে খানিকটা ক্ষোভ খানিকটা অভিমান খানিকটা হতাশা মেশানো থাকলেও অনেক হিসেব করেই আপনি পুরোপুরি কোটা বাতিলের কথাগুলো বলেছেন।  রাজপথে নেমে আসা ছাত্র-ছাত্রীরাও আপনার কথার প্রতি আস্থা রেখে তাদের আন্দোলন স্থগিত করেছেন।  এখন তাদের বিশ্বাসের মূল্যায়নও করতে হবে আপনাকেই এবং তা যত দ্রুত সম্ভব ততই মঙ্গল সবার।  অভিবাদন তরুণ প্রজন্মকে, অভিবাদন আপনাকে। 

মঞ্জুরুল আলম পান্না : সাংবাদিক, কলাম লেখক। 
monjurpanna777@gmail.com